📄 বনু উমাইয়ার শাসনামল, একটি নির্মোহ পর্যালোচনা
আন্দালুস বিজিত হয়েছিল ৯২ হিজরীতে উমাইয়া শাসনামলে। নির্দিষ্ট করে বললে উমাইয়া খলীফা ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিকের শাসনামলে; যিনি ৮৬ হিজরী থেকে ৯৬ হিজরী (৭০৫-৭১৫ খৃস্টাব্দ) পর্যন্ত তৎকালীন মুসলিম সাম্রাজ্যের খলীফা ছিলেন। অর্থাৎ খলীফা ওয়ালিদের শাসনকালের মধ্য সময়ে এই মহান বিজয় অর্জিত হয়েছিল। এটি একটি ঐতিহাসিক সত্য যে, ইসলামী ইতিহাসে উমাইয়া শাসনামল অত্যন্ত কঠিন ও ব্যাপক তথ্য-বিভ্রাটের শিকার হয়েছে। অপপ্রচারের মাধ্যমে উমাইয়া শাসনব্যবস্থাকে বিকৃত রূপে তুলে ধরতে অপবাদ, মিথ্যা ও জাল ঘটনা তৈরি করে শাসকদের চরিত্র কলঙ্কিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ উমাইয়া শাসনামল হলো নবুওয়াত ও খেলাফতে রাশেদার যুগের পর ইসলামী ইতিহাসের সমৃদ্ধ ও উজ্জ্বলতম যুগ; যে যুগের ইতিহাস রচিত হয়েছে সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীনদের মহান জামাতের যুগপৎ কর্মধারায়। উল্লিখিত ঐতিহাসিক তথ্যবিকৃতির পেছনে মূল কারণ হলো এই দৃষ্টিভঙ্গি যে, একশ্রেণির লোক বিশেষত ইসলামী জীবনব্যবস্থার প্রতি বীতশ্রদ্ধ ব্যক্তিরা মনে করে যে, ইসলামী ইতিহাস তো কেবল আবু বকর রাযি. ও ওমর রাযি. এই দুই খলীফার শাসনামলের ইতিহাস। বরং কেউ কেউ তো নিজেদের হীনমন্যতা থেকে এই মহান সাহাবীদ্বয়কেও রেহাই দেন না; অথচ তাঁদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সুবিদিত ও সর্বজনস্বীকৃত। এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, এসব অপপ্রচার ও অপবাদ রটানোর পেছনে বিরুদ্ধবাদীদের মূল উদ্দেশ্য হলো মুসলমানদের মন-মস্তিষ্কে এ ভ্রান্ত বিশ্বাস বদ্ধমূল করে তোলা যে, নতুন করে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার নির্মাণ কিছুতেই সম্ভব নয়। তারা যেন প্রকারান্তরে এ কথাই বলতে চায় যে, দেখ, আবু বকর ও ওমরের খেলাফতকাল তো নবীযুগের অতি নিকটবর্তী আর উমাইয়া ও আব্বাসী শাসনামল নবীযুগের সন্নিকটেই। তারাই যখন (বিরুদ্ধবাদীদের ধারণামতে) প্রকৃত ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি, তাহলে শেষ যুগে মুসলমানদের অবস্থা আর কী হবে?!
