📄 সিউটা সমস্যা ও কাউন্টের সাহায্য
মূসা বিন নুসাইর তাঁর সৈন্যসংখ্যার সমস্যা সমাধান করতে পেরেছিলেন আমাজিগ গোত্রের মাধ্যমে। জাহাজ নির্মাণ কারখানার মাধ্যমে নৌবহরেরও ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু আন্দালুস-ভূমি তখনও মুসলমানদের কাছে অচেনা রয়ে গিয়েছিল এবং সিউটা নৌ-বন্দরের সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। সিউটা বন্দর ছিল গোথিক শাসক জুলিয়ানের নিয়ন্ত্রণে। এ সমস্যার সমাধানের জন্য মূসা বিন নুসাইর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও কোনো কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ঠিক তখনই গায়ব থেকে খোদায়ী সাহায্য নেমে এল এবং জুলিয়ানের একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে তা মূর্ত হয়ে উঠল।
সিউটা-প্রশাসক জুলিয়ান দেখতে পেলেন যে, মুসলমানগণ একে একে চারপাশের অঞ্চলগুলো দখল করে নিচ্ছে। তিনি ভাবছিলেন, মুসলমানরা যদি তাঁর রাজত্ব আক্রমণ করে, তবে তিনি কতক্ষণ টিকতে পারবেন? পাশাপাশি আন্দালুস-শাসক রডারিকের প্রতি জুলিয়ানের অন্তরে ছিল প্রচণ্ড বিদ্বেষ। রডারিক জুলিয়ানের বন্ধু উইটিযাকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন এবং জুলিয়ানের কন্যাকে অপহরণ করেছিলেন। এ সংবাদ জানামাত্র জুলিয়ান প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন। কিন্তু সামরিকভাবে তিনি রডারিকের চেয়ে দুর্বল হওয়ায় একটি পথই খোলা ছিল—মুসলমানদের সহায়তা করা।
জুলিয়ান জানতেন রডারিক প্রজাদের ওপর সীমাহীন জুলুম করেন এবং ইহুদিদের ওপর পুনরায় নিপীড়ন শুরু করেছেন। এসব কারণে জনগণ রডারিককে অপছন্দ করত এবং তাঁর শোষণ থেকে মুক্তি চাইছিল। এই পরিস্থিতিতে জুলিয়ান তারিক বিন যিয়াদের কাছে দূত প্রেরণ করে একটি প্রস্তাব দিলেন। প্রস্তাবটি ছিল এমন:
১. আমরা আপনাকে সিউটা বন্দরের নিয়ন্ত্রণভার দেব।
২. আমরা আপনাকে আন্দালুস ভূমি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করব এবং যাতায়াতে সাহায্য করব।
৩. বিনিময়ে রডারিক উইটিযার পরিবারের যে সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছেন, তা তাঁদের ফিরিয়ে দিতে হবে।
মূসা বিন নুসাইর এই সংবাদ পেয়ে অত্যন্ত খুশি হলেন। তিনি খলীফা ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিকের অনুমতি চাইলেন। ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিক সতর্কতামূলক শর্ত দিলেন যে, মূল বাহিনী পাঠানোর আগে যেন একটি ক্ষুদ্র দল পাঠিয়ে সেখানকার অবস্থা যাচাই করে নেওয়া হয়।
টিকাঃ
৪৫. এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে: হিয়াস্যী, আওয়াফুল ফুতূহ ফী জয়ী আন্দালুস, পৃ : ৩৫ ও মাক্বারী, নাফহুত তীব, ১/২৫১-২৫২।
৪৬. হুসাইন মুনিস, মা’আলিমু তারিখিল আন্দালুস, ১/৪৬-৪৩ ও মুহাম্মদ সুহাইল তাকুশ, তারিখুল উমাবিয়ীন ফিল আন্দালুস, পৃ : ৩০-৩৫।
৪৭. মাক্বারী, নাফহুত তীব, ১/২৫৫।
৪৮. দেখুন: হিয়াস্যী, আওয়াফুল ফুতূহ, পৃ: ৭২ ও মাক্বারী, নাফহুত তীব, ১/২৪৪।
📄 সারিয়্যায়ে তরীফ বিন মালিক : আন্দালুসে প্রথম ইসলামী অভিযান
খলীফা ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিকের অনুমতি পাওয়ার মাত্র মূসা বিন নুসাইর চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করে দিলেন এবং তরীফ বিন মালিকের নেতৃত্বে পাঁচশ সৈনিকের একটি বাহিনী প্রস্তুত করলেন। তরীফ নিজেও বার্বার বংশোদ্ভূত ছিলেন। তিনি ৮৯ হিজরীর রমযান মাসে (৭১০ খৃষ্টাব্দে) চারটি জাহাজে করে পাঁচশ সৈন্য নিয়ে আন্দালুস অভিমুখে রওয়ানা হলেন। এই বাহিনীর মধ্যে একশ ছিল অশ্বারোহী এবং চারশ পদাতিক।
তারা দক্ষিণ আন্দালুসে অবতরণ করলেন। তরীফ বিন মালিক তাঁর দায়িত্ব সফলভাবে পালন করলেন এবং ওই এলাকার পরিবেশ-পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেন। তিনি যে দ্বীপে প্রথম অবতরণ করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে তাঁর নামানুসারে এর নাম হয় ‘তরীফ দ্বীপ’। অভিযান শেষ করে তিনি মূসা বিন নুসাইরের কাছে ফিরে এসে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন। এরপর দীর্ঘ এক বছর ধরে মূসা বিন নুসাইর পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে সাত হাজার যোদ্ধার একটি বাহিনী তৈরি করলেন।
টিকাঃ
৪৯. দেখুন: হিয়াস্যী, আওয়াফুল ফুতূহ, পৃ: ৭২ ও মাক্বারী, নাফহুত তীব, ১/২৪৪।
৫০. হিয়াস্যী, আওয়াফুল ফুতূহ, পৃ: ৩৬ ও হুসাইন মুনিস, ফাতহুল আন্দালুস।
📄 আন্দালুস বিজয় এবং জুলিয়ান ও ইহুদিদের সহায়তা
আন্দালুস বিজয় প্রসঙ্গে অনেক ইতিহাসগ্রন্থে সিউটা-প্রশাসক জুলিয়ানের নাম আলোচিত হয়েছে এবং তাঁর সহায়তাকেই মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, মূসা বিন নুসাইর অনেক আগে থেকেই এই অভিযানের পরিকল্পনা করছিলেন। জুলিয়ানের প্রস্তাব সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল মাত্র। ইহুদিদের পক্ষ থেকে মুসলিম বাহিনীকে সহায়তার যে দাবি করা হয়, তাও ভিত্তিহীন বলে প্রমাণিত হয়। কারণ:
১. প্রাচীন আরবী ইতিহাস গ্রন্থগুলোতে ইহুদিদের সহায়তার কোনো সুস্পষ্ট উল্লেখ নেই।
২. এটি একটি নিখাদ ইসলামী পরিকল্পনা ছিল যা জুলিয়ানের প্রস্তাবের পূর্বেই করা হয়েছিল।
৩. মুসলিম বাহিনী কোনো শহর জয় করার পর সেখানে ইহুদিদের বসবাস দেখতে পেলে তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করত, যার অর্থ আগে থেকে তাদের সাথে কোনো যোগাযোগ ছিল না।
টিকাঃ
১. লেখক অজ্ঞাত, আখবারুন মাজমুয়া, পৃ: ২১-২২।
১. গিসানউদ্দীন ইবনুল খতীব, আলহাজ্জাতু কী আখবারি গারনাতা, ১/১০১।