📄 ইতিহাস ও যুদ্ধইতিহাস-গ্রন্থ নিয়ে একটি পর্যালোচনা
বালাতুশ শুহাদার যুদ্ধকে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা আমরা ইসলামী ইতিহাসের খুব বেশি যুদ্ধের ক্ষেত্রে পাইনি। আর তা হলো, ইসলামী ঐতিহাসিকরা এই যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ বর্ণনায় প্রায় সম্পূর্ণ নীরব থেকেছেন। প্রকৃতপক্ষে এটি এমন এক বিস্ময়কর বিষয়, যার গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যাখ্যা আমরা আজও খুঁজে পাইনি। মুসলিম ঐতিহাসিকগণ কোনো পরাজয়ের ইতিহাস বর্ণনা করতে কখনোই দ্বিধা বা কার্পণ্য করেননি, সে পরাজয় যত নির্মম ও বেদনাদায়কই হোক না কেন; না আন্দালুসের ইতিহাস বর্ণনায়, না অন্যান্য যুগের ইতিহাসের ক্ষেত্রে। উদাহরণস্বরূপ, জুলাইহীন থেকে শুরু করে সুদূর অতীত বা নিকট অতীত, এমনকি অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটেনি। আমরা ধারণা করতে পারি যে, হয়তো এই যুদ্ধ সম্পর্কে লিখিত ঐতিহাসিক পাণ্ডুলিপি কোথাও লুকিয়ে আছে এবং তা প্রকাশিত হওয়ার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে। মিসরের প্রখ্যাত লেখক ও গবেষক এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক ডক্টর ইসমাইল মুমিন এ বিষয়ে যা বলেছেন, তা-ই উল্লেখ করা সংগত। তিনি এই যুদ্ধের বিবরণ সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণের আশ্চর্য নীরবতায় বিস্মিত হয়ে এর কারণ অনুসন্ধান করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত এ কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, বাস্তবে এর একটিই কারণ। আর তা হলো, এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর পরাজয় এতটা নির্মম ও বেদনাদায়ক ছিল যে, প্রথমদিকের ঐতিহাসিকগণ প্রচণ্ড মর্মবেদনা ও দুঃখবোধের কারণে এর সামান্য আলোচনাকেও সম্পূর্ণরূপে পরিহার করেছেন। ফলে এর তথ্যাদি বিস্মৃতির অতল গর্ভে হারিয়ে গেছে। পরবর্তীতে ঐতিহাসিকগণ শুধু এতটুকু তথ্য ছাড়া আর কিছুই লাভ করতে পারেননি যে, ১১৪ ও ১১৫ হিজরীর মাঝে সংঘটিত এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী অত্যন্ত নির্মমভাবে পরাজিত হয়েছিল। ইসলামী ইতিহাস যখন এ বিষয়ে নীরব, তখন আমাদের একমাত্র অবলম্বন হলো ইউরোপীয় খ্রিষ্টান ঐতিহাসিকগণের বর্ণনাসমূহ। ইউরোপীয় বর্ণনাসমূহে বিশদভাবে এ যুদ্ধের কথা আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু এসব বর্ণনা অনেক ক্ষেত্রে অতিশয়োক্তির দোষে দুষ্ট। ইউরোপীয় ঐতিহাসিকগণ এ যুদ্ধকে খ্রিষ্টবাদের উদ্ধার বলে অভিহিত করেছেন। সুতরাং বালাতুশ শুহাদা যুদ্ধের যেসব বিস্তারিত বিবরণ আমরা জানতে পারি, তা সবই একমাত্র ইউরোপীয় উৎস থেকেই নেওয়া।
টিকাঃ
১৮৩. ড. ইবনুল মুসলিম, কাজ্জাজুল আলমাদলুস, পৃ: ২২৯।
📄 সংখ্যাধিক্য ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ-প্রাচুর্য পরাজয়ের অন্যতম কার্যকারণ
