📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 নবী ও সাহাবাযুগের এত নিকট সময়ের মহান তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন-কাফেলার সদস্যদের অন্তরে কীভাবে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও পার্থিব সম্পদ-প্রীতি জাগ্রত হল? কীভাবে তাদের মাঝে গোত্রবাদ ও জাতীয়তাবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল?

📄 নবী ও সাহাবাযুগের এত নিকট সময়ের মহান তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন-কাফেলার সদস্যদের অন্তরে কীভাবে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও পার্থিব সম্পদ-প্রীতি জাগ্রত হল? কীভাবে তাদের মাঝে গোত্রবাদ ও জাতীয়তাবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল?


বালাতুশ শুহাদা যুদ্ধে পরাজয়ের কারণাবলী নিয়ে কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, নবী ও সাহাবায়ে কেরামদের এত নিকট সময়ের মহান তাবেয়ীন ও তাবে তাবেয়ীনদের অন্তরে কীভাবে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও পার্থিব সম্পদ-প্রীতি জাগ্রত হলো? কীভাবে তাদের মাঝে গোত্রবাদ ও জাতীয়তাবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল? এই প্রশ্নের প্রথম অংশের উত্তরে আমরা বলব, এই পরাজয় যদি ১১৪ হিজরীতে হয়ে থাকে, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে? এ বহিঃপ্রকাশ তো নবীর যুগেই ৩ হিজরীতে ওহুদ যুদ্ধকালীন সাহাবীদের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল। আর এ প্রসঙ্গেই সাহাবীদের সংশোধন করে আয়াতও নাযিল হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে কিছু লোক এমন যারা দুনিয়া কামনা করছিল, আর কিছু ছিল এমন যারা চাচ্ছিল আখিরাত। অতঃপর আল্লাহ তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য তাদের থেকে তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিলেন, অবশ্য তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। আল্লাহ মুমিনের প্রতি অতি অনুগ্রহশীল।’ [সূরা আলে-ইমরান : ১৫২]। সুতরাং এ কথা বলা যায় যে, ওহুদ যুদ্ধের বাস্তবতাটিই নতুন করে বালাতুশ শুহাদা প্রান্তরে ফিরে এসেছিল। সাহাবায়ে কেরামের একটি দল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ অমান্য করায় আলোচ্য আয়াতটি নাযিল হয়। নবীজী তাদেরকে একটি পাহাড় পাহারা দেওয়ার জন্য বলেছিলেন; কিন্তু বিজয় সুনিশ্চিত ভেবে গনীমতের সম্পদের টানে তারা সেই অবস্থান ছেড়ে নিচে নেমে এসেছিল। আর তাদের এই ভুলের পরিণতিতে নিশ্চিত বিজয় পরাজয়ে রূপান্তরিত হয়েছিল। এ কারণেই হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রাযি. বলেছেন, এ আয়াতটি নাযিল হওয়ার পূর্বে আমার ধারণাই ছিল না যে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ দুনিয়া কামনা করে।

