📄 ফ্রান্সে সামরিক অভিযান পরিচালনা
ফ্রান্সে সামরিক অভিযান পরিচালনা ‘প্রশাসক-আমল’-এর প্রথম অংশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়। এ আমলে ফ্রান্সে অভিযান পরিচালনার জন্য বড় বড় অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। সামনে আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে এমন কয়েকজন প্রশাসকের কথা আলোচনা করব, ফ্রান্সে সামরিক তৎপরতায় যাঁদের বিশেষ ভূমিকা ও অবদান রয়েছে।
📄 সামাহ বিন মালিক আলখাওলানী রহ.
সামাহ্ বিন মালিক আলখাওলানী ছিলেন মুসলিম আন্দালুসের চতুর্থ প্রশাসক। আন্দালুসের প্রথম প্রশাসক আব্দুল আযীয বিন মুসা বিন নুসায়ের ৯৭ হিজরীতে সেভিলে নিহত হলে আইয়ুব বিন হাবীব আল-লাখমীকে সাময়িকভাবে আন্দালুসের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। আইয়ুব ছিলেন মুসা বিন নুসায়েরের ভাগ্নে। ১০০ হিজরী মোতাবেক ৭১৮ খৃস্টাব্দে দায়িত্ব গ্রহণ করা আইয়ুবের শাসনামল ছয় মাসের বেশি স্থায়ী হয়নি। এরপর তৎকালীন আফ্রিকার গভর্নর মুহাম্মাদ বিন ইয়াজীদের পক্ষ থেকে ১০০ হিজরীর যিলহজ মাসে (৭১৯ খৃস্টাব্দের আগস্ট মাসে) আল-হুর বিন আবদুর রহমান আস-সাক্কাফীকে আন্দালুস শাসনের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তিনি তিন বছর আন্দালুসের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন এবং তিনিই সেভিল থেকে কর্ডোভায় রাজধানী স্থানান্তর করেন। অবশ্য কারও কারও মতে তাঁর পূর্ববর্তী প্রশাসক আইয়ুব আল-লাখমীর আমলেই রাজধানী স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়েছিল।
১০১ হিজরীর সফর মাসে (৭২০ খৃস্টাব্দের সেপ্টেম্বর) মুসলিম সাম্রাজ্যের তৎকালীন খলীফা সুলাইমান বিন আব্দুল মালিকের মৃত্যু হলে ওমর বিন আব্দুল আযীয রহ. তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি ১০২ হিজরীর রমযান মাসে সামাহ্ বিন মালিককে আন্দালুসের গভর্নর নিযুক্ত করেন। এতদিন পর্যন্ত আন্দালুস-প্রশাসক সরাসরি দারুল খেলাফতের অধীন ছিল না; বরং তা আফ্রিকার প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো। কিন্তু ওমর বিন আব্দুল আযীয প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব বিবেচনায় আন্দালুস-প্রশাসককে সরাসরি কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অধীন করে দেন।
এ হিসেবে সামাহ্ বিন মালিক আলখাওলানী রহ.-এর শাসনামল ও তাঁর যাবতীয় কর্ম-অবদানকে আমরা মহান খলীফা ওমর বিন আব্দুল আযীয রহ.-এর সংস্কারের অন্তর্ভুক্ত বলে ধরে নিতে পারি। ন্যায়বিচারে খলীফা রাশেদদের ‘পঞ্চম সদস্য’ ওমর বিন আব্দুল আযীয রহ. মাত্র আড়াই বছর মুসলিম সাম্রাজ্যের খেলাফতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু এই নাতিদীর্ঘ সময়কালেই পুরো মুসলিম বিশ্ব শান্তি-নিরাপত্তা, সুখ-সমৃদ্ধি এবং ন্যায়-ইনসাফে ছেয়ে গিয়েছিল।
টিকাঃ
১৩৮. খিলাফতের ধারাবাহিকতা জানতে দেখুন: মাক্কারী, নাফহুত তীব, ১/২৫৬।