বনু উমাইয়ার শাসনআমল (৪০-১৩২ হিজরী/৬৬০-৭৫০ খৃস্টাব্দ) পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডে মুসলমান জনগোষ্ঠীর ওপর প্রকৃত অনুগ্রহ ও বিরাট অবদান রেখেছে। আমরা যদি উমাইয়া শাসনামলে যে পরিমাণ মানুষ ইসলামের পতাকাতলে আশ্রয় নিয়েছে কেবল তাদের সংখ্যার প্রতি দৃষ্টিপাত করি, শুধু এতটুকুই বনু উমাইয়ার প্রতি আরোপিত মিথ্যা অপবাদ ও অভিযোগ খণ্ডনের জন্য যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে। বনু উমাইয়ার শাসনামলই লিবিয়া থেকে শুরু করে মরক্কো পর্যন্ত পুরো উত্তর আফ্রিকা ইসলামের ছায়াতলে শামিল হয়ে গিয়েছিল। যদিও এসব অঞ্চলে ইসলামী বিজয়াভিযান তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান বিন আফফান রাযি.-এর যুগেই সূচিত হয়েছিল; কিন্তু পরবর্তী সময়ে এখানকার অধিবাসীগণ ধর্মত্যাগ করেছিল। এরপর উমাইয়া শাসনামলে নতুন করে এসব অঞ্চল বিজিত হয়। উমাইয়া শাসকবৃন্দ একই সঙ্গে আরবের চতুর্দিকে ইসলামের বিজয়াভিযান অব্যাহত রেখেছিলেন। পশ্চিমে তাঁদের অভিযান আন্দালুস পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। পূর্বে মুহাম্মদ বিন কাসিম আল সাক্কাফীর হাতে বিজিত হয়েছিল সিন্ধু অঞ্চল, কুতায়বা বিন মুসলিম আল বাহেলীর হাতে বিজিত হয়েছিল ট্রান্সঅক্সিয়ানা (মধ্য এশিয়া) অঞ্চল; তাঁর বিজয়াভিযান বিস্তৃত হয়েছিল সুদূর চীন পর্যন্ত, আর মাসলামা বিন আব্দুল মালিকের হাতে বিজিত হয়েছিল উত্তরের বিস্তীর্ণ ককেশীয় অঞ্চল।
হাজার হাজার মানুষ আল্লাহর দ্বীন গ্রহণ করেছিল। পৃথিবীর সেসব ভূখণ্ডে ইসলামের সূর্য উদিত হয়েছিল, যেখানকার অধিবাসীগণ বছরের পর বছর গোঁড়া মূর্তিপূজা, আগুন ও রাজদরবারের পূজা করত। ইসলামের আগমনে এসব ভূখণ্ড থেকে নিশ্চিহ্ন হয়েছিল অসংখ্য ভ্রান্ত বিশ্বাস ও কুসংস্কার। আল্লাহর অনুগ্রহে বনু উমাইয়ার মাধ্যমে পৃথিবী প্রত্যক্ষ করেছিল আল্লাহ্ তা’য়ালা'র সুস্পষ্ট অনুগ্রহ। এ কারণেই তারা দলে দলে কিংবা ব্যক্তিগতভাবে ইসলামের প্রতি অগ্রসর হয়েছিল। উত্তরোত্তর তারা হয়েছিল ইসলামের সাহসী সৈনিক, বিদগ্ধ আলেম ও দূরদর্শী নেতা; অসামান্য অবদান রেখেছিল ইসলামের খেদমতে বিভিন্ন অঞ্চলে। বনু উমাইয়া যে বীজ রোপণ করেছিল, মুসলিম উম্মাহ তার সুদীর্ঘ ইতিহাস জুড়ে তারই ফল ও ফসল সংগ্রহ করে ধন্য হয়েছে। ফিকহ ও তাফসীর, সাহিত্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞান, ভূগোল ও প্রকৌশলবিদ্যা, রসায়ন ও দর্শনশাস্ত্র—মোটকথা, জ্ঞানের বিভিন্ন অঙ্গনে যুগে যুগে যারা ছিলেন নেতৃবৃন্দের আসনে, তারা প্রায় সবাই উমাইয়া শাসনামলে বিজিত অঞ্চলসমূহের আলো-ঝলকেই বড় হয়েছেন, বিদ্যা ও জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়েছেন। হাদীসশাস্ত্রের মহান সেবক বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, নাসায়ী; ইতিহাস ও রিজাল-শাস্ত্রের পথিকৃৎ ইবনে খালদুন, বায়হাকী; কিংবা চিকিৎসাবিজ্ঞানের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব