📄 মূসা বিন নুসায়ের ও আন্দালুস বিজয়ের পথে প্রতিবন্ধকতাসমূহ
মূসা বিন নুসাইর উত্তর আফ্রিকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ওই অঞ্চলে স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হলো। উলামাদের মাঝে ইসলামের প্রচার-প্রসার বৃদ্ধি পেল, মানুষ দ্বীনি শিক্ষা অর্জনে মনোযোগী হলো। মূসা বিন নুসাইর রহ. যখন ওই অঞ্চলে তাঁর কর্মসূচীর সুফল প্রত্যক্ষ করলেন, তখন সৈন্য সংগ্রহ ও ইসলাম প্রচারের পরিকল্পনা করতে লাগলেন, যেখানে তখনও ইসলামের দাওয়াত পৌঁছায়নি। আর তখনই তিনি আন্দালুস অভিযান পরিচালনার চিন্তা করলেন। যদিও উত্তর আফ্রিকা এবং মাগরিবের ভূভাগগুলো তখন মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, কিন্তু মূসা বিন নুসাইরের তীক্ষ্ণ সামরিক দৃষ্টিতে আরও কিছু প্রতিবন্ধকতা ধরা পড়ল। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হলো:
প্রথম বাধা : নৌযানের অভাব
মূসা বিন নুসাইর হিসেব করে দেখলেন, আন্দালুসে অভিযান পরিচালনা করতে হলে তাঁকে মাগরেব ও আন্দালুসের মধ্যকার যে সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে হবে, তার দূরত্ব ১৬ কিলোমিটারের কম নয়। অথচ সে সময় তাঁর কাছে এই সামুদ্রিক দূরত্ব অতিক্রম করে মুসলিম বাহিনীকে ওপারে পৌঁছিয়ে দেওয়ার মতো উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত নৌযান ছিল না। কেননা, 'যাতুস সাওয়ারী' যুদ্ধ ও সাইপ্রাস অভিযানের মতো দু'-একটি অভিযানের কথা বাদ দিলে মুসলমানদের অধিকাংশ যুদ্ধাভিযান ছিল স্থলপথে। তাই মুসলমানদের বিশালাকৃতির যুদ্ধ-জাহাজের তেমন প্রয়োজনও পড়েনি। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মুসলিম বাহিনীকে আন্দালুস পৌঁছাতে প্রয়োজন বিশালাকার সব নৌযানের।
দ্বিতীয় বাধা : ব্যালেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জের উপস্থিতি
মূসা বিন নুসাইর তাঁর পূর্ববর্তীদের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন। তিনি চারপাশের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে সামনে এক কদমও অগ্রসর হতে প্রস্তুত ছিলেন না। আন্দালুসের পূর্বদিকে কয়েকটি দ্বীপ ছিল, যা ব্যালেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ (Balearic Islands) নামে পরিচিত। এর মধ্যে সামরিক কৌশলগত দিক থেকে তিনটি দ্বীপের অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; মায়োর্কা (Palma de Mallorca), মাইনোর্কা (Menorca) ও ইবিজা (Ibiza) দ্বীপ। প্রাচীন আরবী উৎসসমূহে এসব দ্বীপকে ‘প্রাচ্য দ্বীপপুঞ্জ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। এই দ্বীপগুলো আন্দালুসের একেবারে সন্নিকটে ছিল। তাই সরাসরি আন্দালুসে প্রবেশ করলে মূসা বিন নুসাইরের পূর্বদিক মোটেই নিরাপদ থাকত না। এ কারণে প্রয়োজন ছিল প্রথমে পূর্বদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
টিকাঃ
