📄 দান কমাতে গিয়ে বাড়ল
বাংলাদেশে তখন সুলতানী শাসন। সুলতান ফিরোজ শাহ বাংলার সিংহাসনে। হযরত বিলালের দেশ আবিসিনিয়ার অধিবাসী তিনি। কৃষ্ণাংগ ফিরোজ শাহ সামান্য অবস্থা থেকে সুলতান পদে অধিষ্ঠিত হবার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন।
সুলতান ফিরোজ শাহ ক্ষমতার উচ্চ শিখরে উঠেও দৃষ্টি তার উর্ধমুখী হলো না, নীচের দিকে জনসাধারণের দিকেই নিবদ্ধ থাকলো। ভুললেন না তিনি জনসাধারণের কথা-গরীবদের কথা। তিনি অকাতরে রাজকোষ থেকে গরীব জনগণকে অর্থ দান করতে লাগলেন। অভাবীর সংখ্যা বিপুল, প্রয়োজন তাদের বিরাট। তাই রাজকোষ থেকে অর্থ খরচ হতেও লাগল পানির মতো। রাজ দরবারের আমীর-উমরারা মহাবিপদে পড়ল—প্রমাদ গুণল তারা।
ভাবল সুলতানের এ কী অমিতাচার! এভাবে দান করতে থাকলে তো রাজকোষ শূণ্য হয়ে যাবে। আমীর উমরারা চিন্তা করলো, সুলতান নিজের হাতে অর্থ সাহায্য দেন না, তাই হয়তো অর্থের মায়া তাঁর কাছে বড় হয় না। দিনে যে অর্থ দান করা হয় তা যদি তিনি এক সংগে দেখতে পেতেন, তাহলে এত অর্থ কিছুতেই তিনি দিতে রাজী হতেন না। সামান্য অবস্থা থেকে তিনি এত বড় হয়েছেন, অর্থের মর্যাদা তাঁর চেয়ে আর বেশী কে বুঝবে। সুতরাং মন্ত্রণা পরিষদ পরামর্শ করে ঠিক করল, দানের অর্থ এনে সুলতানের সামনে হাজির করতে হবে। পরামর্শ অনুসারেই কাজ হলো। পরদিন দানের জন্য নির্দিষ্ট একলক্ষ কাঁচা রৌপ্য মুদ্রা এনে স্তূপীকৃত করে একজন মন্ত্রী অতি বিনয় সহকারে বললেন, "এ টাকাগুলোই আজ গরীব ও সাহায্যপ্রার্থীদের মধ্যে বিতরণের জন্য দিয়েছিলেন।”
সুলতান ফিরোজ শাহ সে টাকার দিকে চেয়ে বললেন, "ও আচ্ছা, এ টাকাও তো যথেষ্ট বলে মনে হচ্ছে না। এর সাথে আরও এক লক্ষ টাকা যোগ করে গরীব দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দাও।”
হতবাক মন্ত্রী আর কিছু বলতে পারলো না, বলতে সাহস পেলোনা। সুলতানের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালিত হলো। সেদিন দান করা হলো দু'লক্ষ রৌপ্য মুদ্রা।
ইতিহাসে ব্যক্তিগত ও বংশীয় রাজসিংহাসনে খোদাভীরু শাসকের আগমনে মাঝে মধ্যে এভাবে রাজকোষ জনসাধারণের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে।
📄 নিপীড়ন আনলো নিপীড়িতের সাফল্য
একদিন মহানবী কা'বার চত্বরে একাকী বসে আছেন। তিনি আপন ভাবে বিভোর।
আবু জাহল গিয়ে সেখানে উপস্থিত হলো। নানা প্রকার ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করে মহানবীর (সা) ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চেষ্টা করল। কিন্তু অনেক চেষ্টাতেও তাঁর মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারলোনা। অবশেষে নবীকে (সা) লক্ষ্য করে সে অনেক গালমন্দ করে। আবু জাহলের এই মূঢ়তায় মহানবী ব্যথিত হলেন। ফিরে এলেন তিনি বাড়ীতে।
মক্কার একজন ক্রীতদাসী সব ঘটনা দেখল। সব কথা সে এসে মহানবীর পিতৃব্য হামজাকে বলে দিল। হামজা সবে শিকার থেকে ফিরেছেন। ভ্রাতুষ্পুত্রের প্রতি আবু জাহলের আচরণের কথা শুনে ক্রোধে জ্বলে উঠলেন। প্রশ্ন তার মনে তার সৎ ও সাধু সজ্জন ভাতিজা কি দোষ করেছে যে সবাই তার উপর অত্যাচার করবে? সে কোন্ কথাটি খারাপ বলে?
