📘 আমরা সেই জাতি > 📄 এই বিরান ঘরের সাহায্যেই কি আপন ঘর ঠিক করতে এসেছি

📄 এই বিরান ঘরের সাহায্যেই কি আপন ঘর ঠিক করতে এসেছি


খলীফা উমার ইবন আব্দুল আযিযের বাসগৃহ। খলীফার পত্নী ঘরে বসে সেলাই করছিলেন। সে সময়ে একজন মহিলা খলীফার গৃহে প্রবেশ করলো। খলীফার ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল সে। পরিচয় দিল, "আমি সুদূর ইরাক থেকে এসেছি।” খলীফা পত্নী ফাতিমা মহিলাটিকে ঘরে এসে বসতে বললেন। মহিলাটি ঘরে প্রবেশ করে এদিক-ওদিক চাইতে লাগলো। বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলো, ঘরে কোন আসবাবপত্র নেই। সে খলীফা পত্নীর দিকে চেয়ে বললো, "এই বিরান ঘরের সাহায্যেই কি আপন ঘর ঠিক করতে এসেছি!”
খলীফা পত্নী তা শুনে বললেন, "লোকদের ঘর ঠিক করতে গিয়েই তো এ ঘর বিরান হয়েছে।”
এ সময় খলীফা উমার ইবন আব্দুল আযিয বাড়ি প্রবেশ করলেন। খলীফার ঘরের সামনেই একটা কূপ ছিল। খলীফা কূপ থেকে পানি তুলে উঠানের এক জলাধারে ঢালতে লাগলেন। তিনি পানি ঢালছিলেন আর মাঝে মাঝে ফাতিমার দিকে দেখছিলেন। এটা লক্ষ্য করে ইরাক থেকে আসা মহিলা খলীফা পত্নীকে বললো, "আপনি এ বেহায়া লোকটি থেকে কেন পর্দা করেন না? লোকটি তো নির্লজ্জের মত বার বার আপনাকে দেখছে।” খলীফা পত্নী ফাতিমা হেসে বললেন, "ইনিইতো আমীরুল মুমিনীন।”
খলীফা উমার ঘরের দিকে এগিয়ে এলেন। তারপর সালাম করে স্বীয় কক্ষের দিকে চলে গেলেন। জায়নামাযে যাওয়ার আগে খলীফা ফাতিমাকে ডেকে মহিলার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। ফাতিমা মহিলাটির আগমনের উদ্দেশ্য খলীফাকে জানালেন। মহিলার সব বিষয় জেনে খলীফা তাকে কাছে ডাকলেন এবং তার বক্তব্য জানতে চাইলেন। মহিলাটি বলল, "আমি খুবই অভাবগ্রস্ত, আমার পাঁচটি মেয়ে আছে। আমি তাদের ভরণ পোষণ করতে পারি না।” খলীফা তার দুঃখের কাহিনী শুনে খুবই ব্যথিত হলেন। সংগে সংগে তিনি দোয়াত কলম নিয়ে ইরাকের গভর্ণরকে চিঠি লিখলেন। খলীফা মহিলার ১মা, ২য়া, ৩য়া ও ৪র্থা মেয়ের জন্য ভাতা নির্ধারণ করে দিলেন। আর বললেন, "৫ম মেয়েকে ঐ চারজনের ভাতা থেকেই পরিপোষণ করতে হবে।”
মহিলা চিঠি নিয়ে ইরাক চলে এলো। পরে সময় করে দেখা করলো ইরাকের গভর্ণরের সাথে। গভর্ণর উমার ইবন আবদুল আযিযের চিঠি পড়ে কাঁদতে শুরু করলেন। মহিলাটি উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, "খলীফা কি মারা গেছেন?” গভর্ণর হাঁসূচক জবাব দিলেন। মহিলাও কাঁদতে শুরু করলো। গভর্ণর তাকে প্রবোধ দিয়ে বললেন, "তোমার আশংকার কোন কারণ নেই। ঐ মহা মানবের চিঠির অমর্যাদা আমি করব না।” গভর্ণর চিঠির মর্ম অনুসারে মহিলাটিকে তার প্রাপ্যের ব্যবস্থা করে দিলেন।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 খলিফা ফরমাস খাটলেন

