📄 সুউচ্চ সংকল্প ও উচ্চাভিলাষের বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত
প্রসঙ্গক্রমে মূসা বিন নুসায়েরের এই সুউচ্চ সংকল্পের বিষয়ে দু-একটি কথা না বললেই নয়। পাঠক আরও অবাক হবেন যখন জানবেন যে, এমন সময় তিনি এই পর্বতকঠিন পরিকল্পনা করেছিলেন, যখন তিনি তাঁর জীবনের পঁচাত্তরটি বসন্ত পেরিয়ে এসেছেন। আল্লাহু আকবার! বয়োবৃদ্ধ একজন মানুষ, এখনও আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করছেন, অশ্বপৃষ্ঠে আরোহণ করে নগরীর পর নগরী জয় করছেন, কয়েক মাস ধরে অবরোধ করে রেখেছেন সেভিল, কয়েক মাস মেরিডা; এরপর একে একে জয় করেছেন বার্সেলোনা, জারাগোজা ও উত্তর-পূর্বের বিভিন্ন নগরী। এবং এখানেই থেমে থাকেননি; অল্পসময়েই অর্জিত সাফল্য ছাপিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখছেন জয় করবেন সাখরা বা কোভাদোঙ্গা (Covadonga), এরপর একে একে জয় করবেন ফ্রান্স, ইতালি ও অন্যান্য দেশ এবং এভাবে পৌঁছাবেন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কন্সট্যান্টিনোপলে! জীবনসন্ধ্যায় উপনীত পরিশ্রান্ত এক মুসলিম কিভাবে এই সুদূরপ্রসারী স্বপ্নের অধিকারী হলেন? কোন বলে বশীভূত হয়ে পঁচাত্তর বছর বয়সে তিনি এই দুর্গম গিরি কান্তার মরু পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন? আজকের মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি তরুণের জন্য তিনি হতে পারেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যাদের বয়স এখনও সত্তর ছোঁয়ানি; অথচ তারা এই ভাবনায় নিমগ্ন যে, আমরা তো জীবিকার সন্ধানে ছুটে ছুটে ক্লান্ত মুসাফির। যারা ভাবছেন, জীবিকার পেছনে ছুটে ছুটে ক্লান্ত হয়েই তারা তাদের কর্তব্য সম্পাদন করে ফেলেছেন। মূসা বিন নুসায়েরের এই সুদৃঢ় ও সমুন্নত মনোবল তাদের জন্য একটি সুস্পষ্ট বার্তা যে, তাদের জীবনের লক্ষ্য এখনও শেষ হয়ে যায়নি। কীভাবেই-বা শেষ হবে? তাঁর মতো প্রজ্ঞাবানদের কাছে কারা শিখা ও আলো পৌঁছাবে? কারা তাদেরকে অভিজ্ঞতার পাথেয় যোগাবে? এবং কারা তাদের চিন্তা-চেতনার সংস্কার ও পরিবৃদ্ধি করবে? সত্তর বছর বয়স হওয়ার পরই মূসা বিন নুসায়ের উত্তর আফ্রিকার বিজয়াভিযান শুরু করেছিলেন। অর্থাৎ বর্তমানের হিসেবে তখন তিনি অবসরের বয়স পার করে ফেলেছিলেন। এরপর সেই তিনিই পঁচাত্তর বছর বয়সে এসে প্রচণ্ড অন্তর-দহনে জ্বলে পুড়ছেন। কিসের জন্য তাঁর মর্ম-যাতনা? কেন এই দহন-যন্ত্রণা? প্রথম কারণ, কন্সট্যান্টিনোপল জয়ের স্বপ্ন। মুসলিম উম্মাহর বিজয় পতাকা তিনি নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন আরও দূর দিগন্তে; অথচ এই মহান সেনাপতি তখনও শাহাদাতের সন্ধানে রত! দ্বিতীয় কারণ, কোভাদোঙ্গা জয় করতে না পারায় তিনি প্রচণ্ড