📄 একমাত্র আল্লাহই আমাদের প্রাণের মালিক
মক্কা বিজয়ের পর মহানবী (সা) মক্কাবাসীর জন্যে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন।
এরপরও কিছু পাষণ্ড প্রকৃতির মানুষ মহানবী (সা)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র আঁটলো। এমনই এক মদ্যপ ও পাষণ্ড ছিল ফুজালা ইবনে উসার। অপরাধীদের আড্ডাখানা, মদের দোকান আর বেশ্যালয়ই ছিল তার স্থান।
জাত-অপরাধী ফুজালা মহানবী (সা)-কে হত্যা করার জন্যে কা'বায় পৌছে দেখলো, মহানবী (সা) নিবিষ্ট মনে তাওয়াফ করছেন, আল্লাহর ধ্যান ছাড়া কোনদিকে তাঁর দৃষ্টি নেই।
ফুজালা একে তার জন্যে এক মহাসুযোগ বলে মনে করলো। অস্ত্রটা কাপড়ের আড়ালে রেখে অত্যন্ত সন্তর্পণে মহানবীর (সা) দিকে এগুলো ফুজালা।
ফুজালা তখন মহানবীর একেবারে কাছে পৌঁছে গেছে। মহানবী (সা) ফুজালার দিকে তাকালেন। বললেন, 'কে, ফুজালা নাকি?'
মহানবী (সা) বললেন, 'কি মতলব আঁটছো?' অন্তরটা কেঁপে উঠলো ফুজালার। বললো সে, 'জ্বি, কিছু না। এই আল্লাহ আল্লাহ করছি।'
মহানবী (সা) ফুজালার চোর ধরা পড়ার মতো দুর্দশাকর অবস্থা দেখে হাসি সম্বরণ করতে পারলেন না। মধুর হেসে তিনি বললেন, 'বেশ কথা, ফুজালা। সেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো।'
ফুজালা বুঝলো তার গোপন অভিসন্ধি মহানবীর কাছে ধরা পড়ে গেছে। ফুজালার অবস্থা তখন অবর্ণনীয়। ভয়, লজ্জা, অনুতাপে অভিভূত ও বিমূঢ় হয়ে পড়লো সে।
বুকের ভেতর তখন তার অসহ্য তোলপাড়। বিমূঢ়, নিশ্চল ফুজালার বুকে মহানবী (সা) তাঁর ডান হাত রাখলেন।
ফুজালা স্বয়ং বলেছেন, 'মহানবীর হাতের স্পর্শ পাওয়ার সাথে সাথে আমার মনের সমস্ত চাঞ্চল্য ও সকল অশান্তি দূর হয়ে গেলো। আমি এক স্বর্গীয় শান্তি ও অনির্বচনীয় তৃপ্তি লাভ করলাম।' ফুজালা হয়ে গেলেন নতুন মানুষ।
মহানবীর স্পর্শে ধন্য পবিত্র দেহ ও শুদ্ধ হৃদয় নিয়ে ফুজালা ছুটলেন তার বাড়ীর দিকে।
পথে দেখা হলো ফুজালার বড় আদরের, বড় গৌরবের রক্ষিতা-সুন্দরীর সাথে। রক্ষিতা সুন্দরী বললো, 'প্রাণেশ্বর ফুজালা, এভাবে কোথায় ছুটছো? এসো আমার কাছে!'
