📘 আমরা সেই জাতি > 📄 সীমাহীন বৈরিতার সীমিত শাস্তি

📄 সীমাহীন বৈরিতার সীমিত শাস্তি


মদীনায় হিজরতের পর মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইহুদীরা বার বার বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। নানারকম ষড়যন্ত্র তারা অবিরাম করে গেছে। খন্দক যুদ্ধের আয়োজন প্রকৃতপক্ষে তারাই করেছিল। আরবের দশ হাজার সৈন্য তারা ডেকে এনেছিল মুসলমানদের ধ্বংসের জন্যেই। সে আয়োজন যখন ব্যর্থ হলো, তখন খায়বরকে কেন্দ্র করে অন্যান্য গোত্রের সাহায্য নিয়ে নিজেরাই মদীনা থেকে মুসলমানদের মুছে ফেলার আয়োজন করেছিল।
কিন্তু খায়বর যুদ্ধেও তারা পরাজিত হলো।
জাগতিক নিয়মে এবং তদানীন্তন আরবের প্রচলিত নিয়মে উচিত ছিল ইহুদীদের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা, তাদের সক্ষম পুরুষদের হত্যা করা এবং অন্যান্যদের দাসে পরিণত করা।
কিন্তু মহানবী (সা) ইহুদীদের সাথে যে ব্যবহার করলেন তখন পর্যন্ত জগতের ইতিহাসে তার কোন তুলনা ছিল না।
যুদ্ধ শেষে মহানবী (সা) ঘোষণা করলেন: (ক) ইহুদীরা আগের মতই স্বাধীনভাবেই ধর্ম-কর্ম পালন করতে পারবে। কেউ কোন প্রকার বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারবে না। (খ) তাদেরকে কোন যাকাত, ওশর দিতে হবে না, যা মুসলমানরা দিয়ে থাকে। (গ) তাদেরকে মুসলমানদের পক্ষে যুদ্ধে যেতে বাধ্য করা হবে না। (ঘ) তাদের বাড়িঘর, জমিজমা পূর্বের ন্যায় তাদেরই অধিকারে থাকবে। (ঙ) তাদের কতকগুলো দুর্গের স্বর্ণ ও রৌপ্য স্পর্শ করা হবে না। (চ) তবে দেশের সমস্ত জমির মালিকানা মদীনা রাষ্ট্রের অধীন থাকবে। জনগণ জমির শস্যের একটা ভাগ মদীনার সরকারকে দেবে এবং (ছ) ভাগ আগের মতই অর্ধাংশ হবে।
এই ঘোষণা যখন হলো, তখন ইহুদীদেরই চোখ বিস্ময়ে বিস্ফারিত হল। তাদের সীমাহীন বৈরিতার বিনিময়ে এই বদান্যতা পাবে, কল্পনাও করতে পারেনি তারা।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 বিশ্বের পরাজয় বিশ্বাসের জয়