ব্যথা পেয়েছেন। তৃতীয় কারণ, তাঁর সবচেয়ে বড় কষ্ট, তিনি পশ্চিম দিক থেকে কন্সট্যান্টিনোপল বিজয়ের আজীবন লালিত স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি। ঐতিহাসিকরা লিখেছেন, আন্দালুস ছেড়ে চলে আসার সময় মূসা বিন নুসায়েরের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। অস্থিরতায় তিনি সর্বদা ছটফট করতেন। তাঁর আশা ছিল, ফ্রান্সের অন্যান্য শহরও জয় করবেন এবং ইউরোপের বিস্তৃত এলাকা জয় করে এই পথেই কন্সট্যান্টিনোপল পৌঁছবেন। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, আন্দালুস থেকে শাম পর্যন্ত প্রশস্ত যাতায়াতপথ আবিষ্কৃত হবে; যে পথে আন্দালুসবাসী জলপথ অতিক্রম করা ছাড়াই স্থলপথে মুসলিম প্রাচ্যে আসা-যাওয়া করবে।
টিকাঃ
১৭. মাক্কারী, নাফহুত তীব, ১/২০৩-২৩৭ ও আলহাজ্জী, আন্দালুসুল ফাতহ, পৃ: ৫০।
১৮. ইবনে আব্দুল হাকাম, ফুতুহু মিসর ওয়াল মাগরিব, পৃ: ২০৯।
📄 প্রত্যাবর্তন ও শেষ ইচ্ছা
খলীফার আদেশ শিরোধার্য মনে করে মূসা বিন নুসায়ের তারিক বিন যিয়াদকে নিয়ে দামেশকের পথ ধরলেন। তাঁরা উভয়ে যখন দামেশকে পৌঁছালেন, খলীফা ওয়ালিদ তখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত। ওয়ালিদের মৃত্যুর পর খেলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন তাঁর ভাই সুলায়মান বিন আবদুল মালিক। তিনি তাঁর প্রয়াত ভাইয়ের নীতিই অবলম্বন করলেন এবং মূসা বিন নুসায়ের কন্সট্যান্টিনোপলের উদ্দেশে ইউরোপের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে মুসলিম বাহিনীর ক্ষতি হতে পারে এই আশঙ্কায় মূসা বিন নুসায়েরকে দামেশকে অবস্থান করাই সমীচীন মনে করলেন। মূসা বিন নুসায়েরের দামেশক প্রত্যাবর্তনের এক বছর পর ৯৭ হিজরী মোতাবেক ৭১৬ খ্রিস্টাব্দে খলীফা সুলায়মান হজ্জের সফরে রওয়ানা হতে মনস্থ করলেন। ফলে মূসা বিন নুসায়ের তাঁর এক প্রবল আকাঙ্ক্ষা পূরণের সুযোগ পেয়ে গেলেন। একটানা দশ বছরের অধিক সময় তিনি উত্তর আফ্রিকা ও আন্দালুসের রণাঙ্গনে কাটিয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তিনি একবারও ফিরে আসেননি। তাই তিনি সে বছরে হজ্জের সফরে খলীফা সুলায়মানের সঙ্গী হলেন। হজ্জের সফরে পরিশেষে মূসা বিন নুসায়ের আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করলেন, ‘হে আল্লাহ! আমার আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী তুমি যদি আমায় কবুল করে থাকো, তাহলে আমাকে আবার ফিরিয়ে দিও রণাঙ্গনে এবং দান করো শাহাদাতের মৃত্যু; আর মৃত্যুই যদি হয় তোমার ফয়সালা, তাহলে তোমার নবীর শহর মদিনাতুর রাসূলে আমার মৃত্যু দিও।’ কুদরতের কারিশমা দেখুন, তিনি হেজাজে পৌঁছলেন, এরপর হজ্জ সম্পাদন করলেন, ফেরার পথে মদিনাতুর রাসূলেই ইন্তেকাল করলেন এবং মদিনায় শুহাদায়ে কেরামের পাশেই সমাহিত হলেন। সত্য পথের পথিক যারা, আল্লাহর সঙ্গে যাদের হৃদয়ের সম্পর্ক সুদৃঢ়, তাঁদের সংকল্প ও অঙ্গীকার এমনই হয়ে থাকে। জীবনের শেষ মুহূর্তেও তাদের হৃদয়-আবেগের এই বহিঃপ্রকাশ। যতটুকু জীবন পান, কর্ম ও অবদানে রেখে যান তার কয়েক গুণ। জীবনসায়াহ্নে আত্মার মালিকের সঙ্গে তাঁদের এমন সুদৃঢ় বন্ধন যে, ফরিয়াদ ও কবুলিয়াত একই সঙ্গে উপচে পড়ে। ডাক এল, উত্তরও এল! মুক্তভাবে যিনি বিচরণ করেছেন আন্দালুসের বিপুল ভূখণ্ডে তরবারি ও তাওহীদের পতাকা হাতে; মৃত্যুর দেখা অবশেষে তিনি পেলেন হজ্জের সফরে, মদিনাতুর রাসূলে। মহান ব্যক্তিত্বের এক আদর্শ ত্যাগের মাধ্যমেই জীবন সায়াহ্ন পূর্ণ হলো। ইসলামের খেদমতে অসামান্য অবদান রাখার মাধ্যমে এই মহান বীর সেনাবাহিনী ধন্য করেছিলেন মুসলিম মাগরিবে (উত্তর আফ্রিকা ও আন্দালুস) উপত্যকা ও মরুপ্রান্তর, পর্বতমালা ও সমতল ভূমিকে। তিনি সত্য পথের দিশা দিয়ে গেছেন এই অঞ্চলের মানুষের কাছে আল্লাহর পয়গাম পৌঁছিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে, তাদেরকে যাবতীয় অন্ধকার থেকে উজ্জ্বল আলোর পথে বের করে আনার জন্য। বীর সেনানী মূসা বিন নুসায়ের আন্দালুস উপদ্বীপের সমরক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছেন, ঘোড়ায় চড়ে কখনো চলে বেড়িয়েছেন সমতল ভূমি, কখনো আরোহণ করেছেন সুউচ্চ পর্বতচূড়া, আবার কখনো অবতরণ করেছেন উপত্যকার নিম্নদেশে। মহান আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস তাঁর মাঝে আপ্লুত ছিল; ফলে তাঁর প্রাণশক্তি ছিল সমৃদ্ধ। দেহ বার্ধক্যজীর্ণ হলেও অঙ্গপ্রত্যঙ্গে শক্তির বলীয়ান হয়ে তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন আল্লাহর যমীনে আল্লাহর কালিমাকে বুলন্দ করতে এবং ইসলামের পতাকাকে সমুন্নত করতে। ইসলাম তাঁকে শক্তিশালী করেছিল; প্রজ্ঞার আলোয় তিনি ছিলেন আলোকিত। আর আন্দালুসের বিজয়ী তারিক বিন যিয়াদ; মূসা বিন নুসায়েরের সঙ্গে দামেশকে পৌঁছার পর তিনি যেন ইতিহাসের পাতা থেকে চিরতরে হারিয়ে গেলেন! ইতিহাস এ সম্পর্কে নীরব যে, এরপর তিনি দামেশকেই রয়ে গিয়েছিলেন, নাকি পুনরায় ফিরে এসেছিলেন আন্দালুসে কিংবা উত্তর আফ্রিকায়? ঐতিহাসিকগণ তারিক বিন যিয়াদের প্রশংসায় যত কথাই বলেন না কেন তা তাঁর কর্ম ও অবদানের জন্য যথেষ্ট হবে না! যে কেউ তারিক বিন যিয়াদের জীবন ও কর্ম নিয়ে মুহূর্তকাল ভাববেন, অবাক বিস্ময়ে অবলোকন করবেন ইসলামের এক অনন্য মহিমা। মাগরিবের অধিবাসী বার্বার গোত্রের একজন সাধারণ ব্যক্তি; ইসলামের স্পর্শ পাওয়ার পূর্বে তিনি ছিলেন অখ্যাত এক গোত্রের লোক; তাঁর জীবনে ইসলামের আগমন ঘটল আর তিনি পরিণত হলেন এক দিগ্বিজয়ী সেনাপতি ও সুদক্ষ রাজনীতিবিদে; যিনি একদিকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন, দেশের পর দেশ জয় করেছেন, অপরদিকে আশ্চর্য দক্ষতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে স্বাক্ষর করেছেন বিবিধ চুক্তিও। এই ধরনের অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব নির্মাণ ও তাঁর জাতিকে সুমহান উচ্চতায় জাগিয়ে তোলা ছাড়া ইসলামের যদি আর কোনো প্রভাব নাও থাকত, তাও ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের জন্য যথেষ্ট হতো। অথচ ইসলামের প্রভাব ও অবদান তো আরও ব্যাপক ও বিস্তৃত। ইসলাম তো এই প্রগতি ও চেতনা ছড়িয়ে দিয়েছে তার পতাকাতলে আশ্রয় নেওয়া প্রতিটি ভূখণ্ডে; ইসলাম তো অসংখ্য মহান ব্যক্তিত্ব নির্মাণ ও আদর্শবান প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে শান্তি ও সমৃদ্ধি এনেছে।
টিকাঃ
১৯. আল-মাক্কারী, নাফহুত তীব, ১/১০০-১০৩ ও আলহাজ্জী, আন্দালুসুল ফাতহ, পৃ: ৫০।
২০. আল-মাক্কারী, নাফহুত তীব, ১/১০০ ও ইবনে আযারী, আল-বায়ানুল মুগরিব, ২/৩৭।
২১. আবদুর রহমান আল-হাজ্জী, আন্দালুসুল ফাতহ, পৃ: ২১৭।
২২. হুসাইন মুনিস, ফাতহুল আন্দালুস, পৃ: ১০৬-১০৭।
📄 সাধনা ও একটি কঠিন শিক্ষা
মূসা বিন নুসায়ের ও তারিক বিন যিয়াদ তাঁদের বিজয়াভিযান পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত করে আন্দালুস থেকে দামেশকে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। কিন্তু আন্দালুসের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের একেবারে সীমান্তে অতি ক্ষুদ্র একটি জনপদ বাকি রয়ে গিয়েছিল, যেখানে তাঁরা অভিযান পরিচালনা করেননি। কোনো মুসলমানের সেদিন কল্পনায়ও আসেনি যে, অবহেলিত ক্ষুদ্রতম এই জনপদই একদিন বিশাল এক খ্রিষ্টান সাম্রাজ্যের বীজ হিসেবে পরিণত হবে আর কয়েক শতাব্দী পর এমন একদিন আসবে, যেদিন এই ক্ষুদ্র বীজই মহীরুহে পরিণত হয়ে আন্দালুসের পতনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। মুসলিম বাহিনীর অসমাপ্ত বিজয়াভিজানে রয়ে যাওয়া সাখরা (Covadonga) অঞ্চলে বড় একটি খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠী বাস করত। আমাদের প্রবল ধারণা এটাই যে, দারুল খেলাফত হতে তলব না করা হলে মূসা বিন নুসায়ের ও তারিক বিন যিয়াদ এ অঞ্চলটি ছেড়ে যেতেন না; বরং একে ইসলামী সাম্রাজ্যের অধীন করে নিতেন। অবশ্য এখান থেকে এই শিক্ষাটি আমরা নিতে পারি যে, অতি নগণ্য কোনো বিষয়েও সামান্য অবহেলা বড় ধরনের দুর্যোগের কারণ হতে পারে। সুতরাং মুসলমানদের কর্তব্য হলো, প্রতিটি কাজে দৃঢ় সংকল্প, প্রত্যয় ও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং পূর্ণতায় পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত নিশ্চিত ও শিথিল না হওয়া।