ফুজালা মুহূর্তের জন্যে না দাঁড়িয়ে রক্ষিতার দিকে দ্বিতীয়বার না তাকিয়ে ছুটতে ছুটতে বলতে লাগলেন, 'একমাত্র আল্লাহই আমাদের প্রাণের মালিক, তাকেই প্রেম করো, শান্তি পাবে। আর নয়, আল্লাহ্ ও ইসলাম আমাকে তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।'
📄 বিশ্বজয়ী মানবতা
মক্কার আবু জাহল ইসলামের প্রধানতম বৈরী ছিলো। বদর যুদ্ধে সে নিহত না হওয়া পর্যন্ত মহানবী (সা) ও ইসলামের বিরুদ্ধে অবিরাম শত্রুতা করে গেছে। আবু জালের পুত্র ইকরামাও তার পিতার মতই ইসলামের বৈরী ছিলো। বিভিন্ন যুদ্ধে তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে খুবই সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। এমন কি মহানবী (সা)-এর মক্কা প্রবেশের সময় যখন কুরাইশদের অস্ত্র হাতে না নেয়ার কথা, তখন ইকরামার নেতৃত্বেই কুরাইশদের একটা দল হত্যা করে দু'জন মুসলিম সৈনিককে।
সেই ইকরামা মক্কা বিজয়ের পর ইসলামের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করলেন।
মক্কা বিজয়ের পর তখনও মহানবী (সা) মক্কায়। একদিন ইকরামা ইবনে আবু জাহল মহানবীর কাছে এলেন। বললেন অভিমান-ক্ষুব্ধ কণ্ঠে, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, মুসলমানরা আমার পিতাকে গালাগালি দিয়ে থাকে।'
খবরটা মহানবী (সা)-কে খুবই বেদনা দিল। তিনি মুসলমানদের এক সমাবেশে সকলকে সম্বোধন করে বললেন, মৃতদের গালাগালি দিয়ে জীবিতদের যন্ত্রণা দিও না। মৃতরা তাদের কর্মফল নিয়ে চলে গেছে। তাদের গালি দেয়া অনুচিত। উচিত মৃত ব্যক্তিদের জীবনের মন্দ দিকটা বাদ দিয়ে কেবল তাদের ভাল দিকটা আলোচনা করা।
ইসলামের এই সভ্যতা, শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে ইসলামের এই মানবতা এবং ইসলামের এই সৌন্দর্যই মানুষের হৃদয় জয়ের মাধ্যমে বিশ্বজয় করেছিল।
📄 কত মূল্য মানুষের!
মক্কার আশে-পাশের অনেক বেদুইন গোত্র আগে থেকেই কুরাইশদের বাড়াবাড়ির কারণে তাদের উপর বিক্ষুব্ধ ছিল এবং সহানুভূতিশীল হয়ে উঠেছিল মুসলমানদের প্রতি। মুসলমানদের মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে কুরাইশদের দর্প চূর্ণ হবার পর এই বেদুইন গোত্রগুলো ইসলামের আরও কাছাকাছি হয়ে পড়েছিল।
মক্কা বিজয় পরবর্তী তাৎক্ষণিক কাজগুলো সম্পন্ন হবার পর মহানবী (সা) তার সাহাবীদের ছোট ছোট দলে বিভক্ত করে পাঠালেন বেদুইন গোত্রগুলোর কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাবার জন্যে। অস্ত্র ব্যবহার ও যুদ্ধ করার অনুমতি এই দলগুলোর প্রতি ছিল না।
হঠাৎ মহানবী (সা)-এর কাছে খবর এল যে, বনি যাজিমা গোত্রের কয়েকজনকে খালিদ বিন ওয়ালিদের দল হত্যা করে ফেলেছে।