📄 খলিফা ফরমাস খাটলেন


খলীফা মামুনের প্রাসাদ। তাঁর প্রাসাদে অতিথি এসেছেন। অতিথি জ্ঞানী ইয়াহইয়া। মেহমান-মেজবান আলোচনায় রত। গভীর রাত। মোমবাতির মিঠা আলো জ্বলছে ঘরে। অতিথির পিপাসা পেয়েছে।
পানির জন্য উৎসুক হয়ে এদিক ওদিক খুঁজতেই খলীফা মামুন জিজ্ঞেস করলেন, "কি চাই আপনার?” অতিথি ইয়াহইয়া তাঁর তৃষ্ণার কথা জানালেন। শুনেই খলীফা উঠে দাঁড়ালেন পানি আনার জন্য। ইয়াহইয়া ব্যস্ত হয়ে খলীফাকে অনুরোধ করলেন "আপনি না উঠে কোন ভৃত্যকে ডাকলে হতো না?”
খলীফা মামুন বললেন, "না না, তা হয় না। খলীফা বলেই কি আপনি আমাকে একথা বলছেন? খলীফা পানি নিয়ে আসতে দোষ কি? স্বয়ং মহানবীই (সা) বলে গেছেন, জাতির প্রধান ব্যক্তি, জনগণের সাধারণ ভৃত্য মাত্র।”
ইয়াহইয়া খলীফার এ কথার কোন জবাব দিতে পারলেন না। মহানবীর (সা) প্রতি, মহানবীর (সা) প্রচারিত আদর্শের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে এল তাঁর। সর্বশক্তিমানের দেয়া কি সে মহান আদর্শ। সে আদর্শ বাদশাহকে বানিয়েছে ফকির, খলীফাকে বানিয়েছে জনগণের ভৃত্য, সেবক ও রক্ষক।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 আপনি এই সামান্য কয়েক তাল মাটি তুলতে পারলেন না

📄 আপনি এই সামান্য কয়েক তাল মাটি তুলতে পারলেন না


স্পেনে তখন হাকামের রাজত্ব। একদিন রাজধানীর নিকটবর্তী একটি স্থান তাঁকে আকৃষ্ট করলো। সেখানে তাঁর জন্য একটি রাজপ্রাসাদ নির্মাণের পরিকল্পনা তিনি ঠিক করে ফেললেন। স্থানটি ছিল এক বৃদ্ধার। বৃদ্ধা সেই স্থানের উপর একটি কুটিরে বাস করতেন। হাকাম স্থানটি উচিত মূল্যে খরিদ করার প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু বৃদ্ধা রাজী হলেন না। তিনি দ্বিগুণ মূল্য দিতে চাইলেন, তবুও বৃদ্ধা সম্মত হলেন না। ক্রুদ্ধ হয়ে হাকাম জোর করে স্থানটি বৃদ্ধার নিকট থেকে কেড়ে নিলেন। অল্প কালের মধ্যেই সে স্থানে বিরাট সুন্দর প্রাসাদ নির্মিত হলো, সম্মুখে তার একটি সুন্দর উদ্যান। বৃদ্ধা কিন্তু নিরুৎসাহিত হলেন না। তিনি সোজা কাজীর কাছে হাকামের বিরুদ্ধে নালিশ করলেন।
কিছুকাল পর হাকাম কাজী সাহেবকে দাওয়াত করলেন তাঁর নতুন প্রাসাদ ও বাগান দেখতে। নির্দিষ্ট সময়ে কাজী একটি গাধা ও কয়েকটি শূন্য থলে নিয়ে উপস্থিত হলেন। বাদশাহ একটু বিস্মিত হলেন। সঙ্গে সঙ্গে একটু কৌতুকও বোধ করলেন। কাজী বাদশাহর কাছে বিনীত নিবেদন জানিয়ে বললেন, "জাঁহাপনা, আমাকে এই বাগান থেকে কয়েক বস্তা মাটি দিতে হুকুম করুন।” এই অদ্ভুত অনুরোধে বাদশাহ তৎক্ষণাৎ রাজী হলেন। কিন্তু মাটি দিয়ে কাজী কি করবেন, তিনি তা আর ভেবে পাননা। কাজী বস্তাগুলো মাটি দিয়ে ভর্তি করলেন, তারপর বাদশাহকে আরও বিস্মিত করে তিনি বস্তাগুলো গাধার পিঠে তুলে দিতে তাকে সাহায্য করতে অনুরোধ করলেন। বাদশাহর কৌতূহল চরমে উঠলো। তিনি তাতেও রাজী হয়ে সানন্দে বস্তাগুলো তুলে দিতে অগ্রসর হলেন। কিন্তু বস্তাগুলো এত ভারী ছিল যে, বাদশাহ শত চেষ্টা করে তার একটিও নড়াতে পারলেন না।
কাজী বাদশাহর দিকে ফিরে চেয়ে বললেন, "আপনি এই সামান্য কয়েক তাল মাটি তুলতে পারলেন না। কিন্তু মহা বিচারের দিন আপনি কি করে গোটা বাগানটাই কাঁধে করে আল্লাহর আদেশে বৃদ্ধাকে ফিরিয়ে দেবেন? কারণ, স্থানটি আপনি বৃদ্ধার নিকট থেকে অন্যায়ভাবে দখল করেছেন।” বাদশাহ লজ্জিত হলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ বৃদ্ধাকে ডেকে পাঠালেন। বৃদ্ধার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তিনি বাগান ও প্রাসাদ সমেত স্থানটি বৃদ্ধাকে দিয়ে দিলেন। শাসনের কর্তৃত্বভার, বড় গুরুদায়িত্ব সে। তার ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য জবাবদিহি করতে হবে মহাবিচারের দিন। আল্লাহর কাছে তার হিসেব নিকেশ দিতে হবে। তাই খলীফাদের, মুসলিম বাদশাহর চিন্তার শেষ নেই, ব্যাকুলতার সীমা নেই। আবার কেউ হয়তো আত্মবিস্মৃত হয়ে ক্ষণিকের জন্য কর্তব্যের কথা ভুলে যান, তখন রূঢ় আঘাত দিয়ে, কৌশল ও তৎপরতার সংগে তার সম্বিত ফিরিয়ে আনতে হয়। খলীফা মানুষ তো। ভুল তাই হতে পারে, কিন্তু ভুলের জন্য ভুগতে হয় জনগণকে, দুর্বলকে। তাই দেশের উজীর, দেশের কাজী, খলীফার প্রতিটি কার্যে তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখেন, নির্মমভাবে আঘাত দিতে, অপ্রিয় ও রূঢ় সত্যকথা বলতে একটুও ইতস্ততঃ বোধ করেন না।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 ফাঁসি দিন আর যা-ই করুন যা সত্য তা বলবই

