📄 তারিক বিন যিয়াদের ভাষণ প্রসঙ্গ
ঐতিহাসিক ইবনে খাল্লিকান ‘ওয়াফায়াতুল আ’ইয়ান’ গ্রন্থে এবং মাক্কারী ‘নফহুত তীব’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, রডারিক-বাহিনী মুসলিম বাহিনীর নিকটবর্তী হলে তারিক বিন যিয়াদ মুসলিম বাহিনীর সামনে দণ্ডায়মান হলেন এবং প্রথমে আল্লাহ্ তা’আলার হামদ ও ছানা পাঠ করলেন। এরপর তিনি মুসলিম বাহিনীকে উদ্বুদ্ধ করে বললেন:
'আমার ভাইয়েরা! পালাবার পথ কোথায়? তোমাদের পেছনে উত্তাল সমুদ্র, আর সামনে উদ্ধত দুশমন। আল্লাহর শপথ, নিজেদের জন্য এটি নির্ভেজাল আনুগত্য প্রদর্শনে ও অটল-অবিচল থাকার চূড়ান্ত পরীক্ষা। মনে রেখো, এই দ্বীপে তোমরা এতিম শিশুদের চেয়েও বেশি অসহায়। তোমাদের শত্রু তোমাদের মোকাবিলা করার জন্য নিজেদের পূর্ণ রসদ ও দলবল নিয়ে প্রস্তুত হয়ে এসেছে। তাদের কাছে যথেষ্ট রসদপত্র আছে। তোমাদের কাছে তরবারি ছাড়া আর কোনো সহায় নেই। তোমাদের আহার কেবল তা-ই, যা তোমরা শত্রুর হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে। যদি এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয় আর এ সময়ের মধ্যে তোমরা উল্লেখযোগ্য কোনো সফলতা অর্জন করতে না পার, তাহলে শত্রুদের অন্তরে তোমাদের প্রতি যে ভয় রয়েছে, তা নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং পরিবর্তে তারা তোমাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হয়ে উঠবে। সুতরাং তোমরা এই অবাধ্যদের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজেদের রক্ষা করো। তোমরা যদি প্রাণের মায়া ত্যাগ করে ময়দানে অবতীর্ণ হতে পার, তাহলে এই সুবর্ণ সুযোগ তোমরা কাজে লাগাতে পারবে।
আমি তোমাদেরকে এমন কোনো পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করছি না, যা থেকে আমি নিজে মুক্ত। আমি যে বিষয়ে তোমাদের উৎসাহিত করছি, তার জন্য আমি নিজেও প্রস্তুত। আজকের এই কঠিন দিনের সামান্য সময়ের ত্যাগই তোমাদের জন্য দীর্ঘকালের সুখ-সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে! তোমরা নিশ্চয়ই জেনেছ যে, এই দ্বীপের নৃপতিদের প্রাসাদে আছে মণি-মুক্তা ও বৈভব। আমীরুল মুমিনীন ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিক তোমাদের বীরদের মধ্য হতে নির্বাচন করেছেন। তিনি কেবল এ আশাই করেন যে, এই দ্বীপে আল্লাহর কালিমা সমুন্নত করার এবং তাঁর দীনকে প্রতিষ্ঠিত করার নেক আমলের মাধ্যমে তোমরা সফল হবে। মনে রেখো, যার প্রতি আমি তোমাদের আহ্বান করছি, তাকে সর্বপ্রথম সাড়া আমিই দেব। আমি এ সংকল্প করেছি যে, যুদ্ধ শুরু হওয়া মাত্র আমি হামলা চালাব এ জাতির স্বৈরাচার শাসক রডারিকের উপর। ইনশাআল্লাহ, আমিই তাকে হত্যা করব। আমার সঙ্গে তোমরাও তখন হামলা করবে। রডারিক নিহত হওয়ার পর আমি যদি শহীদ হয়ে যাই, তবে তোমাদের মধ্যে বীর-সাহসী ও দূরদর্শী ব্যক্তির অভাব হবে না, যাকে তোমরা নিজেদের নেতা হিসেবে বরণ করে নেবে। রডারিকের মৃত্যু শত্রুবাহিনীর মশালকে ভেঙে দেবে।'
টিকাঃ
৯৬. ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ’ইয়ান, ৬/৪২১-৪২২।
