📄 আন্দালুসের পরিচিতি
বর্তমান বিশ্বমানচিত্রের স্পেন ও পর্তুগাল—এই দুটি দেশ জুড়ে ছিল তৎকালীন আন্দালুস। এ ভূখণ্ডকে আইবেরিয়ান উপদ্বীপও (Iberian Peninsula) বলা হয়। উভয় দেশের সম্মিলিত আয়তন প্রায় ছয় লক্ষ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ তৎকালীন আন্দালুস ছিল বর্তমান মিশরের দুই-তৃতীয়াংশের চেয়ে কিছুটা ছোট। আন্দালুস উপদ্বীপকে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র মরক্কো হতে একটি প্রণালী বিভক্ত করে রেখেছে, যা মুসলমানদের আন্দালুস বিজয়ের সময় থেকেই জাবালে তারিক প্রণালী নামে পরিচিত। প্রণালীটির আয়তন প্রায় ১২.৮ কিলোমিটার; যার দক্ষিণ প্রান্তে আছে মরক্কোর সিউটা (Ceuta) নগরী আর উত্তর প্রান্তে আন্দালুসের 'জাবালে তারিক' বা তারিক পর্বত।
টিকাঃ
২. বর্তমান উপদ্বীপের বহু ইবেরিয়ানরা প্রাচীন ঐতিহ্যের ঋণ আইবেরিয়ান উপদ্বীপ। ইবেরিয়ান দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্ত বরাবর আইবেরিয়ান উপদ্বীপের আয়তন ৫৮২,০০০ বর্গ কি.মি. (২,২৫,০০০ বর্গমাইল)। পশ্চিমদিক বরাবরই এর একপেশে ইউরোপ থেকে পৃথক করে রেখেছে। স্পেন, পর্তুগাল ও আন্দোর এই তিনটি দেশের পাশাপাশি ভূমধ্য সাগর এবং আটলান্টিক উপদ্বীপের অন্তর্ভুক্ত।
৩. 'প্রণালী’ শব্দের মূল অর্থ দুটি ভূমির মাঝ দিয়ে বা দু'টো জলপথের মাঝ দিয়ে। যেখানে মিনারের মাধ্যমে আমরা দিগন্তে দূরকে কাছে এবং আগন্তুকদের আগমন দেখতে পাই। মূলতঃ প্রণালী হচ্ছে উপদ্বীপ। আন্দালুসের উত্তর-পশ্চিমের একটি পাহাড় এবং দক্ষিণ-পশ্চিম의 ভূমধ্য সাগর বা পশ্চিম ভূমধ্যসাগর বা পূর্ব ভূমধ্যসাগরের সংযোগকারী সরু জলপথকে প্রণালী বলা হয়।
৪. এ পাহাড় পূর্বে ভূমধ্যসাগরীয় মরক্কো যে জলপ্রবাহ দুটি নদীর সংযোগস্থলে সংযুক্ত করে, তাকে প্রণালী বলা হয়। একটি প্রণালী যেহেতু পৃথক দুটি জলভূমির সংগম ঘটিয়ে যোগাযোগব্যবস্থার দূরত্বে আছে যাহোক ভূখণ্ডে আছে, তাই সব সুয়েজ পরিধির বিভিন্ন প্রণালী বিশ-রাজধানীসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিবেচিত হয়েছে এবং প্রণালী দখল দিয়ে সংযুক্ত হয়েছে বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা।
৫. উত্তর আফ্রিকা ও আইবেরিয়ান উপদ্বীপের মাঝে অবস্থিত এই প্রণালীই ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরকে যুক্ত করেছে। আন্দালুস বিজয়ী যোদ্ধা তারিক বিন যিয়াদকে দিয়ে প্রণালীটির দক্ষিণ তীরে অবস্থিত সৈকতনীয়ের নাম 'জাবালে তারিক' এবং প্রণালীর নাম 'জাবালে তারিক প্রণালী' রাখা হয়। ইউরোপীয়রা একে 'জিব্রাল্টার প্রণালী' (The Strait of Gibraltar) বলে থাকে। জাবাল শব্দও ঐতিহাসিকভাবে এই প্রণালীকে 'সাবান আলফাক্রাহ' নামেও অভিহিত করে থাকেন।
৬. 'সিউটা' বিউটিফুল প্রণালীর তীরে অবস্থিত মরক্কোর অন্যতম একটি শহর, যা বর্তমানে স্পেন সরকারের কাছ থেকেই। মরক্কোর আরও একটি বন্দর-নগরী 'মালীলা' (Melilla)-ও স্পেনের দখলে রয়েছে। জিব্রাল্টার সিউটা নগরীকে ‘সাবাক’ (صَبَار) বলা হয়।
📄 ভৌগোলিক অবস্থান