এই খবর শোনামাত্র মহানবী (সা) ব্যাকুলভাবে উচ্চস্বরে বলে উঠলেন, 'হে আল্লাহ, তুমি জান, খালিদের এই কাজের সাথে আমার বিন্দুমাত্রও সম্পর্ক নেই।' সংগে সংগেই মহানবী (সা) বিষয়টার তদন্ত করলেন। তদন্তে পরিষ্কার হলো যে, আবদুল্লাহ ইবনে হুজাইফার বলার দোষে হোক, অথবা নিজের শুনার ভুলের কারণে হোক, খালিদ একটা ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে ঐ অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়েছিলেন।
বনি যাজিমার লোকরাও জেনে আনন্দিত হলো যে, খালিদের কাজের সাথে মহানবীর (সা) কোন প্রকার সম্বন্ধ বা সহানুভূতি নেই। তারা আরও বুঝতে পারলো যে, খালিদ ভুলক্রমেই যুদ্ধাদেশ প্রদান করেছিলেন।
এসব জেনে বনি যাজিমার লোকরা আশ্বস্ত হলো এবং তাদের মনের বিরূপতাও মিটে গেল।
ওদিকে তদন্ত শেষে মহানবী (সা) হযরত আলী (রা)-কে প্রচুর অর্থসহ বনি যাজিমার কাছে প্রেরণ করলেন তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্যে।
বনি যাজিমার লোকেরা দারুণ বিস্মিত হলো ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্যে হযরত আলীকে আসতে দেখে। যেহেতু হত্যাকাণ্ড ইচ্ছাকৃত নয়, ভুলক্রমে তা সংঘটিত হয়েছে, তাই ক্ষতিপূরণ নেবার কোন চিন্তাও তাদের মনে উদয় হয়নি।
হযরত আলী (রা) মহানবী (সা)-এর প্রতিনিধি হিসেবে বনি যাজিমার ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করলেন। নিয়ম অনুযায়ী রক্তপণ বাবদ যে অর্থ বনি যাজিমা'র প্রাপ্য হতে পারে, তার চেয়ে অনেক বেশী অর্থ হযরত আলী তাদের দিলেন।
বনি যাজিমা'র কাছে এ এক অকল্পনীয় দৃশ্য, অভাবনীয় এক ঘটনা। যারা আজ বিজয়ী সেই শক্তি তাদের মত এক ক্ষুদ্র গোত্রের কাছে অপরাধ না হওয়া সত্ত্বেও অপরাধ স্বীকার করে এভাবে তার ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে।
বনি যাজিমা পল্লীতে তখন জয়-জয়কার পড়ে গেল মহানবী (সা) এবং ইসলামের নামে।
ওদিকে মহানবীর কাছে হযরত আলী যখন ফিরে গেলেন ক্ষতিপূরণ শেষে এবং বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, ওদের যা প্রাপ্য তার চেয়ে ওদের বেশী দিয়ে ফেলেছি। মহানবী আনন্দিত কণ্ঠে বললেন, 'ভাল করেছ, বেশ করেছ।'
তারপর মহানবী (সা) তার দুই হাত উপরে তুলে উচ্চকণ্ঠে আবার বললেন, 'আল্লাহ, তুমি জান। খালিদের কাজের সাথে আমার কোন সম্বন্ধ নেই, আমি নিরপরাধ।'
📄 বন্দী মুক্তির এমন দৃশ্য দুনিয়া আর দেখেনি
হুনাইন যুদ্ধে হাওয়াজিনরা তাদের সমুদয় ধন-সম্পদ এবং স্ত্রী-পুত্র পরিজন ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল।
এই 'মালে গণিমত' ও বন্দীদের উপর ছিল যুদ্ধে যোগদানকারী প্রতিটি মুসলমানের হক। সর্বসম্মত যুদ্ধ-আইন অনুসারে তাঁদের মধ্যেই এসব বণ্টন করে দেবার কথা। কিন্তু মহানবী (সা) ধন-সম্পদ ও যুদ্ধবন্দী সবকিছুই মক্কার জি'রানা নামক স্থানে সযত্নে রক্ষা করলেন। তার ইচ্ছা ছিল সর্বস্বান্ত হয়ে পড়া হাওয়াজিনরা এসে এসব ফিরে পাবার প্রার্থনা করলে তাদের এসব ফেরত দেবার ব্যবস্থা করবেন।