📄 বিশ্বের পরাজয় বিশ্বাসের জয়


খায়বর যুদ্ধ তখন শেষ।
মহানবী (সা) তখনও খায়বরে।
ভেতরে ভেতরে ইহুদীরা পাগল হয়ে গেছে কিছু করার জন্যে।
ইহুদীদের একটা গ্রুপ সিদ্ধান্ত নিল মহানবী (সা)-কে হত্যা করার। ঠিক হলো বিষ খাওয়ানোই সবচেয়ে নিরাপদ।
পরিকল্পনা অনুসারে ছাগল জবাই করে রান্না করা গোশতে তীব্র বিষ মেশানো হলো, যার ফোঁটা পরিমাণ গলাধঃকরণ করলে সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মৃত্যু ঘটবে। মহানবী (সা) ছাগলের রানের গোশত বেশী পছন্দ করতেন। সেই রানের গোশতে অধিক পরিমাণে বিষ মেশানো হলো।
যয়নাব নামে সম্ভ্রান্ত বংশীয়া ইহুদী মেয়ে আরও কয়েকজনকে সাথে নিয়ে মহানবী (সা)-এর কাছে এসে বলল, 'আপনার জন্যে এই সামান্য হাদিয়া এনেছি। আপনি অনুগ্রহ করে গ্রহণ করবেন কি?'
মহানবী (সা) ধন্যবাদের সাথে হাদিয়া গ্রহণ করলেন এবং উপস্থিত সাহাবাদের সাথে নিয়ে খেতে বসলেন।
তিনি এক টুকরো গোশত খেয়েই সাহাবাদের উদ্দেশ্যে দ্রুত বললেন, 'গোশতে বিষ মোশানো আছে, খেওনা কেউ।'
কিন্তু বিশর নামের একজন সাহাবী তখন এক টুকরার কিছু অংশ গিলে ফেলেছিলেন।
সংগে সংগেই তাঁর দেহে বিষক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। দেহ তার বিবর্ণ হয়ে যেতে লাগল। বিষের যন্ত্রণায় তিনি কাতর হয়ে পড়লেন।
মহানবী (সা) যয়নাব ও তার সাথীদের ডেকে তাদের কৃত অপরাধের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন।
যয়নাব উদ্যত কণ্ঠেই বলল, 'আপনাকে হত্যা করার জন্যে এটা করেছি।' আর তার সাথী ইহুদীরা ধূর্ততার সাথে বলল, 'আমরা পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম, তুমি যদি ভণ্ড হও, তাহলে বিষ তোমার জিহ্বা স্পর্শ করার সাথে সাথে তোমার মৃত্যু ঘটবে। আর যদি সত্যিই নবী হও, তাহলে বিষ তোমার কিছু করতে পারবে না।'
চারদিকে দাঁড়ানো সাহাবীরা ইহুদীদের এই ষড়যন্ত্রে ক্রোধে তখন আগুন। তারা বলল, 'এদের হত্যা করার অনুমতি কি আমরা পাব না?'
মহানবী (সা) তাদেরকে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিলেন। তাঁর নিজের উপর অত্যাচারের প্রতিশোধ কখনও তিনি নেন না, এ জন্যে কাউকে কোন দণ্ডও কখনও তিনি দেন না।
যয়নাব উদ্যত কণ্ঠে উত্তর দিয়েছিল ঠিকই। কিন্তু শীঘ্রই তার ভাবান্তর ঘটতে লাগল। সে মনে করেছিল তখনই তাদের গর্দান চলে যাবে, হত্যা করা হবে তাদের সংগে সংগেই। সাহাবাদের প্রতি ধৈর্য ধারণের উপদেশ, প্রতিশোধ না নেবার মহানবীর কথায় সে বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে পড়ল। দ্বিতীয়ত, সাহাবী বিশরের চেয়ে অনেক বেশী গোশত মহানবী (সা) খেয়েছেন। কিন্তু বিশর যেখানে মুমূর্ষু, সেখানে মহানবী সুস্থ। তাঁর ঠোঁট দু'টি বিবর্ণ হওয়া ছাড়া বিষের আর কোন প্রতিক্রিয়া তাঁর দেহে নেই। এই চিন্তা যয়নাবের মনকে ওলট-পালট করে দিল।
সর্বোপরি যয়নাব যখন দেখল, তাদের হত্যা তো দূরে গ্রেফতারও করা হলো না, তখন যয়নাব আর স্থির থাকতে পারলো না। মুহূর্তে তার হৃদয় থেকে সব বিদ্বেষ কোথায় যেন দূর হয়ে গেল। তার জায়গায় তার হৃদয়ে নামল মহানবীর প্রতি ভক্তি, মমতার অঢেল প্রস্রবণ। সে লুটিয়ে পড়ল মহানবীর পায়ে এবং কালেমায়ে তাইয়্যেবা পাঠ করে ইসলামে দাখিল হয়ে গেল।
হত্যা করতে এসে নতুন জীবন পেল যয়নাব, নতুন মানুষ হয়ে গেল সে।
কিন্তু তার সৌভাগ্যের জীবন স্থায়ী হলো না। বিষক্রিয়ার ফলে তিনদিন পরে সাহাবী বিশর-এর মৃত্যু ঘটলে হত্যার অপরাধে যয়নাব প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হলেন。

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 স্বজনের চেয়ে ওয়াদা বড়

📄 স্বজনের চেয়ে ওয়াদা বড়


হুদায়বিয়া সন্ধির পর দেশের ভেতরে-বাইরে ইসলামের দ্রুত বিস্তারে দিশেহারা হয়ে পড়ল কুরাইশ এবং আরবের প্রধান পৌত্তলিক গোত্রগুলো।
মক্কার কুরাইশ, তায়েফের সাকিফ এবং হোনায়েনের হাওয়াজেন ছিল আরবের প্রধান পৌত্তলিক গোত্র। তারা একযোগে চেষ্টা করে সমগ্র দক্ষিণ আরবের সব পৌত্তলিক গোত্রকে সংঘবদ্ধ করল মহানবীর মদীনার উপর শেষ আঘাত হানার জন্যে।
অসুবিধাটা হয়ে দাঁড়াল মক্কার পার্শ্ববর্তী খোজাআ গোত্র। গোত্রটি মুসলমানদের মিত্র এবং আশ্রিত। হুদায়বিয়ার সন্ধিতে একটা শর্ত ছিল যে আরবের অন্যান্য গোত্র তাদের ইচ্ছা অনুসারে কুরাইশ অথবা মুসলমান যে কোন পক্ষের মিত্র হতে পারে। সেই অনুসারে খোজাআর চিরশত্রু বনি বকর কুরাইশদের সাথে যোগ দিলে বনি খোজাআ মুসলমানদের সাথে সন্ধি করে। তাছাড়া এই খোজাআ পূর্ব থেকে বরাবরই মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল।
কুরাইশ, হাওয়াজেন ও সাকিফ গোত্রত্রয় পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিল, মুখের সামনে থেকে খোজাআদের সরাতে হবে, নির্মূল করতে হবে। এতে হবে দুইটা কাজ। এক, গোটা দক্ষিণ আরব একমুখী হবে এবং হুদায়বিয়া সন্ধি ভঙ্গ হওয়ার ফলে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধের সুযোগ পাওয়া যাবে।
বনি খোজাআদের প্রতিবেশী এবং চিরশত্রু বনি বকর গোত্রকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করল কুরাইশরা এবং উত্তেজিত করে তুলল তাদেরকে খোজাআদের বিরুদ্ধে।
একদিন রাতে ঘুমন্ত খোজাআ গোত্রের উপর আপতিত হলো বনি বকরের লোকেরা। তাদের সাহায্য করতে এল কুরাইশদেরও কিছু লোক।
সেদিন রাতে অমানুষিক হত্যাকাণ্ড অনুষ্ঠিত হলো খোজাআ পল্লীতে। বাঁচার জন্যে কিছু পুরুষ-নারী-শিশু আশ্রয় নিয়েছিল কা'বা ঘরে, যেখানে সকল মানুষ অবধ্য। কিন্তু কা'বায় আশ্রয় নিয়েও বাঁচল না তারা। আক্রমণকারীদের একজন চিৎকার করে বলল, আজ আর ঈশ্বর বলে কেউ নেই, আজ মনের সাধ মিটিয়ে শত্রু বিনাশ কর।
বনি খোজাআর এই মর্মান্তিক খবর মদীনায় গিয়ে পৌঁছল। শোকাভিভূত হয়ে পড়লেন মহানবী। একদিকে খোজাআদের হত্যাকাণ্ড, অন্যদিকে কুরাইশদের জঘন্য অপরাধ দুই-ই তাকে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করল। খোজাআরা তার মিত্র, আশ্রিত আর কুরাইশরা তার স্বজন।
কিন্তু সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন মহানবী (সা)। কুরাইশদেরকে তাদের সন্ধি ভঙ্গ ও হত্যাকাণ্ডের শাস্তি অবশ্যই ভোগ করতে হবে।
তিনি কুরাইশদেরকে একটা সুযোগ দেয়ার জন্য দূত পাঠালেন মক্কায়। তিনি বলে পাঠালেন, অর্থ দ্বারা অন্যায় হত্যাকাণ্ডের ক্ষতিপূরণ করতে হবে, অথবা বনি বকর গোত্রের সাথে মিত্রতা পরিত্যাগ করতে হবে। কোন একটিকে তাঁদের গ্রহণ করতে হবে।
কুরাইশরা সন্ধি ভঙ্গই চাচ্ছিলো। সুতরাং মহানবীর শর্ত পাবার সাথে সাথেই তারা হুদায়বিয়ার সন্ধি ভেঙ্গে গেছে বলে ঘোষণা দিলো।
কুরাইশদের আচরণ মহানবী (সা)-কে খুবই ব্যথিত করলো। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি মক্কা অভিযানের সিদ্ধান্ত নিলেন।
সন্ধি বাতিল করার পর কুরাইশরা বুঝতে পারলো ঝোঁকের মাথায় তারা যে কাজ করেছে, তা ঠিক হয়নি। স্বয়ং আবু সুফিয়ান ছুটলেন মদীনায় বুঝিয়ে মহানবীকে নিবৃত্ত করার জন্যে। আবু সুফিয়ান আবু বকর (রা), উমর (রা), আলী (রা) সহ সকলের দ্বারস্থ হলেন সুপারিশ করার জন্য যে, হুদায়বিয়ার সন্ধি ঠিক আছে, ভেঙ্গে যায়নি। কিন্তু মহানবী কোন কথার প্রতিই কর্ণপাত করলেন না। স্বজনের চেয়ে চুক্তি বড়, ওয়াদা বড়, খোজাআদের প্রতি কৃত অন্যায়ের অবশ্যই প্রতিবিধান করতে হবে।
৮ম হিজরী ১৮ই রমযান দশ হাজার মুসলিম মুজাহিদ নিয়ে মক্কার পথে যাত্রা করলেন মহানবী (সা)।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 একমাত্র আল্লাহই আমাদের প্রাণের মালিক

