📄 ঈমান যেখানে সবার বড়
ইসলামের জন্য অনুকূল মদীনা মুনাওয়ারায় হিজরাতের স্থির সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ার পর মহানবী (সা) মক্কার মুসলমানদের নির্দেশ দিলেন চুপে চুপে একে একে হিজরাত করার জন্যে। মহানবীর (সা) এ নির্দেশ পাবার পর সবাই অত্যন্ত গোপনে হিজরাতের জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন। কিন্তু কথাটা গোপন থাকলো না। শিকারগুলো যাতে পালাতে না পারে সেজন্য বিধর্মী কুরাইশরা সতর্ক হয়ে গেল। এর মধ্যেই মুসলমানরা একা একা অথবা একাধিকজন মিলে বাড়ী-ঘর, সহায়-সম্পত্তি সব ফেলে মদীনায় হিজরাত করতে লাগলেন।
উম্মে সালামা এবং তাঁর স্বামী আবু সালামা হৃদয় বিদারক এক পরীক্ষার সম্মুখীন হলেন হিজরাতের সময়। উম্মে সালামার পিতার গোত্রের লোকরা এসে উম্মে সালামাকে কেড়ে নিয়ে যেতে চাইল, আর আবু সালামার গোত্রের লোকেরা এসে আবু সালামার দুগ্ধপোষ্য আদরের শিশুকে কেড়ে নিল। স্ত্রী ও শিশুর কান্নায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হলো। সব কান্না উপেক্ষা করে আবু সালামার স্ত্রী ও শিশুকে কুরাইশরা কেড়ে নিয়ে গেল। ক্রন্দনরত আবু সালামার ঈমানই কিন্তু সবার উপর বিজয়ী হলো। তিনি চোখ দু'টি মুছে মদীনার পথে যাত্রা করলেন।
আবু সালামা চলে যাবার পর উম্মে সালামার চোখের পানি কোনদিন শুকায়নি। এক বছর পর আত্মীয় স্বজনের মন নরম হলো। তারা শিশুসহ উম্মে সালামাকে এক উটে তুলে দিলো। একমাত্র ঈমানের শক্তি সম্বল করে উম্মে সালামা মদীনার পথে যাত্রা করলেন। পথিমধ্যে দেখা হলো উসমান ইবনে তালহার সাথে। তিনি সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমার সাথে আর কে আছে?' উম্মে সালামা উত্তরে বললেন, 'এই শিশু আর আল্লাহ'। উত্তর শুনে উসমান ইবনে তালহা বলেছেন, তার বুক কেঁপে উঠল। তিনি উম্মে সালামাকে মদীনা পৌঁছে দিলেন।
📄 ইসলামের প্রথম জুমআর প্রথম খুতবা
দীর্ঘ দুই সপ্তাহ ধরে সীমাহীন ব্যাকুলতা নিয়ে মদীনাবাসী অপেক্ষা করছেন মহানবীর (সা) জন্য। মহানবীর (সা) মদীনা প্রবেশের খবর মদীনায় ছড়িয়ে পড়ার পর সাজ সাজ রব পড়ে গেল মদীনার ঘরে ঘরে মহানবীকে (সা) স্বাগত জানাবারজন্য।
সেদিন ছিল শুক্রবার। মহানবী কুবা পল্লী থেকে মদীনা যাত্রা করলেন। তাঁর সামনে পেছনে ডানে বামে মুসলিম জনতার সারিবদ্ধ মিছিল। সবার মুখে আল্লাহু আকবার ধ্বনি। মহানবী বনু সালেম গোত্রের কাছে পৌঁছলেন, তখন জুমআর নামাযের সময় হলো। মহানবী জুমআর নামাযের আয়োজনের নির্দেশ দিলেন। সেখানে জুমআর নামায অনুষ্ঠিত হলো। ইসলামের প্রথম জুমআর নামায এটাই। মহানবী জুমআর নামাযে যে খুতবা দিলেন, সেটা ইসলামের ইতিহাসের প্রথম খুতবা। সে ঐতিহাসিক খুতবায় মহানবী বললেন-