ইবনে সীনা, ফারাবী, আল কিন্দি ও আল বিরুনী; এ এক দীর্ঘ তালিকা। ইসলামী বিজয়াভিযানে প্রথমে তাদের দেশ বিজিত হয়েছে, এরপর বিজিত হয়েছে তাদের অন্তরদেশ। এভাবে একের পর এক অঞ্চলের আবালবৃদ্ধবনিতা বিজিত হয়েছে উমাইয়া শাসনামলে আর সূচিত হয়েছে কালজয়ী ও বিস্ময়কর এক অনন্য ধারা। উমাইয়া আমলে বিজয়াভিযান ও আল্লাহর পথে লড়াই ছিল মুসলমানদের সহজাত আকর্ষণের বিষয়। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে দলে দলে রুম ও কায়সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শরিক হতো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রত্যাশায় এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে। অধিকন্তু উমাইয়া শাসনামলেই ইসলামী শরী’য়তের দ্বিতীয় উৎস সুন্নাতে নববী সংরক্ষণের কাজ শুরু হয় এবং উমাইয়া শাসনকৃত অঞ্চলে ইসলামী আইনব্যবস্থা কার্যকর করা হয়। প্রখ্যাত আলেম ইবনু হাযম রহ. উমাইয়া শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে সুস্পষ্ট সত্য উচ্চারণ করেছেন। বনু উমাইয়ার শাসনব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেছেন, উমাইয়া শাসনামলে মুসলিম সাম্রাজ্য ছিল একটি নির্ভেজাল মানবীয় রাষ্ট্র। উমাইয়া শাসকগণ নিজেদের জন্য কোন রাজকীয় নগরীর পত্তন করেননি, বিলাসী জীবনযাপনের জন্য প্রাসাদ নির্মাণ বা কোন প্রাচীর বানিয়ে জনবিচ্ছিন্ন হননি। খেলাফতের পূর্বে তারা যে বাড়িতে বাস করতেন, পরবর্তী সময়েও তারা সেখানেই বসবাস করতেন। আপন প্রজাদেরকে তারা ‘হে আমার মাওলা’, ‘হে সায়্যিদ’ ইত্যাদি সম্বোধন ব্যবহার করতে দিতেন না। তারা অধীনস্থদের উচ্চাশাপ্রকাশক শব্দে আহ্বান করতেন না। তাদের বার্তার সূচনা এভাবে হতো না—‘বাদশার পক্ষ হতে দাসের প্রতি’। সামন্তবাদীদের ন্যায় পদচুম্বন বা সম্মুখভূমিতে সিজদাবনত হওয়ার কোন রীতি তাদের দরবারে প্রচলিত ছিল না। শাসনভূমির বিভিন্ন অংশে আমীর-প্রশাসক নিয়োগ-বরখাস্তের পেছনে তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য থাকত সঠিক ও ইনসাফপূর্ণ শাসন প্রতিষ্ঠা করা। এ কারণেই তারা আন্দালুস, সিন্ধু, খোরাসান, আর্মেনিয়া, ইয়ামেনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষমতাশালী প্রশাসকদেরকে বরখাস্ত করে অন্য উপযুক্ত ব্যক্তিদের দায়িত্ব প্রদান করেছেন। এককালে পৃথিবীর যে বিস্তৃত অঞ্চল তারা শাসন করেছেন, অন্য কোন রাজবংশ তা পারেনি। তৎকালে আন্দালুসে ছিল একদিকে পুরো ইসলামী বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও আভিজাত্যের কেন্দ্রবিন্দু এবং অন্যদিকে তৎকালীন খৃস্টান শক্তির জন্য ছিল অত্যন্ত ভয়ের কারণ।
টিকাঃ
৯৪. বনু উমাইয়া-পরবর্তী খলিফা মুতাদিদ শাসনামলে হিশামের পত্নী যিনি আন্দালুসের খলীফা ছিলেন তখন একবার কোনো "বিয়ে-পড়ানোর" রীতি ছিল। যখন খলীফা মুতাদিদ হিশামকে হুকুম করেন তখন এই শাদী গ্রহণ করে, যাতে সর্বোতভাবে পরিচর্যায় "মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান" হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