** যাতুস সাওয়ারী যুদ্ধ (Battle of the Masts) ও বাইজান্টাইন (৬৩৫ খ্রিস্টাব্দে) মুসলিম বাহিনী ও বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের মধ্যে সংঘটিত একটি নৌ-যুদ্ধ। এতে কুরাবুন এর বীরত্বপূর্ণ অবদান প্রসিদ্ধ। এই যুদ্ধটি উভয় দেশের সামরিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাক্রম। এটি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের নৌবাহিনীর ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয় এবং সাম্রাজ্যের সামরিক ক্ষমতা দুর্বল করে তোলে। এর ফলে মুসলিম বাহিনী আন্দালুসের দিকে অভিযান করার জন্য প্রস্তুত হতে পারে।
📄 প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে মূসা বিন নুসায়েরের গৃহীত পদক্ষেপসমূহ
আন্দালুস বিজয়ের পথে এতগুলো বাধা ও প্রতিবন্ধকতা উপলব্ধি করেও মূসা বিন নুসাইর হতাশ হননি; বরং পরিস্থিতি তাঁর বিজয়-সংকল্প আরও বাড়িয়ে তুলল। তিনি ধীরে-সুস্থে এসব প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু করলেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রাধিকারযোগ্য দিকগুলো নির্ধারণ করে কাজ শুরু করলেন।
এক. নৌবহর প্রতিষ্ঠা ও জাহাজ নির্মাণ
মূসা বিন নুসাইর ৮৮-৮৯ হিজরী মোতাবেক ৭০৬-৭০৭ খৃষ্টাব্দে নৌবহর ও জাহাজ নির্মাণের কাজ শুরু করলেন। যদিও এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প ছিল; কিন্তু তিনি ইস্পাতকঠিন মনোবলকে কাজে লাগিয়ে উত্তর আফ্রিকায় একাধিক নৌবন্দর ও জাহাজ নির্মাণ কারখানা প্রতিষ্ঠা করলেন।
দুই. আমাজিগ (বার্বার) জাতিকে ইসলামে শিক্ষা প্রদান
এ সময়ে মূসা বিন নুসাইর বিভিন্ন বিশেষ মজলিসের মাধ্যমে আমাজিগ গোত্রকে ইসলামে দীক্ষিত ও সুশিক্ষিত করতে সচেষ্ট হলেন। তিনি তাদের ইসলামের আকীদা, বিশ্বাস ও আমল শিক্ষা দিলেন এবং তাদের হৃদয়ে আল্লাহর রাস্তায় জান-মাল ব্যয় করার স্পৃহা সৃষ্টি করলেন। যখন তিনি নিশ্চিত হলেন যে, তারা ইসলামের অকুতোভয় সৈনিকরূপে গড়ে উঠেছে, তখন থেকে তিনি তাদের ওপর আস্থা রাখতে শুরু করলেন এবং তাদেরকে মুসলিম বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করতে লাগলেন। ফলে যারা একসময় ইসলামের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, সেই আমাজিগ গোত্রই ইসলামী সেনাবাহিনীর বৃহত্তম অংশে পরিণত হলো।
তিন. তারিক বিন যিয়াদকে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান
মূসা বিন নুসাইর তাঁর আন্দালুস অভিযানের নেতৃত্বের জন্য আমাজিগ গোত্রীয় অভিজ্ঞ নেতা তারিক বিন যিয়াদকে নির্বাচিত করলেন। তারিক বিন যিয়াদের মাঝে তাকওয়া, বীরত্ব ও সমরকুশলতার সমাবেশ ঘটেছিল। তারিক বিন যিয়াদ আরব বংশীয় ছিলেন না, ছিলেন আমাজিগ গোত্রীয়। মূসা বিন নুসাইর বেশ কয়েকটি কারণে তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। যেমন: ক. সহজাত দক্ষতা—মূসা বিন নুসাইর জানতেন যে, নেতৃত্বের ক্ষেত্রে আরবী-অনারবী ভেদাভেদ নেই, বরং যোগ্যতাই মূল। তারিকের মাঝে এই দায়িত্ব পালনের পূর্ণ যোগ্যতা ছিল। খ. আপন গোত্রের নেতৃত্ব—তারিক আমাজিগ বংশীয় হওয়ায় তাঁর নিজ গোত্রের যোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও ভাববিনিময় করা সহজ ছিল এবং তাদেরকে সঠিকভাবে পরিচালনা করাও সম্ভব ছিল।
