📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 জ্ঞান-বিজ্ঞানে তৎকালীন ইউরোপের পশ্চাদপদতা

📄 জ্ঞান-বিজ্ঞানে তৎকালীন ইউরোপের পশ্চাদপদতা


প্রকৃতপক্ষে এ আলোচনা নিশ্চয়ই যথার্থ হবে যে, ইসলামী বিজয়াভিযানের প্রাক্কালে ইউরোপের বা বিশেষ করে আন্দালুস অঞ্চলের পরিবেশ-পরিস্থিতি কেমন ছিল এবং আন্দালুস অঞ্চলে বসবাসকারী জনগণের ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেওয়ার পর বিদ্যমান অবস্থা ও পরিস্থিতি কীভাবে বদলে গিয়েছিল? সে সময় ইউরোপ ছিল মূর্খতা ও পশ্চাদগামিতার ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত একটি অঞ্চল। ইউরোপে তখন একটি আইনই সদা কার্যকর ছিল, আর তা হল 'শোষণ' ও 'অবিচার'। শাসকগোষ্ঠীই ধন-সম্পদ ও দেশের যাবতীয় সম্পদের মালিক হত আর সাধারণ জনগণ জীবন নির্বাহ করত প্রচুর অভাব ও দারিদ্র্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে। শাসকগোষ্ঠী নিজেদের বিলাসী জীবন নিশ্চিতকরণে একের পর এক নির্মাণ করত রাজপ্রাসাদ, দুর্গ ও নিরাপত্তা-প্রাচীর আর সাধারণ জনগোষ্ঠী আশ্রয় ও বসবাসের সামান্য জায়গাটুকুও খুঁজে পেত না। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যই ছিল তাদের নিয়তি। বরং সাধারণ জনগণের অবস্থা এত করুণ ছিল যে, জমি-জমার সঙ্গে সঙ্গে তাদেরও কেনা-বেচা হত। ইউরোপের জাতিবর্গ তখন অবস্থান করছিল নীতি-নৈতিকতার নিম্নতম স্তরে। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় সামান্য কারণে হত্যা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এমনকি মানবজীবনের অতি স্বাভাবিক ও সাধারণ রীতি-নীতিও তারা হারিয়ে ফেলেছিল। উদাহরণস্বরূপ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিচ্ছন্নতা একটি স্বতন্ত্র বিষয়। কিন্তু পরিচ্ছন্নতা বলে কোন কিছু তাদের মধ্যে ছিল না। দীর্ঘদিনের ময়লা জমে থাকা সত্ত্বেও তারা তা শরীরের ওপর গেঁথে রাখত। তৎকালীন এ অঞ্চল সফরকারী মুসলিম পরিব্রাজকগণ উল্লেখ করেছেন যে, তৎকালীন আন্দালুসের অধিবাসীগণ বছরে এক-দু'বারের বেশি গোসল করত না। বরং তারা মনে করত, শরীরে জমে থাকা ময়লা শারীরিক সুস্থতা এবং কল্যাণ ও বরকতের কারণ। এ অঞ্চলের কিছু অধিবাসী এমন ছিল, যারা ইশারা-ইঙ্গিতে পারস্পরিক ভাব বিনিময় করত। লেখাপড়া দূরে থাক, তাদের কোন বর্ণমালা-রীতিই ছিল না। তারা মূর্তিপূজক ও অগ্নিপূজারীদের মতো বিভিন্ন আকীদা ও বিশ্বাস লালন করত; যেমন—মৃত ব্যক্তির লাশ পুড়িয়ে দেওয়া, মৃত ব্যক্তির সঙ্গে তার স্ত্রী, দাসী বা অন্য কোন আপনজনকে জীবন্ত কবর দেওয়া ইত্যাদি। এসব অমানবিক কাজ গোপনে সংঘটিত হত না; বরং সমাজের সকলের জ্ঞাতসারে সকলের চোখের সামনেই এসব ঘটনা ঘটত। এককথায় মুসলমানদের বিজয়লাভের পূর্ব পর্যন্ত পুরো ইউরোপ আচ্ছন্ন ছিল পশ্চাদগামিতা, অনাচার-অবিচার ও চরম দরিদ্রতায়। তারা অবস্থান করছিল সভ্যতা ও সংস্কৃতির আলো থেকে শত ক্রোশ দূরে। আন্দালুসের বিজয় এবং দীর্ঘকাল এই অসভ্যতায় নিমজ্জিত থাকা সত্ত্বেও ইউরোপবাসীদের এ থেকে বের হওয়ার জন্য কোন মাথাব্যথাই ছিল না, ছিল না কোন অনুভূতি ও চিন্তা। বস্তুত খ্রিস্টীয় একাদশ-দ্বাদশ শতকের পূর্বে আন্দালুসের বাইরের ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি সামান্য অনুরাগও ছিল না।

টিকাঃ
২১. আবু ওয়াসেল আল-আব্বাসী, কিতাবুল মানাসিক ওয়াস মাহামিক (হায়াকিলুল আদায়াত ওয়া ইফরাজুল ক্বাজা), পৃ: ১১১।
২২. প্রাগুক্ত, পৃ: ১৮৬-১৮৭।
২৩. গোস্তাভ লে বন, আর-রাহুল আরবী, পৃ: ০৫৭।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 গথ জাতির আন্দালুস শাসন