বিস্তৃত-সদৃশ আইবেরিয়ান উপদ্বীপ ইউরোপের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে অবস্থিত। পূর্ব-পশ্চিমে এই উপদ্বীপটি পূর্ব দিকে ধীরে ধীরে সঙ্কীর্ণ হয়ে গেছে, আর পশ্চিমে যতই অগ্রসর হয়েছে, ততই প্রসারিত হয়েছে। আন্দালুসের উত্তর সীমানায় যেই প্রাকৃতিক প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পিরেনিজ পর্বতমালা (Pyrenees Mountains), যা এ ভূখণ্ডকে ফ্রান্স থেকে পৃথক করেছে। এই একটি দিক বাদে বাকি সব দিক থেকে আইবেরিয়ান উপদ্বীপটি জলভাগ দ্বারা বেষ্টিত। এ কারণেই সম্পূর্ণ অর্থে আরবগণ একে 'আন্দালুস দ্বীপ' বলে থাকেন। পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে আইবেরিয়ান উপদ্বীপকে ঘিরে আছে ভূমধ্যসাগর, আর দক্ষিণ-পশ্চিম, পশ্চিম ও উত্তর দিক থেকে আছে আটলান্টিক মহাসাগর। সুতরাং পিরেনিজ পর্বতমালাই একমাত্র স্থল প্রাচীর, যা ইউরোপের সঙ্গে উপদ্বীপটিকে সংযুক্ত করেছে। কেননা, উত্তর দিকে এটি আটলান্টিক মহাসাগরের সাথে আর দক্ষিণ দিকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত। অন্য একটি লক্ষ্যণীয় বিষয় হল পিরেনিজ পর্বতমালা স্পেন ও ফ্রান্সের মাঝে এমনভাবে বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যে, মানচিত্রের দিকে তাকালে মনে হয়, স্পেন যেন ইউরোপ থেকে মুখ ফিরিয়ে মরক্কোর দিকে মুখ করে আছে! এ কারণেই মুসলিম ভূগোলবিদগণ সর্বসম্মতভাবে আন্দালুসকে ইউরোপ মহাদেশের ভূখণ্ড গণ্য না করে আফ্রিকার বিস্তৃত অংশের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। আর এ বিষয়টি তো সুবিদিত যে, জিব্রাল্টার, উত্তর আফ্রিকা ও প্রাকৃতিক দিক থেকে মরক্কোর সঙ্গে, বিশেষত সিউটা ও তাঞ্জিয়া (Tangier) অঞ্চলের সঙ্গে আন্দালুসের যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। আইবেরিয়ান উপদ্বীপের অভ্যন্তরে বিশাল এলাকা জুড়ে আছে সুবিস্তৃত মালভূমি, যা মেসেটা মালভূমি (The Meseta Central Plateau) নামে পরিচিত। এই মালভূমি অঞ্চলকে সমান্তরাল করে আইবেরিয়ান উপদ্বীপে আছে দীর্ঘ পর্বতমালা। আর পুরো ভূখণ্ডে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য নদী-নালা; যে কারণে ওপর থেকে আইবেরিয়ান উপদ্বীপকে দেখলে মনে হয়, পানির তৈরি জালের ওপর ভেসে থাকা এক খণ্ড সুবিস্তীর্ণ ভূমি!
টিকাঃ
৩২. সামরিক দিক দ্বারা পরিবেষ্টিত ভূখণ্ডকে 'দ্বীপ' বলে; তবে তিনদিক পানি দ্বারা বেষ্টিত ও একদিক স্থল ভাগের সঙ্গে যুক্ত হলে তাকে উপদ্বীপ বলাই যুক্তিযুক্ত। এ কারণেই তাকে দ্বীপ বলে অভিহিত করা সত্ত্বেও অর্থপূর্ণ নয়, বরং রূপকার্থে।
৩৩. মুহাম্মাদ নুয়াইমী জাবাল, আরবী যুগ মুসলিমিল আন্দালুস, পৃ: ১৩।
📄 ‘আন্দালুস’ নামকরণের কারণ
এ অঞ্চলের নাম আন্দালুস রাখার পেছনে জড়িয়ে আছে এক সুপ্রাচীন ইতিহাস। অতীতকালে জর্মান কিছু জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা সুইডেন, ডেনমার্ক, নরওয়েসহ ইউরোপের উত্তর স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ থেকে এসে আন্দালুস দখল করে নিয়েছিল এবং দীর্ঘকাল ধরে এ অঞ্চলেই বসবাস করেছিল। অবশ্য কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে এ জনগোষ্ঠী জার্মানি থেকে এসেছিল। এ জনগোষ্ঠীকে ভান্ডাল গোত্র বলা হত আর এর বাসিন্দাদের নামের সঙ্গে মিল রেখে এ ভূখণ্ডকে বলা হত 'ভান্ডালুসিয়া'। আন্দালুস মূলত এই 'ভান্ডালুসিয়া' শব্দেরই অপভ্রংশ। কালের বিবর্তনে 'ভান্ডালুসিয়া' প্রথমে 'আন্দালুসিয়া', এরপর 'আন্দালুস' রূপ ধারণ করে। প্রাচীন এই জনগোষ্ঠী বর্বরতা ও নৃশংসতার জন্য সুপরিচিত ছিল। এ কারণেই ইংরেজিতে ভান্ডালিজম (Vandalism) বলা হয়। অন্যায়, বর্বর ও অসভ্য আক্রমণকে ভান্ডালিজম বলে। আর ভান্ডাল জনগোষ্ঠীর মাঝে এসব বিষয় পুরোপুরি বিদ্যমান ছিল। পরবর্তী সময়ে এ জনগোষ্ঠী আন্দালুস ছেড়ে চলে যায়। এরপর অন্য একটি জনগোষ্ঠী এ অঞ্চল শাসন করতে থাকে। ইতিহাসে এরা গোথ বা ভিসিগথ (Visigoths) জাতি নামে পরিচিত। মুসলমানদের আন্দালুস বিজয়ের পূর্ব পর্যন্তও এই গোথ জাতিই আন্দালুস শাসন করেছিল।