কিন্তু সপ্তাহকাল অপেক্ষার পরেও যখন তারা এল না, তখন মহানবী (সা) ধন-সম্পদগুলো মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন।
দু'সপ্তাহ পরে হাওয়াজিনরা এল।
হাওয়াজিনদের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা মহানবীর (সা)-এর কাছে উপস্থিত হয়ে কাতর কণ্ঠে আরজ করল, "মুহাম্মাদ! আজ আমরা আপনার করুণা ভিক্ষা করতে এসেছি। আমাদের অপরাধ ও অত্যাচারের দিকে আপনি তাকাবেন না। হে আরবের সাধু, নিজ গুণে আমাদের প্রতি দয়া করুন।"
মহানবী (সা) দয়ার সাগর। মানুষের দুঃখ-বেদনা মোচন করে আলোর পথে নেয়ার জন্যেই তো তাঁর আগমন।
হাওয়াজিনদের করুণ অবস্থায় অভিভূত হয়ে পড়লেন মহানবী (সা)। কিন্তু কি করবেন তিনি! হাওয়াজিনরা দেরী করায় তাদের যুদ্ধক্ষেত্রের ধন-সম্পদ সমুদয় বণ্টন হয়ে গেছে। বাকি আছে ছয় হাজার যুদ্ধবন্দী নর-নারী। কিন্তু মুক্তিপণ ছাড়া তাদের ছেড়ে দিতে কেউ রাজী হবে না। সবদিক ভেবে মহানবী (সা) ওদ্রের বললেন, “তোমাদের জন্যে অনেক অপেক্ষা করেছি। ধন-সম্পদ ফিরে পাবার কোন উপায় তোমাদের আর নেই। বন্দীদের মুক্তির ব্যাপারটা নিয়ে আমি ভাবছি। আমার ও আমার স্বগোত্রীয়দের প্রাপ্য বন্দীদের বিনাপণে মুক্তি দেবার ভার আমি নিতে পারি। অন্যান্য মুসলমান ও অমুসলমানদের অংশ সম্বন্ধে আমি এখন জোর করে কোন কথা বলতে পারছি না। তোমরা নামাযের সময় এসো এবং নামায শেষে সকলের কাছে প্রার্থনা জানাও। আমি যা বলার তখন বলব।"
নামাযের সময়।
নামাজ শেষ হতেই হাওয়াজিন প্রতিনিধিরা উঠে দাঁড়িয়ে সকলের সামনে কাতর কণ্ঠে তাদের বন্দীদের মুক্তি প্রার্থনা করল।
হাওয়াজিনদের কথা শেষ হবার সাথে সাথে মহানবী (সা) উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, "তোমাদের এই ভাইয়েরা অনুতপ্ত হৃদয়ে তোমাদের কাছে তাদের বন্দী স্বজনদের মুক্তি প্রার্থনা করছে। আমি এ ব্যাপারে তোমাদের সকলের মতামত জানতে চাই। তবে তার আগে আমার মতটা তোমাদের জানিয়ে দিচ্ছি যে, আব্দুল মুত্তালেব গোত্রের প্রাপ্য সমস্ত বন্দীকেই আমি বিনা পণে মুক্তি দিয়েছি।"
মহানবীর (সা) মত জানার পর একে একে মুহাজির ও আনসার দলপতিরা আনন্দের সাথে তাঁদের নিজ নিজ গোত্রের প্রাপ্য অংশের দাবী পরিত্যাগ করলেন। দু'একজন গোত্রপতি শত্রু হাওয়াজিনদের বন্দীদের বিনাপণে মুক্তি দিতে অমত প্রকাশ করলেন। তাদের কোন প্রকার চাপ না দিয়ে মহানবী (সা) তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, "তোমাদের প্রাপ্য ক্ষতি পূরণের জন্যে আমি দায়ী রইলাম। প্রথম সুযোগেই এই ঋণ আমি পরিশোধ করে দেব।"
হাওয়াজিনদের ছয় হাজার বন্দীর সবাই মুক্তি পেল। এক কপর্দক মুক্তিপণও হাওয়াজিনদের উপর চাপানো হলো না।
বিদায় দেবার সময় মহানবী (সা) ছয় হাজার বন্দীর সকলকে নতুন কাপড় পরিয়ে দিলেন।
বন্দী মুক্তির এমন দৃশ্য দুনিয়া আর কখনও দেখেনি, দেখবেও না কোনদিন।