📄 প্রাথমিক অবস্থায় আন্দালুসে মুসলিম বাহিনী দুর্বল থাকা সত্ত্বেও আন্দালুসবাসী কেন তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেনি?
আন্দালুসে আগমনকারী মুসলিম বাহিনীর সর্বমোট সৈন্যসংখ্যা ছিল বিশ হাজার। তারিক বিন যিয়াদের সঙ্গে এসেছিল বার হাজার সৈন্য। এদের মধ্যে বারবাত প্রান্তরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন তিন হাজার যোদ্ধা আর বারবাত প্রান্তর থেকে টলেডোর পথে বিভিন্ন অভিযানে শহীদ হয়েছিলেন সহস্রাধিক যোদ্ধা। অর্থাৎ তারিক বিন যিয়াদ টলেডো পৌঁছেছিলেন মাত্র ছয় হাজার সৈন্য নিয়ে। এরপর মুসা বিন নুসাইর আঠার হাজার সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আন্দালুস-ভূমিতে পা রাখেন। ফলে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা চব্বিশ হাজারে পৌঁছে। পরবর্তী সময়ে আবার এদেরকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত করে অবিজিত বিভিন্ন অঞ্চল জয় করার উদ্দেশ্যে বিস্তৃত আন্দালুস-ভূমির বিভিন্ন এলাকায় এবং দক্ষিণ ফ্রান্সের কিছু অঞ্চলে প্রেরণ করা হয়। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই এ প্রশ্ন উঠতে পারে যে, সুযোগ ও শক্তি থাকা সত্ত্বেও আন্দালুসবাসীরা কেন মুসলিম প্রশাসনের বিরুদ্ধে বা আপন আপন অঞ্চলে বিদ্যমান ক্ষুদ্র সৈন্যদলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেনি? অথচ প্রতিটি অঞ্চলের অধিবাসীদের তুলনায় মুসলিম সৈন্যদের পরিমাণ এত কম ছিল যে, তুলনা করাও অবান্তর।
আসলে এ প্রশ্নই পুরোপুরি অবান্তর ও বিস্ময়কর! সঠিক প্রশ্ন তো এই হতে পারে যে, আন্দালুসবাসী বিদ্রোহ করবে কেন? এ প্রশ্ন মোটেই সংগত নয় যে, তারা বিদ্রোহ করেনি কেন?! মুসলিম বাহিনীর অভিযানের পূর্বে আন্দালুসী জীবন অতিক্রান্ত হচ্ছিল নিপীড়ন-নিষ্পেষণ, অত্যাচার-অবিচার ও প্রচণ্ড দারিদ্র্যের এক অন্ধকারাচ্ছন্ন জগতে। তাদের সম্পদ লুট করা হতো, সম্মান-মর্যাদা পদদলিত হতো; কিন্তু না এর বিচার ছিল, না ছিল বিচারপ্রার্থীর অধিকার। শাসকগোষ্ঠী জনগণের সম্পদে রাজকীয় প্রাসাদ গড়ত আর বিলাসিতায় দিন অতিবাহিত করত; অপরদিকে সাধারণ জনগণ ভীষণ কষ্টে পচা-গলা খাদ্যের খোঁজে হয়রান হয়ে ঘুরত। রোদে পুড়ে তারা ক্ষেত-খামারে কাজ করত, ফল ও ফসল জমা হতো অন্যের ভাণ্ডারে। শুধু তা-ই নয়, নিজেদের চাষ করা জমি-জমা সহ তারা নিজেরাও কেনা-বেচা হতো! তাহলে আন্দালুসবাসী কেন বিদ্রোহ করবে? তারা এমন শাসকদের আগমন প্রত্যাশায় বিদ্রোহ করবে, যারা তাদের ওপর দেবে নানা রূপ আযাব-যন্ত্রণা?! নাকি তারা বিদ্রোহ করবে নতুন কোনো রাজাকে পাওয়ার প্রত্যাশায়? তারা বিদ্রোহ করবে নিদারুণ দুর্ভিক্ষ, লুণ্ঠন ও ছিনতাই, নির্যাতন ও নিপীড়ন এবং প্রশাসনের হাতে পিষ্ট হওয়ার সেই অতীত স্মৃতিকে নতুন করে ফিরিয়ে আনতে?
