📄 টলেডোর দোরগোড়ায় তারিক বিন যিয়াদ
টলেডো স্পেনের প্রাচীনতম শহরগুলোর একটি। এটি আইবেরিয়ান উপদ্বীপের মধ্যভাগে বর্তমান স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদ থেকে ৭১ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। সুগভীর উপত্যকা-বেষ্টিত ও উচ্চভূমিতে অবস্থিত টলেডো নগরীর তিনদিকেই আছে টাগুস নদী (Tagus River)। আফ্রিকা-প্রশাসক মুসা বিন নুসায়েরের প্রজ্ঞা ও ধীরস্থিরতা ছিল সর্বজনবিদিত। তিনি আন্দালুস অভিযানের পূর্বে তারিক বিন জিয়াদকে জাবাল ও কর্ডোভা নগরী অতিক্রম করে এই রাজধানী টলেডোর পথে অগ্রসর হতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। কেননা, তাঁর আশঙ্কা ছিল, এর ফলে খ্রিষ্টান বাহিনী মুসলিম বাহিনীকে ঘিরে ফেলার সুযোগ পেতে পারে। কিন্তু তারিক বিন জিয়াদ দেখতে পেলেন, তাঁর সামনে টলেডোর পথ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। মুসা বিন নুসায়ের তাঁকে যে আশঙ্কার কথা বলেছিলেন, তেমন কোনো আশঙ্কাও এখন নেই। সবদিক বিবেচনায় তাঁর মনে হলো রাজধানী টলেডোতে অভিযান পরিচালনার এটিই উপযুক্ত সময়। টলেডোকে সবদিক থেকেই মনে করা হতো খ্রিষ্টানদের সবচে' সুরক্ষিত নগরী। কেননা, নগরীটি উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম—তিন দিক থেকে পাহাড়-পর্বত দ্বারা বেষ্টিত ছিল আর উন্মুক্ত দক্ষিণ দিকে ছিল বিশালাকার সমরাস্ত্র সজ্জিত দুর্গ। তারিক বিন জিয়াদ ভেবে দেখলেন, যদি খ্রিষ্টানদের এই ছত্রভঙ্গ ও দুর্বল অবস্থায় টলেডো আক্রমণ করা যায়, তাহলে তারা কিছুতেই মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে না এবং সহজেই নগর-বিজয় সম্পন্ন হবে। এখন যদি অভিযান পরিচালনা করা না হয়, ভবিষ্যতে আর এই সুবিধা পাওয়া যাবে না, তখন অভিযান হয়ে যাবে সুকঠিন। বাস্তবেও তারিক বিন জিয়াদের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ সঠিক প্রমাণিত হলো। টলেডোবাসী প্রতিরোধ করার পরিবর্তে দুর্গ-প্রাচীরের প্রধান দ্বার উন্মুক্ত করে দিল। মুসলিম বাহিনী কোনো প্রকার লড়াই ছাড়া এই খ্রিষ্টানদের রাজধানী টলেডো নগরীতে প্রবেশ করল।
তারিক বিন যিয়াদ রাজধানী টলেডো জয় করেই ক্ষান্ত হলেন না; বরং উত্তর দিকে অভিযান অব্যাহত রাখলেন। একে একে অতিক্রম করলেন ক্যাস্টিলা (Castile) ও লিওন (Leon) নগরী; খ্রিষ্টানদের তাড়িয়ে দিয়ে গেলেন আস্তোরগা (Astorga) পর্যন্ত। গথিক জাতির অনিষ্ট থেকে বাঁচতে শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নিল স্পেনের একেবারে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে গ্যালিসিয়া (Galicia) অঞ্চলের সুউচ্চ পর্বতমালায়। তারিক এরপরও তাঁর অভিযান অব্যাহত রাখলেন এবং আস্তুরিয়াস (Asturias) অঞ্চলের পর্বতমালা অতিক্রম করে আটলান্টিক মহাসাগরের শাখা বিস্কে উপসাগর (Bay of Biscay) পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন। বিস্কে সাগরের উপকূলীয় এলাকায় পৌঁছে সমাপ্ত হলো তারিক বিন যিয়াদের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ঐতিহাসিক এই সুগঠিত যুদ্ধাভিযান।
টিকাঃ
১. ইবনুল কাত্তান, আল-বায়ানুল মুগরিব, ১/১০০, মাক্কারী, আযহারুল জিবর, ১/১২৩ ও ইবনে খালদূন, তারীখু ইবনে খালদূন, ১/২ ও মুহাম্মাদ মুসলিম জুরান, তারীখুল মুসলিমীন ফিল আন্দালুস, পৃ: ৪১।
২. লেখক অজ্ঞাত, আল-বায়ানুল মুগরিব, ১/১০০-১০১ ও মাক্কারী, আযহারুল জিবর, ১/২৩৫।
