📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 জিযিয়ার পরিমাণ

📄 জিযিয়ার পরিমাণ


যারা ইসলামের জিযিয়া-বিধানের কঠোর সমালোচনা করেন এবং একে অমুসলিম জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নিপীড়ন, অবিচার ও লাঞ্ছনা বলে অভিহিত করেন, তারা সম্ভবত যখন জানবেন যে, অমুসলিম নাগরিকদের কাছ থেকে জিযিয়া গ্রহণ করা হয় মুসলিম নাগরিকদের কাছ থেকে গৃহীত যাকাতের বিপরীতে; আরও জানবেন যে, মুসলিম সামর্থ্যবান নাগরিকদের প্রদত্ত যাকাতের চেয়ে অমুসলিম সামর্থ্যবান নাগরিকদের ওপর আরোপিত জিযিয়ার পরিমাণ অনেক কম, তখন তারা কী মন্তব্য করবেন কিংবা তখন তাদের কী মন্তব্য করা উচিত? অধিকন্তু কোনো জিযিয়া প্রদানকারী নাগরিক ইসলাম গ্রহণ করলে তার অনাদায়ী জিযিয়া মওকুফ হয়ে যায়। মুসলমানদের সঙ্গে যুদ্ধে শারীরিক অংশগ্রহণের পরিবর্তে অমুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তাদানে মুসলিম নাগরিকরাও রাষ্ট্রীয় সম্পদ হতে একটি অংশ প্রদান করে। মুসলিম বাহিনী যখন আন্দালুস জয় করে, তখন পূর্বনির্ধারিত শর্তের ভিত্তিতে উপযুক্ত একজন অমুসলিম নাগরিকের ওপর আরোপিত জিযিয়ার পরিমাণ ছিল বার্ষিক এক দীনার (একটি স্বর্ণমুদ্রা)। অপরদিকে এক একজন মুসলিম নাগরিক নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হলে এবং এ অবস্থায় এক বছর অতিবাহিত হলে তাকে প্রদান করতে হতো মোট সম্পদের ২.৫%। সুতরাং আহলে কিতাব ও অন্যান্য অমুসলিম নাগরিকরা যে জিযিয়া প্রদান করত, তার তুলনায় মুসলিম নাগরিকদের প্রদত্ত যাকাতের পরিমাণ ছিল অনেক গুণ বেশি। আরও দেখুন, ইসলামের যাকাতের পরিমাণ বর্তমান বিশ্বে প্রচলিত যে কোনো কর-ব্যবস্থার চেয়ে কম। বর্তমান কর-ব্যবস্থায় হ্রাস ও বৃদ্ধিতে ১০%, ২০%, এমনকি কোথাও কোথাও মোট সম্পদের ৫০ থেকে ৭০%ও কর ধার্য করা হয়। আর ইসলামের যাকাতের পরিমাণ কখনোই মোট সম্পদের ২.৫%-এর বেশি হয় না, আর জিযিয়া তো সেই যাকাতের চেয়েও অনেক কম। এ বিবেচনায় জিযিয়াকে বলা যায় পৃথিবীর সবচেয়ে কম পরিমাণ রাজস্ব কর। বিভিন্ন রাষ্ট্রশাসকগণ নিজ দেশের জনগণের ওপর যে রাজস্ব আরোপ করেন, তার চেয়ে জিযিয়ার পরিমাণ অনেক কম। অধিকন্তু রহমতের নবী হযরত আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আহলে কিতাবদের ওপর সাধ্যাতীত কিছু আরোপ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। শুধু নিষেধ করেই ক্ষান্ত হননি; যারা তাদের ওপর জুলুম করবে বা তাদের কোনো ক্ষতি করবে, তাদের ভীতিপ্রদর্শনপূর্বক ইরশাদ করেছেন, 'সাবধান! যে ব্যক্তি চুক্তিভুক্ত অমুসলিম নাগরিকের প্রতি অবিচার করবে, তাদের অপদস্থ করবে, তাদের ওপর সামর্থ্যের অধিক কোনো কিছু চাপিয়ে দেবে অথবা মনোতুষ্টি ব্যতিরেক তাদের কোনো সম্পদ ছিনিয়ে নেবে কাল কিয়ামতের দিন আমি তার প্রতিপক্ষ হব (অর্থাৎ তার বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করব)।'

