📄 দুনিয়াটা আপনাদের মত বুজুর্গের কারণে টিকে আছে
তখন উমর ফারুক (রা)-এর খিলাফতকাল।
উবাদাহ বিন সামিত তখন ফিলিস্তিনীদের কাজী। আর মুয়াবিয়া (রা) সেই ফিলিস্তিনের গভর্নর।
উবাদাহ (রা) অন্যায়-অসংগতি তা যত ছোটই হোক, তার কাছে নতি শিকার করতো না।
এই উবাদাহ (রা)-এর সাথে একদিন কথা কাটাকাটি হয়ে গেল মুয়াবিয়ার (রা)। গভর্নর মুয়াবিয়া তাকে কিছু কঠোর কথা শোনালেন।
হযরত উবাদা (রা) তা সহ্য করলেন না। ফিলিস্তিন ছেড়ে চলে এলেন মদীনায়। আসার সময় মুয়াবিয়া (রা)-কে বললেন, 'ভবিষ্যতে আপনি যেখানে থাকবেন, আমি সেখানে থাকবো না।'
মদীনায় ফিরে এলে খলিফা উমর (রা) তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। বললেন সব কথা উবাদাহ (রা)।
সব শোনার পর খলিফা উমর (রা) বললেন, "আমি আপনাকে কোনক্রমেই সেখান থেকে সরিয়ে আনবো না। দুনিয়াটা আপনাদের মত বুজুর্গের কারণেই টিকে আছে। যেখানে আপনাদের মত লোক থাকবে না, আল্লাহ সেই জমিনকে খারাপ ও ধ্বংস করে দেবেন। আপনি আপনার স্থানে ফিরে যান। আমি আপনাকে মুয়াবিয়ার (রা) অধীনতা থেকে পৃথক করে দিলাম।”
খলিফা উমর (রা) অনুরূপভাবে গভর্নর মুয়াবিয়াকেও লিখে পাঠালেন।
📄 হাদীসের প্রতি ভালোবাসা
জাবির ইবন আবদুল্লাহ নবুয়তের ত্রয়োদশ বছরে যে ৭৫ জন মদিনাবাসী মিনার এক গোপন অবস্থানে মহানবীর হাতে শপথ নিয়েছিলেন তাঁদেরই একজন।
তিনি মহানবীর সাথে প্রধান সব যুদ্ধ ও অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন।
মহানবী (সা)-এর মৃত্যুর পর শোকের দুর্বহ ভার নিয়ে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন কুরআন পাঠ এবং কুরআন ও হাদীস শিক্ষাদান কাজে।
মহানবীর একটা হাদীসের মূল্য তাঁর কাছে ছিল তাঁর সবকিছুর চেয়ে বেশী মূল্যবান।
একবার তিনি খবর পেলেন 'কিসাস' বা বদলা সম্পর্কিত একটি হাদীস রয়েছে আবদুল্লাহ বিন আনিসের কাছে এবং তিনি বাস করছেন সিরিয়ায়।
খবর পেয়েই জাবির ইবনে আবদুল্লাহ সিরিয়ায় যাওয়ার জন্যে একটি উট কিনলেন এবং সিরিয়া যাত্রা করলেন সেই হাদীসটি শোনার জন্যে।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তিনি পৌঁছলেন সিরিয়ায়। আবদুল্লাহ ইবনে আনিসের বাড়িতে। আব্দুল্লাহ ইবনে আনিসের কাছে খবর পাঠালেন যে, মদীনা থেকে জাবির ইবনে আবদুল্লাহ তাঁর সাথে দেখা করতে এসেছে।
নাম শুনেই চমকে উঠলেন আবদুল্লাহ বিন আনিস। বললেন, কোন জাবির, জাবির ইবনে আবদুল্লাহ?