৯২. ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা ইবনে খালদুন, ২/৩৪৬।
📄 আন্দালুস-বিজয়ের পূর্বে উত্তর আফ্রিকায় মুসলমানদের অবস্থা
আন্দালুস বিজয়ের সত্তর বছর পূর্বেই (২২ হিজরী/৬৪২ খৃস্টাব্দ) আফ্রিকার উত্তরাঞ্চল ইসলামের আলোয় আলোকিত হয়েছিল। আফ্রিকার এ অঞ্চলে আমাযিগ (Amazighs) গোত্র (যা বার্বার গোত্র নামে বিখ্যাত) বসবাস করত। বার্বাররা ছিল অত্যন্ত একরোখা, যুদ্ধবাজ ও সাহসী জাতি। তারা একাধিকবার ইসলাম গ্রহণ করার পরও ধর্মত্যাগ করেছিল। ফলে বেশ কয়েকবার তাদের সঙ্গে মুসলমানদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অবশেষে মূসা বিন নুসাইর রহ.-এর হাতে ৮৫ হিজরীর শেষদিকে বা ৮৬ হিজরীতে (৭০৪ বা ৭০৫ খৃস্টাব্দে) এ অঞ্চলে ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং অস্থিতিশীলতার পরিসমাপ্তি ঘটে।
টিকাঃ
৯৩. ‘বার্বার’ শব্দটি মূলত লাতিন ‘বার্বারাস’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। রোমানদের মূলে (খ্রিস্টপূর্ব কয়েক শত বছর পূর্বে) ‘বার্বার’ বলে পরিচিত যে কোন অনারবদের শ্রেণি-জাতি-গোষ্ঠীকে বোঝানো হতো, যাদের ভাষা ও ধ্বনি ছিল দুর্বোধ্য। এরপর ইউরোপীয়দের ক্ষেত্রে শব্দটি ব্যবহৃত হতো সেসব জাতির জন্য, যারা গ্রিক ভাষা ও সভ্যতা সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল। ফলকথায় আরবদের ছাড়া দুনিয়ার অধিবাসীদের সকলকে রোমানরা যেমন ‘বার্বার’ বলত, আরবগণ তাদের সময়ে আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী জাতিগণকে ‘বার্বার’ বলত। কারণ, তারা যে ভাষায় কথা বলত, আরবদের কাছে তা ছিল দুর্বোধ্য। আন্দালুস আক্রমণের কাল থেকে ‘বার্বার’ শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে। দেখুন: তারিক আব্দুল হাদী, আন্দালুস ফতহে মুরাবিতীন ও মারাকুশ, পৃ: ২৩।
📄 মূসা বিন নুসায়ের একজন জাত সেনাপতি
মূসা বিন নুসাইর ছিলেন একজন সুদক্ষ সেনাপতি ও আত্মপ্রত্যয়ী ব্যক্তিত্ব। আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর মাধ্যমে উত্তর আফ্রিকার বিস্তৃত অঞ্চলে ইসলামকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি একজন আরবী ছিলেন। বিখ্যাত সাহাবী দাহইয়া কালবী রাযি.-সহ বিভিন্ন সাহাবী থেকে তিনি হাদীস রেওয়ায়েত করেছেন। ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, তিনি ছিলেন তীক্ষ্ণ ধী-শক্তিসম্পন্ন, উদার, সাহসী, খোদাভীরু ও আত্মপ্রত্যয়ী ব্যক্তিত্ব। তাঁর নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনী কোন যুদ্ধে পরাজিত হয়নি। তাঁর পিতা নুসাইর বিন আবদুর রহমান বিন ইয়াযিদ একজন বীর সৈনিক ছিলেন। তিনি ঐতিহাসিক ইয়ারমুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। হযরত মুয়াবিয়া রাযি. তাঁকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। হযরত ওমর রাযি. ও উসমান রাযি.