টিকাঃ
১. সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩০৫২।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 উত্তরে তারিক বিন যিয়াদের অব্যাহত অভিযান

📄 উত্তরে তারিক বিন যিয়াদের অব্যাহত অভিযান


বারবাত প্রান্তরের ঐতিহাসিক যুদ্ধে জয়লাভ করার পর তারিক বিন যিয়াদ তাঁর মূল বাহিনী নিয়ে সামনে অগ্রসর হন এবং পথে যোগ দেওয়া সৈন্যদেরকে ছোট ছোট দলে বিভক্ত করে উপদ্বীপের বিভিন্ন অংশে অভিযানে প্রেরণ করলেন। তিনি নিজ মূল বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলেন উত্তরের দিকে; দক্ষিণ আন্দালুসের অন্যতম নগরী ইসিজা (Ecija)-এর উদ্দেশে। বারবাত প্রান্তরে পরাজিত স্প্যানিশ বাহিনীর অবশিষ্ট সেনারা সেখানে সমবেত হয়েছিল এবং মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে পুনরায় লড়াই করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ইসিজা যাওয়ার পথে তারিক বিন যিয়াদ সিদোনিয়া (Medina-Sidonia) ও মুরর (Moron de la Frontera) নগরী জয় করলেন। ইসিজা পৌঁছার পর সেখানে জড়ো হওয়া স্প্যানিশ বাহিনীর সঙ্গে মুসলিম বাহিনীর প্রচণ্ড যুদ্ধ হলো। অবশ্য তীব্রতা ও প্রচণ্ডতায় বারবাত প্রান্তরের যুদ্ধের সঙ্গে এ যুদ্ধের কোনো তুলনা করা যায় না। কেননা, বারবাতের যুদ্ধে স্প্যানিশ বাহিনী তাদের সিংহভাগ শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। ফলে ইসিজাবাসী পরাজয় স্বীকার করে এবং জিযিয়া প্রদানের চুক্তি করল। মুসলিম বাহিনী কর্তৃক কোনো শহর যুদ্ধের মাধ্যমে জয় করা আর জিযিয়া চুক্তির মাধ্যমে জয় করা—এ দু’য়ের মাঝে মোটা দাগের পার্থক্য রয়েছে। মুসলিম বাহিনী কোনো নগরী যুদ্ধের মাধ্যমে জয় করলে সে নগরীর সকল সম্পদের কর্তৃত্ব লাভ করে; অপরদিকে জিযিয়া চুক্তির বিনিময়ে জয় করার অর্থ নগরীর মালিকানা পরাজিত জাতিরাই পাবে, তারা কেবল জিযিয়া প্রদানের মাধ্যমে বশ্যতা স্বীকার করবে। পূর্বে উল্লেখ করে এসেছি, সেকালে জিযিয়ার পরিমাণ ছিল বার্ষিক এক দীনার। উল্লেখ্য, ইসিজা জয়ের সময় তারিক বিন জিয়াদের বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা নয় হাজারের বেশি ছিল না। ইসিজা বিজয়ের পর তারিক বিন জিয়াদ দক্ষিণালুসের অন্যান্য শহর জয়ের জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাহিনী প্রেরণ করলেন। আর নিজ মূল বাহিনী নিয়ে রওয়ানা হলেন আরও উত্তরে আন্দালুসের তৎকালীন রাজধানী টলেডোর উদ্দেশে। ক্ষুদ্র বাহিনীগুলো প্রেরিত হয়েছিল কর্ডোভা, গ্রানাডা, মালাগা ও মুরসিয়ার উদ্দেশে। এগুলো প্রত্যেকটি ভূমধ্যসাগরের উপকূলবর্তী এলাকা ও জাবালে তারিক প্রণালী-সংলগ্ন দক্ষিণ আন্দালুসের গুরুত্বপূর্ণ নগরী। প্রেরিত এসব সৈন্যদের কোনোটির সদস্য-সংখ্যা সাত শ’-এর বেশি ছিল না। কিন্তু সাত শ’ সৈন্যের হাতেই বিজিত হলো রহস্যময় ও সবুজ নগরী কর্ডোভা। কোরআনের ভাষায়, 'এবং (হে নবী!) তুমি যখন (তীরের ওপর মাটি) নিক্ষেপ করেছিলে, তখন তা তুমি নিক্ষেপ করোনি; বরং আল্লাহই নিক্ষেপ করেছিলেন।' [সূরা আনফাল: ১৭]। অন্যান্য ক্ষুদ্র বাহিনীর অভিযানও সফল হলো। গ্রানাডা, আরজোনা ও মালাগা বিজিত হলো যুদ্ধের মাধ্যমে আর মুরসিয়া ও তার ঘাঁটি অরিহুয়েলা (Orihuela) বিজিত হলো জিযিয়া চুক্তির মাধ্যমে।