"সকল মহিমা সকল গরিমা একমাত্র আল্লাহর। তাঁরই মহিমা কীর্তন করি, তাঁরই সাহায্য প্রার্থনা করি, তাঁরই নিকটে ক্ষমা ভিক্ষা করি এবং সৎপথ চিনবার শক্তি তাঁর নিকটই যাচঞা করি। তাঁর প্রতিই ঈমান আনবো এবং তাঁর আদেশ অমান্য করবো না। যে তাঁর বিদ্রোহী তাকে আপনার বলে মনে করবো না।
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ ইলাহ নেই, এবং এও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর দাস ও প্রেরিত রাসূল। যখন দীর্ঘকাল পর্যন্ত জগত রাসূলের উপদেশ থেকে বঞ্চিত ছিল, যখন জ্ঞান জগৎ থেকে লুপ্ত হয়ে যাচ্ছিল, যখন মানবজাতি ভ্রষ্টতা ও অনাচারে জর্জরিত হচ্ছিল, তাদের মৃত্যু ও কঠোর কর্মফল ভোগের সময় যখন নিকটবর্তী হয়ে আসছিল এহেন সময় আল্লাহ সেই রাসূলকে সত্যের আলো ও জ্ঞান দিয়ে বিশ্ববাসীর নিকট প্রেরণ করেছেন।
আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের অনুগত হয়ে চললেই মানব-জীবনের চরম সফলতা লাভ হবে। পক্ষান্তরে তাঁদের অবাধ্য হলে ভ্রষ্ট, পতিত ও পথহারা হয়ে পড়তে হবে।
সকলে নিজকে এমনভাবে গঠিত ও সংশোধিত করে নাও, যেন পাপজনিত কাজের প্রবৃত্তিই তোমাদের হৃদয় থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। তোমাদের প্রতি এই আমার চরম উপদেশ। পরকাল চিন্তা ও তাকওয়া অবলম্বন করা অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর উপদেশ এক মুসলিম অন্য মুসলিমকে দিতে পারে না। যে সব দুষ্কর্ম থেকে আল্লাহ তোমাদের বিরত থাকতে আদেশ করেছেন, সাবধান, তার নিকটেও যেও না। এই-ই হচ্ছে উৎকৃষ্টতম উপদেশ, এই-ই হচ্ছে শ্রেষ্ঠতম জ্ঞান।
আল্লাহ সম্পর্কে তোমার কর্তব্য আছে। তাঁর সাথে তোমার যে সম্বন্ধ আছে, তুমি তা ভুলে যেও না। সে ব্যাপারে যেখানে যে ত্রুটি ঘটে যায়, তুমি প্রকাশ্যে ও গোপনে তার সংশোধন কর, তোমার সে সম্বন্ধকে তুমি দৃঢ় ও নিখুঁত করে নাও—এই হচ্ছে জ্ঞান এবং পরজীবনের চরম সম্বল।
স্মরণ রেখো, এর অন্যথা করলে, তোমরা কর্মফলের সম্মুখীন হতে ভীত হলেও তার হাত থেকে ছাড়া পাবার উপায় নেই। আল্লাহ প্রেমময় ও দয়াময়, তাই এই কর্মফলের অপরিহার্য পরিণামের কথা পূর্ব থেকেই তোমাদের জানিয়ে সতর্ক করে দিচ্ছেন। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের কথাকে সত্যে পরিণত করবে, কার্যত নিজের প্রতিজ্ঞা পালন করবে, তার সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, "আমার বাক্যের রদবদল নেই এবং মানবের প্রতি অত্যাচারীও নই।” অতএব তোমরা মুখ্য ও গৌণ, প্রকাশ্য ও গুপ্ত সব বিষয়েই তাকওয়ার সন্ধান কর। তাকওয়াই পরম ধন, তাকওয়াতেই মানবতার চরম সাফল্য।