এই দুঃসহ জীবনের অবসানের পর আন্দালুসবাসী কী পেয়েছিল? মুসলিম অভিযাত্রীরা আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে তাদের জন্য নিয়ে এসেছিলেন 'ইসলাম'। সেই ইসলাম, যা পূর্বের সকল অন্যায় বিধান ও প্রচলনকে নিষিদ্ধ করেছে আর আন্দালুসবাসীকে বলতে এসেছে, এসো, আমি তোমাদেরকে অন্যায়ের পরিবর্তে ন্যায়ের সমাজ উপহার দেব। এটা আমার পক্ষ থেকে তোমাদের প্রতি কৃপা-দান নয়; বরং তোমাদের, তোমাদের জাতি ও রাষ্ট্রের, তোমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার। আমি সেই ইসলাম, যাতে শাসক-শাসিতের অধিকারে কোনো ব্যবধান নেই। যদি তোমাদের কেউ অন্যায়ের বিচার নিয়ে দাঁড়ায় ইসলামী রাষ্ট্রের বিচারকের দরবারে, বিচারক বিবেচনা করবেন না যে কে মুসলমান আর কে খ্রিষ্টান; তিনি দেখবেন না বাদী-বিবাদীর জাতি-বর্ণ বা বংশ; তিনি দেখবেন ন্যায় নীতির পক্ষে, সত্যের পক্ষে। আমি সেই ইসলাম, যাতে মানুষের সম্মান ও মূল্য তার সম্পদ বা ক্ষমতার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয় না; বরং প্রত্যেকের মর্যাদা নির্দিষ্ট করা হয় তার তাকওয়া বা খোদাভীতি দিয়ে। আর ইসলামে তো সকল সম্পদের অধিকার ও সুযোগ শ্রেণি-বৈষম্যহীন, শাসক-শাসিত সকলের জন্য সমভাবে অবধারিত।
আমি সেই ইসলাম, যার অনুসারী শাসক তোমাকে বলবে, যদি তুমি মুসলমান হও এবং সম্পদশালী হও, তাহলে তোমাকে প্রদান করতে হবে মাত্র ২.৫% সম্পদ যাকাত হিসেবে; যদি তা নিসাব পরিমাণ হয় এবং নিসাব-সম্পদ এক বছর অতিবাহিত হয়। আর যদি তুমি অভাবী ও দরিদ্র হও, তাহলে তোমার কিছুই প্রদান করতে হবে না; বরং নিজে স্বাবলম্বী হওয়া পর্যন্ত বাইতুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) থেকে তুমি লাভ করবে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা। আর যদি তুমি অমুসলিম হও, সম্পদে ও শক্তিতে সামর্থ্যবান; তাহলে তোমাকে জিযিয়া প্রদান করতে হবে, যার পরিমাণ মুসলমানদের যাকাতের চেয়ে অনেক কম। এই জিযিয়া তুমি প্রদান করবে মুসলিম সরকার কর্তৃক তোমাকে প্রদানকৃত নিরাপত্তার বিনিময়ে। যদি তারা তোমাকে নিরাপত্তা প্রদানে ব্যর্থ হয়, তবে তোমার প্রদানকৃত সম্পদ তোমাকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। আর যদি তুমি সম্পদশালী না হও কিংবা হও বৃদ্ধ ও অক্ষম, তাহলে তোমার কিছুই প্রদান করতে হবে না, বিনা জিযিয়ায় তুমি লাভ করবে মুসলিম সরকারের নিরাপত্তা। ইসলাম তো আন্দালুসবাসীর কাছে এসেছিল মুক্তি ও শান্তির পয়গাম নিয়ে। আর তাই ইসলামকে তারা আঁকড়ে ধরেছে এবং আপন করে নিয়েছে। তারা পারেনি ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে এবং অন্যায়-নিপীড়ন, লাঞ্ছনা-বঞ্চনার তিক্ততাকে পুনরায় ফিরিয়ে পাওয়ার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের চিরস্থায়ী শান্তিকে বিসর্জন দিতে।
টিকাঃ
১। লেখক অনুবাদ, ‘আখবারুন মাজমুআ’, পৃ: ১৭, ইবনে আ’যারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/৬ ও মাক্কারী, নফহুত তীব, ১/২১৪।
২। লেখক অনুবাদ, ‘আখবারুন মাজমুআ’, পৃ: ২১।
📄 পুরো আন্দালুস-ভূমিতে একজন ব্যক্তিও কি এমন ছিল না, যে ক্ষমতার মোহে বা ব্যক্তিস্বার্থে বিদ্রোহ করার ইচ্ছা করবে?
