📄 দুই পক্ষের প্রকৃত তুলনা
সংখ্যা ও শক্তিতে অনেক ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও যদি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যাবে যে বাস্তব শক্তিতে মুসলিম বাহিনীই ছিল অগ্রগামী। একদল ছিল ঈমানী শক্তিতে বলীয়ান, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও শাহাদাতের তামান্না নিয়ে যুদ্ধ করতে এসেছিল। তাদের মাঝে কোনো বিভেদ ছিল না, শাসক-প্রজা সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল। অন্যদিকে রডারিকের এক লক্ষ সৈন্যের বাহিনী ছিল বৈষম্যে ভরা। সেখানে কেউ ছিল প্রভু আর কেউ ছিল দাস। তাদের লক্ষ্য ছিল কেবল ব্যক্তিগত প্রাণ বাঁচিয়ে পরিবারে ফিরে যাওয়া। রাজা রডারিক বিলাসী জীবন থেকে বের হতে না পেরে যুদ্ধের ময়দানেও স্বর্ণের সিংহাসনে চড়ে এসেছিলেন, আর তাঁর সৈন্যরা ছিল ক্ষুধার্ত ও শোষিত। ফলে এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বেই যেন এর ফলাফল নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল।
📄 বারবাত উপত্যকা ও রমযান মাস
এভাবেই পবিত্র মাসে রমযানে বারবাত উপত্যকার সেই অসম আর সুনিশ্চিত এক যুদ্ধ শুরু হলো। যুদ্ধ শুরু হলো সত্য ও বাতিলের মাঝে। মাসে রমযানের সাথে জড়িয়ে আছে কত যুদ্ধ-ইতিহাস! কত অভিযান ও বিজয়ের উপাখ্যান। টানা আটদিন ধরে চলল প্রচণ্ড লড়াই, উভয় বাহিনীর মাঝে রক্তক্ষয়ী ভয়ানক এক যুদ্ধ। খ্রিষ্টান বাহিনী প্রবল তরঙ্গের মতো আছড়ে পড়তে লাগল মুসলিম বাহিনীর উপর। কিন্তু মুসলিম বাহিনী যেন সীসাগলা প্রাচীর; দৃঢ় মনোবল ও অটল-অবিচল। এ যেন— 'মুমিনদের মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত প্রতিশ্রুতির সত্যতা নিশ্চিত করেছে এবং তাদের মধ্যে এমন লোকও আছে, যারা তাদের নযরানা আদায় করেছে এবং আছে এমন কিছু লোক, যারা এখনও প্রতীক্ষায় আছে, আর তারা (তাদের সংকল্পে) কিছুমাত্র পরিবর্তন আনেনি।' [সূরা আহযাব: ২৩]
আটদিন একটানা যুদ্ধ চলার পর মুসলিম বাহিনীর নিরঙ্কুশ বিজয়ের মধ্য দিয়েই যুদ্ধ শেষ হলো। আল্লাহ তায়ালা বারবাত উপত্যকায় ধৈর্য ও পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের বিনিময়ে মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করলেন। তারিক বিন যিয়াদের নেতৃত্বে মুসলমানগণ বীরত্বের এমন এক মহাকাব্য রচনা করল, যার নমুনা মাগরেব ও আন্দালুস-ভূমি ইতঃপূর্বে প্রত্যক্ষ করেনি। একটানা আটদিন ধরে চলেছে তরবারির সংঘাত, প্রতিদিন শহীদ হয়েছে উভয় পক্ষের কত যোদ্ধা! গথ বাহিনী লড়াই করেছে বীর বিক্রমে, প্রবল প্রতাপে। কিন্তু যে ঈমানী দৃঢ়তা ও বিশ্বাসের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে মুসলিম বাহিনী লড়াই করেছে, তার সামনে কীভাবে টিকবে গথ বাহিনীর বীরত্ব ও প্রতাপ! ঐতিহাসিক ইবনে আ’যারী রহ. বারবাতের রণক্ষেত্রে যুদ্ধরত মুসলিম বাহিনীর বীরত্বগাথা উল্লেখ করেছেন।
রমযান শেষ হওয়ার দুই দিন পূর্বে এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। শাওয়াল মাসের পাঁচ তারিখ রবিবার পর্যন্ত একটানা আট দিন এই যুদ্ধ চলল। তারপর আল্লাহ তাআলা মুসলিম বাহিনীর প্রতিপত্তিকে জয়যুক্ত করলেন। শত্রুদের বহুসংখ্যক সেনা নিহত হলো। বিজয়ী মুসলিম সৈন্যদের রক্তে ও ঘামে সিক্ত হয়ে রমজানের শেষ দিনগুলো অতিবাহিত হলো।
📄 বারবাত যুদ্ধে অর্জিত গুরুত্বপূর্ণ কিছু ফলাফল
১. এ যুদ্ধের মাধ্যমেই আন্দালুসে জুলুম-অন্যায়, জাহিলিয়্যাত-মূর্খতা এবং অনাচার ও স্বেচ্ছাচারিতার দীর্ঘ ইতিহাসের পাতা উল্টে সুসভ্যতা ও সুসমৃদ্ধির এক নব দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
২. মুসলিম বাহিনীর অশ্বারোহী বাহিনীর সৈনিকরা খুব দ্রুতই সফলতা লাভ করে। ফলে পদাতিক বাহিনীও অশ্বারোহী বাহিনীর ন্যায় গতিশীলতা পায়।