হামজা শিকারের ধনুক কাঁধে নিয়ে আবু জাহলের সন্ধানে বের হলেন। কাবা ঘরে তাকে পেয়ে সক্রোধে ধনুক দিয়ে তার মাথায় আঘাত করতে লাগলেন এবং হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলেন, "পাষন্ড! আর তুই মুহাম্মাদের উপর অত্যাচার করবি? আচ্ছা, আমিও মুহাম্মাদের ধর্ম গ্রহণ করেছি, কি করবি কর।"
অতপর হামজা চলে এলেন মহানবীর কাছে। মহানবীকে বললেন, 'আনন্দিত হও ভাতিজা, আবু জাহলকে শায়েস্তা করেছি।'
মহানবী সব বুঝলেন। কিন্তু আনন্দ কিংবা কৃতজ্ঞতার কোন ভাবই তাঁর মুখে প্রকাশ পেলনা। তিনি বললেন, "চাচা, এতে আনন্দের কিছুই নেই। যদি শুনতাম যে আপনি সত্যকে গ্রহণ করেছেন, তাহলে তা আমার জন্য আনন্দের ব্যাপারহতো।”
হামজার হৃদয় দুলে উঠল। আরো মনে পড়ল, মুহাম্মাদের ধর্ম গ্রহণের কথা তিনি আবু জাহলকে বলেই এসেছেন। এবার অন্তর থেকে তার সাক্ষ্য বেরিয়ে এল লা ইলাহা ইলাল্লাহু।
এইভাবে কুরাইশদের প্রতিদিনের অত্যাচার ইসলামের নতুন নতুন সাফল্যই এনে দিতে লাগল।
📄 ঈমান যেখানে সবার বড়
ইসলামের জন্য অনুকূল মদীনা মুনাওয়ারায় হিজরাতের স্থির সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ার পর মহানবী (সা) মক্কার মুসলমানদের নির্দেশ দিলেন চুপে চুপে একে একে হিজরাত করার জন্যে। মহানবীর (সা) এ নির্দেশ পাবার পর সবাই অত্যন্ত গোপনে হিজরাতের জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন। কিন্তু কথাটা গোপন থাকলো না। শিকারগুলো যাতে পালাতে না পারে সেজন্য বিধর্মী কুরাইশরা সতর্ক হয়ে গেল। এর মধ্যেই মুসলমানরা একা একা অথবা একাধিকজন মিলে বাড়ী-ঘর, সহায়-সম্পত্তি সব ফেলে মদীনায় হিজরাত করতে লাগলেন।
উম্মে সালামা এবং তাঁর স্বামী আবু সালামা হৃদয় বিদারক এক পরীক্ষার সম্মুখীন হলেন হিজরাতের সময়। উম্মে সালামার পিতার গোত্রের লোকরা এসে উম্মে সালামাকে কেড়ে নিয়ে যেতে চাইল, আর আবু সালামার গোত্রের লোকেরা এসে আবু সালামার দুগ্ধপোষ্য আদরের শিশুকে কেড়ে নিল। স্ত্রী ও শিশুর কান্নায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হলো। সব কান্না উপেক্ষা করে আবু সালামার স্ত্রী ও শিশুকে কুরাইশরা কেড়ে নিয়ে গেল। ক্রন্দনরত আবু সালামার ঈমানই কিন্তু সবার উপর বিজয়ী হলো। তিনি চোখ দু'টি মুছে মদীনার পথে যাত্রা করলেন।
আবু সালামা চলে যাবার পর উম্মে সালামার চোখের পানি কোনদিন শুকায়নি। এক বছর পর আত্মীয় স্বজনের মন নরম হলো। তারা শিশুসহ উম্মে সালামাকে এক উটে তুলে দিলো। একমাত্র ঈমানের শক্তি সম্বল করে উম্মে সালামা মদীনার পথে যাত্রা করলেন। পথিমধ্যে দেখা হলো উসমান ইবনে তালহার সাথে। তিনি সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমার সাথে আর কে আছে?' উম্মে সালামা উত্তরে বললেন, 'এই শিশু আর আল্লাহ'। উত্তর শুনে উসমান ইবনে তালহা বলেছেন, তার বুক কেঁপে উঠল। তিনি উম্মে সালামাকে মদীনা পৌঁছে দিলেন।