৩২. ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আইয়ান, ৪/৩৫১-৩৫২ ও মাক্কারী, নফহুত তীব, ১/২৪০-২৪১।
📄 এই ভাষণের ঐতিহাসিক সত্যতা সম্পর্কে আমাদের অবস্থান
১. পূর্বতন ও পরবর্তী যুগের (আন্দালুস বিজয়ের) ইতিহাস-সংকলকগণ কেউই এ ভাষণের কথা উল্লেখ করেননি, যা ভাষণটি সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মাঝে সংশয় সৃষ্টি করে। এর ফলে এর ঐতিহাসিক সত্যতার সম্ভাবনা হ্রাস পায়।
২. ভাষণটির বাক্য ও বর্ণনাভঙ্গী হিজরী প্রথম শতকে প্রচলিত আরবী-শৈলীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাছাড়াও একজন সেনাপতি তার যুদ্ধপূর্ব ভাষণে এমন ছন্দবদ্ধ ভাষা ব্যবহার করবেন, এ বিষয়টি অবাস্তবিক।
৩. উল্লিখিত ভাষণে একটি বাক্য আছে— 'ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিক আরব বীরদের মাঝ থেকে তোমাদেরকে নির্বাচিত করেছেন'। অথচ আন্দালুস অভিযানের জন্য উপযুক্ত যোদ্ধাদের বাছাই ও নির্বাচন আফ্রিকা-প্রশাসক মুসা বিন নুসায়ের কর্তৃক হয়েছিল, খলীফা ওয়ালিদ কর্তৃক নয়।
৪. পরিস্থিতির দাবি ছিল এ ক্ষেত্রে প্রথমত ভাষণ হবে পরিস্থিতি-উপযোগী কুরআনের আয়াত, হাদীসে রাসূল, যুদ্ধকৌশল সম্পর্কিত দিক-নির্দেশনা ও ইসলামী ভাবধারা সম্বলিত।
৫. তারিক বিন যিয়াদ নিজে যেমন আমাজিগ গোত্রীয় ছিলেন, মুসলিম বাহিনীর অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন আমাজিগ গোত্রের। সুতরাং প্রথমত ভাষণ তাদের ভাষায় হওয়াই ছিল সঙ্গত। কারণ আমাজিগ যোদ্ধাদের আরবী জ্ঞান অত উন্নত না হওয়াটাই স্বাভাবিক।
টিকাঃ
৩৩. আবদুর রহমান আলহাজ্জী, আন্দালুসুল ফাতহ, পৃ : ৪২-৫১।
📄 তারিক বিন যিয়াদের নৌবহর জ্বালিয়ে দেওয়া প্রসঙ্গ
বারবাত প্রান্তর সংঘটিত ঐতিহাসিক যুদ্ধের আলোচনা শেষে পরবর্তী প্রসঙ্গে যাওয়ার পূর্বে আমরা আরেকটি বিষয়ে পর্যালোচনা করতে চাচ্ছি। ঐতিহাসিক ও প্রচলিত ইউরোপীয় অনেক ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে একটি ঘটনা প্রচার করা হয়েছে। আর তা হলো, বারবাত প্রান্তর যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে তারিক বিন যিয়াদ কর্তৃক সব নৌযান পুড়িয়ে ফেলার ঘটনা। এর তাৎপর্য বিষয়ে বর্ণিত আছে যে, মুসলিম বাহিনীর যুদ্ধ-স্পৃহা বৃদ্ধি করতে এবং তাদের মরণপণ লড়াইয়ের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেই মূলত তারিক বিন যিয়াদ সবগুলো জাহাজ পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও যুক্তি-প্রমাণের ভিত্তিতে আমরা এই বর্ণনাটিকে কাল্পনিক বলে গণ্য করেছি। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণ হলো:
১. ইসলামী ইতিহাসে এই বর্ণনাটির বিশুদ্ধ কোনো সনদ নেই। বর্ণনাটি মূলত ইউরোপীয় বিভিন্ন বর্ণনা ও উপকথা থেকে আমাদের ইতিহাসে স্থান পেয়েছে।
২. যদি বাস্তবিকই এমন কিছু ঘটত, তাহলে মুসা বিন নুসায়ের বা খলীফা ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিকের পক্ষ থেকে অবশ্যই তারিক বিন যিয়াদের কাছে কৈফিয়ত তলব করা হতো এবং এর বৈধতা-অবৈধতা নিয়ে আলোচনা হতো। কোনো ইতিহাস-গ্রন্থে এমন কোনো প্রতিক্রিয়ার বিবরণ নেই।
