📄 ফাঁসি দিন আর যা-ই করুন যা সত্য তা বলবই
সুলতান আলাউদ্দিন খালজী তাঁর প্রধান কাজী (প্রধান বিচারপতি)-কে আহবান করলেন দরবারে। কাজী দরবারে এলেন। সুলতান জিজ্ঞেস করলেন, "দুর্নীতিপরায়ণ কর্মচারীদের বিকলাংগ করে শাস্তি দেয়া যায় কিনা।” কাজী রায় দিলেন, "এরূপ শাস্তি ইসলাম বিরুদ্ধ।” এই উত্তরে সুলতান মনক্ষুন্ন হলেন। তিনি আবার জানতে চাইলেন, "দেবগিরি থেকে আমি যে ধনসম্পদ লাভ করেছি, তা আমার না জন সাধারণের প্রাপ্য?” নির্ভীক কাজী উত্তর দিলেন, "ইসলামের সৈন্যবল দিয়ে তা অধিকৃত হয়েছে, সে সম্পদ আপনার হতে পারে না। জনসাধারণের কোষাগারে তা অবিলম্বে জমা দেয়া উচিত।”
সুলতান এবার আর ক্রোধ রাখতে পারলেন না। ক্রুদ্ধ ও বিরক্ত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, "জনসাধারণের কোষাগারে আমার ও আমার পুত্র-পরিজনদের অধিকার বা অংশ কতটুকু?”
অবিচল কন্ঠে কাজী উত্তর দিলেন, "একজন সৈনিকের যতটুকু ততটুকু অংশ আপনার ও আপনার পুত্রের প্রাপ্য। আপনার খেয়াল খুশীমত অর্থ যদি আপনি জনসাধারণের কোষাগার থেকে ব্যয় করেন, তাহলে এর জন্য মহা বিচারের দিন আপনাকে আল্লাহর কাছে জবাব দিহি করতে হবে।”
কাজীর কথায় সুলতান ভীষণ রেগে গেলেন। চরম শাস্তি দেবেন বলে সুলতান তাঁকে শাসালেন।
অকম্পিত কন্ঠে কাজী বললেন, "ফাঁসিই দিন আর যাই করুন, যা সত্য তা বলবই।” উপস্থিত সকলেই কাজীর ভবিষ্যত ভেবে শংকিত হয়ে পড়ল।
পরদিন কাজী দরবারে হাজির হলেন। সুলতান কাজীকে সসম্মানে গ্রহণ করলেন দরবারে। বহু মূল্যবান উপঢৌকন দিয়ে তাঁকে সম্মানিত করলেন। নির্মম হলেও আলাউদ্দিন খালজীর সত্যগ্রহন করার সাহস ছিল। তাঁর বাহুবলের সাথে এই সত্য-প্রীতি যুক্ত ছিল বলেই তাঁর একচ্ছত্র প্রভাব সিন্ধু নদ থেকে রামেশ্বরমের সেতু পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল。
📄 দান কমাতে গিয়ে বাড়ল
বাংলাদেশে তখন সুলতানী শাসন। সুলতান ফিরোজ শাহ বাংলার সিংহাসনে। হযরত বিলালের দেশ আবিসিনিয়ার অধিবাসী তিনি। কৃষ্ণাংগ ফিরোজ শাহ সামান্য অবস্থা থেকে সুলতান পদে অধিষ্ঠিত হবার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন।
সুলতান ফিরোজ শাহ ক্ষমতার উচ্চ শিখরে উঠেও দৃষ্টি তার উর্ধমুখী হলো না, নীচের দিকে জনসাধারণের দিকেই নিবদ্ধ থাকলো। ভুললেন না তিনি জনসাধারণের কথা-গরীবদের কথা। তিনি অকাতরে রাজকোষ থেকে গরীব জনগণকে অর্থ দান করতে লাগলেন। অভাবীর সংখ্যা বিপুল, প্রয়োজন তাদের বিরাট। তাই রাজকোষ থেকে অর্থ খরচ হতেও লাগল পানির মতো। রাজ দরবারের আমীর-উমরারা মহাবিপদে পড়ল—প্রমাদ গুণল তারা।