📄 ইসলামের প্রথম জুমআর প্রথম খুতবা
দীর্ঘ দুই সপ্তাহ ধরে সীমাহীন ব্যাকুলতা নিয়ে মদীনাবাসী অপেক্ষা করছেন মহানবীর (সা) জন্য। মহানবীর (সা) মদীনা প্রবেশের খবর মদীনায় ছড়িয়ে পড়ার পর সাজ সাজ রব পড়ে গেল মদীনার ঘরে ঘরে মহানবীকে (সা) স্বাগত জানাবারজন্য।
সেদিন ছিল শুক্রবার। মহানবী কুবা পল্লী থেকে মদীনা যাত্রা করলেন। তাঁর সামনে পেছনে ডানে বামে মুসলিম জনতার সারিবদ্ধ মিছিল। সবার মুখে আল্লাহু আকবার ধ্বনি। মহানবী বনু সালেম গোত্রের কাছে পৌঁছলেন, তখন জুমআর নামাযের সময় হলো। মহানবী জুমআর নামাযের আয়োজনের নির্দেশ দিলেন। সেখানে জুমআর নামায অনুষ্ঠিত হলো। ইসলামের প্রথম জুমআর নামায এটাই। মহানবী জুমআর নামাযে যে খুতবা দিলেন, সেটা ইসলামের ইতিহাসের প্রথম খুতবা। সে ঐতিহাসিক খুতবায় মহানবী বললেন-
"সকল মহিমা সকল গরিমা একমাত্র আল্লাহর। তাঁরই মহিমা কীর্তন করি, তাঁরই সাহায্য প্রার্থনা করি, তাঁরই নিকটে ক্ষমা ভিক্ষা করি এবং সৎপথ চিনবার শক্তি তাঁর নিকটই যাচঞা করি। তাঁর প্রতিই ঈমান আনবো এবং তাঁর আদেশ অমান্য করবো না। যে তাঁর বিদ্রোহী তাকে আপনার বলে মনে করবো না।
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ ইলাহ নেই, এবং এও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর দাস ও প্রেরিত রাসূল। যখন দীর্ঘকাল পর্যন্ত জগত রাসূলের উপদেশ থেকে বঞ্চিত ছিল, যখন জ্ঞান জগৎ থেকে লুপ্ত হয়ে যাচ্ছিল, যখন মানবজাতি ভ্রষ্টতা ও অনাচারে জর্জরিত হচ্ছিল, তাদের মৃত্যু ও কঠোর কর্মফল ভোগের সময় যখন নিকটবর্তী হয়ে আসছিল এহেন সময় আল্লাহ সেই রাসূলকে সত্যের আলো ও জ্ঞান দিয়ে বিশ্ববাসীর নিকট প্রেরণ করেছেন।
আল্লাহর ও তাঁর রাসূলের অনুগত হয়ে চললেই মানব-জীবনের চরম সফলতা লাভ হবে। পক্ষান্তরে তাঁদের অবাধ্য হলে ভ্রষ্ট, পতিত ও পথহারা হয়ে পড়তে হবে।
সকলে নিজকে এমনভাবে গঠিত ও সংশোধিত করে নাও, যেন পাপজনিত কাজের প্রবৃত্তিই তোমাদের হৃদয় থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। তোমাদের প্রতি এই আমার চরম উপদেশ। পরকাল চিন্তা ও তাকওয়া অবলম্বন করা অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর উপদেশ এক মুসলিম অন্য মুসলিমকে দিতে পারে না। যে সব দুষ্কর্ম থেকে আল্লাহ তোমাদের বিরত থাকতে আদেশ করেছেন, সাবধান, তার নিকটেও যেও না। এই-ই হচ্ছে উৎকৃষ্টতম উপদেশ, এই-ই হচ্ছে শ্রেষ্ঠতম জ্ঞান।