যদিও আবদুর রহমান আলগাফিকীর নেতৃত্বাধীন এ বাহিনী সৈন্যসংখ্যায় বিশাল ছিল, কিন্তু আকস্মিকভাবেই মুসলিম বাহিনী এক গুরুতর সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল। আর তা হলো, মুসলিম বাহিনী অনেকগুলো শহর জয় করার পর পয়টিয়ার্সে (Poitiers) শিবির স্থাপন করেছিল। ফলে মুসলিম বাহিনীর হাতে জমা হয়েছিল প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ। এ কারণে মুসলিম বাহিনীর মনোযোগ নিবদ্ধ ছিল যুদ্ধলব্ধ সম্পদের প্রতি। যুদ্ধলব্ধ এই বিশাল সম্পদই তাদের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আবদুর রহমান আলগাফিকী যখন পয়টিয়ার্সে পৌঁছলেন, তখন পুরোনো একটি সমস্যা নতুন করে জেগে ওঠে। আরব ও আমাজিগ গোত্রের মুসলমানদের মাঝে নতুন করে জাগ্রত হয় সেই সাম্প্রদায়িক চিন্তা, যা ইতঃপূর্বে আন্দালুসে দূরীভূত হয়েছিল। যুদ্ধলব্ধ সম্পদের বণ্টন-বিধান সুষ্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তা নিয়ে উভয় গোষ্ঠী বিবাদে জড়িয়ে পড়েছিল। প্রত্যেকেই অপরের হাতে থাকা সম্পদের দিকে দৃষ্টি দিচ্ছিল। দল যখন ভারী হয়, তখন এক ধরনের অহংকার মানুষকে ঘিরে ধরে। আন্দালুসের ইতিহাসে আর কখনোই মুসলিম বাহিনী এত অধিক সৈন্যসংখ্যার অধিকারী ছিল না। তারা ভেবেছিল, কোনো প্রভাবশালী শক্তিই আমাদের সামনে দাঁড়াতে পারবে না। বালাতুশ শুহাদা প্রান্তরে উভয় বাহিনী মুখোমুখি হলো। একদিকে পঞ্চাশ হাজার সৈন্যের মুসলিম বাহিনী, অপরদিকে চার্লস মার্টেলের (Charles Martel) নেতৃত্বে চার লক্ষ সৈন্যের ইউরোপীয় বাহিনী। নয় দিন উভয় বাহিনীর মধ্যে ঘোরতর লড়াই চলল; কিন্তু জয়-পরাজয় নির্ধারিত হলো না। যুদ্ধের দশম দিন মুসলিম বাহিনী ইউরোপীয়দের ওপর এমন প্রচণ্ড হামলা চালাল যে, বিজয় প্রায় হাতের মুঠোয় চলে এল। এমন সময় ইউরোপীয় বাহিনীর একটি অশ্বারোহী দল মুসলিমদের যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ছাউনি পর্যন্ত পৌঁছে যেতে সক্ষম হলো। এ অবস্থা দেখে সেখানে থাকা মুসলিম বাহিনীর কিছু সদস্য ‘নিয়ে গেল, নিয়ে গেল’ বলে চিৎকার করে উঠল। আওয়াজ শুনে মূল বাহিনীর একটি অশ্বারোহী দল সম্পদ রক্ষা করার জন্য যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আকস্মিকভাবে পিছু হটল। ফলে মুসলিম বাহিনীর কেন্দ্রস্থল শূন্য হয়ে গেল এবং পুরো বাহিনীর শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ল। সেনাপতি আবদুর রহমান আলগাফিকী এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ঠিক করার চেষ্টা করতে লাগলেন। এই পরিস্থিতির মধ্যেই প্রতিপক্ষের একটি তীর তাঁর শরীরে বিদ্ধ হলো এবং তিনি শাহাদাত বরণ করলেন। মুসলিম বাহিনী একই সঙ্গে দুটি মহাবিপর্যয়ের সম্মুখীন হলো; একদিকে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি, অপরদিকে মহান সেনাপতির শাহাদাত। দশম দিনের সূর্য ডোবার পর মুসলিম বাহিনী দক্ষিণ দিকে পিছু হটল। একাদশ দিন ইউরোপীয় বাহিনী যুদ্ধ করতে এসে দেখল ময়দান জনশূন্য। ডক্টর আবদুর রহমান আলআন্দালুসী মনে করেন যে, মুসলিম বাহিনী সেনাপতির শাহাদাতের পর কৌশলগত কারণে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে এসেছিল। তবে ডক্টর আবদুল হালীম আ'ওয়াইস একে ওহুদ ট্র্যাজেডির সাথে তুলনা করেছেন এবং এর মাধ্যমে ইউরোপ বিজয়ের স্বপ্ন ভেঙে গেছে বলে অভিহিত করেছেন। যাই হোক, এ পরাজয়ের কারণও নগণ্য ছিল না। এর মাধ্যমেই থেমে গিয়েছিল আমাদের ইউরোপ-অভিযান।
টিকাঃ
১৮২. ড. ইবনুল মুসলিম, কাজ্জাজুল আলমাদলুস, পৃ: ২২৯।
১৮৩. বিস্তারিত জানতে দেখুন: আবদুর রহমান আলআন্দালুসী, কাজ্জাজুল আলমাদলুসী, পৃ: ১৬৭।
১৮৫. আবদুল হালীম আ'ওয়াইস, দিরাসাতুন লি সুইতিল হামাইনা হাওদা'উল ইসলামিয়া, পৃঃ ৭-৮।
📄 বিপর্যয়কর বিজয়!