ভাবল সুলতানের এ কী অমিতাচার! এভাবে দান করতে থাকলে তো রাজকোষ শূণ্য হয়ে যাবে। আমীর উমরারা চিন্তা করলো, সুলতান নিজের হাতে অর্থ সাহায্য দেন না, তাই হয়তো অর্থের মায়া তাঁর কাছে বড় হয় না। দিনে যে অর্থ দান করা হয় তা যদি তিনি এক সংগে দেখতে পেতেন, তাহলে এত অর্থ কিছুতেই তিনি দিতে রাজী হতেন না। সামান্য অবস্থা থেকে তিনি এত বড় হয়েছেন, অর্থের মর্যাদা তাঁর চেয়ে আর বেশী কে বুঝবে। সুতরাং মন্ত্রণা পরিষদ পরামর্শ করে ঠিক করল, দানের অর্থ এনে সুলতানের সামনে হাজির করতে হবে। পরামর্শ অনুসারেই কাজ হলো। পরদিন দানের জন্য নির্দিষ্ট একলক্ষ কাঁচা রৌপ্য মুদ্রা এনে স্তূপীকৃত করে একজন মন্ত্রী অতি বিনয় সহকারে বললেন, "এ টাকাগুলোই আজ গরীব ও সাহায্যপ্রার্থীদের মধ্যে বিতরণের জন্য দিয়েছিলেন।”
সুলতান ফিরোজ শাহ সে টাকার দিকে চেয়ে বললেন, "ও আচ্ছা, এ টাকাও তো যথেষ্ট বলে মনে হচ্ছে না। এর সাথে আরও এক লক্ষ টাকা যোগ করে গরীব দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দাও।”
হতবাক মন্ত্রী আর কিছু বলতে পারলো না, বলতে সাহস পেলোনা। সুলতানের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালিত হলো। সেদিন দান করা হলো দু'লক্ষ রৌপ্য মুদ্রা।
ইতিহাসে ব্যক্তিগত ও বংশীয় রাজসিংহাসনে খোদাভীরু শাসকের আগমনে মাঝে মধ্যে এভাবে রাজকোষ জনসাধারণের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে।
📄 নিপীড়ন আনলো নিপীড়িতের সাফল্য
একদিন মহানবী কা'বার চত্বরে একাকী বসে আছেন। তিনি আপন ভাবে বিভোর।
আবু জাহল গিয়ে সেখানে উপস্থিত হলো। নানা প্রকার ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করে মহানবীর (সা) ধৈর্যচ্যুতি ঘটাতে চেষ্টা করল। কিন্তু অনেক চেষ্টাতেও তাঁর মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারলোনা। অবশেষে নবীকে (সা) লক্ষ্য করে সে অনেক গালমন্দ করে। আবু জাহলের এই মূঢ়তায় মহানবী ব্যথিত হলেন। ফিরে এলেন তিনি বাড়ীতে।
মক্কার একজন ক্রীতদাসী সব ঘটনা দেখল। সব কথা সে এসে মহানবীর পিতৃব্য হামজাকে বলে দিল। হামজা সবে শিকার থেকে ফিরেছেন। ভ্রাতুষ্পুত্রের প্রতি আবু জাহলের আচরণের কথা শুনে ক্রোধে জ্বলে উঠলেন। প্রশ্ন তার মনে তার সৎ ও সাধু সজ্জন ভাতিজা কি দোষ করেছে যে সবাই তার উপর অত্যাচার করবে? সে কোন্ কথাটি খারাপ বলে?