বলেই তড়িঘড়ি এমন অবস্থার মধ্যে বাড়ী থেকে বের হলেন যে, তার গা থেকে চাদর পড়ে গিয়ে পায়ের তলায় মথিত হতে লাগল। কিন্তু সেদিকে কোন ভ্রূক্ষেপ নেই।
তিনি গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন আবদুল্লাহ ইবনে জাবিরকে অপরিসীম শ্রদ্ধা ও ভক্তি নিয়ে।
জাবির বললেন, আমি শুনলাম আপনার কাছে 'কিসাস' সংক্রান্ত একটা হাদীস রয়েছে। আমি এসেছি সে হাদীস শুনতে। বলুন সে হাদীসটি।
আবদুল্লাহ বিন আনিস বর্ণনা করলেন, “আমি রাসূল (সা) থেকে শুনেছি, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা বান্দাদেরকে একত্রিত করবেন। সবাই উলংগ ও খাতনাবিহীন অবস্থায় থাকবে এবং বুহম হবে ('বুহম' অর্থ কারও কিছুই থাকবে না)। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা ডেকে বলবেন, 'আমি বদলা দেব, আমিই মালিক। আমি যতক্ষণ পর্যন্ত প্রত্যেক জান্নাতীকে প্রত্যেক দোজখী থেকে এবং প্রত্যেক দোজখী থেকে প্রত্যেক জান্নাতীকে হক আদায় করে না দেব, ততক্ষণ পর্যন্ত কাউকে জান্নাতে অথবা দোজখে নিক্ষেপ করবো না। এমনকি একটি সাধারণ থাপ্পড়ের কিসাস বা বদলাও আদায় করে দেব। এই বদলা কিভাবে দেয়া হবে আমরা তো সবাই তখন শূন্য হাতে থাকব? এই প্রশ্নের জবাবে রাসূল (সা) বললেন, “নেকি ও বদী দিয়ে ফায়সালা করা হবে।”
এই হাদীস শুনে নেয়ার পর জাবির ইবনে আবদুল্লাহ আবার মদীনা যাত্রা করলেন।
📄 তাকদীরের উপর বিশ্বাস রাখা
মদীনায় নিজ বাড়ীতে মৃত্যুর মুখে উবাদাহ বিন সামিত।
অসহনীয় রোগ-যন্ত্রণার মধ্যে দর্শনার্থীদের সান্ত্বনা দিয়ে তিনি বলছেন, "আল্লাহর ফজিলতে ভাল আছি।"
শেষ মুহূর্ত যখন আসন্ন তখন উবাদাহ (রা) তাঁর গোলাম-খাদেম প্রতিবেশী এবং যাদের সাথে সব সময় উঠা-বসা করেছেন সেই পরিচিতজনদের তিনি ডেকে আনতে বললেন।
সবাইকে ডেকে আনা হলো।
সবাই উপস্থিত হলে তাদের সবাইকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, "সম্ভবত এটাই আমার শেষ দিন এবং আজকের রাত আমার আখিরাতের প্রথম রাত হতে পারে। তোমাদের সাথে আমি যদি আমার মুখ দিয়ে অথবা হাত দিয়ে কঠিন আচরণ করে থাকি, তাহলে আমার প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাওয়ার আগেই একে একে তার প্রতিশোধ নিয়ে নাও এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ আমার থেকে প্রতিশোধ নেবেন।"
লোকেরা আরজ করল, "আপনি আমাদের পিতৃতুল্য এবং আমাদেরকে আদব ও শিষ্টাচার শিখিয়েছেন।”
উবাদাহ (রা) বললেন, "তোমরা কি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছ?”
সবাই বলল, "হ্যাঁ, ক্ষমা করে দিয়েছি।"
উবাদাহ (রা) বললেন, “হে আমার আল্লাহ, সাক্ষী থেকো।”
অন্তিম মুহূর্তে তাঁর ছেলে এসে আরজ করল, "আমাকে কিছু ওসিয়ত করুন।” পুত্রকে শেষ-উপদেশে বললেন তিনি, "তাকদীরের উপর ইয়াকিন রেখো। তা না হলে ঈমানের জন্যে উপযুক্ত হতে পারবে না।"
📄 মুনাফিক সর্দারের ঈমানদার পুত্র
বনি মুসতালিকের যুদ্ধ শেষ। মহানবী (সা)-এর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী মদীনায় ফিরছে।
কি এক ঘটনায় একজন মুহাজিরের সাথে একজন আনসারের বিরোধ বাধল। বলা হলো, একজন মুহাজির লাথি মেরেছে একজন আনসারকে। এ নিয়ে পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যে একটা শোরগোল সৃষ্টি হলো। মহানবী (সা)-এর কানে এলো বিষয়টা। তিনি তাদের ডেকে বললেন, 'এ তো জাহেলী যুগের আওয়াজের মত শোনাচ্ছে। এসব অশোভন কথাবার্তা পরিত্যাগ কর।' বিষয়টা এখানেই মিটে গেল।
মুসলিম বাহিনীর সাথে মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ছিল। তার ছেলেও ছিল। সে মুনাফিক নয়।
ঘটনাটা মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ বিন উবাই-এর কানেও গেল। মুহাজির ও আনসার মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টির একটা বড় সুযোগ বলে একে সে মনে করল।
সে নেচে উঠল। বলল, কি! একজন মুহাজির এই কাজ করেছে? ঠিক আছে মদীনায় একবার পৌঁছতে দাও। সম্মানী লোকেরা মদীনাবাসী নীচু সম্প্রদায়ের (মক্কাবাসী) লোকদের মদীনা থেকে বের করে দেবে।' আবদুল্লাহ বিন উবাই-এর ষড়যন্ত্রের কথা উমর (রা)-এর কানে গেল। উমর (রা) মহানবী (সা)-এর কাছে গিয়ে আরজ করলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি অনুমতি দিলে ঐ মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দিতে পারি।" মহানবী (সা) বললেন, 'না। মানুষ বলবে যে, আমি নিজের লোকদের হত্যা করে থাকি।'
মহানবীর কথায় উমর (রা) চুপ করে গেলেন।
আবদুল্লাহ বিন উবাই-এর ছেলে কিন্তু চুপ করে থাকলেন না। পিতার ঔদ্ধত্যে ক্রুদ্ধ আবদুল্লাহ (রা) তার পিতাকে গিয়ে বললেন, "আল্লাহর কসম, আমি আপনাকে মদীনা প্রবেশ করতে দেব না, যে পর্যন্ত না আপনি নিজ মুখে সাক্ষ্য দেন যে, আপনি নীচ লোক, আর রাসূলুল্লাহ সম্মানিত।” অবস্থা বেগতিক দেখে মুনাফিক সর্দার আবদুল্লাহ বিন উবাই পুত্র যেভাবে বলেছে সেইভাবে সাক্ষ্য দিল।