৮. মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইনান, দাওলাতুল ইসলাম ফিল আন্দালুস, ১/৭১।
📄 তারিকের শক্তিবৃদ্ধিতে মূসা বিন নুসায়েরের আগমন
এদিকে তারিক বিন যিয়াদের দ্রুতগতির অভিযানের সংবাদ মুসা বিন নুসায়েরকে বিচলিত করে তুলল। তাঁর দৃষ্টিতে বিজয়াভিযানে অধীরতা ও তাড়াহুড়া করা ছিল একটি অপরিণামদর্শী ও অবিবেচনামূলক কাজ। আমরা পূর্বেই বলে এসেছি যে, উত্তর আফ্রিকার প্রতিটি অভিযানে মুসা বিন নুসায়ের স্থিতধীতা, প্রজ্ঞা ও সহিষ্ণুতার অপরূপ পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছিলেন এবং এভাবেই তাঁর বিজয়াভিযান আটলান্টিক পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। তাই তিনি কিছুটা কঠোরতা প্রকাশ করে একটি বার্তা তারিক বিন যিয়াদের উদ্দেশে প্রেরণ করলেন এবং তিনি না পৌঁছা পর্যন্ত তারিক বিন যিয়াদকে বিজয়াভিযান স্থগিত রেখে অপেক্ষা করতে বললেন। মুসা বিন নুসায়েরের আশঙ্কা ছিল খ্রিষ্টান বাহিনী একজোট হয়ে যে কোনো মুহূর্তে তারিক-বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। এরপর মুসা বিন নুসায়ের তারিক বিন যিয়াদকে সহায়তা করার জন্য আঠারো হাজার সৈন্যের এক বাহিনী প্রস্তুত করলেন।
টিকাঃ
৯. লেখক অজ্ঞাত, ‘আখবারুন মাজমুআ’, পৃ: ২৪।
📄 কোথা থেকে এল এরা?
মুসলিম বিশ্বের বিশাল অংশে যখন আল-আন্দালুস-ভূমির অভাবনীয় বিজয়াভিযানের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল, তখন এই পুণ্যকর্মে শরীক হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় সমকালীন মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আল-আন্দালুস-ভূমিতে মুসলিমরা অবতীর্ণ হলেন। তারিক বিন যিয়াদের সঙ্গে যারা আল-আন্দালুসে বিজয়ে শরীক ছিল, তাদের অধিকাংশ ছিল আমাজিগ (বার্বার) গোত্রীয়। আর এবার যে আঠারো হাজার সৈনিক মুসা বিন নুসায়েরের নেতৃত্বে আল-আন্দালুস অভিযানের জন্য প্রস্তুত হলো, তারা ছিল ইয়েমেন, শাম ও ইরাক থেকে ছুটে আসা আরব যোদ্ধা। আল্লাহর রাহে জিহাদের সওয়াব লাভ করার উদ্দেশ্যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তারা সাগরে পৌঁছেছিল। এবার তারা তারিক বিন যিয়াদকে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে মুসা বিন নুসায়েরের নেতৃত্বে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আল-আন্দালুস-ভূমিতে পা রাখেন।
📄 পথে মূসা বিন নুসায়েরের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অভিযান
একদল ঐতিহাসিকের দাবি হলো মুসা বিন নুসায়ের কিছুটা ঈর্ষান্বিত হয়ে তারিক বিন যিয়াদের বিজয়াভিযান স্থগিত করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন যে, আল-আন্দালুস বিজয়ের কৃতিত্ব এককভাবে তারিক বিন যিয়াদের না হয়ে বরং তাঁরও অংশ থাকুক। আর এ কারণেই তিনি তারিকের অভিযান স্থগিত রেখে নিজে আল-আন্দালুস-ভূমিতে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হলো, মুসা বিন নুসায়ের ছিলেন সতর্ক ও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিসম্পন্ন সুদক্ষ প্রশাসক ও সেনানায়ক। হীনম্মন্যতার লেশমাত্র তাঁর মধ্যে ছিল না। আল-আন্দালুস অভিযানে নেতৃত্বের জন্য তিনি তাই তারিক বিন যিয়াদকে নির্বাচিত করেছিলেন। অধিকন্তু তারিক বিন যিয়াদ ছিলেন তাঁরই নির্বাচিত প্রশাসক। ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে এবং বিজয়ীর আসনে তারিক বিন যিয়াদের আগমন তো মুসা বিন নুসায়েরের হাত ধরেই। সুতরাং তারিক বিন যিয়াদের যা কিছু অর্জন, নিশ্চিতভাবেই তা মুসা বিন নুসায়েরের কৃতিত্ব বলে গণ্য হবে।