এ প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলব, কেন থাকবে না; নিশ্চয়ই আন্দালুস-ভূমিতে এমন অনেক স্বার্থান্বেষী মানুষের অস্তিত্ব ছিল, যাদের ছিল প্রচুর অনুসারী ও সহযোগী; যারা নিজেদের হারানো প্রতিপত্তিকে ফিরে পেতে এবং নিজেদের স্বার্থ বাস্তবায়ন করতে ইসলামী হুকুমতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার ইচ্ছাও লালন করত। তারপরও কেন তারা বিদ্রোহ করেনি, সে প্রশ্নের উত্তর রয়েছে পবিত্র কুরআনের এই আয়াতে— ‘(হে মুসলিমগণ!) প্রকৃতপক্ষে তাদের অন্তরে আল্লাহর চেয়ে তোমাদের ভয়ই বেশি। তা এজন্য যে, তারা এমনই এক সম্প্রদায়, যাদের বুঝ-সমঝ নেই।’ [সূরা হাশর: ১৪]। যে যুগে মুসলমানগণ নিয়মিত জিহাদ পরিচালনা করত, সে যুগে ইহুদি-নাসারা ও মুশরিকদের অন্তরে মুসলিমদের প্রতি এক প্রকার ভয় ও প্রভাব বিরাজমান ছিল। আল্লাহ তা’আলা মুসলিমদেরকে এক আশ্চর্য গাম্ভীর্য ও প্রভাব দান করে থাকেন। তাই কাফের-মুশরিকরা সবাইকে তাদেরকে ভক্তি বা শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আমাকে এমন প্রভাব দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে যা এক মাসের দূরত্ব পর্যন্ত অনুভূত হয়।’
অতএব আল্লাহ তাদের কাছে এমন দিক থেকে এলেন, যা তারা ধারণাও করতে পারেনি। আল্লাহ তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করলেন। [সূরা হাশর : ০২]। অমুসলিমদের অন্তরে মুসলিমদের প্রতি এই ভয় ও প্রভাব সৃষ্টির নেপথ্য কারণ এই নয় যে, মুসলমানগণ যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো ধরনের জাদুকরী আচরণ করেন, কিংবা তারা নজিরবিহীন নৃশংস কোনো অপরাধ করেন। বরং এ ভীতি আল্লাহর সৈনিক ও আল্লাহওয়ালাদের জন্য বরাদ্দকৃত ইজ্জত-সম্মান ও প্রভাবের এক উপহার। মুসলমানদের যুদ্ধ ও যুদ্ধকালীন আচরণ তো মানুষের জন্য উচ্চতর আদর্শের নজির; বরং সকলের জন্য করুণা ও রহমত। মুসলিম শরীফে যেমনি বুরাইদা রাযি.-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, নবীজী যখন মুসলিম সৈন্যদেরকে বিদায় জানাতেন, তখন তাদের সম্বোধন করে বলতেন, তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করবে। তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে। যুদ্ধ করো; তবে সীমা লঙ্ঘন করো না, প্রতারণা করো না, নিহত ব্যক্তির অঙ্গ বিকৃত করো না এবং কোনো শিশুকে হত্যা করো না। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, তোমরা কোনো বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিকে, শিশু-কিশোরকে বা নারীকে হত্যা করো না।
অমুসলিমরা যখন মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধ করে, তখন কোথায় থাকে এসব নীতি-আদর্শ? বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ও কসোভোতে দুই লক্ষ মুসলিম নাগরিককে নির্মমভাবে হত্যা করার সময় কোথায় ছিল এই নীতি-আদর্শ? চেচনিয়ায় রুশ বাহিনীর নির্যাতনের সময়, কাশ্মীরে ভারতীয়দের হত্যা-উৎসবের সময়, ফিলিস্তিনে ইসরাঈলী ইহুদিদের নিয়মিত কামানের গোলার সময় এবং আফগানিস্তান ও ইরাকে আমেরিকার অন্যায় আগ্রাসনের সময় কোথায় থাকে এই নীতি ও আদর্শ? যদিও শত্রুর অন্তরে ঢেলে দেওয়া হয়েছে মুমিনের ভয়, তারপরও মুসলমানদের যুদ্ধ-বিধান পৃথিবীবাসীর জন্য দয়া ও রহমত। বরং ইসলামী শাসনের ছায়ায় বসবাস করাও অমুসলিমদের জন্য পরম সৌভাগ্যের কারণ। কারণ, কুরআনের ভাষায় ইসলামের বিধান হলো, যারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘর-বাড়ি থেকে বহিষ্কার করেনি, তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে ও তাদের প্রতি ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ইনসাফকারীদেরকে