📄 বিপর্যয়কর বিজয়!
আমাদের এ শিরোনাম অনেক পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য মনে হতে পারে। বিজয় আবার বিপর্যয়কর হয় কী করে! কিন্তু এটাই ইতিহাস-স্বীকৃত বাস্তবতা। নিরপেক্ষ অনেক ইউরোপীয় ঐতিহাসিকও বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছেন। নোবেল বিজয়ী প্রখ্যাত ফরাসি লেখক আনাতোল ফ্রাঁস (Anatole France) বলেছেন, ফরাসি ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো পয়টিয়ার্সের (বালাতুশ শুহাদা) যুদ্ধ। ৭৩২ খ্রিস্টাব্দে চার্লস মার্টেল যখন পয়টিয়ার্সে আরব (মুসলিম) বাহিনীকে পরাজিত করেন, তখন মূলত আরব সভ্যতা ইউরোপীয় অসভ্যতা ও বর্বরতার কাছে বাধা পেয়ে থমকে দাঁড়ায়।
টিকাঃ
১৮৬. দেখুন: বাকবী আবু আলীম, ফাতহুন উন্দালা, পৃ: ৪৪ ও আবদুর রহমান আলআন্দালুসী, তাওরীখুন উন্দালুসী, পৃ: ১৯৯-২০০।
📄 ইতিহাস ও বাস্তবতা
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, 'হে মানুষ! নিশ্চয়ই আল্লাহর ওয়াদা সত্য। সুতরাং এই পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে কিছুতেই ধোঁকায় না ফেলে এবং আল্লাহ সম্পর্কেও যেন মহা ধোকাবাজ (শয়তান) তোমাদেরকে ধোঁকা না ফেলে।' [সুরা ফাতির: ০৫]। আন্দালুসের বিজয় ছিল এক মহাপরীক্ষা। মুসলমানগণ যুগে যুগে বিজিত ভূখণ্ডের অবারিত সম্পদের মোহে পড়েছে এবং সম্পদের দরুণই প্রতিযোগিতায় পরস্পর হানাহানিতে লিপ্ত হয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদের জন্য দারিদ্র্যের আশঙ্কা করি না; বরং আমি আশঙ্কা করি যে, তোমাদের কাছে দুনিয়ার প্রাচুর্য এসে যাবে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের কাছে এসেছিল; তখন তোমরা তা লাভ করতে পরস্পর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে, যেভাবে তারা লিপ্ত হয়েছিল। এ ধন-সম্পদ তাদেরকে যেভাবে ধ্বংস করেছিল, তোমাদেরকেও তেমনিভাবে ধ্বংস করে দেবে।' সুতরাং মহান আল্লাহর শাশ্বত রীতি হলো, নেককার বান্দারা যদি সম্পদ-আকর্ষণে প্রলুব্ধ হয়ে পড়ে, তবে সেই বৈষয়িক সম্পদই তাদের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মুসলিম বাহিনী আরেকটি প্রতিকূলতার শিকার হয়েছিল—তা হলো আরব ও আমাজিগদের মাঝে জাতিগত বৈরিতা ও সাম্প্রদায়িক মনোভাব। এই বিষবাষ্প মুসলমানদের জন্য কতটা ভয়াবহ ছিল, ফ্রান্স তা ইতিহাসেও যেমন সংরক্ষণ করে রেখেছে, তেমনি যুগে যুগে নিজেদের স্মৃতিপটে ধরে রেখেছে। এর শত শত বছর পরে ৯৫০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রাঙ্করা যখন আলজেরিয়ায় অনুপ্রবেশ করে, তখন তারা আলজেরিয়ানদের মধ্যে আরব-আমাজিগ জাতি-বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তারা বলতে থাকে যে, আমাজিগরা আর্য এবং ফরাসিরাও আর্য, তাই আরবরা হলো বহিরাগত। ফরাসিরা আমাজিগ ভাষা শিক্ষার জন্য আলাদা একাডেমি তৈরি করে আরবী ভাষার প্রভাব কমানোর চেষ্টা করে। অথচ সেই ফ্রান্সেই ১৯৯৬ সালে যখন প্রধানমন্ত্রী লিওনেল জসপিন (Lionel Jospin) আঞ্চলিক ভাষার সংরক্ষণে একটি প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তখন প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক (Jacques Chirac) তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, এ প্রকল্পের মাধ্যমে কি আপনি ফ্রান্সকে বলকান অঞ্চলে পরিণত করতে চান?! অর্থাৎ এ জাতীয় প্রকল্প তাদের দৃষ্টিতে নিজ ভূমিতে অবৈধ হলেও মুসলিম দেশে তারা তা বৈধ মনে করে।
টিকাঃ
১৮৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৪২৩ ও সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৯৬১।
১. দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একটি ঐতিহাসিক উপদ্বীপকে বলকান অঞ্চল বলা হয়। বর্তমানে বিভক্ত বলকান অঞ্চলের রাষ্ট্রসমূহ মোট ১১টি: ১. আলবেনিয়া ২. বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা ৩. বুলগেরিয়া ৪. ক্রোয়েশিয়া ৫. মন্টেনীগ্রো ৬. গ্রীস ৭. ম্যাকিডোনিয়া ৮. সার্বিয়া ৯. কসোভা ১০. রোমানিয়া ১১. স্লোভেনিয়া।
২. কাফি মুফাতীহ, ‘দাওয়াতু কিউরাহিল আন্দালুসিয়া' শীর্ষক প্রবন্ধ, আল-আহরাম পত্রিকা, ৫/৭/২০০০ খৃস্টাব্দ।