কিন্তু মুসা বিন নুসায়েরের তাড়না ছিল মুসলিম বাহিনীর নিরাপত্তার বিষয়টি। মুসলিম বাহিনী আগমন ভূমি থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছিল। সৈন্যদের সংখ্যাও তখন ছিল কম। অধিকন্তু রাজধানীর দিকে এগোতে গিয়ে মুসলিম বাহিনী দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে অনেক অ-বিজিত ও শত্রুসংকুল নগরী পেছনে ফেলে গিয়েছিল। তাই মুসা বিন নুসায়ের তাঁর বাহিনী নিয়ে প্রথমে সেসব নগরীর দিকে রওনা হলেন, যেগুলোতে তারিক বিন যিয়াদ অভিযান পরিচালনা করেননি। প্রথমে তিনি সেভিল (Seville) অভিমুখে রওয়ানা হলেন। সেভিল যাওয়ার পথে প্রথমে তিনি তারিক বিন যিয়াদ কর্তৃক বিজিত সিডোনিয়া নগরীর অধিবাসীদের পুনর্সংগঠিত করলেন এবং তৎকালীন আন্দালুস অঞ্চলের অন্যতম প্রধান দুর্গ কারমোনা (Carmona) জয় করলেন। এরপর তিনি সেভিলে পৌঁছে সেভিল অবরোধ করলেন। কয়েক মাস দীর্ঘ অবরোধের পর সেভিলবাসী আনুগত্য স্বীকার করে দুর্গ-দ্বার উন্মুক্ত করে দিল। এরপর মুসা বিন নুসায়ের সেভিল অতিক্রম করে আরও উত্তরে চললেন। যে পথে তারিক বিন যিয়াদ অভিযান পরিচালনা করেছিলেন, তিনি সে পথে না গিয়ে উত্তর-পশ্চিমে চলতে লাগলেন। মুসা বিন নুসায়েরের লক্ষ্য ছিল একই সঙ্গে তারিক বিন যিয়াদের সহায়তা ও আল-আন্দালুস বিজয়াভিযানের পূর্ণতা নিশ্চিত করা; বিজয়-কৃতিত্ব ছিনিয়ে নেওয়া তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। মুসা বিন নুসায়ের তাঁর পথচলা অব্যাহত রাখলেন। পথে তিনি বড় বড় আরও অনেক অঞ্চল জয় করলেন। এরপরে তিনি পৌঁছলেন মেরিডা (Mérida) নামক অঞ্চলে। তারিক বিন যিয়াদ তখনও টলেডোতে মুসা বিন নুসায়েরের আগমনের অপেক্ষায় আছেন। মেরিডা ছিল ওই সময়ের একটি সুরক্ষিত এলাকা, যেখানে বহুসংখ্যক গোথিক সৈন্য সমবেত হয়েছিল। মুসা বিন নুসায়ের মেরিডা অবরোধ করলেন। এ অবরোধ কয়েক মাস দীর্ঘ হলো। অবরোধের শেষ মাস ছিল রমযান মাস। ধৈর্য ও সহনশীলতার দীর্ঘ পরীক্ষার পর ঈদুল ফিতরের দিন মেরিডার বাসিন্দারা আনুগত্য স্বীকার করল এবং প্রাচীরের দ্বার খুলে দিল। মুসা বিন নুসায়ের তাদের সঙ্গে জিযিয়া প্রদানের শর্তে চুক্তি করলেন।
মেরিডা জয় করেই মুসা বিন নুসায়ের ক্ষান্ত হলেন না। তিনি তাঁর পুত্র আব্দুল আযীযকে পশ্চিমের বিভিন্ন অঞ্চল জয় করার জন্য প্রেরণ করলেন। পিতা মুসা বিন নুসায়েরের মতো আব্দুল আযীযও ছিলেন অকুতোভয় যোদ্ধা। পশ্চিম দিকে অভিযান পরিচালনা করে তিনি অনেক নতুন প্রদেশে প্রবেশ করলেন এবং অল্প সময়েই পুরো পশ্চিম অঞ্চল জয় করলেন। বর্তমানে এ অঞ্চলটি ‘পর্তুগাল’ নামে পরিচিত। অভিযান পরিচালনা করে তিনি লিসবন (Lisbon) পর্যন্ত পৌঁছালেন এবং লিসবন জয় করলেন। এ অভিযানের কারণেই আব্দুল আযীয বিন মুসা বিন নুসায়েরকে ‘পর্তুগাল বিজেতা’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
টিকাঃ
১০. ড. ফারুক মারমারী এর ওপরে উল্লেখ করেছেন। দেখুন : লেখক অজ্ঞাত, আখবারুন মাজমুআ, পৃ : ২৪ ও রাফীকী, আল-আন্দালুস, ২/২৬।
১১. মুহাম্মাদ ইবনুল কাসিম, আল-আন্দালুস, পৃ : ৫৮।
১২. লেখক অজ্ঞাত, আখবারুন মাজমুআ, পৃ: ২৬ ও ৪৩।
১৩. আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মদ, তাওয়ারিখ আল-আন্দালুস, পৃ: ২৮।