📄 আবদুর রহমান আলগাফিকী রহ.
আমবাসা বিন সুহাইমের শাহাদত ছিল আন্দালুসের ইতিহাসে এক অপূরণীয় ক্ষতি। এরপর একে একে বেশ কয়েকজন প্রশাসক আন্দালুস শাসন করেন। মাত্র পাঁচ বছরে (১০৭-১১২ হিজরী/৭২৬-৭৩০ খৃস্টাব্দ) আন্দালুসের প্রশাসনে বদল ঘটে ছয় বার। এই ছয় প্রশাসকের সর্বশেষ ছিলেন হাইছাম বিন ওবায়দুল আলকালাবী।
এ সময় থেকেই আন্দালুসের মুসলমানদের মধ্যে বিবাদ ও মতপার্থক্যের উদ্ভব হতে শুরু করে। একদিকে আরব মুসলমানগণ, অপরদিকে আমাজিগ মুসলমানগণ; আর বিরোধের ভিত্তি ছিল জাতি-বংশের ভিন্নতা। মুসলিম বাহিনীর এই কলহের সুযোগ নিয়ে ফ্রান্সে খ্রিষ্টানরা সংঘবদ্ধ হতে থাকে। অবশেষে আল্লাহ তা’আলা মুসলমানদের প্রতি অনুগ্রহ করেন; এক মহান ব্যক্তিত্ব আবজন সুপ্ত খাহবাখাপনার মাধ্যমে বিরাজমান সাম্প্রদায়িক মনোভাব বিনাশ করে আমাজিগ ও আরব মুসলমানের নতুন করে ঐক্যবদ্ধ করেন। এই মহান ব্যক্তি আন্দালুসবাসীর মাঝে ইসলামের এই শাশ্বত বাণী ছড়িয়ে দেন যে, আরব-অনারব নয়; মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া ও খোদাভীতি। এ মহান ব্যক্তিত্ব ছিলেন আবদুর রহমান আলগাফিকী রহ।
টিকাঃ
১৫৭. ইবন আ'যারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/২৯৩।
১৫৮. প্রাগুক্ত, পৃ: ২৯৪।
১৫৯. প্রাগুক্ত, পৃ: ২৯৫।
📄 কে এই আবদুর রহমান আলগাফিকী?
তাঁর পুরো নাম আবদুর রহমান বিন আবদুল্লাহ বিন বিশর বিন হারেম আলগাফিকী। তিনি ছিলেন ইরাকের ‘আক’ গোত্রের শাখা ‘গাফিক’ বংশোদ্ভূত। তাঁর উপনাম ছিল আবু সাঈদ। তিনি ছিলেন একাধারে একজন সুদক্ষ প্রশাসক, মহান বীর ও সমরকুশলী সেনাপতি। সাহাবায়ে কেরামের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে থাকায় তিনি শামিল ছিলেন তাবেয়ীদের মর্যাদাবান কাফেলায়। খলীফা সুলাইমান বিন আবদুল মালিকের রাজত্বকালে তিনি আফ্রিকা হয়ে আন্দালুসে আসেন। মুসা বিন নুসায়ের ও আবদুল আযীয বিন মুসার আন্দালুস অবস্থানকালে তিনি তাঁদের সঙ্গে মিলিত হন। তখন থেকে তিনি আন্দালুসের পূর্ব উপকূলের সেনাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
টিকাঃ
৭৩. ড. আবদুর রহমান মাহমুদ, পৃ: ৩১, ইবনে আসাকীর, তারিখু দিমাশক, ২/৯৬ ও মাক্কারী, নফহুত তীব, ১/১০৫।
৭৫. ইবনুল ফারাদী, তারীখু উলামায়ে আন্দালুস, ১/১০৬ ও মাক্কারী, ১/২১৫।
৭৬. মাক্কারী, নাফহুত তীব, ৫/২১৫।
📄 আবদুর রহমান আলগাফিকীর সামরিক মেধা ও চিন্তাকুশলতা
আবদুর রহমান আলগাফিকীর সামরিক চিন্তাশীলতার অনন্যসাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারার সহজাত ক্ষমতা। একজন সেনাপতি যদি চান যে, তাঁর সামরিক কার্যক্রম বিক্ষিপ্ত না হোক এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বের কারণে তাঁর লক্ষ্য হাতছাড়া না হোক, তাহলে তাঁর জন্য এটি অপরিহার্য একটি গুণ। আবদুর রহমান আলগাফিকীর সামরিক নীতির আরেকটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য, নিজের সামর্থ্য ও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য-অর্জনের দূরত্ব ও ব্যবধান সম্বন্ধে সচেতন থাকা। অধিকন্তু তিনি ‘মোকাবেলার পূর্বে যথেষ্ট প্রস্তুতি গ্রহণ’-এর নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। অর্থাৎ যুদ্ধের পূর্বে সেনাবাহিনী ও জনগণকে সর্বাত্মক প্রস্তুত করা, অস্ত্রের পর্যাপ্ততা সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া; প্রথমে ঈমান ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভরসার শক্তি, এরপর সৈন্যদের মধ্যে ঐক্যের শক্তি এবং যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো ধরনের দুর্বলতাকে প্রশ্রয় না দেওয়া। কারণ এর কোনো একটির ক্ষেত্রে সামান্য অবহেলা মানে পুরো বাহিনীর পরাজয় ডেকে আনা।
📄 আবদুর রহমান আলগাফিকীর চরিত্র
আবদুর রহমান আলগাফিকী ছিলেন অতি উন্নত চরিত্রের অধিকারী। সাহাবায়ে কেরামের বরকতময় সংস্পর্শে যিনি লাভ করেছিলেন সঠিক ও বিশুদ্ধ ইসলামী দীক্ষা, তাঁর মাঝে সমাবেশ ঘটেছিল সকল উন্নত মানবিক বৈশিষ্ট্য ও গুণের। উমাইয়া শ্রেষ্ঠতম কাফেলায় হাতে গড়া যার নীতি-নৈতিকতা, তিনি তাঁর প্রজাদের সঙ্গে সুন্দরতম ব্যবহার করতেন। ন্যায়-ইনসাফ, ধার্মিকতা ও সহিষ্ণুতাপূর্ণ আচরণ ছিল তাঁর ভূষণ। তিনি নেতা ও শাসক হিসেবে প্রজাদের কাছ থেকে কিছুই পাওয়ার প্রত্যাশা করতেন না। তিনি তো প্রত্যাশী ছিলেন কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালীন প্রতিদানের। আল্লামা যাহাবী রহ. তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, আবদুর রহমান আলগাফিকী ছিলেন আন্দালুসের প্রশাসক হিশাম বিন আব্দুল মালিক কর্তৃক নির্ধারিত গভর্নর। তিনি ইবনে ওমর রাযি. হতে হাদিস বর্ণনা করেছেন। ইবনে বাকুওয়াল আন্দালুসে আগমনকারী তাবেয়ীদের তালিকায় তাঁর নাম উল্লেখ করেছেন। তিনি ছিলেন সৎ, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে নিপুণ, খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে বহুবার অভিযান পরিচালনাকারী এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনে ন্যায়পরায়ণ।
টিকাঃ
৭৭. যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ৭/২৭৪-২৭৫ ও মাক্কারী, নফহুত তীব, ৬/১।
৭৮. মাক্কারী, তারীখুল ইসলাম, ৭/৬১৪।
৭৯. যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ৭/৬২।
৮০. যাহাবী, ৭/২৭৪-২৭৫।