৩. ইউরোপীয় ঐতিহাসিকরা বিশ্বাস করতে পারেন না যে, মাত্র বার হাজার পদাতিক মুসলিম সৈন্য কীভাবে এক লক্ষ অশ্বারোহী খ্রিষ্টান সৈন্যকে পরাজিত করল। এই বিজয়ের একটি জাগতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করাতেই তারা এই কাহিনী ছড়িয়েছে যে, পালানোর পথ ছিল না বলেই মুসলিমরা জিতেছে।
৪. ইসলামের ইতিহাসে এমন অনেক ক্ষেত্র আছে যেখানে মুসলিমরা সংখ্যায় অল্প হয়েও জয়ী হয়েছে। তাদের বীরত্ব ও লড়াইয়ের উদ্দীপনা জাগাতে জাহাজ পোড়ানোর মতো নাটকের প্রয়োজন পড়ে না।
৫. তারিক বিন যিয়াদের ন্যায় একজন প্রাজ্ঞ ও সুদক্ষ সেনাপতি নিজের প্রত্যাবর্তনের পথ রুদ্ধ করে ফেলবেন, এটা বোধগম্য নয়। যুদ্ধে সাময়িক পশ্চাদপসরণ বা দল পুনর্গঠনের প্রয়োজন হতে পারে, যা শরীয়তসম্মত যুদ্ধকৌশল। তিনি সেই পথ বন্ধ করতে পারেন না।
৬. সবচেয়ে বড় কথা হলো, জাহাজগুলো তারিক বিন যিয়াদের মালিকানাধীন বা সরকারি সম্পদ ছিল না। এগুলো সিউটা-প্রশাসক জুলিয়ানের কাছ থেকে শর্তসাপেক্ষে ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। সুতরাং এগুলো পোড়ানোর কোনো অধিকার তাঁর ছিল না।
টিকাঃ
৪৬. ইবনুল আছীর, আল-কামিলু ফিত-তারীখ, ২/৬ ও যিবরালী, তারিখুল ইবর, পৃ: ৬৫।
৪৭. মাক্কারী, নফহুত তীব, ১/২৯৪।
৪৮. জুলিয়ান ফালুন, কিস্সাতুল আন্দালুস, পৃ: ৭২।
📄 তারিক বিন যিয়াদের অব্যাহত অভিযান ও আন্দালুসের বিভিন্ন অঞ্চল জয়
বারবাত প্রান্তরে মুসলিম বাহিনীর ঐতিহাসিক বিজয়ের পর মাগরেব ও উত্তর আফ্রিকা থেকে অনেক নতুন অভিযাত্রী মুসলিম বাহিনীতে যোগ দিতে লাগল। ফলে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা আশাতীত বৃদ্ধি পেল। তারিক বিন যিয়াদ ভেবে দেখলেন, বিজয়কে পূর্ণতা দানের এবং সামান্য ক্ষয়ক্ষতি স্বীকারের মাধ্যমে পূর্ণ বিজয় বাস্তবায়নের এটিই শ্রেষ্ঠ সময়। এর পেছনে কারণগুলো ছিল—
১. এক লক্ষ সৈন্যের বিরুদ্ধে বার হাজার মুসলিম সৈনিকের অভাবনীয় বিজয়ের ফলে মুসলিম বাহিনী এখন অত্যন্ত উচ্চ মনোবল ও প্রাণশক্তির অধিকারী।
২. নতুন অনেক স্বেচ্ছাসেবী যোগ দেওয়ায় সৈন্যসংখ্যাও এখন প্রচুর।
৩. এই অভাবনীয় পরাজয়ে খ্রিষ্টান বাহিনীর আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়েছে।
৪. যুদ্ধে খ্রিষ্টান বাহিনী তাদের মূল শক্তি ও সেনাদল হারিয়ে প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছে।
৫. রডারিকের পতনের ফলে সাধারণ জনগণের ওপর যে প্রভাব পড়েছে, তা তাদেরকে ইসলামের সুমহান শিক্ষার সঙ্গে পরিচিত করার বড় সুযোগ তৈরি করেছে।
৬. সিউটা-প্রশাসক জুলিয়ান কতক্ষণ মিত্র থাকবে তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না, তাই সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত অগ্রসর হওয়া জরুরি ছিল।
এসব কারণে তারিক বিন যিয়াদ বারবাত যুদ্ধ শেষ হওয়ার অবব্যহিত পরেই আন্দালুসের অভ্যন্তরে অসংখ্য শহর জয় করার লক্ষ্যে তাঁর বাহিনী নিয়ে তৎকালীন রাজধানী টলেডোর উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। টলেডো তখন নতুন কোনো শাসককে বরণ করে নেওয়ার প্রতীক্ষায় ছিল। সেখানে রডারিক-অনুসারী ও উইটিযা-অনুসারীদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই চলছিল।