টিকাঃ
২. লেখক অজ্ঞাত, ‘আল-বায়ানুল মুগরিব’, পৃ: ১৬, ইবনুল আছীর, আল-কামিল ফিত তারিখ, ২/৮ ও মাক্কারী, আযহারুল জিবর, ১/২৩০।
১. লেখক অজ্ঞাত, আল-বায়ানুল মুগরিব, পৃ: ১৮, মাক্কারী, আযহারুল জিবর, ১/২৩০-২৩১, ইবনে হায়্যান, আল-মুকতবাস, পৃ: ৭৮ ও মুহাম্মাদ মুসলিম জুরান, তারীখুল মুসলিমীন ফিল আন্দালুস, পৃ: ৪১।
২. মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইনান, দাওলাতুল ইসলাম ফিল আন্দালুস, ১/৭০।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 টলেডোর দোরগোড়ায় তারিক বিন যিয়াদ

📄 টলেডোর দোরগোড়ায় তারিক বিন যিয়াদ


টলেডো স্পেনের প্রাচীনতম শহরগুলোর একটি। এটি আইবেরিয়ান উপদ্বীপের মধ্যভাগে বর্তমান স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদ থেকে ৭১ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। সুগভীর উপত্যকা-বেষ্টিত ও উচ্চভূমিতে অবস্থিত টলেডো নগরীর তিনদিকেই আছে টাগুস নদী (Tagus River)। আফ্রিকা-প্রশাসক মুসা বিন নুসায়েরের প্রজ্ঞা ও ধীরস্থিরতা ছিল সর্বজনবিদিত। তিনি আন্দালুস অভিযানের পূর্বে তারিক বিন জিয়াদকে জাবাল ও কর্ডোভা নগরী অতিক্রম করে এই রাজধানী টলেডোর পথে অগ্রসর হতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। কেননা, তাঁর আশঙ্কা ছিল, এর ফলে খ্রিষ্টান বাহিনী মুসলিম বাহিনীকে ঘিরে ফেলার সুযোগ পেতে পারে। কিন্তু তারিক বিন জিয়াদ দেখতে পেলেন, তাঁর সামনে টলেডোর পথ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। মুসা বিন নুসায়ের তাঁকে যে আশঙ্কার কথা বলেছিলেন, তেমন কোনো আশঙ্কাও এখন নেই। সবদিক বিবেচনায় তাঁর মনে হলো রাজধানী টলেডোতে অভিযান পরিচালনার এটিই উপযুক্ত সময়। টলেডোকে সবদিক থেকেই মনে করা হতো খ্রিষ্টানদের সবচে' সুরক্ষিত নগরী। কেননা, নগরীটি উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম—তিন দিক থেকে পাহাড়-পর্বত দ্বারা বেষ্টিত ছিল আর উন্মুক্ত দক্ষিণ দিকে ছিল বিশালাকার সমরাস্ত্র সজ্জিত দুর্গ। তারিক বিন জিয়াদ ভেবে দেখলেন, যদি খ্রিষ্টানদের এই ছত্রভঙ্গ ও দুর্বল অবস্থায় টলেডো আক্রমণ করা যায়, তাহলে তারা কিছুতেই মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে না এবং সহজেই নগর-বিজয় সম্পন্ন হবে। এখন যদি অভিযান পরিচালনা করা না হয়, ভবিষ্যতে আর এই সুবিধা পাওয়া যাবে না, তখন অভিযান হয়ে যাবে সুকঠিন। বাস্তবেও তারিক বিন জিয়াদের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ সঠিক প্রমাণিত হলো। টলেডোবাসী প্রতিরোধ করার পরিবর্তে দুর্গ-প্রাচীরের প্রধান দ্বার উন্মুক্ত করে দিল। মুসলিম বাহিনী কোনো প্রকার লড়াই ছাড়া এই খ্রিষ্টানদের রাজধানী টলেডো নগরীতে প্রবেশ করল।

