📄 তাকদীরের উপর বিশ্বাস রাখা
মদীনায় নিজ বাড়ীতে মৃত্যুর মুখে উবাদাহ বিন সামিত।
অসহনীয় রোগ-যন্ত্রণার মধ্যে দর্শনার্থীদের সান্ত্বনা দিয়ে তিনি বলছেন, "আল্লাহর ফজিলতে ভাল আছি।"
শেষ মুহূর্ত যখন আসন্ন তখন উবাদাহ (রা) তাঁর গোলাম-খাদেম প্রতিবেশী এবং যাদের সাথে সব সময় উঠা-বসা করেছেন সেই পরিচিতজনদের তিনি ডেকে আনতে বললেন।
সবাইকে ডেকে আনা হলো।
সবাই উপস্থিত হলে তাদের সবাইকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, "সম্ভবত এটাই আমার শেষ দিন এবং আজকের রাত আমার আখিরাতের প্রথম রাত হতে পারে। তোমাদের সাথে আমি যদি আমার মুখ দিয়ে অথবা হাত দিয়ে কঠিন আচরণ করে থাকি, তাহলে আমার প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাওয়ার আগেই একে একে তার প্রতিশোধ নিয়ে নাও এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ আমার থেকে প্রতিশোধ নেবেন।"
লোকেরা আরজ করল, "আপনি আমাদের পিতৃতুল্য এবং আমাদেরকে আদব ও শিষ্টাচার শিখিয়েছেন।”
উবাদাহ (রা) বললেন, "তোমরা কি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছ?”
সবাই বলল, "হ্যাঁ, ক্ষমা করে দিয়েছি।"
উবাদাহ (রা) বললেন, “হে আমার আল্লাহ, সাক্ষী থেকো।”
অন্তিম মুহূর্তে তাঁর ছেলে এসে আরজ করল, "আমাকে কিছু ওসিয়ত করুন।” পুত্রকে শেষ-উপদেশে বললেন তিনি, "তাকদীরের উপর ইয়াকিন রেখো। তা না হলে ঈমানের জন্যে উপযুক্ত হতে পারবে না।"
📄 মুনাফিক সর্দারের ঈমানদার পুত্র
বনি মুসতালিকের যুদ্ধ শেষ। মহানবী (সা)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী মদীনায় ফিরছে।
কি এক ঘটনায় একজন মুহাজিরের সাথে একজন আনসারের বিরোধ বাধল। বলা হলো, একজন মুহাজির লাথি মেরেছে একজন আনসারকে। এ নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যে একটা শোরগোল সৃষ্টি হলো। মহানবী (সা)-এর কানে এলো বিষয়টা। তিনি তাদের ডেকে বললেন, 'এ তো জাহেলী যুগের আওয়াজের মত শোনাচ্ছে। এসব অশোভন কথাবার্তা পরিত্যাগ কর।' বিষয়টা এখানেই মিটে গেল।
মুসলিম বাহিনীর সাথে মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ছিল। তার ছেলেও ছিল। সে মুনাফিক নয়।
ঘটনাটা মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ বিন উবাই-এর কানেও গেল। মুহাজির ও আনসার মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টির একটা বড় সুযোগ বলে একে সে মনে করল।
সে নেচে উঠল। বলল, কি! একজন মুহাজির এই কাজ করেছে? ঠিক আছে মদীনায় একবার পৌঁছতে দাও। সম্মানী লোকেরা মদীনাবাসী নীচু সম্প্রদায়ের (মক্কাবাসী) লোকদের মদীনা থেকে বের করে দেবে।' আবদুল্লাহ বিন উবাই-এর ষড়যন্ত্রের কথা উমর (রা)-এর কানে গেল। উমর (রা) মহানবী (সা)-এর কাছে গিয়ে আরজ করলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি অনুমতি দিলে ঐ মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিতে পারি।" মহানবী (সা) বললেন, 'না। মানুষ বলবে যে, আমি নিজের লোকদের হত্যা করে থাকি।'
মহানবীর কথায় উমর (রা) চুপ করে গেলেন।