আল্লাহ সম্পর্কে তোমার কর্তব্য আছে। তাঁর সাথে তোমার যে সম্বন্ধ আছে, তুমি তা ভুলে যেও না। সে ব্যাপারে যেখানে যে ত্রুটি ঘটে যায়, তুমি প্রকাশ্যে ও গোপনে তার সংশোধন কর, তোমার সে সম্বন্ধকে তুমি দৃঢ় ও নিখুঁত করে নাও—এই হচ্ছে জ্ঞান এবং পরজীবনের চরম সম্বল।
স্মরণ রেখো, এর অন্যথা করলে, তোমরা কর্মফলের সম্মুখীন হতে ভীত হলেও তার হাত থেকে ছাড়া পাবার উপায় নেই। আল্লাহ প্রেমময় ও দয়াময়, তাই এই কর্মফলের অপরিহার্য পরিণামের কথা পূর্ব থেকেই তোমাদের জানিয়ে সতর্ক করে দিচ্ছেন। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজের কথাকে সত্যে পরিণত করবে, কার্যত নিজের প্রতিজ্ঞা পালন করবে, তার সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, "আমার বাক্যের রদবদল নেই এবং মানবের প্রতি অত্যাচারীও নই।” অতএব তোমরা মুখ্য ও গৌণ, প্রকাশ্য ও গুপ্ত সব বিষয়েই তাকওয়ার সন্ধান কর। তাকওয়াই পরম ধন, তাকওয়াতেই মানবতার চরম সাফল্য।
সঙ্গত ও সংযতভাবে পৃথিবীর সকল সুখ উপভোগ কর, তিনি তোমাদেরকে তাঁর কিতাব দিয়েছেন, তাঁর পথ দেখিয়েছেন। এখন কে প্রকৃতপক্ষে সত্যের সেবক আর কে কেবল মূর্খের দাবীসর্বস্ব মিথ্যাবাদী তা জানা যাবে। অতএব আল্লাহ যেমন তোমাদের মঙ্গল করেছেন, তোমরাও সেরূপ আল্লাহর মঙ্গল সাধনে প্রবৃত্ত হও, আল্লাহর শত্রু—পাপাচারকারীদেরকে শত্রু বলে জ্ঞান কর "এবং আল্লাহর নামে যথাযথ জিহাদে প্রবৃত্ত হও। (এই কাজের জন্য) তিনি তোমাদের নির্বাচিত করে নিয়েছেন এবং তিনি তোমাদের নাম রেখেছেন 'মুসলিম'।” (কুরআন) কারণ (নিজের কর্মফলে ও প্রকৃতির অপরিহার্য বিধানে) যার ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী, সে সত্য, ন্যায় ও যুক্তি মতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হোক। আর যে জীবন লাভ করবে, সে সত্য, ন্যায় ও যুক্তি সহায়তায় জীবনলাভ করুক। নিশ্চয় জেন, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন শক্তি নেই।
অতএব, সদা-সর্বদা আল্লাহকে স্মরণ কর, আর পরকালের জন্য সম্পদ সঞ্চয় করে নাও। আল্লাহর সাথে তোমার সম্বন্ধ কি, এ যদি তুমি বুঝতে পার, বুঝে নিয়ে তাকে দৃঢ় ও নিখুঁত করে নিতে পার, তাঁর প্রেম স্বরূপে সম্পূর্ণ বিশ্বাসের সাথে আত্মনির্ভর করতে পার, তাহলে তোমার প্রতি মানুষের যে ব্যবহার তার ভার তিনিই গ্রহণ করবেন। কারণ মানুষের উপর আল্লাহরই আজ্ঞা প্রচলিত হয়, আল্লাহর উপর মানুষের হুকুম চলে না, মানব তার প্রভু নয়, কিন্তু তিনি তাদের প্রভু। আল্লাহু আকবর, সেই মহিমান্বিত আল্লাহ ব্যতীত আর কারও হাতে কোন শক্তি নেই।”