আমাদের এ শিরোনাম অনেক পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য মনে হতে পারে। বিজয় আবার বিপর্যয়কর হয় কী করে! কিন্তু এটাই ইতিহাস-স্বীকৃত বাস্তবতা। নিরপেক্ষ অনেক ইউরোপীয় ঐতিহাসিকও বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছেন। নোবেল বিজয়ী প্রখ্যাত ফরাসি লেখক আনাতোল ফ্রাঁস (Anatole France) বলেছেন, ফরাসি ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো পয়টিয়ার্সের (বালাতুশ শুহাদা) যুদ্ধ। ৭৩২ খ্রিস্টাব্দে চার্লস মার্টেল যখন পয়টিয়ার্সে আরব (মুসলিম) বাহিনীকে পরাজিত করেন, তখন মূলত আরব সভ্যতা ইউরোপীয় অসভ্যতা ও বর্বরতার কাছে বাধা পেয়ে থমকে দাঁড়ায়।
টিকাঃ
১৮৬. দেখুন: বাকবী আবু আলীম, ফাতহুন উন্দালা, পৃ: ৪৪ ও আবদুর রহমান আলআন্দালুসী, তাওরীখুন উন্দালুসী, পৃ: ১৯৯-২০০।
📄 ইতিহাস ও বাস্তবতা
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, 'হে মানুষ! নিশ্চয়ই আল্লাহর ওয়াদা সত্য। সুতরাং এই পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে কিছুতেই ধোঁকায় না ফেলে এবং আল্লাহ সম্পর্কেও যেন মহা ধোকাবাজ (শয়তান) তোমাদেরকে ধোঁকা না ফেলে।' [সুরা ফাতির: ০৫]। আন্দালুসের বিজয় ছিল এক মহাপরীক্ষা। মুসলমানগণ যুগে যুগে বিজিত ভূখণ্ডের অবারিত সম্পদের মোহে পড়েছে এবং সম্পদের দরুণই প্রতিযোগিতায় পরস্পর হানাহানিতে লিপ্ত হয়েছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদের জন্য দারিদ্র্যের আশঙ্কা করি না; বরং আমি আশঙ্কা করি যে, তোমাদের কাছে দুনিয়ার প্রাচুর্য এসে যাবে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের কাছে এসেছিল; তখন তোমরা তা লাভ করতে পরস্পর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে, যেভাবে তারা লিপ্ত হয়েছিল। এ ধন-সম্পদ তাদেরকে যেভাবে ধ্বংস করেছিল, তোমাদেরকেও তেমনিভাবে ধ্বংস করে দেবে।' সুতরাং মহান আল্লাহর শাশ্বত রীতি হলো, নেককার বান্দারা যদি সম্পদ-আকর্ষণে প্রলুব্ধ হয়ে পড়ে, তবে সেই বৈষয়িক সম্পদই তাদের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মুসলিম বাহিনী আরেকটি প্রতিকূলতার শিকার হয়েছিল—তা হলো আরব ও আমাজিগদের মাঝে জাতিগত বৈরিতা ও সাম্প্রদায়িক মনোভাব। এই বিষবাষ্প মুসলমানদের জন্য কতটা ভয়াবহ ছিল, ফ্রান্স তা ইতিহাসেও যেমন সংরক্ষণ করে রেখেছে, তেমনি যুগে যুগে নিজেদের স্মৃতিপটে ধরে রেখেছে। এর শত শত বছর পরে ৯৫০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রাঙ্করা যখন আলজেরিয়ায় অনুপ্রবেশ করে, তখন তারা আলজেরিয়ানদের মধ্যে আরব-আমাজিগ জাতি-বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তারা বলতে থাকে যে, আমাজিগরা আর্য এবং ফরাসিরাও আর্য, তাই আরবরা হলো বহিরাগত। ফরাসিরা আমাজিগ ভাষা শিক্ষার জন্য আলাদা একাডেমি তৈরি করে আরবী ভাষার প্রভাব কমানোর চেষ্টা করে। অথচ সেই ফ্রান্সেই ১৯৯৬ সালে যখন প্রধানমন্ত্রী লিওনেল জসপিন (Lionel Jospin) আঞ্চলিক ভাষার সংরক্ষণে একটি প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তখন প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক (Jacques Chirac) তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, এ প্রকল্পের মাধ্যমে কি আপনি ফ্রান্সকে বলকান অঞ্চলে পরিণত করতে চান?! অর্থাৎ এ জাতীয় প্রকল্প তাদের দৃষ্টিতে নিজ ভূমিতে অবৈধ হলেও মুসলিম দেশে তারা তা বৈধ মনে করে।
টিকাঃ
১৮৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৪২৩ ও সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৯৬১।
১. দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের একটি ঐতিহাসিক উপদ্বীপকে বলকান অঞ্চল বলা হয়। বর্তমানে বিভক্ত বলকান অঞ্চলের রাষ্ট্রসমূহ মোট ১১টি: ১. আলবেনিয়া ২. বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা ৩. বুলগেরিয়া ৪. ক্রোয়েশিয়া ৫. মন্টেনীগ্রো ৬. গ্রীস ৭. ম্যাকিডোনিয়া ৮. সার্বিয়া ৯. কসোভা ১০. রোমানিয়া ১১. স্লোভেনিয়া।
২. কাফি মুফাতীহ, ‘দাওয়াতু কিউরাহিল আন্দালুসিয়া' শীর্ষক প্রবন্ধ, আল-আহরাম পত্রিকা, ৫/৭/২০০০ খৃস্টাব্দ।