📄 সকল ক্ষেত্রে আন্দালুসবাসীর মুসলিম-অনুকরণ
‘প্রশাসক-আমল’-এর প্রথম অংশের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এটিও যে, এ সময়েই আন্দালুসবাসী সব ক্ষেত্রে মুসলমানদের অনুসরণ শুরু করে। এমনকি বিজয়ী ও শাসনকারী আরবজাতি যে ভাষায় কথা বলত, তারা সে ভাষা শিখতে শুরু করে। বরং সে যুগের আন্দালুসী খ্রিষ্টান ও ইহুদি জনগোষ্ঠীও তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আরবী পাঠদান এবং লিখন পদ্ধতি প্রবর্তনকে গৌরব ও আভিজাত্যের প্রতীক মনে করত।
📄 মুসলিম প্রশাসন কর্তৃক কর্ডোভাকে আঞ্চলিক রাজধানী নির্ধারণ
এ আমলের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য এটিও যে, মুসলিম প্রশাসন কর্ডোভাকে তাদের শাসনকার্যের কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করে। এর পূর্বে উত্তরের টলেডো ছিল আন্দালুসের রাজধানী। কিন্তু মুসলিম শাসকগণের সতর্ক বিবেচনায় ধরা পড়ে যে, টলেডো ফ্রান্সের খ্রিষ্টান অঞ্চলের সন্নিকট। ফলে তা সব সময়ই থাকবে ঝুঁকি ও বিপদের কেন্দ্রবিন্দুতে। তাই তাঁদের দৃষ্টিতে টলেডোর মতো একটি অরক্ষিত নগরীকে রাজধানী হিসেবে গ্রহণ করা মোটেই সমীচীন মনে হয়নি। বিপরীতে তাঁরা দেখতে পান যে কর্ডোভা এ ধরণের আশঙ্কা ও ঝুঁকিমুক্ত; অধিকন্তু তা যোগাযোগ ও সামরিক রসদ সরবরাহের বিবেচনায় উত্তর আফ্রিকার ইসলামী রাষ্ট্রের তুলনামূলক সন্নিকট। তাই কর্ডোভাকেই তাঁরা এ অঞ্চলের রাজধানী হিসেবে নির্বাচন করেন।
টিকাঃ
১৩৭. ইবনে আ'যারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/২৯ ও মাক্কারী, নাফহুত তীব, ৫/৭৪।
📄 ফ্রান্সে সামরিক অভিযান পরিচালনা
ফ্রান্সে সামরিক অভিযান পরিচালনা ‘প্রশাসক-আমল’-এর প্রথম অংশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়। এ আমলে ফ্রান্সে অভিযান পরিচালনার জন্য বড় বড় অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। সামনে আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে এমন কয়েকজন প্রশাসকের কথা আলোচনা করব, ফ্রান্সে সামরিক তৎপরতায় যাঁদের বিশেষ ভূমিকা ও অবদান রয়েছে।
📄 সামাহ বিন মালিক আলখাওলানী রহ.
সামাহ্ বিন মালিক আলখাওলানী ছিলেন মুসলিম আন্দালুসের চতুর্থ প্রশাসক। আন্দালুসের প্রথম প্রশাসক আব্দুল আযীয বিন মুসা বিন নুসায়ের ৯৭ হিজরীতে সেভিলে নিহত হলে আইয়ুব বিন হাবীব আল-লাখমীকে সাময়িকভাবে আন্দালুসের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। আইয়ুব ছিলেন মুসা বিন নুসায়েরের ভাগ্নে। ১০০ হিজরী মোতাবেক ৭১৮ খৃস্টাব্দে দায়িত্ব গ্রহণ করা আইয়ুবের শাসনামল ছয় মাসের বেশি স্থায়ী হয়নি। এরপর তৎকালীন আফ্রিকার গভর্নর মুহাম্মাদ বিন ইয়াজীদের পক্ষ থেকে ১০০ হিজরীর যিলহজ মাসে (৭১৯ খৃস্টাব্দের আগস্ট মাসে) আল-হুর বিন আবদুর রহমান আস-সাক্কাফীকে আন্দালুস শাসনের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তিনি তিন বছর আন্দালুসের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন এবং তিনিই সেভিল থেকে কর্ডোভায় রাজধানী স্থানান্তর করেন। অবশ্য কারও কারও মতে তাঁর পূর্ববর্তী প্রশাসক আইয়ুব আল-লাখমীর আমলেই রাজধানী স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়েছিল।
১০১ হিজরীর সফর মাসে (৭২০ খৃস্টাব্দের সেপ্টেম্বর) মুসলিম সাম্রাজ্যের তৎকালীন খলীফা সুলাইমান বিন আব্দুল মালিকের মৃত্যু হলে ওমর বিন আব্দুল আযীয রহ. তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি ১০২ হিজরীর রমযান মাসে সামাহ্ বিন মালিককে আন্দালুসের গভর্নর নিযুক্ত করেন। এতদিন পর্যন্ত আন্দালুস-প্রশাসক সরাসরি দারুল খেলাফতের অধীন ছিল না; বরং তা আফ্রিকার প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হতো। কিন্তু ওমর বিন আব্দুল আযীয প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব বিবেচনায় আন্দালুস-প্রশাসককে সরাসরি কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অধীন করে দেন।
এ হিসেবে সামাহ্ বিন মালিক আলখাওলানী রহ.-এর শাসনামল ও তাঁর যাবতীয় কর্ম-অবদানকে আমরা মহান খলীফা ওমর বিন আব্দুল আযীয রহ.-এর সংস্কারের অন্তর্ভুক্ত বলে ধরে নিতে পারি। ন্যায়বিচারে খলীফা রাশেদদের ‘পঞ্চম সদস্য’ ওমর বিন আব্দুল আযীয রহ. মাত্র আড়াই বছর মুসলিম সাম্রাজ্যের খেলাফতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কিন্তু এই নাতিদীর্ঘ সময়কালেই পুরো মুসলিম বিশ্ব শান্তি-নিরাপত্তা, সুখ-সমৃদ্ধি এবং ন্যায়-ইনসাফে ছেয়ে গিয়েছিল।
টিকাঃ
১৩৮. খিলাফতের ধারাবাহিকতা জানতে দেখুন: মাক্কারী, নাফহুত তীব, ১/২৫৬।
১৩৯. লেখক অজ্ঞাত, ‘আখবারুন মাজমুয়া’, পৃ: ২৮, ইবনে আ'যারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/২৬৬ ও মাক্কারী, নাফহুত তীব, ১/২৯১।
১৪০. ইবনে আ'যারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/২৬৬ ও মাক্কারী, নাফহুত তীব, ১/২৯১。
১৪১. লেখক অজ্ঞাত, ‘আখবারুন মাজমুয়া’, পৃ: ২৯, ইবনে আ'যারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/২৭১ ও মাক্কারী, নাফহুত তীব, ১/২৯৪।
১৪২. ইবনে আ'যারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/২৮০ ও মাক্কারী, নাফহুত তীব, ৫/৭৪।
১৪৩. ডঃ আলী, তারীখুল উমায়্যাহ, ৪/১৭২-৭৩, ডঃ হাশেমী, তারীখুল ইসলাম, ৬/৩৭২ ও ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নেহায়া, ৯/২০৩。
১৪৪. ইবন আ'যারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/২৮৬ ও ইবনুল ক্বাযী, আল-বিদায়া ওয়ান নেহায়া, ৪/১১৭।