📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 আন্দালুস অভিযানের কার্যকারণ

📄 আন্দালুস অভিযানের কার্যকারণ


কেন তারা নিজেদের অভিযানকে পশ্চিমে অব্যাহত রেখে আফ্রিকা মহাদেশের আরও গভীরে প্রবেশ করলেন না? এর পরিবর্তে কেন তারা দিক পরিবর্তন করে উত্তরে অগ্রসর হলেন এবং আন্দালুস অভিমুখে? আর আন্দালুস অভিযানের জন্য মুসলিম অভিযাত্রীগণ কেন এই সময়কালকেই (৯২ হিজরী/৭১১ খৃষ্টাব্দ) বেছে নিলেন? পাঠক-মনে এ ধরণের নানা প্রশ্ন উপস্থিত হওয়া অতি স্বাভাবিক বিষয়। এসব প্রশ্নের উত্তর এই যে, এ সময়ের মধ্যে মুসলমানগণ উত্তর আফ্রিকার সমস্ত দেশ বিজয় সম্পন্ন করে ফেলেছিলেন। মিশর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো প্রভৃতি দেশের বিজয়াভিযান ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছিল। মুসলিম বাহিনী পৌঁছে গিয়েছিল মরক্কোর প্রান্তসীমায় এবং আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে। কাজেই চলমান বিজয়াভিযান অব্যাহত রাখতে মুসলিম বাহিনীর সামনে তখন মাত্র দুটি পথ খোলা ছিল: দিক পরিবর্তন করে উত্তর অভিমুখী হওয়া এবং আটলান্টিক মহাসাগরের দিকে যাওয়া (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগাল) প্রবেশ করা, কিংবা উত্তর-পূর্ব অভিমুখে অগ্রসর হওয়া। অতএব, এ অবস্থায় দিক পরিবর্তন করে আন্দালুস অভিমুখে অগ্রসর হওয়ারই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যুদ্ধসংক্রান্ত সূত্রগুলো বলছে যে, সুবিশাল ভূখণ্ড আক্রমণ কিংবা স্রেফ সাম্রাজ্য বিস্তারের উদ্দেশ্যে বিজয়াভিযান পরিচালনা করা হয়নি। সকল মানুষকে এক আল্লাহে বিশ্বাস করার প্রতি আহ্বান করা এবং তাদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়াই ছিল ইসলামি অভিযানসমূহের মৌলিক উদ্দেশ্য। হিজরী নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে যেহেতু উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে দ্বীন প্রচার ও শিক্ষার কাজ একটি ব্যাপক সফলতা পেয়েছিল, তাই সেখানে নতুন অভিযানের প্রয়োজন ছিল না। যখনই এই সুযোগ সৃষ্টি হলো যে, ইসলামের সার্বজনীন দাওয়াত-নীতি অনুযায়ী বিজয় অভিযানের দিক পরিবর্তন করে আন্দালুস ভূমির দিকে পরিচালিত করা যায়, তখন তারা তা-ই করলেন।

মুসলমানগণ তাদের সকল অভিযানের ক্ষেত্রে এ নীতি ও পন্থাই অবলম্বন করেছেন। ঐতিহাসিক কাদিসিয়ার যুদ্ধের পূর্বে মহান সাহাবী রিবয়ী বিন আমীর রাযি. ও পারস্যের বিখ্যাত সেনাপতি রুস্তমের মাঝে যে কথোপকথন হয়েছিল, তাতেও ইসলামী দাওয়াতের এই নীতিটি মূর্ত হয়ে ওঠে। সাহাবী রিবয়ী যখন রুস্তমকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করলেন, তখন সে জিজ্ঞেস করল, কিসের আকর্ষণে আপনারা আমাদের দেশে এসেছেন? উত্তরে এই মহান সাহাবী দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, আল্লাহ্ তা’য়ালা আমাদেরকে এ উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেছেন যে, আমরা যেন আল্লাহর বান্দাদেরকে সৃষ্টির দাসত্ব-শৃঙ্খল হতে উদ্ধার করে স্রষ্টার দাসত্বের গৌরবের পথে নিয়ে আসি; পৃথিবীর সংকীর্ণতা থেকে প্রশস্ততার দিকে এবং ধর্মসমূহের অনিষ্ঠতা হতে ইসলামের ন্যায়-ইনসাফ নীতির দিকে নিয়ে আসি। আল্লাহ্ আমাদেরকে তাঁর দ্বীন দিয়ে এ সত্যের পথে আহ্বান করার জন্য মানুষের কাছে পাঠিয়েছেন। যারা এ দ্বীন গ্রহণ করবে, আমরা তাদেরকে আপন করে নেব এবং অভিযান প্রত্যাহার করে ফিরে যাব; আর যারা এ দ্বীনের দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করবে, তাদের সঙ্গে আমরা লড়াই করে যাব; যতক্ষণ না আল্লাহ্র নির্ধারিত প্রতিশ্রুতি লাভ করি। রুস্তম জিজ্ঞেস করল, আল্লাহ্র নির্ধারিত প্রতিশ্রুতি কী? উত্তরে রিবয়ী বিন আমির রাযি. বললেন, অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে শহীদ হলে আল্লাহ্র প্রতিশ্রুতি জান্নাত আর জীবিত থাকলে আল্লাহ্র প্রতিশ্রুতি 'বিজয়'।।

টিকাঃ
২৮. মারিয়া মাকলুফি বিনসের ফিকরু ইফরিন। আফ্রিকা ও মরক্কোর বিশাল ভূমি ৯২,০০,০০০ বর্গ কিলোমিটার। প্রাগুক্ত, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া ও মরক্কোর মোট আয়তন ২০ লক্ষ ১৫ হাজার বর্গ মাইল।
৯৩. তাবারী, তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ২/৪০১ ও ইবনুল আসীর, আল-কামিল ফিততারীখ, ২/৬১১।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 তৃতীয় পরিচ্ছেদ : তারিক বিন যিয়াদের আন্দালুস বিজয়

📄 তৃতীয় পরিচ্ছেদ : তারিক বিন যিয়াদের আন্দালুস বিজয়


তরীফ বিন মালিকের প্রাথমিক অভিযানের প্রায় এক বছর পর মূসা বিন নুসায়েরের পূর্ণাঙ্গ অভিযানের প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো। ৯২ হিজরীর শাবান মাসে সাত হাজার সৈন্যের সমন্বয়ে গঠিত মুসলিম বাহিনী তারিক বিন যিয়াদের নেতৃত্বে আন্দালুসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। তারিক বিন যিয়াদের বাহিনীকে বিদায় দেওয়ার সময় মূসা বিন নুসায়ের কায়রোয়ানে সিজদায় পড়ে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করছিলেন এবং মুসলিম বাহিনীর বিজয় প্রার্থনা করছিলেন।

টিকাঃ
১. তারিক বিন যিয়াদ কোন দ্বীপে অবতরণ করেছিলেন, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইবনুল আসীর, ইবনে খালদূন ও মাক্কারী জিব্রাল্টার দ্বীপে অবতরণ হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।
২. আবদুল রহমান আলহাজ্জী, আন্দালুসিয়া আলফাতু, পৃ: ৫৭-৬৬।
৩. বিস্তারিত জানতে: প্রাগুক্ত, পৃ: ৪৭-৪৮।

ফন্ট সাইজ
15px
17px