-এর খেলাফতকালে হযরত মুয়াবিয়া রাযি. যখন শামের গভর্নর ছিলেন, তখন নুসাইর রহ. ছিলেন শামের পুলিশবাহিনীর প্রধান। অন্য কোন বর্ণনামতে তিনি স্বয়ং মুয়াবিয়া রাযি.-এর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা-বাহিনীর প্রধান ছিলেন। মুয়াবিয়া রাযি. যখন মিশর অভিযানে যান, তখন নুসাইর রহ. তাঁর সঙ্গী হননি। পরবর্তী সময়ে মুয়াবিয়া রাযি. তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার প্রতি আমার অনুগ্রহ ও স্নেহশীল আচরণ সত্ত্বেও তুমি কেন আমার সঙ্গী হলে না? উত্তরে নুসাইর বললেন, যিনি আপনার তুলনায় আমার আনুগত্য ও কৃতজ্ঞতার বেশি হকদার, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে আপনার কৃতজ্ঞতা আদায় করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। মুয়াবিয়া রাযি. প্রশ্ন করলেন, তিনি কে? নুসাইর উত্তর দিলেন, আল্লাহ তাআলা। নুসাইরের উত্তর শুনে মুয়াবিয়া রাযি. একেবারে চুপ হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন, আমি আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করছি। এরপর মুয়াবিয়া রাযি. তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান।
ইতিহাসের পাতায় মূসা বিন নুসাইর-এর মহীয়সী মাতার অসীম সাহসিকতার একটি ঘটনাও সংরক্ষিত আছে। তিনি তাঁর স্বামী ও পিতার সঙ্গে ইয়ারমুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধের ঘোরতর এক মুহূর্তে যখন মুসলিম বাহিনী প্রধান প্রতিপক্ষ কাফিরদের ঝটকা খেলো, মুসার বীরবতী মা দেখতে পেলেন, একজন কাফির সেনাধ্যক্ষ পালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এ দৃশ্য দেখে আমি তক্ষুণি একটি খুঁটি তুলে নিলাম এবং কাফির সেনাপতির কাছে গিয়ে সজোরে আঘাত করে তার মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেললাম। এরপর আমি তার যুদ্ধসাজ ও যুদ্ধ-পোশাক সংগ্রহ করতে অগ্রসর হলে মুসলিম সেনারা আমাকে সহায়তা করলেন।
এমনই বীর পিতা-মাতার সন্তান হলেন মূসা বিন নুসাইর রহ.। তিনি বড় হয়েছিলেন ধর্মীয় পরিবেশে, তৎকালীন খেলাফতের প্রাণকেন্দ্র শামে খলীফা হযরত মুয়াবিয়া রাযি.-এর রাজপরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সন্তানদের সঙ্গে। ফলে শৈশব থেকেই তিনি গড়ে উঠেছিলেন ঈমানী প্রেষণা ও দ্বীনী চেতনাকে লালন করে। এরপর পূর্ণ যৌবনে উপনীত হতেই তিনি বিভিন্ন সম্মান ও পদমর্যাদার জন্য বিবেচিত হতে থাকেন। প্রথম জীবনে বসরায় কর (খরাজ) আদায়ের দায়িত্বে (সহকারী গভর্নর পদে) নিযুক্ত হন। এরপর হযরত মুয়াবিয়া রাযি.