বালাতুশ শুহাদা প্রান্তরে যুদ্ধের প্রারম্ভিক দুই-তিনদিন মুসলিম বাহিনীর প্রাধান্য ছিল। এরপর খৃষ্টান বাহিনী যখন মুসলিম বাহিনীর রণকৌশলের সুযোগ নিয়ে আক্রমণ চালিয়ে সব কেড়ে নিতে উদ্যত হয়, তখন সম্পদ-প্রীতিতে আক্রান্ত মুসলিম বাহিনীর একাংশ হতভম্ব হয়ে পড়ে এবং প্রাথমিক বিজয় পরাজয়ে রূপান্তরিত হয়। আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. তাঁর তাফসীর গ্রন্থে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লেখেন: এ যুদ্ধে আল্লাহ তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করেননি; বরং নতুন করে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। বালাতুশ শুহাদা প্রান্তরে মুসলিম বাহিনী সমূলে ধ্বংস হয়নি; বরং নতুন করে উচ্চাভিলাষী হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। আমরা যদি ওহুদ যুদ্ধের দিকে আরও পূর্বে ফিরে যাই, দৃষ্টি নিবদ্ধ করি সাহাবায়ে কেরামের প্রথম অভিজ্ঞ দল বদরী জামাতের দিকে, তাহলে বদর যুদ্ধেও আমরা দেখতে পাব বালাতুশ শুহাদার ছায়া। বদর যুদ্ধের পরও মুসলমানদের মধ্যে গণীমত সম্পদ নিয়ে মতবিরোধ হয়েছিল; আর এ কারণেই বদর যুদ্ধের গৌরবময় বিজয় যে সূরার সিংহভাগ জুড়ে আলোচিত হয়েছে, সেই সূরা আনফাল শুরুই হয়েছে গণীমত প্রসঙ্গে। ইরশাদ হয়েছে, ‘(হে নবী!) লোকেরা তোমাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (সম্পদের ফয়সালা)-এর অধিকার আল্লাহ ও রাসূলের। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক শুধরে নাও। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, যদি তোমরা প্রকৃত মুমিন হও।’ [সূরা আনফাল: ০১]। এ আয়াতেও সাহাবায়ে কেরামকে সংশোধন করা হয়েছে। আর এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কেননা এটি মানব-প্রকৃতির একটি অংশ।

টিকাঃ
৩৫৪. সহীহ বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, হাদীস নং ১৫৯৬ ও ইবনে কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ২/১১৪।
৩৫৫. ইবনে কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ১/২৪০।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 জাতীয়তাবাদ ও গোত্রবাদের সমস্যা

📄 জাতীয়তাবাদ ও গোত্রবাদের সমস্যা


আর প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশের উত্তর প্রথম অংশের মতোই। কেননা এ ধরনের সাম্প্রদায়িক চিন্তা নবীর যুগের মুসলমানদের মধ্যেও প্রকাশ পেয়েছে। আর মানবপ্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এ জাতীয় চিন্তার আনাগোনা একটি পর্যায় পর্যন্ত নিন্দনীয়ও নয়; যা নবীযুগে বা বর্তমান যুগেও পরিলক্ষিত হয়। তবে ওই দুই ব্যক্তির মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য আছে, যাদের একজন এ ধরনের চিন্তায় আক্রান্ত হওয়ার পরই আত্মসমর্থনের পথে অগ্রসর হন; আর অন্যজন এই সাম্প্রদায়িক চিন্তায় ডুবে থেকে বিভেদ ও কলহ সৃষ্টি করেন। এক্ষেত্রে আমরা দুই মহান সাহাবী আবু যার রাযি. ও বেলাল রাযি.-এর সেই প্রসিদ্ধ ঘটনার কথা স্মরণ করতে পারি। কোনো একটি বিষয়ে মনোবিরোধের একপর্যায়ে আবু যার রাযি. স্বয়ং বেলাল রাযি.-কে তিরস্কার করে বলেছিলেন, ‘এই কৃষ্ণ মহিলার সন্তান!’ বেলাল রাযি. মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে নবীজিকে বিষয়টি অবহিত করলেন। নবীজী এ কথা শুনে অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন এবং আবু যার রাযি.-কে ডেকে বললেন, ‘তোমার মধ্যে তো এখনও জাহেলী যুগের স্বভাব রয়ে গেছে। জেনে রেখো, তোমাদের ক্রীতদাসেরা তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করেছেন। তাই যার অধীনে তার ভাই থাকবে, সে যেন নিজে যা খায়, তাকে তা-ই খাওয়ায়; নিজে যা পরিধান করে, তাকে তা-ই পরিধান করায়; তাদের ওপর এমন কোনো কাজ চাপিয়ে না দেয়, যা তাদের জন্য খুব কষ্টকর। যদি এমন কষ্টকর কাজের দায়িত্ব চাপাতেই চাও, তাহলে তোমরাও তাদের সে কাজে সাহায্য করবে।’