📄 গথ জাতির আন্দালুস শাসন


খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর শেষদিকে পশ্চিমা গোথ জাতি এলারিক (Alaric)-এর নেতৃত্বে রোমান সাম্রাজ্যের পশ্চিম অংশের বিভিন্ন নগরীর ওপর কর্তৃত্ব বিস্তারে সক্ষম হয়। এর নেপথ্য কারণ এই ছিল যে, গোথ জাতি রোমান সম্রাট থিওডোসিয়াস (Theodosius)-এর সহায়তায় এমন কিছু পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করেছিল, যা তাদের ক্ষমতা লাভের পথ সুগম করেছিল। ৪১০ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাটের মৃত্যু হলে গোথ নেতা এলারিক পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপে অন্যতম শক্তিশালী নেতারূপে আবির্ভূত হন। এরপর তিনি রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী রোম নগরীর কর্তৃত্ব অর্জনে তৎপর হন এবং ৪১০ খ্রিস্টাব্দে এক রক্তক্ষয়ী ঘটনার মাধ্যমে আপন লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হন। ঐতিহাসিকগণ এই ঘটনাকে 'আন্দালুস আক্রমণ' রূপে অভিহিত করে থাকেন। এ সময় রোমান সাম্রাজ্যের নেতৃবৃন্দ আইবেরিয়ান উপদ্বীপে বসবাসরত বর্বর ভান্ডাল জাতিগোষ্ঠীকে এই মর্মে উপদ্বীপের উত্তর-পশ্চিম অংশে স্থায়ীভাবে বসবাস করার অনুমতি প্রদান করে যে, তারা আশপাশের অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীদের প্রতি কোন ধরনের হুমকি সৃষ্টি করবে না। কিন্তু বাস্তবতা হল, তখন রোমানরা ছিল শক্তি-সামর্থ্যে দুর্বল আর ভান্ডাল গোষ্ঠী ছিল যেমন সংখ্যায় অধিক, তেমনই অসভ্যতা ও বর্বরতায় পুষ্ট। ফলে যা হওয়ার, তা-ই হল। ভান্ডাল গোষ্ঠী পুরো অঞ্চল জুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করল এবং পার্শ্ববর্তী গাল (Gaule) রাষ্ট্রের (বর্তমান ফ্রান্স) জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াল। এর কিছুদিন পর এলারিকের মৃত্যুতে রোমে বিরাজমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির অবসান ঘটে। এরপর গোথ নেতা আটাউলফ (Ataulf) তার স্থলাভিষিক্ত হন। পরিস্থিতিতে উন্নতি হলে তৎকালীন রোম সম্রাট আটাউলফকে প্রথমে গাল রাষ্ট্রের দক্ষিণাংশে শাসনের অনুমতি দান করেন এবং পরবর্তী সময়ে তাকে ভান্ডাল গোত্রের ওপরও কর্তৃত্ব প্রদান করেন। এর ফলে শুরু হয় ভান্ডাল জনগোষ্ঠীর ওপর শক্তিশালী গোথ জাতির উপর্যুপরি আক্রমণ ও দমন-পীড়ন। ফলে ভান্ডাল গোষ্ঠী উপদ্বীপের দক্ষিণ দিকে বিতাড়িত হয়। তবে কিছুকাল পরেই তারা সেখানে রোমান সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব গড়ে তোলে। এভাবে ধীরে ধীরে গোথ জাতি এ অঞ্চলে নিরঙ্কুশ প্রতিপত্তি অর্জন করে। বিশেষ করে তাদের শক্তিশালী নেতা ভ্যালিয়া (Valia)-এর শাসনামলে পুরো উপদ্বীপের ওপর তারা একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। কালের পরিক্রমায় একসময় রোমান সাম্রাজ্যের ক্ষমতা ও শক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হলে গোথ জাতি রোমান সাম্রাজ্য হতে স্বাধীন হয়ে উপদ্বীপে নিজেদের স্বতন্ত্র শাসনক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে এবং গোথ নেতা ইউরিক (Euric) ৪৬৬ খ্রিস্টাব্দে 'রাজা' উপাধি ধারণ করেন। ইতিহাসের পরবর্তী ধাপে গোথ নামে সুপরিচিত পশ্চিমা গোথ জাতির স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতারূপে এই ইউরিককেই গণ্য করা হয়।

মুসলিম বাহিনীর আন্দালুস বিজয়ের কয়েক বছর বা তার কিছু পূর্বে রডারিক (Roderic) নামক জনৈক সেনাপতি তৎকালীন গোথ-নৃপতি উইটিযা (Wittiza) কে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করেন। এই রডারিকের শাসনকালেই মুসলমানদের আন্দালুস বিজয় সম্পন্ন হয়। ইসলামের বিজয়ের পূর্বে অরাজক রাজনৈতিক পরিবেশ, জরাজীর্ণ সমাজকাঠামো ও ভ্রান্ত শাসনব্যবস্থার কারণে তৎকালীন আন্দালুসবাসী গোষ্ঠীগত হীনতা, দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক পশ্চাদপদতার শিকার ছিল। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, সমকালীন আন্দালুসের শাসকগোষ্ঠীর রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষা-ব্যবস্থা দুর্বল ছিল কিংবা তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি ছিল না। বরং যে কোন শক্তিশালী বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করা, ব্যাপক প্রতিরোধ করা এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মত সামরিক শক্তি তাদের পূর্ণমাত্রায় ছিল। প্রকৃতপক্ষে গোথ-নৃপতি উইটিযার হত্যাকাণ্ডের সময় পর্যন্ত তাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দৃঢ়ভাবে বহাল ছিল। এরপরও তাদের মধ্যে মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে জনমত ও প্রতিরোধের সকল প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্ণ শক্তি ছিল।

টিকাঃ
২৪. ফারুক ইবনে যিহাদাহ: হুলিউন সুফিল, আন্দালুস আল-মাজদ, পৃ: ১৯।
২৫. প্রাগুক্ত, পৃ: ১৯০-১৯১।
২৬. প্রাগুক্ত, পৃ: ১৯০-১৯১।

ফন্ট সাইজ
15px
17px