-এর আমলেই তিনি নৌ-বাহিনীর প্রধানের পদ লাভ করেন এবং সাইপ্রাস-অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে ৮৯ হিজরীতে (আরেক মতে ৭৭ হিজরীতে) খলীফা ওয়ালীদ বিন আবদুল মালিকের শাসনকালে তিনি লাভ করেন ইফ্রিকিয়া ও মাগরিবের প্রশাসনের দায়িত্ব। এ দায়িত্ব লাভের মধ্য দিয়েই মূসা বিন নুসাইর-এর সামনে সেই মহান খেদমত আঞ্জাম দেওয়ার অনুকূল সুযোগ এসে যায়, যা তাঁর পূর্বপুরুষগণ সেভাবে করতে পারেননি। প্রশাসকের দায়িত্ব লাভ করার পর প্রথমেই তিনি এ অঞ্চলে স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনেন। এরপর মাগরিবের প্রতি মনোযোগ দিলেন এবং সেখানে ইসলামী বাহিনীকে পুনর্বিন্যস্ত করলেন। মাগরিব থেকে তখন প্রভূত বিশৃঙ্খলা চলছিল। তিনি সেখানকার অধিবাসীদেরকে শান্ত করার প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেন এবং তাদেরকে পুনরায় আনুগত্যের অধীনে নিয়ে আসেন। সবাইকে নিয়ে তিনি ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিতে সাহায্য করলেন। এরপর সীমান্ত গড়লেন, সমবেত জনতার উদ্দেশে খোতবা প্রদান করলেন এবং দোয়া করলেন। দোয়া ও মুনাজাতে তিনি খলীফা ওয়ালীদ বিন আবদুল মালিকের নাম নিলেন না। তাঁকে বলা হলো, আপনি আমিরুল মুমিনীনদের জন্য দোয়া করছেন না কেন? তিনি উত্তর দিলেন, এটি এখন এমন এক মুহূর্ত, যেখানে আল্লাহ তাআলা ছাড়া আর কাউকে ডাকা যায় না। এরপর বৃষ্টি হলো এবং সকলে তৃপ্ত হয়ে ফিরে গেল।
টিকাঃ
৯৪. ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৫/১৮৬।
৯৫. ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা ইবনে খালদুন, ৬/২২০, ৬/৪৮৯।
৯৬. ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৫/১৮৬।
৯৭. ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৫/১৮৬ ও ফাকী, মাফতুহ জিব জিস জুনুবিল আন্দালুস জাদিদ, ১/২৩৫।
৯৮. ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৫/১৮৬।
১০০. ইবনে হাজার, আল-ইসাবাহ ফী তারীখিল সাহাবাহ, ৮/৩১৪।
১০১. বিলিকী, আল-মাজমা, ১/৩০৫।
১০২. ফাকী, মাফতুহ জিব জুনুবিল আন্দালুস, ১/২৩৭।
১০৩. মূসা বিন নুসাইর, আল-ইসাবাহ ফী তারীখিল সাহাবাহ। ১/২৩৫। ইফ্রিকিয়া ও মাগরিবের মধ্যে বর্তমান তিউনিসিয়া ও লিবিয়ার পশ্চিমাংশ এবং আলজেরিয়ার উত্তর উপকূলকে বোঝানো হয়।
১০৪. ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৪/৩১১।
১০৫. ইবনে খালিকান, ওয়াফায়াতুল আইয়ান, ৪/১১৪।
১০০. ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৪/৩১১, ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৯/১৩০ ও ফাকী, মাফতুহ জিব, ১/২৩৫।
📄 আফ্রিকায় ইসলামের অবস্থান সুদৃঢ়করণে মূসা বিন নুসায়েরের প্রচেষ্টা
মাগরিবের গভর্নর হওয়ার পর মূসা বিন নুসাইরের সর্বপ্রথম চিন্তা ও পরিকল্পনা ছিল এ অঞ্চলে ইসলামের অবস্থানকে সুদৃঢ় করা। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, এ অঞ্চলের জনসাধারণ ইতঃপূর্বে একাধিকবার মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল। তাই এ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য তাঁর প্রথম কর্তব্য ছিল এ বিষয়টি অনুধাবন করা যে, কেন তারা বারবার ধর্মত্যাগ করে? এবং কেনইবা তারা মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চায়?