৩. যুদ্ধের পূর্বে মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল বার হাজার। যুদ্ধ শেষে দেখা গেল এর মধ্যে অনেক সৈন্যই আর জীবিত নেই। যারা প্রাণ দিয়েছেন তারা শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেছেন।
বারবাত যুদ্ধের পর রাজা রডারিক চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলেন। ঐতিহাসিক ইবনুল আছীর তাঁর ‘আল-কামিল’ গ্রন্থে লিখেছেন, বার হাজার মুসলিম বাহিনীর মধ্যে বিপুল সংখ্যক যোদ্ধা শহীদ হয়েছিলেন।
টিকাঃ
৯৬. ইবনে আল-আছীর, আল-কামিলু ফিত তারীখি ইবনে আল-আছীর, ৭/৩।
৭. মাক্কারীয়, নফহুত তীব, ১/২৯৪।
📄 তারিক বিন যিয়াদের ভাষণ প্রসঙ্গ
ঐতিহাসিক ইবনে খাল্লিকান ‘ওয়াফায়াতুল আ’ইয়ান’ গ্রন্থে এবং মাক্কারী ‘নফহুত তীব’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, রডারিক-বাহিনী মুসলিম বাহিনীর নিকটবর্তী হলে তারিক বিন যিয়াদ মুসলিম বাহিনীর সামনে দণ্ডায়মান হলেন এবং প্রথমে আল্লাহ্ তা’আলার হামদ ও ছানা পাঠ করলেন। এরপর তিনি মুসলিম বাহিনীকে উদ্বুদ্ধ করে বললেন:
'আমার ভাইয়েরা! পালাবার পথ কোথায়? তোমাদের পেছনে উত্তাল সমুদ্র, আর সামনে উদ্ধত দুশমন। আল্লাহর শপথ, নিজেদের জন্য এটি নির্ভেজাল আনুগত্য প্রদর্শনে ও অটল-অবিচল থাকার চূড়ান্ত পরীক্ষা। মনে রেখো, এই দ্বীপে তোমরা এতিম শিশুদের চেয়েও বেশি অসহায়। তোমাদের শত্রু তোমাদের মোকাবিলা করার জন্য নিজেদের পূর্ণ রসদ ও দলবল নিয়ে প্রস্তুত হয়ে এসেছে। তাদের কাছে যথেষ্ট রসদপত্র আছে। তোমাদের কাছে তরবারি ছাড়া আর কোনো সহায় নেই। তোমাদের আহার কেবল তা-ই, যা তোমরা শত্রুর হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে। যদি এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয় আর এ সময়ের মধ্যে তোমরা উল্লেখযোগ্য কোনো সফলতা অর্জন করতে না পার, তাহলে শত্রুদের অন্তরে তোমাদের প্রতি যে ভয় রয়েছে, তা নিঃশেষ হয়ে যাবে এবং পরিবর্তে তারা তোমাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হয়ে উঠবে। সুতরাং তোমরা এই অবাধ্যদের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজেদের রক্ষা করো। তোমরা যদি প্রাণের মায়া ত্যাগ করে ময়দানে অবতীর্ণ হতে পার, তাহলে এই সুবর্ণ সুযোগ তোমরা কাজে লাগাতে পারবে।
আমি তোমাদেরকে এমন কোনো পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করছি না, যা থেকে আমি নিজে মুক্ত। আমি যে বিষয়ে তোমাদের উৎসাহিত করছি, তার জন্য আমি নিজেও প্রস্তুত। আজকের এই কঠিন দিনের সামান্য সময়ের ত্যাগই তোমাদের জন্য দীর্ঘকালের সুখ-সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে! তোমরা নিশ্চয়ই জেনেছ যে, এই দ্বীপের নৃপতিদের প্রাসাদে আছে মণি-মুক্তা ও বৈভব। আমীরুল মুমিনীন ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিক তোমাদের বীরদের মধ্য হতে নির্বাচন করেছেন। তিনি কেবল এ আশাই করেন যে, এই দ্বীপে আল্লাহর কালিমা সমুন্নত করার এবং তাঁর দীনকে প্রতিষ্ঠিত করার নেক আমলের মাধ্যমে তোমরা সফল হবে। মনে রেখো, যার প্রতি আমি তোমাদের আহ্বান করছি, তাকে সর্বপ্রথম সাড়া আমিই দেব। আমি এ সংকল্প করেছি যে, যুদ্ধ শুরু হওয়া মাত্র আমি হামলা চালাব এ জাতির স্বৈরাচার শাসক রডারিকের উপর। ইনশাআল্লাহ, আমিই তাকে হত্যা করব। আমার সঙ্গে তোমরাও তখন হামলা করবে। রডারিক নিহত হওয়ার পর আমি যদি শহীদ হয়ে যাই, তবে তোমাদের মধ্যে বীর-সাহসী ও দূরদর্শী ব্যক্তির অভাব হবে না, যাকে তোমরা নিজেদের নেতা হিসেবে বরণ করে নেবে। রডারিকের মৃত্যু শত্রুবাহিনীর মশালকে ভেঙে দেবে।'
টিকাঃ
৯৬. ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আ’ইয়ান, ৬/৪২১-৪২২।
৩২. ইবনে খাল্লিকান, ওয়াফায়াতুল আইয়ান, ৪/৩৫১-৩৫২ ও মাক্কারী, নফহুত তীব, ১/২৪০-২৪১।