📄 ফাঁসি দিন আর যা-ই করুন যা সত্য তা বলবই


সুলতান আলাউদ্দিন খালজী তাঁর প্রধান কাজী (প্রধান বিচারপতি)-কে আহবান করলেন দরবারে। কাজী দরবারে এলেন। সুলতান জিজ্ঞেস করলেন, "দুর্নীতিপরায়ণ কর্মচারীদের বিকলাংগ করে শাস্তি দেয়া যায় কিনা।” কাজী রায় দিলেন, "এরূপ শাস্তি ইসলাম বিরুদ্ধ।” এই উত্তরে সুলতান মনক্ষুন্ন হলেন। তিনি আবার জানতে চাইলেন, "দেবগিরি থেকে আমি যে ধনসম্পদ লাভ করেছি, তা আমার না জন সাধারণের প্রাপ্য?” নির্ভীক কাজী উত্তর দিলেন, "ইসলামের সৈন্যবল দিয়ে তা অধিকৃত হয়েছে, সে সম্পদ আপনার হতে পারে না। জনসাধারণের কোষাগারে তা অবিলম্বে জমা দেয়া উচিত।”
সুলতান এবার আর ক্রোধ রাখতে পারলেন না। ক্রুদ্ধ ও বিরক্ত কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, "জনসাধারণের কোষাগারে আমার ও আমার পুত্র-পরিজনদের অধিকার বা অংশ কতটুকু?”
অবিচল কন্ঠে কাজী উত্তর দিলেন, "একজন সৈনিকের যতটুকু ততটুকু অংশ আপনার ও আপনার পুত্রের প্রাপ্য। আপনার খেয়াল খুশীমত অর্থ যদি আপনি জনসাধারণের কোষাগার থেকে ব্যয় করেন, তাহলে এর জন্য মহা বিচারের দিন আপনাকে আল্লাহর কাছে জবাব দিহি করতে হবে।”
কাজীর কথায় সুলতান ভীষণ রেগে গেলেন। চরম শাস্তি দেবেন বলে সুলতান তাঁকে শাসালেন।
অকম্পিত কন্ঠে কাজী বললেন, "ফাঁসিই দিন আর যাই করুন, যা সত্য তা বলবই।” উপস্থিত সকলেই কাজীর ভবিষ্যত ভেবে শংকিত হয়ে পড়ল।
পরদিন কাজী দরবারে হাজির হলেন। সুলতান কাজীকে সসম্মানে গ্রহণ করলেন দরবারে। বহু মূল্যবান উপঢৌকন দিয়ে তাঁকে সম্মানিত করলেন। নির্মম হলেও আলাউদ্দিন খালজীর সত্যগ্রহন করার সাহস ছিল। তাঁর বাহুবলের সাথে এই সত্য-প্রীতি যুক্ত ছিল বলেই তাঁর একচ্ছত্র প্রভাব সিন্ধু নদ থেকে রামেশ্বরমের সেতু পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00