আবদুল্লাহ বিন উবাই-এর ছেলে কিন্তু চুপ করে থাকলেন না। পিতার ঔদ্ধত্যে ক্রুদ্ধ আবদুল্লাহ (রা) তার পিতাকে গিয়ে বললেন, "আল্লাহর কসম, আমি আপনাকে মদীনা প্রবেশ করতে দেব না, যে পর্যন্ত না আপনি নিজ মুখে সাক্ষ্য দেন যে, আপনি নীচ লোক, আর রাসূলুল্লাহ সম্মানিত।” অবস্থা বেগতিক দেখে মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ বিন উবাই পুত্র যেভাবে বলেছে সেইভাবে সাক্ষ্য দিল।
📄 জীবন দিয়ে আদব রক্ষা
সাহাবী বারা (রা) বিনা মা'রুর পুত্র বশর বিন বারা। প্রাণবন্ত এক নবীন যুবক সে।
ইসলামের যুগ-সন্ধিক্ষণের ঘটনা। আকাবায় শপথ গ্রহণকারীদের একজন তিনি। বদর, উহুদ ও খন্দকের লড়াই-এরও তিনি এক যোদ্ধা।
খাইবার যুদ্ধের পর এক ঘটনায় তিনি মহনবীর প্রতি আদব প্রকাশে এক ইতিহাস সৃষ্টি করলেন।
এক ইহুদীনির দাওয়াত গ্রহণ করেছেন মহানবী (সা)। সাহাবীদের নিয়ে তিনি খেতে বসেছেন।
সাহাবীদের মধ্যে বশর বিন বারা রয়েছেন। খাওয়া শুরু করেছেন তিনি। গোশতের সাথে বিষ মেশানো আছে বুঝতে পেরেই মহানবী (সা) খেতে নিষেধ করলেন সবাইকে।
কিন্তু বশর বিন বারা বিষযুক্ত গোশতের টুকরা গিলে ফেলেছেন।
গোশতের টুকরো মুখে দিয়ে গোশতের স্বাদ থেকে বারাও বুঝতে পেরেছিলেন যে, গোশতে কিছু ঘটেছে। মনে হলো, গোশতের টুকরো তিনি উগরে ফেলেন। কিন্তু দস্তরখানায় মহানবীর সামনে এইভাবে উগরে ফেলাকে বেআদবী মনে করলেন এবং গিলে ফেললেন গোশতের টুকরা।
এই গোশতের বিষক্রিয়াতেই বশর বিন বারা ইন্তিকাল করেন。
📄 খাদেমের সাথে ব্যবহার
আনাস বিন মালিক মহানবীর ফায়-ফরমাশ শোনে।
মহানবী (সা) হিজরত করে মদীনা আসার পর পরই আনাসের মা উম্মে সুলাইম ১০ বছরের আনাসকে মহানবীর কাছে পেশ করে বলেন, আমার এ কলিজার টুকরা আপনার খেদমতে হাজির থাকবে, আপনার ফায়-ফরমাশ শুনবে। আপনি তাকে গ্রহণ করুন।
তারপর থেকে রাত এবং মধ্যদিনের একটা অংশ বাড়িতে কাটানো ছাড়া ফজরের পূর্ব থেকে গোটা সময় আনাস কাটিয়েছেন মহানবীর খেদমতে। অনেক কথা ও কাহিনীর আকর ছিলেন এই আনাস ইবনে মালিক (রা)।
একদিনের কথা।
মহানবী (সা) কোন কাজের নির্দেশ দিলেন আনাসকে। আনাস আদেশ তামিলের জন্যে বেরিয়ে গেল। পথে একদল ছেলেকে খেলতে দেখে সে দাঁড়িয়ে গেল এবং খেলা দেখতে লাগল। মহানবীর আদেশের কথা বেমালুম ভুলে গেল সে।
অনেক দেরী দেখে আনাসের খোঁজে বেরুলেন মহানবী (সা) নিজে। খেলা দেখায় মশগুল আনাসকে দেখতে পেলেন তিনি।
আল্লাহর রাসূলকে দেখে আনাসের মনে পড়ে গেল আল্লাহর রাসূলের আদেশের কথা। কিন্তু ভয় পেয়ে পালানোর মত বেয়াদবী করল না আনাস। লজ্জিত হয়ে আদবের সাথে দাঁড়িয়ে থাকল।
মহানবী (সা) এসে স্নেহের সাথে আনাসের হাত হাতে নিলেন এবং স্মরণ করিয়ে দিলেন তাঁর আদেশের কথা।
আনাস ছুটল তার কাজ নিয়ে। মহানবী (সা) যতক্ষণ আনাস না ফিরল, ততক্ষণ কাছেই একটা দেয়ালের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকলেন।
আনাস (রা) বলেন, "আমি দশ বছর তাঁর খেদমত করেছি। কিন্তু নবী (সা) আমার উপর কোন সময় অসন্তুষ্ট হননি এবং আমার উপর কোন দাপটও দেখাননি। এমনকি কোন সময় এমন কথাও বলেনি যে, অমুক কাজ কেন করেছ বা অমুক কাজ কেন করনি।"