এ ঘটনার শিক্ষার দিক হলো আবু যার রাযি.-এর পরবর্তী আচরণ, যা তিনি নিজের অন্যায়ের প্রতিবিধান হিসেবে এবং নবীজীর অসন্তুষ্টি প্রশমনে করেছিলেন। আবু যার রাযি. কী করলেন? তিনি স্বয়ং বেলাল রাযি.-এর সামনে মাথা পেতে দিলেন আর বারবার তাকে পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন, যেন তিনি তাঁর পা দিয়ে আবু যরের চেহারা মাড়িয়ে দেন এবং এর মাধ্যমে তার অন্যায়ের প্রতিবিধান হয়। বেলাল রাযি. এ কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং আবু যার রাযি.কে ক্ষমা করে দিলেন। নবীযুগেই এমনই আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল আওস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে। শাস বিন কায়েস নামক জনৈক মুনাফিক উভয় গোত্রের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টি করতে আওস গোত্রের কিছু লোককে চিৎকার করে বলতে উস্কানি দিল, 'হে আওস গোত্রের লোকেরা, সাহায্য করো'। খাযরাজ গোত্রের কিছু লোকও চিৎকার করে উঠল, 'হে খাযরাজ গোত্রের লোকেরা, সাহায্য করো'। এ কথা শুনে নবীজী বললেন, 'আমি তোমাদের মাঝে বিদ্যমান থাকা অবস্থায় তোমরা এই জাহেলী উচ্চারণ মুখে আনছ?! এ ধরনের মনোভাব পরিহার করো, এটি অত্যন্ত ঘৃণ্য'।

নবীজীর ওফাতের পর বনূ হানীফা কর্তৃক বিদ্রোহের যে ঘটনা ঘটেছিল, সাম্প্রদায়িক চিন্তাধারার এর চেয়ে বড় দৃষ্টান্ত আর কী হতে পারে? এ সময় বনূ হানীফা ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে মিথ্যাবাদী মুসাইলামাতুল কাযযাবের পক্ষাবলম্বন করে। মুসাইলামাতুল কাযযাবের জনৈক অনুসারীকে তখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘তুমি কি জানো যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্যবাদী আর মুসাইলামা মিথ্যাবাদী?’ সে উত্তর দিল, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মাদ সত্যবাদী আর মুসাইলামা মিথ্যাবাদী; কিন্তু বনূ রবীআর মিথ্যাবাদী ব্যক্তি আমার কাছে বনূ মুদার-এর সত্যবাদী ব্যক্তির চেয়ে প্রিয়।’ লোকটির দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি সাম্প্রদায়িকতায় ভরপুর ছিল। ঈমানের নূর যদি তার হৃদয়কে স্পর্শ করত, তাহলে সে এ ধরনের কথা কিছুতেই বলতে পারত না। সুতরাং জাতীয়তাবাদ ও গোত্রবাদ-এর অস্তিত্ব তখনও ছিল। তবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ জাতীয় সমস্যার দ্রুত প্রতিকার করতেন, মানুষের মাঝে ঈমানী চেতনাকে ফিরিয়ে আনতেন এবং তাদেরকে আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। মহান আল্লাহর নির্দেশও হলো: ‘উপদেশ দিতে থাকো। কেননা উপদেশ মুমিনদের উপকারে আসে।’ [সূরা যারিআত: ৫৫]। নবীজীর প্রতিকার-চেষ্টা সাহাবায়ে কেরামও দ্রুত গ্রহণ করতেন এবং যা ঘটে গেছে তা ত্যাগ করে ভবিষ্যতে তার পুনরাবৃত্তি করতেন না। তাদের হৃদয়গহনে সব সময় জাগরুক থাকত মহান আল্লাহর বাণী: ‘অতঃপর যখন শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে, তখন তাদের মধ্যকার কোনো আত্মীয়তা বাকি থাকবে না এবং কেউ কাউকে কিছু জিজ্ঞেসও করবে না। তখন যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই সফলকাম হবে। আর যারা নিজেদের জন্য লোকসানের ব্যবস্থা করেছিল, তারা সদা-সর্বদা জাহান্নামে থাকবে।’ [সূরা মুমিনুন: ১০১-১০৩]।

টিকাঃ
২৫৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩০ ও সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৬১।
২৬০. তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ২/২৭৭ ও ইবনে কাছীর, আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬/৩৩০।

ফন্ট সাইজ
15px
17px