📄 সাক্ষী হওয়ার যোগ্যতা
কাযী আবু জাফর বিন আব্দুল ওয়াহিদ হাশমী বর্ণনা করেছেন : একদিন কাযী আবু উমার রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে মদের পাত্র ভেঙ্গে প্রচুর মদ ছড়িয়ে থাকার দৃশ্য তাঁর চোখে পড়ল। একজন প্রত্যক্ষদর্শী যিনি কাযীর সাথে হাঁটছিলেন তিনি বললেন, 'এভাবে মদ ছড়িয়ে উৎকট গন্ধ ছড়ায়।' কাযী শুনলেন কিছুই বললেন না। কিন্তু একদিন ঐ লোক সাক্ষী হয়ে তাঁর আদালতে আসল কোন এক ব্যাপারে, কাযী তাঁর সাক্ষ্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলেন।
সাক্ষী লোকটি খুব ভীত হয়ে পড়ল। সে অন্য লোকের দ্বারা জানতে চাইল এর কারণ কি।
কারণ হিসাবে কাযী সে দিনের ঘটনার উল্লেখ করে বললেন, 'মদ ইসলামে হারাম। এর গন্ধ খারাপ কিংবা ভাল তা বিবেচ্য বিষয় নয়। কিন্তু সে এ বিষয়টাকে বিবেচ্য বিষয়ে পরিণত করেছে। সুতরাং হয় সে প্রবঞ্চনা করছে অথবা মিথ্যা বলছে কিংবা সে কিছুই বুঝে না অজ্ঞ। সুতরাং আমি তার সাক্ষ্য গ্রহণ করতে পারি না।'
📄 বসন্তের যিনি স্রষ্টা তার সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে দেখ
আল্লাহর ধ্যানে সর্বদা মশগুল থাকতেন তাপসী রাবেয়া বসরী। সকল সৃষ্টির স্রষ্টা, সব সৌন্দর্যের উৎস পরম প্রভু আল্লাহই ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান।
বসরায় সেদিন বসন্তের সকাল। বসরায় বিখ্যাত গোলাব বাগানগুলো ফুলসম্ভারে পূর্ণ। বাতাস সে ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে চারদিক মোহিত করছিল। পাখি গান গাইছিল। বুলবুলগুলো যেন ফিসফিস করে গোলাবের প্রতি তাদের ভালবাসা প্রকাশ করছিল। চারদিকটা বসন্তের নতুন প্রাণচাঞ্চল্যে নেচে উঠছিল।
পরিচারিকা তাপসী রাবেয়াকে গিয়ে বললো, বাইরে আসুন। দেখুন, বসন্তে প্রকৃতি কি অপূর্ব রূপ সম্ভারে সেজেছে। রাবেয়া তাঁর নামাযের ঘর থেকে বললেন, 'বাইরের দুনিয়া স্বতঃ পরিবর্তনশীল। রূপবৈচিত্র্য আর কি দেখব, তুমি আস এবং একবার বসন্তের যিনি স্রষ্টা তাঁর অকল্পনীয় সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে দেখ।'
পরম প্রভুর পরম সৌন্দর্য যাঁরা উপলব্ধি করেন, দুনিয়ার কোন সৌন্দর্যই তাঁদের কাছে সৌন্দর্য নয়।
📄 যেমন ছেলে তেমনি মা
খন্দক যুদ্ধের একটি মুহূর্ত।
মদীনার আনসার প্রধান সা'আদ ইবনে মা'আজ বিশেষ এক কাজে ব্যস্ত ছিলেন।
মনে তাঁর আনন্দ। পরিখা মুশরিক বাহিনীকে উচিত শিক্ষা দিয়েছে। ওদের তর্জন-গর্জন এখন সবই ওপাড়ে। সংখ্যার জোরে মুহূর্তে মুসলমানদের পিষে ফেলার পর্বতপ্রমাণ অহংকার নিয়ে ওরা ছুটে এসেছিল। দশহাত গভীর ৬ হাজার হাত দীর্ঘ পরিখায় ওদের অহংকার এসে থুবড়ে পড়েছে।
নিশ্চিন্ত মনে কাজ করছিলেন সা'আদ ইবনে মা'আজ।
হঠাৎ আগুনের মত ছড়িয়ে পড়া খবর সা'আদ ইবনে মা'আজও শুনলেন। মুশরিক বাহিনী সর্বাত্মক এক আক্রমণ পরিচালনা করেছে। ওরা পরিখা পার হওয়ার চেষ্টা করছে।
খবর শোনার সাথে সাথে সা'আদ উঠে দাঁড়ালেন। পাশ থেকে বর্শা তুলে নিয়ে ছুটলেন তিনি পরিখার পাড়ে।
তিনি ছুটছেন আর আবৃত্তি করছেন একটা কবিতার অংশ: একটু অপেক্ষা কর, মানুষ আসিতেছে, সময় পূর্ণ হইলে মরণ তো আসিবেই, সুতরাং মরণে আর ভয় কি?
পাশেই সা'আদ ইবনে মা'আজের বাড়ি। মা'আজের উচ্চ কণ্ঠস্বর শুনে তার মা বেরিয়ে এলেন। দেখলেন সা'আদকে এবং শুনলেন খবরও।
শুনেই উত্তেজিত ও আবেগময় কণ্ঠে সা'আদের মা সা'আদকে লক্ষ্য করে চিৎকার করে বললেন, 'বৎস পিছিয়ে পড়েছো, দ্রুত অগ্রসর হও।'
মায়ের উৎসাহ ও আশীর্বাদে দ্রুততর হলো সা'আদ ইবনে মা'আজের গতি। তিনি পরিখা তীরে পৌঁছতেই শত্রুপক্ষের একটা তীর এসে বিদ্ধ করল তাঁকে। গুরুতর আহত হলেন তিনি।
এই আঘাত তাকে শাহাদাতের দিকে নিয়ে গেল।
অচিরেই শাহাদাতের অমৃত সুধা পান করলেন তিনি।
📄 ‘... শুকনো রুটি সম্বল করে’
এক বিপদ যায়, আরেক বিপদ আসে।
হোদায়বিয়ার সন্ধির পর কোরাইশদের দিক থেকে মহানবী (সা) নিশ্চিন্ত হলেন। কিন্তু বিপদ ছুটে এল ইহুদীদের দিক থেকে।
ষড়যন্ত্রকারী ও চির মুসলিম-বিদ্বেষী ইহুদীরা যখন বুঝলো মক্কার কুরাইশদের আর শক্তি নেই মুসলমানদের ধ্বংস করার, তখন খায়বরের ইহুদী গোত্রগুলো পার্শ্ববর্তী শক্তিশালী গাতফান ও অন্যান্য পৌত্তলিক গোত্রকে নানা প্রকার আশা ও প্রলোভন দেখিয়ে তাদের মদীনা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত করলো।
তারা মুসলমানদের উত্যক্ত ও দুর্বল করার জন্য মুসলমানদের একটা বাণিজ্য কাফেলা আক্রমণ করে অনেককে হতাহত করল এবং সবকিছু লুণ্ঠন করে নিয়ে গেল। এর কিছুদিন পর আরও দুঃসাহসী হয়ে তারা মদীনার উপকণ্ঠে জ-ফারাদ প্রান্তরে মহানবী (সা) ও তাঁর সাহাবাদের পশুপালে আক্রমণ চালিয়ে প্রহরী এক মুসলমানকে হত্যা করে লোকটির স্ত্রীসহ গোটা পশুপালকে লুট করে নিয়ে গেল।
মহানবী (সা) গুপ্তচর পাঠিয়ে খবর নিয়ে জানলেন, ইহুদী ও গাতফানীরা মদীনা আক্রমণের জন্যে প্রস্তুত। যে কোন সময় তারা মদীনার উপর আপতিত হতে পারে।
মহানবী (সা) আর মুহূর্ত দেরী করলেন না। ওরা মদীনা আক্রমণের আগেই ওদের ঘাঁটি খায়বর আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।
মহানবী (সা) ১৪শ' পদাতিক ও দু'শ' সওয়ারী নিয়ে খায়বর যাত্রা করলেন। তিনি এমনভাবে তাঁর বাহিনী পরিচালনা করলেন যাতে গাতফানীদের থেকে খায়বরের ইহুদীদের বিচ্ছিন্ন করা যায়। তাই হলো। গাতফানীরা মনে করল মুসলমানরা তাদের ফাঁদে আটকাবার চেষ্টা করছে। তারা ভয়ে দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরে তাদের এলাকায় দুর্গে আশ্রয় নিল।
ইহুদীরাও সম্মুখ যুদ্ধ এড়িয়ে খায়বরে তাদের সুরক্ষিত দুর্গে গিয়ে প্রবেশ করল এবং মিত্র গাতফানীদের আগমনের অপেক্ষা করতে লাগল।
তারা আরও ভাবল, দুর্গ অবরোধ করে মুসলমানরা তাদের কাবু করতে পারবে না। বেশীদিন দুর্গ অবরোধ করে বসে থাকার মত রসদ মুসলমানদের নেই। ইহুদীদের এই হিসাব সত্য। মুসলমানদের তখন খুবই আর্থিক দুর্দিন।
মুসলমানরা মাত্র কিছু ছাতু সম্বল করে খায়বর অভিযানে এসেছিল। সে ছাতু ক'দিনেই নিঃশেষ হয়ে গেল।
অনাহার-অর্ধাহারের কালছায়া নেমে এল মুসলিম শিবিরে। অবরোধের সময় যত বাড়ল, মুসলমানদের দুঃখ-দুর্দশা ততই বৃদ্ধি পেতে লাগল। তার উপর দুর্গ প্রাকার থেকে ইহুদীরা মাঝে মাঝেই তীর, বর্ষা, পাথর ইত্যাদি নিক্ষেপ করে মুসলমানদের হতাহত করতে লাগল। ইহুদীদের ধারণা হলো, অনাহার-অর্ধাহারে মুসলমানরা বিপর্যস্ত হয়ে অচিরেই অবরোধ উঠিয়ে পালিয়ে বাঁচবে।
এদিকে মহানবী (সা) যখন দেখলেন যে, ইহুদীরা কোন মতেই আত্মসমর্পণ বা সন্ধি করবে না, তখন একদিন তিনি সাথীদেরকে দুর্গ দখলের নির্দেশ দিলেন। এই নির্দেশ অমৃত হয়ে দেখা দিল মুসলমানদের জন্য। ক্ষুধা-তৃষ্ণার জ্বালা তারা ভুলে গেল। মুহূর্তেই দুর্বল শরীর তাদের সবল হয়ে উঠল।
শুরু হলো ঘোরতর যুদ্ধ।
একের পর এক ইহুদী দুর্গে ইসলামের পতাকা উড্ডীন হতে লাগল।
ইহুদীদের সর্ব বৃহৎ দুর্গ কা'মুছ। তিনদিন যুদ্ধ চালাবার পর মুসলমানরা এ দুর্গ দখল করে নিল। কা'মুহু দুর্গের পতনের পর এক সপ্তাহের মধ্যে খায়বরের সকল ইহুদী দুর্গের পতন ঘটল।
যুদ্ধে মুসলমানরা যে কতটা দক্ষতা ও বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন, যুদ্ধের ফলাফল থেকেই তা আঁচ করা যায়। ৪ সপ্তাহের যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন ১৫ জন মুসলিম, আর অন্যপক্ষে মারা গিয়েছিলেন ৯৩ জন ইহুদী।
অনাহার, অর্ধাহার আর সংখ্যা স্বল্পতা মুসলমানদের বিজয় ঠেকাতে পারেনি। আর প্রাচুর্য, সংখ্যাধিক্য এবং সুরক্ষিত দুর্গ পারেনি ইহুদীদের বিজয় দিতে।