১৩৯. লেখক অজ্ঞাত, ‘আখবারুন মাজমুয়া’, পৃ: ২৮, ইবনে আ'যারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/২৬৬ ও মাক্কারী, নাফহুত তীব, ১/২৯১।
১৪০. ইবনে আ'যারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/২৬৬ ও মাক্কারী, নাফহুত তীব, ১/২৯১。
১৪১. লেখক অজ্ঞাত, ‘আখবারুন মাজমুয়া’, পৃ: ২৯, ইবনে আ'যারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/২৭১ ও মাক্কারী, নাফহুত তীব, ১/২৯৪।
১৪২. ইবনে আ'যারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/২৮০ ও মাক্কারী, নাফহুত তীব, ৫/৭৪।
১৪৩. ডঃ আলী, তারীখুল উমায়্যাহ, ৪/১৭২-৭৩, ডঃ হাশেমী, তারীখুল ইসলাম, ৬/৩৭২ ও ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নেহায়া, ৯/২০৩。
১৪৪. ইবন আ'যারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/২৮৬ ও ইবনুল ক্বাযী, আল-বিদায়া ওয়ান নেহায়া, ৪/১১৭।
📄 সামাহ বিন মালিক রহ.-এর যুদ্ধ-তৎপরতা
ইসলামী ইতিহাসের সুবিখ্যাত এই মহান প্রশাসক ফ্রান্সে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতেন। পুরো ফ্রান্সে তখন নোরবোন নামক একটি ক্ষুদ্র মুসলিমীয় নগরী ছিল, যা মুসা বিন নুসায়ের একটি ক্ষুদ্র বাহিনী পাঠিয়ে জয় করেছিলেন। কিন্তু সামাহ্ বিন মালিক আলখাওলানী ফ্রান্সের পুরো দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল জয় করেন এবং সেখানে সেপ্টিমেনিয়া (Septimania) নামে এক বিশাল ইসলামী প্রদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। সামাহ্ বিন মালিক আলখাওলানী একই সঙ্গে ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে বিজয়াভিযান পরিচালনা করেছিলেন, আবার আন্দালুস ও ফ্রান্সের জনসাধারণের মধ্যে ইসলামী শিক্ষার প্রচার-প্রসারেও ভূমিকা রেখেছিলেন। এরই মাঝে ১০২ হিজরীর ৯ যিলহজ আরাফার দিন (৭২১ খৃস্টাব্দের ৯ জুলাই) এ মহান সেনাপতি তুলুয (Toulouse)-এর যুদ্ধক্ষেত্রে শাহাদত বরণ করেন।
টিকাঃ
১৪৬. লেখক অজ্ঞাত, ‘আখবারুন মাজমুয়া’, পৃ: ৩২।
১৪৭. প্রাগুক্ত, পৃ: ৩০৩।
১৪৮. ইবন আ'যারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/২৮৩ ও ইবনুল ক্বাযী, আল-বিদায়া ওয়ান নেহায়া, ৬/১৩।
📄 আমবাসা বিন সুহাইম রহ.
সামাহ্ বিন মালিক রহ. শহীদ হওয়ার পর আন্দালুসবাসী আবদুর রহমান বিন আবদুল্লাহ আলগাফিকী রহ. কে তাঁদের প্রশাসক হিসেবে নির্বাচন করেন। আবদুর রহমান আলগাফিকী সামরিক বাহিনীকে একত্র করে সফলভাবে ১০২ হিজরীর যিলহজ মাসে আন্দালুসে ফিরে আসেন। এটি আবদুর রহমানের প্রথম শাসনকাল, যা দুই মাসের বেশি স্থায়ী হয়নি। ১০৩ হিজরীর সফর মাসে তৎকালীন আফ্রিকার গভর্নর ইয়াজীদ বিন আবু মুসলিম তাঁকে বরখাস্ত করেন এবং তাঁর পরিবর্তে আমবাসা বিন সুহাইম আল-কালবীকে আন্দালুসের প্রশাসক নিযুক্ত করেন।
টিকাঃ
১৪৯. ইবনে আ'যারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/২৮৪。
১৫০. প্রাগুক্ত, পৃ: ২৮৫।
১৫১. ইবনে আ'যারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/২৮৬ ও মাক্কারী, নাফহুত তীব, ১/২৯২।