📄 আন্দালুস-ভূমিতে তারিক বিন যিয়াদ
মুসলিম বাহিনী রওয়ানা হলো এবং জাহাজে করে প্রণালী পার হলো। সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদ প্রণালী পার হয়ে তীরের একটি পাহাড়ে অবতরণ করলেন। সেই থেকেই তাঁর নামানুসারে পাহাড়টির নাম হয় ‘জাবালে তারিক’ এবং প্রণালীর নাম হয় ‘জাবালে তারিক প্রণালী’। জাবালে তারিক থেকে তারিক বিন যিয়াদ নিকটবর্তী আলজেসিরাস (Algeciras) নামক এলাকায় পৌঁছালেন। সেখানে মুসলিম বাহিনী আন্দালুসের দক্ষিণ অঞ্চলীয় এক ক্ষুদ্র বাহিনীর মুখোমুখি হলো।
ইসলামের বিধান অনুযায়ী তারিক বিন যিয়াদ প্রথমে তাদের সামনে দাওয়াত পেশ করলেন। তাদের বলা হলো যে, ইসলাম গ্রহণ করলে বা জিজিয়া কর দিলে তাদের জান-মাল ও ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে। কিন্তু তারা কোনো প্রস্তাবই গ্রহণ করেনি এবং যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলো। তীব্র লড়াইয়ের পর আল্লাহ তা’আলা তারিক বিন যিয়াদের বাহিনীকে বিজয় দান করলেন।
📄 আন্দালুস অভিযানের প্রাথমিক বিজয়সমূহ
যখন আন্দালুসের উত্তর প্রান্তে অবস্থানরত রডারিকের কাছে তারিক বিন যিয়াদের আগমন-সংবাদ পৌঁছল, প্রথমে তিনি বিচলিত হননি। তাঁর ধারণা ছিল এটি সাধারণ কোনো দস্যুদলের আক্রমণ। কিন্তু যখন তিনি জানতে পারলেন মুসলিম বাহিনী কঠোরতা নিয়ে সামনে এগোচ্ছে, তখন তিনি তাঁর শ্রেষ্ঠ সেনাপতি কেনিশিয়োর নেতৃত্বে একটি বড় দল পাঠালেন। কিন্তু এই বাহিনীও মুসলিমদের কাছে পরাজিত হলো এবং কেনিশিয়ো নিহত হলো। বেঁচে যাওয়া সৈন্যরা রডারিককে এই নতুন বিপদের খবর দিতে উত্তর দিকে পালিয়ে গেল।
টিকাঃ
৬০. মাক্কারী, রাফহুল তীব।
৬১. মাক্কারী, আলবায়ানুল মুগরিব ফী আখবারিল আন্দালুসিল ওয়াল মাগরিব, ১/১ ও মুহাম্মাদ মুবারক ইব্রাহীম, আন্দালুস বিজয়ের ইতিহাস, পৃ: ৩৬-৩৭।
📄 বারবাত প্রান্তরের ঐতিহাসিক যুদ্ধ ও আন্দালুস বিজয়
পরাজিত সৈনিকদের বার্তা পেয়ে রডারিক উন্মাদ হয়ে গেলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ এক লক্ষ অশ্বারোহীর বিশাল বাহিনী নিয়ে মুসলিমদের মোকাবিলায় দক্ষিণ অভিমুখে রওয়ানা হলেন। তারিক বিন যিয়াদের কাছে তখন মাত্র সাত হাজার সৈন্য ছিল, যার অধিকাংশ ছিল পদাতিক। রডারিকের বিশাল বাহিনীর সংবাদ পেয়ে তারিক মূসা বিন নুসাইরের কাছে সাহায্যের আবেদন করলেন। মূসা বিন নুসাইর দ্রুত আরও পাঁচ হাজার সৈন্য পাঠালেন, ফলে মুসলিম বাহিনীর মোট সৈন্যসংখ্যা হলো বার হাজার।
তারিক বিন যিয়াদ যুদ্ধের জন্য বারবাত উপত্যকা (de Guadalete) নির্বাচন করলেন। এই স্থানটি কৌশলগতভাবে নিরাপদ ছিল—পিছনে ও ডানে পাহাড় এবং বামে একটি হ্রদ ছিল। রডারিক যখন পৌঁছলেন, তিনি অত্যন্ত বিলাসী বেশে স্বর্ণের সিংহাসনে চড়ে এসেছিলেন। তিনি এতটাই নিশ্চিত ছিলেন যে, সঙ্গে করে প্রচুর দড়ি নিয়ে এসেছিলেন মুসলিমদের বন্দী করার জন্য। ২৮ রমযান উভয় বাহিনী মুখোমুখি হলো এবং শুরু হলো ইতিহাসের এক অসম যুদ্ধ।
টিকাঃ
৬৪. রডারিকের সেনাসংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। স্পেনীয় লেখকরা উল্লেখ করেছেন ১ লক্ষ ২ হাজার, মাক্কারী ও আধুনিক গবেষকদের মতে তা ছিল ১ লক্ষ।
৬২. দেবর আনজুন, আলবায়ানুল মুগরিব, পৃ: ৪৭ ও মাক্কারী, রাফহুল তীব, ১/২৫২।
৬৬. কোনো কোনো ঐতিহাসিক এই যুদ্ধে দু'টি উপত্যকাও উল্লেখ করেছেন।
৬৭. ইবনে আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব ফী আখবারিল আন্দালুস, ২/৯।
📄 দুই পক্ষের প্রকৃত তুলনা
সংখ্যা ও শক্তিতে অনেক ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও যদি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়, তবে দেখা যাবে যে বাস্তব শক্তিতে মুসলিম বাহিনীই ছিল অগ্রগামী। একদল ছিল ঈমানী শক্তিতে বলীয়ান, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও শাহাদাতের তামান্না নিয়ে যুদ্ধ করতে এসেছিল। তাদের মাঝে কোনো বিভেদ ছিল না, শাসক-প্রজা সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল। অন্যদিকে রডারিকের এক লক্ষ সৈন্যের বাহিনী ছিল বৈষম্যে ভরা। সেখানে কেউ ছিল প্রভু আর কেউ ছিল দাস। তাদের লক্ষ্য ছিল কেবল ব্যক্তিগত প্রাণ বাঁচিয়ে পরিবারে ফিরে যাওয়া। রাজা রডারিক বিলাসী জীবন থেকে বের হতে না পেরে যুদ্ধের ময়দানেও স্বর্ণের সিংহাসনে চড়ে এসেছিলেন, আর তাঁর সৈন্যরা ছিল ক্ষুধার্ত ও শোষিত। ফলে এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বেই যেন এর ফলাফল নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল।