📄 ইহুদীদের কাছে মহাপুরুষ এক নিমিষে হন পাষন্ড
আবদুল্লাহ ইবনে সালাম মদীনার ইহুদী সমাজের প্রধানতম পন্ডিত। তিনি সেখানকার ইহুদী সমাজের অসীম ভক্তিশ্রদ্ধার পাত্র। তিনিও উদগ্রীবভাবে মহানবীর প্রতিক্ষা করছিলেন।
মহানবী মদীনায় পৌঁছলে তিনি তাঁর সাথে দেখা করতে গেলেন। মহানবী তখন কয়েকজন সাহাবীকে উপদেশ দিচ্ছিলেন। তিনি বলছিলেন, "সকলকে শান্তি ও প্রেমপূর্ণ সম্বোধন কর। সকলকে খেতে দাও এবং নির্জন নিস্তব্ধ নিশীথে যখন সমস্ত লোক ঘুমিয়ে থাকে তখন নামাযে লিপ্ত হও।”
আবদুল্লাহ ইবনে সালাম বলেছেন "নবীর মুখ দেখেই আমার মন যেন বলে উঠল, এ কোন ভন্ড ও মিথ্যাবাদীর মুখ নয়।”
পরে আবদুল্লাহ মহানবীর সাথে একান্তে সাক্ষাৎ করলেন। ধর্মতত্ত্ব সংক্রান্ত কয়েকটা জটিল প্রশ্ন উত্থাপন করতঃ তার মীমাংসা করে দিতে বললেন। মহানবী সংক্ষেপে কয়েকটা কথায় সে প্রশ্নগুলোর এমন সুন্দর ও সন্তোষজনক সমাধান করে দিলেন যে, আবদুল্লাহর যুগ-যুগান্তের জটিল যুক্তিতর্ক ও কুটিল দার্শনিকতা জর্জরিত হৃদয়ে অভিনব প্রশান্তির উদ্রেগ হলো। ভক্তিতে তাঁর অন্তরটা নুয়ে পড়ল। তারপর তাওরাতে বর্ণিত লক্ষণের সাথে মহানবীকে মিলিয়েও নিলেন তিনি। অতঃপর নিজের গোত্র, নিজের জাতি ইহুদী সমাজ—কারও অপেক্ষা না করে তিনি ঘোষণা করলেন, 'আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ (সা) তাঁর রাসূল।'
ইসলাম গ্রহণের পর আবদুল্লাহ ইবনে সালাম মহানবীর কাছে নিবেদন করলেন, 'ইহুদীরা আমাকে তাদের প্রধান পন্ডিত ও সমাজপতি বলে বিশ্বাস করে থাকে। আমার পিতা সম্বন্ধেও তাদের এ বিশ্বাস ছিল। আমার ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ না করে ইহুদীদের ডেকে আমার কথা জিজ্ঞেস করুন।'
মহানবী ইহুদীদের ডাকলেন। ডেকে তাদের ইসলামের দাওয়াত দিলেন। কিন্তু তারা তা গ্রহণ করল না। তখন মহানবী তাদের আবদুল্লাহ ইবনে সালাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তারা এক বাক্যে বলল, "তিনি মহাপুরুষের বংশধর, নিজেও মহাপুরুষ এবং তিনি মহাপন্ডিতের বংশধর, নিজেও একজন মহাপন্ডিত। তিনি আমাদের সরদার পুত্র সরদার।”
মহানবী তখন তাদের বললেন, "আচ্ছা, আবদুল্লাহ যদি আমাকে সত্য নবী বলে স্বীকার করেন এবং তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।" ইহুদীরা বলে উঠল "সর্বনাশ, তা কি কখনও সম্ভব?”
তখন নবীর আহবানে আবদুল্লাহ আড়াল থেকে বের হয়ে এলেন এবং সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "তোমরা সকলেই জেনেছ যে, ইনি আল্লাহর সত্য রাসূল, তাঁকে স্বীকার কর মুক্তি পাবে।”
আবদুল্লাহর এই কথা শুনে এক মুহূর্তে ইহুদীদের সুর পাল্টে গেল। তারা বলল, "আমরা প্রথমে ঠিক কথা বলিনি, আবদুল্লাহ একজন ভীষণ পাঁজী, ভয়ানক পাষন্ড সে। তার চৌদ্দ পুরুষও পাষন্ড, ইত্যাদি।”
📄 মেহমানদের মর্যাদা পেল যুদ্ধবন্দীরা
বদর যুদ্ধে বিজয়ী মুসলমানদের হাতে অনেক কুরাইশ বন্দী হলো। এরা সেই তারা, যারা মহানবী (সা) এবং তাঁর অনুসারীদের উপর তের বছর ধরে অমানুষিক অত্যাচার করেছে এবং তাঁদেরকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে। সেই যুগের নীতি অনুসারে হয় তাদের সকলকে হত্যা অথবা তাদেরকে দাস বানিয়ে নেয়া যেত। কিন্তু মহানবী (সা) তাদের সাথে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী ব্যবহার করলেন।
তিনি তাদের সাথে মেহমানের মত ব্যবহার করতে নির্দেশ দিলেন। মুসলমানদের নিজেদের খাওয়ার ব্যাপারে কষ্ট হলেও বন্দীদের ভাল এবং পেট পুরে খাবার দেয়া হতো। মুসলমানরা দু'চারটা খেজুর খেয়ে দিন কাটাতেন, কিন্তু বন্দীদের রুটি খাওয়ান হতো। বন্দীদের একজন পরবর্তীকালে বলেছেন, "মদীনাবাসীদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। ওরা আমাদের ঘোড়ায় চড়িয়ে নিজেরা পায়ে হেঁটে পথ চলত। তারা প্রায় না খেয়ে আমাদের খাওয়াতো।”
📄 একজন শরীফজাদা এবং একজন ভিক্ষুক
একদিন কয়েকজন সাহাবী নবী করীম (সা)-এর নিকট বসা ছিলেন, ঐ সময় একজন লোক তাঁদের সামনে দিয়ে চলে গেল। নবী করীম (সা) সাহাবীদের জিজ্ঞেস করলেন, ঐ লোকটি সম্বন্ধে তোমরা কি জান?
তাঁরা বললেন, তিনি শরীফযাদা, ভাল ঘরে বিয়ে করতে চাইলে সবাই সাদরে গ্রহণ করবে। কথা বলতে থাকলে সবাই মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনবে এবং কারো জন্য সুফারিশ করলে কথা রাখবে।
তাঁদের কথা শুনে নবী করীম (সা) চুপ করে রইলেন।
একটু পরে আরেক ব্যক্তি সেখান দিয়ে চলে গেল। নবী করীম (সা) সাহাবীদের জিজ্ঞেস করলেন, এ লোকটি সম্বন্ধে তোমাদের অভিমত কি?
তাঁরা বললেন, সে একজন ভিক্ষুক, তাকে কেউ ভিক্ষে দেয় না, তার কথাও কেউ শোনে না, কারও জন্য সুফারিশ করতে গেলে তার কথা কেউ আমল দেয় না।
শুনে নবী করীম (সা) বললেন, প্রথম লোকটির মত যদি দুনিয়ার সব লোক হয়ে যায়, তথাপি সকলে মিলে দ্বিতীয় লোকটির সমান হবে না।
নিতান্ত দরিদ্র ও তুচ্ছ ব্যক্তিও যদি সৎ পথে বিচরণ করে, সৎকার্য করে জীবন কাটায়, তবে আল্লাহর নিকট সে বেআমল শরীফ লোক থেকে অনেক শ্রেষ্ঠ এবং সম্মানিত।
📄 মদীনা হিংস্র জন্তুর শিকারে পরিণত হয় হোক
মহানবীর (সা) মৃত্যুর পর আবুবকর সিদ্দীক (রা) খলীফা নির্বাচিত হলেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে মহানবী (সা) সিরিয়ায় একটি অভিযান প্রেরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় সেই মুহূর্তে তা স্থগিত হয়ে যায়। কিন্তু আবুবকর (রা) খলীফা হয়েই সেই অভিযান প্রেরণের উদ্যোগ নিলেন। মুসলিম নেতৃবৃন্দের অনেকেই এর সাথে দ্বিমত পোষণ করলেন এই বলে যে, মদীনা অরক্ষিত হয়ে পড়লে মহানবীর (সা) মৃত্যুর সুযোগ নিয়ে গোলযোগকারী যারা মাথা তুলতে চাচ্ছে, তারা সুযোগ পেয়ে যেতে পারে।
জবাবে খলীফা আবুবকর (রা) বললেন, "মহানবীর (সা) কোন সিদ্ধান্তকে আমি অমান্য করতে পারবো না। মদীনা হিংস্র বন্য জন্তুর শিকারে পরিণত হয় হোক, কিন্তু সেনাবাহিনীকে তাদের মৃত মহান নেতার ইচ্ছা পূরণ করতেই হবে।"
হযরত আবুবকর (রা) এর প্রেরিত এই অভিযান ছিল সিরিয়া, পারস্য ও উত্তর আফ্রিকায় ইসলামের বিজয় অভিযানের মিছিলে প্রথম গৌরবোজ্জ্বল অভিযাত্রা।
অভিযান সফল হয়েছিল। দেড়মাস পর সেনাপতি উসামা বিজয়ীর বেশে মদীনায় ফিরে এসেছিলেন।