ভালোবাসেন। [সূরা মুমতাহিনা : ০৮]। মুসলিম রাষ্ট্রে অমুসলিমদের উপাসনালয় তাদের হাতেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের জান-মালের নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এমনকি বিচারপ্রার্থনায় মুসলিম-অমুসলিম কোনো বিভেদ রাখা হয়নি। সুতরাং আন্দালুসীদের বিদ্রোহ করলেই বরং বিস্ময়ের বিষয় হতো। যে ইসলাম আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতাকে মহান স্রষ্টার পক্ষ থেকে, মহা প্রজ্ঞাময় সর্বজ্ঞাত সত্তার পক্ষ থেকে প্রদান করেছে; যিনি জানেন সৃষ্টি ও সৃষ্টিজগতের কল্যাণ, যিনি জানেন চোখের দেখা ও অন্তরের গোপন চিন্তাও; সে ইসলামের বিরুদ্ধে যদি তারা বিদ্রোহ করত, তবেই বরং তা বিস্ময়ের বিষয় হতো।
টিকাঃ
৩৫১. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৭৩১।
৩৫২. সুনান আবূ দাউদ, হাদীস নং ২৬১২।
৩৫৩. নীতি-আদর্শ ও বিবেকশূন্যতার উদাহরণ হলো মায়ানমারের আরাকান প্রদেশের মুসলিম-নিধনের ঘটনা। জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
📄 নবী ও সাহাবাযুগের এত নিকট সময়ের মহান তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন-কাফেলার সদস্যদের অন্তরে কীভাবে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও পার্থিব সম্পদ-প্রীতি জাগ্রত হল? কীভাবে তাদের মাঝে গোত্রবাদ ও জাতীয়তাবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল?
বালাতুশ শুহাদা যুদ্ধে পরাজয়ের কারণাবলী নিয়ে কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, নবী ও সাহাবায়ে কেরামদের এত নিকট সময়ের মহান তাবেয়ীন ও তাবে তাবেয়ীনদের অন্তরে কীভাবে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও পার্থিব সম্পদ-প্রীতি জাগ্রত হলো? কীভাবে তাদের মাঝে গোত্রবাদ ও জাতীয়তাবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল? এই প্রশ্নের প্রথম অংশের উত্তরে আমরা বলব, এই পরাজয় যদি ১১৪ হিজরীতে হয়ে থাকে, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে? এ বহিঃপ্রকাশ তো নবীর যুগেই ৩ হিজরীতে ওহুদ যুদ্ধকালীন সাহাবীদের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল। আর এ প্রসঙ্গেই সাহাবীদের সংশোধন করে আয়াতও নাযিল হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে কিছু লোক এমন যারা দুনিয়া কামনা করছিল, আর কিছু ছিল এমন যারা চাচ্ছিল আখিরাত। অতঃপর আল্লাহ তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য তাদের থেকে তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিলেন, অবশ্য তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। আল্লাহ মুমিনের প্রতি অতি অনুগ্রহশীল।’ [সূরা আলে-ইমরান : ১৫২]। সুতরাং এ কথা বলা যায় যে, ওহুদ যুদ্ধের বাস্তবতাটিই নতুন করে বালাতুশ শুহাদা প্রান্তরে ফিরে এসেছিল। সাহাবায়ে কেরামের একটি দল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ অমান্য করায় আলোচ্য আয়াতটি নাযিল হয়। নবীজী তাদেরকে একটি পাহাড় পাহারা দেওয়ার জন্য বলেছিলেন; কিন্তু বিজয় সুনিশ্চিত ভেবে গনীমতের সম্পদের টানে তারা সেই অবস্থান ছেড়ে নিচে নেমে এসেছিল। আর তাদের এই ভুলের পরিণতিতে নিশ্চিত বিজয় পরাজয়ে রূপান্তরিত হয়েছিল। এ কারণেই হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রাযি. বলেছেন, এ আয়াতটি নাযিল হওয়ার পূর্বে আমার ধারণাই ছিল না যে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ দুনিয়া কামনা করে।
