📄 উকবা ইবনুল হাজ্জাজ-এর বিজয়াভিযান
উকবা ইবনুল হাজ্জাজ প্রায় সাত বছর আন্দালুসের শাসন পরিচালনা করেন। তিনি সামরিক তৎপরতায় বিশেষ দক্ষতা দেখান এবং ফ্রান্সে ইসলামের ঝাণ্ডা পুনরায় সমুন্নত করেন। তিনি ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের অনেক এলাকা জয় করেন এবং সেখানে মুসলিমদের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। তাঁর শাসনকালে বিজয় অভিযানের পাশাপাশি দাওয়াতী কার্যক্রমও সমানভাবে চলেছে। কথিত আছে, তাঁর হাতে প্রায় এক হাজার খ্রিষ্টান যুদ্ধবন্দী ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে উত্তর-পশ্চিম আন্দালুসের গ্যালিসিয়া (Galicia) অঞ্চলেও অভিযান পরিচালনা করেন। তবে পাহাড়ী দুর্গম এলাকার কারণে পাম্পলোনা বা কোভাদোঙ্গা (Covadonga) অঞ্চলে খ্রিষ্টানদের একটি ক্ষুদ্র অংশ টিকে ছিল, যারা পরবর্তীতে বড় ধরনের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামের এই মহান সৈনিক ১২৩ হিজরীতে (৭৪১ খৃষ্টাব্দে) শহীদ হন এবং তাঁর শাহাদতের মধ্য দিয়ে প্রশাসক আমলের প্রথম ধাপের সমাপ্তি ঘটে।
টিকাঃ
১৮৬. মাক্কারী, নফহুত তীব, ১/১০০।
১৮৭. ইবনে আ'যারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/২৬।
১৯৪. লেখক অজ্ঞাত, ‘আখবারুন মাজমুআ’, পৃ: ৩৫।
📄 প্রশাসক আমলের দ্বিতীয় ধাপ
প্রশাসক আমলের দ্বিতীয় স্তরের সূচনা ১২৩ হিজরীতে এবং সমাপ্তি ১৩৮ হিজরীতে (৭৪১-৭৫৬ খৃষ্টাব্দে)। এই সময়কালটি আন্দালুসের ইতিহাসে চরম অরাজকতা, গৃহযুদ্ধ এবং বিদ্রোহের কাল হিসেবে পরিচিত। এর মূলে ছিল আরব ও বার্বারদের মধ্যে ঘৃণিত বর্ণবাদ এবং সাম্প্রদায়িক সংঘাত। এই সময়ে প্রশাসনের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে যায় এবং প্রতিটি গোত্রই ক্ষমতার লোভে মত্ত হয়ে পড়ে। এই সুযোগে উত্তর-পশ্চিমের খ্রিষ্টান শক্তিগুলো শক্তিশালী হতে থাকে এবং মুসলিম ভূখণ্ডের বিভিন্ন অংশ দখল করে নেয়।
📄 মাগরেবে খারেজীদের বিদ্রোহ
উকবা ইবনুল হাজ্জাজের মৃত্যুর পর ১২৩ হিজরীতে (৭৪১ খৃষ্টাব্দে) আন্দালুসের শাসনক্ষমতা পুনরায় আব্দুল মালিক বিন কাতান আলফিহরীর হাতে চলে আসে। তাঁর এই দ্বিতীয় মেয়াদে উত্তর আফ্রিকা ও মাগরেব অঞ্চলে এক ভয়াবহ খারেজী বিদ্রোহ দেখা দেয়। খারেজীরা বার্বারদের মধ্যে আরবদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। তারা তৎকালীন তানজা-প্রশাসক এবং সুস (Sous) নগরীর প্রশাসকদের হত্যা করে। উত্তর আফ্রিকার গভর্নর ওবায়দাল্লাহ ইবনুল হাবহাব এই বিদ্রোহ দমনে সেনাবাহিনী পাঠালে ১২৩ হিজরীতে ‘শলীফাতের (পতন) যুদ্ধ’ সংঘটিত হয়, যেখানে আরব বাহিনী বার্বারদের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। খলীফা হিশাম বিন আব্দুল মালিক এই সংবাদে অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে কুলসুম বিন ইয়াজকে বিশাল বাহিনীসহ বিদ্রোহ দমনে পাঠান। কিন্তু সেখানেও মুসলিমরা অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়ে পড়ে এবং বিপর্যয়ের শিকার হয়।
টিকাঃ
১৯৭. ড. হুসাইন মুনিস, ফাতহুল আন্দালুস, পৃ: ১৭০-১৭৩।
১৯৯. ইবনে আব্দুল হাকাম, ফুতুহু মিসর ওয়াল মাগরিব, ১/২৩৭।
📄 খারেজী ফিতনা ও বিদ্রোহ এবার আন্দালুস-ভূমিতে
প্রশাসক ও প্রশাসনবিরোধী এই বিদ্রোহ কেবল উত্তর আফ্রিকায় সীমাবদ্ধ রইল না, তা দ্রুত আন্দালুসেও ছড়িয়ে পড়ল। আন্দালুসে বসবাসরত বার্বার জনগোষ্ঠী প্রশাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করল। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের গ্যালিসিয়া ও আস্তুরিয়া এলাকায় বিদ্রোহ প্রবল আকার ধারণ করে। বিদ্রোহীরা তিনটি বড় বাহিনীতে বিভক্ত হয়ে টলেডো, কর্ডোভা এবং জাজিরাতুল খাদরা বা দক্ষিণ অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে আব্দুল মালিক বিন কাতান দিশেহারা হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত তিনি মাগরেবে অবরুদ্ধ হয়ে থাকা শামী বাহিনীর নেতা বালজ বিন বিশারকে সাহায্য করার জন্য আন্দালুসে ডেকে পাঠান। শামী বাহিনী আন্দালুসে প্রবেশ করে বিদ্রোহীদের দমন করলেও পরবর্তীতে তারা নিজেরাই ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়।
টিকাঃ
১০৬. লেখক অজ্ঞাত, ‘আখবারুন মাজমুআ’, পৃ : ৪২।
১০৯. ড. হুসাইন মুনিস, ফাতহুল আন্দালুস, পৃ : ১৭৪-১৭৬।