হামজা শিকারের ধনুক কাঁধে নিয়ে আবু জাহলের সন্ধানে বের হলেন। কাবা ঘরে তাকে পেয়ে সক্রোধে ধনুক দিয়ে তার মাথায় আঘাত করতে লাগলেন এবং হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠলেন, "পাষন্ড! আর তুই মুহাম্মাদের উপর অত্যাচার করবি? আচ্ছা, আমিও মুহাম্মাদের ধর্ম গ্রহণ করেছি, কি করবি কর।"
অতপর হামজা চলে এলেন মহানবীর কাছে। মহানবীকে বললেন, 'আনন্দিত হও ভাতিজা, আবু জাহলকে শায়েস্তা করেছি।'
মহানবী সব বুঝলেন। কিন্তু আনন্দ কিংবা কৃতজ্ঞতার কোন ভাবই তাঁর মুখে প্রকাশ পেলনা। তিনি বললেন, "চাচা, এতে আনন্দের কিছুই নেই। যদি শুনতাম যে আপনি সত্যকে গ্রহণ করেছেন, তাহলে তা আমার জন্য আনন্দের ব্যাপারহতো।”
হামজার হৃদয় দুলে উঠল। আরো মনে পড়ল, মুহাম্মাদের ধর্ম গ্রহণের কথা তিনি আবু জাহলকে বলেই এসেছেন। এবার অন্তর থেকে তার সাক্ষ্য বেরিয়ে এল লা ইলাহা ইলাল্লাহু।
এইভাবে কুরাইশদের প্রতিদিনের অত্যাচার ইসলামের নতুন নতুন সাফল্যই এনে দিতে লাগল।
📄 ঈমান যেখানে সবার বড়
ইসলামের জন্য অনুকূল মদীনা মুনাওয়ারায় হিজরাতের স্থির সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ার পর মহানবী (সা) মক্কার মুসলমানদের নির্দেশ দিলেন চুপে চুপে একে একে হিজরাত করার জন্যে। মহানবীর (সা) এ নির্দেশ পাবার পর সবাই অত্যন্ত গোপনে হিজরাতের জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন। কিন্তু কথাটা গোপন থাকলো না। শিকারগুলো যাতে পালাতে না পারে সেজন্য বিধর্মী কুরাইশরা সতর্ক হয়ে গেল। এর মধ্যেই মুসলমানরা একা একা অথবা একাধিকজন মিলে বাড়ী-ঘর, সহায়-সম্পত্তি সব ফেলে মদীনায় হিজরাত করতে লাগলেন।
উম্মে সালামা এবং তাঁর স্বামী আবু সালামা হৃদয় বিদারক এক পরীক্ষার সম্মুখীন হলেন হিজরাতের সময়। উম্মে সালামার পিতার গোত্রের লোকরা এসে উম্মে সালামাকে কেড়ে নিয়ে যেতে চাইল, আর আবু সালামার গোত্রের লোকেরা এসে আবু সালামার দুগ্ধপোষ্য আদরের শিশুকে কেড়ে নিল। স্ত্রী ও শিশুর কান্নায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হলো। সব কান্না উপেক্ষা করে আবু সালামার স্ত্রী ও শিশুকে কুরাইশরা কেড়ে নিয়ে গেল। ক্রন্দনরত আবু সালামার ঈমানই কিন্তু সবার উপর বিজয়ী হলো। তিনি চোখ দু'টি মুছে মদীনার পথে যাত্রা করলেন।
আবু সালামা চলে যাবার পর উম্মে সালামার চোখের পানি কোনদিন শুকায়নি। এক বছর পর আত্মীয় স্বজনের মন নরম হলো। তারা শিশুসহ উম্মে সালামাকে এক উটে তুলে দিলো। একমাত্র ঈমানের শক্তি সম্বল করে উম্মে সালামা মদীনার পথে যাত্রা করলেন। পথিমধ্যে দেখা হলো উসমান ইবনে তালহার সাথে। তিনি সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমার সাথে আর কে আছে?' উম্মে সালামা উত্তরে বললেন, 'এই শিশু আর আল্লাহ'। উত্তর শুনে উসমান ইবনে তালহা বলেছেন, তার বুক কেঁপে উঠল। তিনি উম্মে সালামাকে মদীনা পৌঁছে দিলেন।