তাদের এই ধর্মত্যাগের কারণ অনুসন্ধানের পর মূসা বিন নুসাইর দু'টি বিষয় খুঁজে পেলেন; বরং বলা ভালো, পূর্ববর্তীদের কর্মপন্থায় দু'টি ত্রুটি তাঁর চোখে ধরা পড়ল। প্রথম ত্রুটিটি হলো, হযরত উকবা বিন নাফে' রাযি. ও তাঁর উত্তরসূরিগণ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তাঁদের বিজয়াভিযান পরিচালনা করেছিলেন। উকবা বিন নাফে' রাযি. একটি জনপদ জয় করার পর বিজিত অঞ্চলে মুসলিম বাহিনীর অবস্থান সুদৃঢ় না করেই আরও গভীরে প্রবেশ করেছিলেন। এরপর অন্যান্য জাতি এবং নতুন অঞ্চল বিজয়ে মনোনিবেশ করেছিলেন। আমাযিগ গোষ্ঠী এ বিষয়টি খেয়াল করে বিদ্রোহ শুরু করে এবং হযরত উকবা রাযি.-এর পিছু নিয়ে তাঁকে অবরোধ ও শহীদ করে দিয়েছিল। এ বিষয়টিকে আমলে নিয়ে মূসা বিন নুসাইর রহ. অত্যন্ত বীরত্বপূর্ণভাবে এবং হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি.-এর ন্যায় সতর্কতামূলক কৌশল অবলম্বন করে তাঁর অভিযানগুলো শুরু করলেন। প্রতিটি পদক্ষেপের পর প্রথমে তিনি নিজের পূর্বের অবস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেন, এরপর নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন। এভাবে সতর্কতার সঙ্গে বীরত্বব্যঞ্জক অভিযান পরিচালনা করার ছয়-সাত বছরের মধ্যে আল্লাহ্ পাক তাঁর হাতে পুনরায় এ অঞ্চলের পূর্ণাঙ্গ বিজয় দান করলেন। অথচ উকবা বিন নাফে' রাযি. মাত্র কয়েক মাসেই এ সুবিশাল অঞ্চল জয় করেছিলেন।
দ্বিতীয় কারণটি হলো, তিনি দেখতে পেলেন, এ অঞ্চলের অধিবাসীগণ ইসলাম ও মুসলমানদের শিক্ষাকে যথার্থভাবে অনুধাবন করেনি; লাভ করেনি ইসলামের সঠিক শিক্ষা। তাই তিনি তাদেরকে ইসলামের শিক্ষা প্রদানে মনোযোগী হলেন এবং শাম ও হেজায থেকে তাবেয়ী আলিমদেরকে নিয়ে এসে এ অঞ্চলের জনসাধারণের জন্য দ্বীন শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন। ফলে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ইসলামের প্রকৃত রূপটি বুঝতে পারল, ইসলামকে মনে-প্রাণে ভালোবাসতে শিখল। দলে দলে তারা ইসলামের পতাকাতলে শামিল হলো। যারা একসময় মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করত, তারাই এবার ইসলামের শ্রেষ্ঠ সৈনিকে পরিণত হলো। এভাবে মূসা বিন নুসাইর উত্তর আফ্রিকার ইসলামের ভিত্তিকে দৃঢ় ও সুপ্রতিষ্ঠিত করলেন।
টিকাঃ
** ইবন আব্দুল্লাহ, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/৪৬, ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৬/১২০, মাক্কারী, নফহুত তীব, ১/১৬৬ ও আল মাররাকুশী, আল মু'জিব ফি আখবারি মাগরিবিল আন্দালুস, ১/১৫২।