তারিক বিন যিয়াদ রাজধানী টলেডো জয় করেই ক্ষান্ত হলেন না; বরং উত্তর দিকে অভিযান অব্যাহত রাখলেন। একে একে অতিক্রম করলেন ক্যাস্টিলা (Castile) ও লিওন (Leon) নগরী; খ্রিষ্টানদের তাড়িয়ে দিয়ে গেলেন আস্তোরগা (Astorga) পর্যন্ত। গথিক জাতির অনিষ্ট থেকে বাঁচতে শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নিল স্পেনের একেবারে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে গ্যালিসিয়া (Galicia) অঞ্চলের সুউচ্চ পর্বতমালায়। তারিক এরপরও তাঁর অভিযান অব্যাহত রাখলেন এবং আস্তুরিয়াস (Asturias) অঞ্চলের পর্বতমালা অতিক্রম করে আটলান্টিক মহাসাগরের শাখা বিস্কে উপসাগর (Bay of Biscay) পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন। বিস্কে সাগরের উপকূলীয় এলাকায় পৌঁছে সমাপ্ত হলো তারিক বিন যিয়াদের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ঐতিহাসিক এই সুগঠিত যুদ্ধাভিযান।

টিকাঃ
১. ইবনুল কাত্তান, আল-বায়ানুল মুগরিব, ১/১০০, মাক্কারী, আযহারুল জিবর, ১/১২৩ ও ইবনে খালদূন, তারীখু ইবনে খালদূন, ১/২ ও মুহাম্মাদ মুসলিম জুরান, তারীখুল মুসলিমীন ফিল আন্দালুস, পৃ: ৪১।
২. লেখক অজ্ঞাত, আল-বায়ানুল মুগরিব, ১/১০০-১০১ ও মাক্কারী, আযহারুল জিবর, ১/২৩৫।
৮. মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইনান, দাওলাতুল ইসলাম ফিল আন্দালুস, ১/৭১।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 তারিকের শক্তিবৃদ্ধিতে মূসা বিন নুসায়েরের আগমন

📄 তারিকের শক্তিবৃদ্ধিতে মূসা বিন নুসায়েরের আগমন


এদিকে তারিক বিন যিয়াদের দ্রুতগতির অভিযানের সংবাদ মুসা বিন নুসায়েরকে বিচলিত করে তুলল। তাঁর দৃষ্টিতে বিজয়াভিযানে অধীরতা ও তাড়াহুড়া করা ছিল একটি অপরিণামদর্শী ও অবিবেচনামূলক কাজ। আমরা পূর্বেই বলে এসেছি যে, উত্তর আফ্রিকার প্রতিটি অভিযানে মুসা বিন নুসায়ের স্থিতধীতা, প্রজ্ঞা ও সহিষ্ণুতার অপরূপ পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছিলেন এবং এভাবেই তাঁর বিজয়াভিযান আটলান্টিক পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। তাই তিনি কিছুটা কঠোরতা প্রকাশ করে একটি বার্তা তারিক বিন যিয়াদের উদ্দেশে প্রেরণ করলেন এবং তিনি না পৌঁছা পর্যন্ত তারিক বিন যিয়াদকে বিজয়াভিযান স্থগিত রেখে অপেক্ষা করতে বললেন। মুসা বিন নুসায়েরের আশঙ্কা ছিল খ্রিষ্টান বাহিনী একজোট হয়ে যে কোনো মুহূর্তে তারিক-বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। এরপর মুসা বিন নুসায়ের তারিক বিন যিয়াদকে সহায়তা করার জন্য আঠারো হাজার সৈন্যের এক বাহিনী প্রস্তুত করলেন।

টিকাঃ
৯. লেখক অজ্ঞাত, ‘আখবারুন মাজমুআ’, পৃ: ২৪।

ফন্ট সাইজ
15px
17px