চার. ব্যালেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ জয়
আন্দালুস বিজয়ের পথ সুগম করার লক্ষে মূসা বিন নুসাইর ব্যালেয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ জয় করেন এবং একে মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। এর মাধ্যমে তিনি পূর্ব দিক থেকে মুসলিম বাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।
টিকাঃ
২৩. মাফরাজী, নফহুত তীব, ১/১৫৭।
২৪. ইবনুল খাতিব—এ ধরনের দুর্দান্ত যুদ্ধে পাওয়া অত্যন্ত বিরল। ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো আত্মরক্ষামূলক বা বিজয়ী যুদ্ধে দ্বিতীয় কোনো জাতির মুসলমানদের কাতার, যুদ্ধ-রীতি ও শ্রেষ্ঠত্বকে এভাবে আপন করে নিতে দেখা যায় না। একবার ইসলাম বিভিন্ন জাতিকে গ্রহণ করে প্রভাবিত করতে পারলে, তারা মুসলিম রাষ্ট্রে সর্বদাই অনুগত হয়েছে। বিশেষত কৃষকদের সাথে প্রভূত কর্মে শক্তি ও সহযোগিতা ও বীরত্বে এটি তাদের বৈশিষ্ট্য।
২৫. ইবনে আব্দুল হাকাম, ‘আন্দালুস মুকদ্দমা’ গ্রন্থে তারিক বিন যিয়াদের কথা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছেন।
📄 সিউটা সমস্যা ও কাউন্টের সাহায্য
মূসা বিন নুসাইর তাঁর সৈন্যসংখ্যার সমস্যা সমাধান করতে পেরেছিলেন আমাজিগ গোত্রের মাধ্যমে। জাহাজ নির্মাণ কারখানার মাধ্যমে নৌবহরেরও ব্যবস্থা করেছিলেন। কিন্তু আন্দালুস-ভূমি তখনও মুসলমানদের কাছে অচেনা রয়ে গিয়েছিল এবং সিউটা নৌ-বন্দরের সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। সিউটা বন্দর ছিল গোথিক শাসক জুলিয়ানের নিয়ন্ত্রণে। এ সমস্যার সমাধানের জন্য মূসা বিন নুসাইর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও কোনো কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ঠিক তখনই গায়ব থেকে খোদায়ী সাহায্য নেমে এল এবং জুলিয়ানের একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে তা মূর্ত হয়ে উঠল।
সিউটা-প্রশাসক জুলিয়ান দেখতে পেলেন যে, মুসলমানগণ একে একে চারপাশের অঞ্চলগুলো দখল করে নিচ্ছে। তিনি ভাবছিলেন, মুসলমানরা যদি তাঁর রাজত্ব আক্রমণ করে, তবে তিনি কতক্ষণ টিকতে পারবেন? পাশাপাশি আন্দালুস-শাসক রডারিকের প্রতি জুলিয়ানের অন্তরে ছিল প্রচণ্ড বিদ্বেষ। রডারিক জুলিয়ানের বন্ধু উইটিযাকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করেছিলেন এবং জুলিয়ানের কন্যাকে অপহরণ করেছিলেন। এ সংবাদ জানামাত্র জুলিয়ান প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন। কিন্তু সামরিকভাবে তিনি রডারিকের চেয়ে দুর্বল হওয়ায় একটি পথই খোলা ছিল—মুসলমানদের সহায়তা করা।