বালাতুশ শুহাদা প্রান্তরে যুদ্ধের প্রারম্ভিক দুই-তিনদিন মুসলিম বাহিনীর প্রাধান্য ছিল। এরপর খৃষ্টান বাহিনী যখন মুসলিম বাহিনীর রণকৌশলের সুযোগ নিয়ে আক্রমণ চালিয়ে সব কেড়ে নিতে উদ্যত হয়, তখন সম্পদ-প্রীতিতে আক্রান্ত মুসলিম বাহিনীর একাংশ হতভম্ব হয়ে পড়ে এবং প্রাথমিক বিজয় পরাজয়ে রূপান্তরিত হয়। আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. তাঁর তাফসীর গ্রন্থে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে লেখেন: এ যুদ্ধে আল্লাহ তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করেননি; বরং নতুন করে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। বালাতুশ শুহাদা প্রান্তরে মুসলিম বাহিনী সমূলে ধ্বংস হয়নি; বরং নতুন করে উচ্চাভিলাষী হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। আমরা যদি ওহুদ যুদ্ধের দিকে আরও পূর্বে ফিরে যাই, দৃষ্টি নিবদ্ধ করি সাহাবায়ে কেরামের প্রথম অভিজ্ঞ দল বদরী জামাতের দিকে, তাহলে বদর যুদ্ধেও আমরা দেখতে পাব বালাতুশ শুহাদার ছায়া। বদর যুদ্ধের পরও মুসলমানদের মধ্যে গণীমত সম্পদ নিয়ে মতবিরোধ হয়েছিল; আর এ কারণেই বদর যুদ্ধের গৌরবময় বিজয় যে সূরার সিংহভাগ জুড়ে আলোচিত হয়েছে, সেই সূরা আনফাল শুরুই হয়েছে গণীমত প্রসঙ্গে। ইরশাদ হয়েছে, ‘(হে নবী!) লোকেরা তোমাকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (সম্পদের ফয়সালা)-এর অধিকার আল্লাহ ও রাসূলের। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক শুধরে নাও। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর, যদি তোমরা প্রকৃত মুমিন হও।’ [সূরা আনফাল: ০১]। এ আয়াতেও সাহাবায়ে কেরামকে সংশোধন করা হয়েছে। আর এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কেননা এটি মানব-প্রকৃতির একটি অংশ।
টিকাঃ
৩৫৪. সহীহ বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, হাদীস নং ১৫৯৬ ও ইবনে কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ২/১১৪।
৩৫৫. ইবনে কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ১/২৪০।
📄 জাতীয়তাবাদ ও গোত্রবাদের সমস্যা
আর প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশের উত্তর প্রথম অংশের মতোই। কেননা এ ধরনের সাম্প্রদায়িক চিন্তা নবীর যুগের মুসলমানদের মধ্যেও প্রকাশ পেয়েছে। আর মানবপ্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ এ জাতীয় চিন্তার আনাগোনা একটি পর্যায় পর্যন্ত নিন্দনীয়ও নয়; যা নবীযুগে বা বর্তমান যুগেও পরিলক্ষিত হয়। তবে ওই দুই ব্যক্তির মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য আছে, যাদের একজন এ ধরনের চিন্তায় আক্রান্ত হওয়ার পরই আত্মসমর্থনের পথে অগ্রসর হন; আর অন্যজন এই সাম্প্রদায়িক চিন্তায় ডুবে থেকে বিভেদ ও কলহ সৃষ্টি করেন। এক্ষেত্রে আমরা দুই মহান সাহাবী আবু যার রাযি. ও বেলাল রাযি.-এর সেই প্রসিদ্ধ ঘটনার কথা স্মরণ করতে পারি। কোনো একটি বিষয়ে মনোবিরোধের একপর্যায়ে আবু যার রাযি. স্বয়ং বেলাল রাযি.-কে তিরস্কার করে বলেছিলেন, ‘এই কৃষ্ণ মহিলার সন্তান!’ বেলাল রাযি. মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে নবীজিকে বিষয়টি অবহিত করলেন। নবীজী এ কথা শুনে অত্যন্ত রাগান্বিত হলেন এবং আবু যার রাযি.-কে ডেকে বললেন, ‘তোমার মধ্যে তো এখনও জাহেলী যুগের স্বভাব রয়ে গেছে। জেনে রেখো, তোমাদের ক্রীতদাসেরা তোমাদেরই ভাই। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তোমাদের অধীনস্থ করেছেন। তাই যার অধীনে তার ভাই থাকবে, সে যেন নিজে যা খায়, তাকে তা-ই খাওয়ায়; নিজে যা পরিধান করে, তাকে তা-ই পরিধান করায়; তাদের ওপর এমন কোনো কাজ চাপিয়ে না দেয়, যা তাদের জন্য খুব কষ্টকর। যদি এমন কষ্টকর কাজের দায়িত্ব চাপাতেই চাও, তাহলে তোমরাও তাদের সে কাজে সাহায্য করবে।’