সঙ্গত ও সংযতভাবে পৃথিবীর সকল সুখ উপভোগ কর, তিনি তোমাদেরকে তাঁর কিতাব দিয়েছেন, তাঁর পথ দেখিয়েছেন। এখন কে প্রকৃতপক্ষে সত্যের সেবক আর কে কেবল মূর্খের দাবীসর্বস্ব মিথ্যাবাদী তা জানা যাবে। অতএব আল্লাহ যেমন তোমাদের মঙ্গল করেছেন, তোমরাও সেরূপ আল্লাহর মঙ্গল সাধনে প্রবৃত্ত হও, আল্লাহর শত্রু—পাপাচারকারীদেরকে শত্রু বলে জ্ঞান কর "এবং আল্লাহর নামে যথাযথ জিহাদে প্রবৃত্ত হও। (এই কাজের জন্য) তিনি তোমাদের নির্বাচিত করে নিয়েছেন এবং তিনি তোমাদের নাম রেখেছেন 'মুসলিম'।” (কুরআন) কারণ (নিজের কর্মফলে ও প্রকৃতির অপরিহার্য বিধানে) যার ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী, সে সত্য, ন্যায় ও যুক্তি মতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হোক। আর যে জীবন লাভ করবে, সে সত্য, ন্যায় ও যুক্তি সহায়তায় জীবনলাভ করুক। নিশ্চয় জেন, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন শক্তি নেই।
অতএব, সদা-সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ কর, আর পরকালের জন্য সম্পদ সঞ্চয় করে নাও। আল্লাহর সাথে তোমার সম্বন্ধ কি, এ যদি তুমি বুঝতে পার, বুঝে নিয়ে তাকে দৃঢ় ও নিখুঁত করে নিতে পার, তাঁর প্রেম স্বরূপে সম্পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে আত্মনির্ভর করতে পার, তাহলে তোমার প্রতি মানুষের যে ব্যবহার তার ভার তিনিই গ্রহণ করবেন। কারণ মানুষের উপর আল্লাহরই আজ্ঞা প্রচলিত হয়, আল্লাহর উপর মানুষের হুকুম চলে না, মানব তার প্রভু নয়, কিন্তু তিনি তাদের প্রভু। আল্লাহু আকবর, সেই মহিমান্বিত আল্লাহ ব্যতীত আর কারও হাতে কোন শক্তি নেই।”
📄 ইহুদীদের কাছে মহাপুরুষ এক নিমিষে হন পাষন্ড
আবদুল্লাহ ইবনে সালাম মদীনার ইহুদী সমাজের প্রধানতম পন্ডিত। তিনি সেখানকার ইহুদী সমাজের অসীম ভক্তিশ্রদ্ধার পাত্র। তিনিও উদগ্রীবভাবে মহানবীর প্রতিক্ষা করছিলেন।
মহানবী মদীনায় পৌঁছলে তিনি তাঁর সাথে দেখা করতে গেলেন। মহানবী তখন কয়েকজন সাহাবীকে উপদেশ দিচ্ছিলেন। তিনি বলছিলেন, "সকলকে শান্তি ও প্রেমপূর্ণ সম্বোধন কর। সকলকে খেতে দাও এবং নির্জন নিস্তব্ধ নিশীথে যখন সমস্ত লোক ঘুমিয়ে থাকে তখন নামাযে লিপ্ত হও।”
আবদুল্লাহ ইবনে সালাম বলেছেন "নবীর মুখ দেখেই আমার মন যেন বলে উঠল, এ কোন ভন্ড ও মিথ্যাবাদীর মুখ নয়।”
পরে আবদুল্লাহ মহানবীর সাথে একান্তে সাক্ষাৎ করলেন। ধর্মতত্ত্ব সংক্রান্ত কয়েকটা জটিল প্রশ্ন উত্থাপন করতঃ তার মীমাংসা করে দিতে বললেন। মহানবী সংক্ষেপে কয়েকটা কথায় সে প্রশ্নগুলোর এমন সুন্দর ও সন্তোষজনক সমাধান করে দিলেন যে, আবদুল্লাহর যুগ-যুগান্তের জটিল যুক্তিতর্ক ও কুটিল দার্শনিকতা জর্জরিত হৃদয়ে অভিনব প্রশান্তির উদ্রেগ হলো। ভক্তিতে তাঁর অন্তরটা নুয়ে পড়ল। তারপর তাওরাতে বর্ণিত লক্ষণের সাথে মহানবীকে মিলিয়েও নিলেন তিনি। অতঃপর নিজের গোত্র, নিজের জাতি ইহুদী সমাজ—কারও অপেক্ষা না করে তিনি ঘোষণা করলেন, 'আল্লাহ ছাড়া কোনও ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ (সা) তাঁর রাসূল।'