📄 একমাত্র আল্লাহই আমাদের প্রাণের মালিক


মক্কা বিজয়ের পর মহানবী (সা) মক্কাবাসীর জন্যে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন।
এরপরও কিছু পাষণ্ড প্রকৃতির মানুষ মহানবী (সা)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র আঁটলো। এমনই এক মদ্যপ ও পাষণ্ড ছিল ফুজালা ইবনে উসার। অপরাধীদের আড্ডাখানা, মদের দোকান আর বেশ্যালয়ই ছিল তার স্থান।
জাত-অপরাধী ফুজালা মহানবী (সা)-কে হত্যা করার জন্যে কা'বায় পৌছে দেখলো, মহানবী (সা) নিবিষ্ট মনে তাওয়াফ করছেন, আল্লাহর ধ্যান ছাড়া কোনদিকে তাঁর দৃষ্টি নেই।
ফুজালা একে তার জন্যে এক মহাসুযোগ বলে মনে করলো। অস্ত্রটা কাপড়ের আড়ালে রেখে অত্যন্ত সন্তর্পণে মহানবীর (সা) দিকে এগুলো ফুজালা।
ফুজালা তখন মহানবীর একেবারে কাছে পৌঁছে গেছে। মহানবী (সা) ফুজালার দিকে তাকালেন। বললেন, 'কে, ফুজালা নাকি?'
মহানবী (সা) বললেন, 'কি মতলব আঁটছো?' অন্তরটা কেঁপে উঠলো ফুজালার। বললো সে, 'জ্বি, কিছু না। এই আল্লাহ আল্লাহ করছি।'
মহানবী (সা) ফুজালার চোর ধরা পড়ার মতো দুর্দশাকর অবস্থা দেখে হাসি সম্বরণ করতে পারলেন না। মধুর হেসে তিনি বললেন, 'বেশ কথা, ফুজালা। সেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো।'
ফুজালা বুঝলো তার গোপন অভিসন্ধি মহানবীর কাছে ধরা পড়ে গেছে। ফুজালার অবস্থা তখন অবর্ণনীয়। ভয়, লজ্জা, অনুতাপে অভিভূত ও বিমূঢ় হয়ে পড়লো সে।
বুকের ভেতর তখন তার অসহ্য তোলপাড়। বিমূঢ়, নিশ্চল ফুজালার বুকে মহানবী (সা) তাঁর ডান হাত রাখলেন।
ফুজালা স্বয়ং বলেছেন, 'মহানবীর হাতের স্পর্শ পাওয়ার সাথে সাথে আমার মনের সমস্ত চাঞ্চল্য ও সকল অশান্তি দূর হয়ে গেলো। আমি এক স্বর্গীয় শান্তি ও অনির্বচনীয় তৃপ্তি লাভ করলাম।' ফুজালা হয়ে গেলেন নতুন মানুষ।
মহানবীর স্পর্শে ধন্য পবিত্র দেহ ও শুদ্ধ হৃদয় নিয়ে ফুজালা ছুটলেন তার বাড়ীর দিকে।
পথে দেখা হলো ফুজালার বড় আদরের, বড় গৌরবের রক্ষিতা-সুন্দরীর সাথে। রক্ষিতা সুন্দরী বললো, 'প্রাণেশ্বর ফুজালা, এভাবে কোথায় ছুটছো? এসো আমার কাছে!'
ফুজালা মুহূর্তের জন্যে না দাঁড়িয়ে রক্ষিতার দিকে দ্বিতীয়বার না তাকিয়ে ছুটতে ছুটতে বলতে লাগলেন, 'একমাত্র আল্লাহই আমাদের প্রাণের মালিক, তাকেই প্রেম করো, শান্তি পাবে। আর নয়, আল্লাহ্ ও ইসলাম আমাকে তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।'

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00