জুলিয়ান জানতেন রডারিক প্রজাদের ওপর সীমাহীন জুলুম করেন এবং ইহুদিদের ওপর পুনরায় নিপীড়ন শুরু করেছেন। এসব কারণে জনগণ রডারিককে অপছন্দ করত এবং তাঁর শোষণ থেকে মুক্তি চাইছিল। এই পরিস্থিতিতে জুলিয়ান তারিক বিন যিয়াদের কাছে দূত প্রেরণ করে একটি প্রস্তাব দিলেন। প্রস্তাবটি ছিল এমন:
১. আমরা আপনাকে সিউটা বন্দরের নিয়ন্ত্রণভার দেব।
২. আমরা আপনাকে আন্দালুস ভূমি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করব এবং যাতায়াতে সাহায্য করব।
৩. বিনিময়ে রডারিক উইটিযার পরিবারের যে সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছেন, তা তাঁদের ফিরিয়ে দিতে হবে।
মূসা বিন নুসাইর এই সংবাদ পেয়ে অত্যন্ত খুশি হলেন। তিনি খলীফা ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিকের অনুমতি চাইলেন। ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিক সতর্কতামূলক শর্ত দিলেন যে, মূল বাহিনী পাঠানোর আগে যেন একটি ক্ষুদ্র দল পাঠিয়ে সেখানকার অবস্থা যাচাই করে নেওয়া হয়।
টিকাঃ
৪৫. এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে: হিয়াস্যী, আওয়াফুল ফুতূহ ফী জয়ী আন্দালুস, পৃ : ৩৫ ও মাক্বারী, নাফহুত তীব, ১/২৫১-২৫২।
৪৬. হুসাইন মুনিস, মা’আলিমু তারিখিল আন্দালুস, ১/৪৬-৪৩ ও মুহাম্মদ সুহাইল তাকুশ, তারিখুল উমাবিয়ীন ফিল আন্দালুস, পৃ : ৩০-৩৫।
৪৭. মাক্বারী, নাফহুত তীব, ১/২৫৫।
৪৮. দেখুন: হিয়াস্যী, আওয়াফুল ফুতূহ, পৃ: ৭২ ও মাক্বারী, নাফহুত তীব, ১/২৪৪।
📄 সারিয়্যায়ে তরীফ বিন মালিক : আন্দালুসে প্রথম ইসলামী অভিযান
খলীফা ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিকের অনুমতি পাওয়ার মাত্র মূসা বিন নুসাইর চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করে দিলেন এবং তরীফ বিন মালিকের নেতৃত্বে পাঁচশ সৈনিকের একটি বাহিনী প্রস্তুত করলেন। তরীফ নিজেও বার্বার বংশোদ্ভূত ছিলেন। তিনি ৮৯ হিজরীর রমযান মাসে (৭১০ খৃষ্টাব্দে) চারটি জাহাজে করে পাঁচশ সৈন্য নিয়ে আন্দালুস অভিমুখে রওয়ানা হলেন। এই বাহিনীর মধ্যে একশ ছিল অশ্বারোহী এবং চারশ পদাতিক।
তারা দক্ষিণ আন্দালুসে অবতরণ করলেন। তরীফ বিন মালিক তাঁর দায়িত্ব সফলভাবে পালন করলেন এবং ওই এলাকার পরিবেশ-পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেন। তিনি যে দ্বীপে প্রথম অবতরণ করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে তাঁর নামানুসারে এর নাম হয় ‘তরীফ দ্বীপ’। অভিযান শেষ করে তিনি মূসা বিন নুসাইরের কাছে ফিরে এসে তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন। এরপর দীর্ঘ এক বছর ধরে মূসা বিন নুসাইর পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে সাত হাজার যোদ্ধার একটি বাহিনী তৈরি করলেন।
টিকাঃ
৪৯. দেখুন: হিয়াস্যী, আওয়াফুল ফুতূহ, পৃ: ৭২ ও মাক্বারী, নাফহুত তীব, ১/২৪৪।
৫০. হিয়াস্যী, আওয়াফুল ফুতূহ, পৃ: ৩৬ ও হুসাইন মুনিস, ফাতহুল আন্দালুস।