ইসলাম গ্রহণের পর আবদুল্লাহ ইবনে সালাম মহানবীর কাছে নিবেদন করলেন, 'ইহুদীরা আমাকে তাদের প্রধান পন্ডিত ও সমাজপতি বলে বিশ্বাস করে থাকে। আমার পিতা সম্বন্ধেও তাদের এ বিশ্বাস ছিল। আমার ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ না করে ইহুদীদের ডেকে আমার কথা জিজ্ঞেস করুন।'
মহানবী ইহুদীদের ডাকলেন। ডেকে তাদের ইসলামের দাওয়াত দিলেন। কিন্তু তারা তা গ্রহণ করল না। তখন মহানবী তাদের আবদুল্লাহ ইবনে সালাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তারা এক বাক্যে বলল, "তিনি মহাপুরুষের বংশধর, নিজেও মহাপুরুষ এবং তিনি মহাপন্ডিতের বংশধর, নিজেও একজন মহাপন্ডিত। তিনি আমাদের সরদার পুত্র সরদার।”
মহানবী তখন তাদের বললেন, "আচ্ছা, আবদুল্লাহ যদি আমাকে সত্য নবী বলে স্বীকার করেন এবং তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।" ইহুদীরা বলে উঠল "সর্বনাশ, তা কি কখনও সম্ভব?”
তখন নবীর আহবানে আবদুল্লাহ আড়াল থেকে বের হয়ে এলেন এবং সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "তোমরা সকলেই জেনেছ যে, ইনি আল্লাহর সত্য রাসূল, তাঁকে স্বীকার কর মুক্তি পাবে।”
আবদুল্লাহর এই কথা শুনে এক মুহূর্তে ইহুদীদের সুর পাল্টে গেল। তারা বলল, "আমরা প্রথমে ঠিক কথা বলিনি, আবদুল্লাহ একজন ভীষণ পাঁজী, ভয়ানক পাষন্ড সে। তার চৌদ্দ পুরুষও পাষন্ড, ইত্যাদি।”
📄 মেহমানদের মর্যাদা পেল যুদ্ধবন্দীরা
বদর যুদ্ধে বিজয়ী মুসলমানদের হাতে অনেক কুরাইশ বন্দী হলো। এরা সেই তারা, যারা মহানবী (সা) এবং তাঁর অনুসারীদের উপর তের বছর ধরে অমানুষিক অত্যাচার করেছে এবং তাঁদেরকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে। সেই যুগের নীতি অনুসারে হয় তাদের সকলকে হত্যা অথবা তাদেরকে দাস বানিয়ে নেয়া যেত। কিন্তু মহানবী (সা) তাদের সাথে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী ব্যবহার করলেন।
তিনি তাদের সাথে মেহমানের মত ব্যবহার করতে নির্দেশ দিলেন। মুসলমানদের নিজেদের খাওয়ার ব্যাপারে কষ্ট হলেও বন্দীদের ভাল এবং পেট পুরে খাবার দেয়া হতো। মুসলমানরা দু'চারটা খেজুর খেয়ে দিন কাটাতেন, কিন্তু বন্দীদের রুটি খাওয়ান হতো। বন্দীদের একজন পরবর্তীকালে বলেছেন, "মদীনাবাসীদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। ওরা আমাদের ঘোড়ায় চড়িয়ে নিজেরা পায়ে হেঁটে পথ চলত। তারা প্রায় না খেয়ে আমাদের খাওয়াতো।”