এ ঘটনার শিক্ষার দিক হলো আবু যার রাযি.-এর পরবর্তী আচরণ, যা তিনি নিজের অন্যায়ের প্রতিবিধান হিসেবে এবং নবীজীর অসন্তুষ্টি প্রশমনে করেছিলেন। আবু যার রাযি. কী করলেন? তিনি স্বয়ং বেলাল রাযি.-এর সামনে মাথা পেতে দিলেন আর বারবার তাকে পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন, যেন তিনি তাঁর পা দিয়ে আবু যরের চেহারা মাড়িয়ে দেন এবং এর মাধ্যমে তার অন্যায়ের প্রতিবিধান হয়। বেলাল রাযি. এ কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং আবু যার রাযি.কে ক্ষমা করে দিলেন। নবীযুগেই এমনই আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল আওস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে। শাস বিন কায়েস নামক জনৈক মুনাফিক উভয় গোত্রের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টি করতে আওস গোত্রের কিছু লোককে চিৎকার করে বলতে উস্কানি দিল, 'হে আওস গোত্রের লোকেরা, সাহায্য করো'। খাযরাজ গোত্রের কিছু লোকও চিৎকার করে উঠল, 'হে খাযরাজ গোত্রের লোকেরা, সাহায্য করো'। এ কথা শুনে নবীজী বললেন, 'আমি তোমাদের মাঝে বিদ্যমান থাকা অবস্থায় তোমরা এই জাহেলী উচ্চারণ মুখে আনছ?! এ ধরনের মনোভাব পরিহার করো, এটি অত্যন্ত ঘৃণ্য'।
নবীজীর ওফাতের পর বনূ হানীফা কর্তৃক বিদ্রোহের যে ঘটনা ঘটেছিল, সাম্প্রদায়িক চিন্তাধারার এর চেয়ে বড় দৃষ্টান্ত আর কী হতে পারে? এ সময় বনূ হানীফা ইসলামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে মিথ্যাবাদী মুসাইলামাতুল কাযযাবের পক্ষাবলম্বন করে। মুসাইলামাতুল কাযযাবের জনৈক অনুসারীকে তখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ‘তুমি কি জানো যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্যবাদী আর মুসাইলামা মিথ্যাবাদী?’ সে উত্তর দিল, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মাদ সত্যবাদী আর মুসাইলামা মিথ্যাবাদী; কিন্তু বনূ রবীআর মিথ্যাবাদী ব্যক্তি আমার কাছে বনূ মুদার-এর সত্যবাদী ব্যক্তির চেয়ে প্রিয়।’ লোকটির দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি সাম্প্রদায়িকতায় ভরপুর ছিল। ঈমানের নূর যদি তার হৃদয়কে স্পর্শ করত, তাহলে সে এ ধরনের কথা কিছুতেই বলতে পারত না। সুতরাং জাতীয়তাবাদ ও গোত্রবাদ-এর অস্তিত্ব তখনও ছিল। তবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ জাতীয় সমস্যার দ্রুত প্রতিকার করতেন, মানুষের মাঝে ঈমানী চেতনাকে ফিরিয়ে আনতেন এবং তাদেরকে আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। মহান আল্লাহর নির্দেশও হলো: ‘উপদেশ দিতে থাকো। কেননা উপদেশ মুমিনদের উপকারে আসে।’ [সূরা যারিআত: ৫৫]। নবীজীর প্রতিকার-চেষ্টা সাহাবায়ে কেরামও দ্রুত গ্রহণ করতেন এবং যা ঘটে গেছে তা ত্যাগ করে ভবিষ্যতে তার পুনরাবৃত্তি করতেন না। তাদের হৃদয়গহনে সব সময় জাগরুক থাকত মহান আল্লাহর বাণী: ‘অতঃপর যখন শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে, তখন তাদের মধ্যকার কোনো আত্মীয়তা বাকি থাকবে না এবং কেউ কাউকে কিছু জিজ্ঞেসও করবে না। তখন যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই সফলকাম হবে। আর যারা নিজেদের জন্য লোকসানের ব্যবস্থা করেছিল, তারা সদা-সর্বদা জাহান্নামে থাকবে।’ [সূরা মুমিনুন: ১০১-১০৩]।
টিকাঃ
২৫৯. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩০ ও সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৬১।
২৬০. তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ২/২৭৭ ও ইবনে কাছীর, আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬/৩৩০।