📘 আমরা সেই জাতি > 📄 কিছু অভাব-অভিযোগের কথা নিয়ে এসেছিলাম

📄 কিছু অভাব-অভিযোগের কথা নিয়ে এসেছিলাম


খলীফা সুলাইমান তাঁর মৃত্যুর পূর্বে গাসবা ইবন সাদ ইবন আসকে বিশ হাজার দীনার দান করে একটি দানপত্র লিখে দিয়ে ছিলেন। কিন্তু টাকাটা গাসবার হাতে যাওয়ার পূর্বেই খলীফা সুলাইমানের মৃত্যু ঘটে।
খলীফা সুলাইমানের মৃত্যুর পর উমার ইবন আবদুল আযিয খলীফা হন। তাঁর খলীফা পদে সমাসীন হবার কয়েকদিন পর গাসবা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে বলল, "খলীফা সুলাইমান আমাকে কিছু অর্থ দান করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সে নির্দেশ কোষাগারে এসে পৌঁছেছে। আপনি আমার বন্ধুলোক, আশা করি আমার জন্য খলীফা সুলাইমানের সে নির্দেশ আনন্দের সাথেই কার্যকর করবেন।”
সত্যিই গাসবা উমার ইবন আবদুল আযিযের বন্ধু ছিল। তিনি সহাস্যে বললেন, "কতটাকা?” গাসবা উত্তর দিল "বিশ হাজার দিনার।” শুনে খলীফা উমারের ভ্রুদ্বয় কুঞ্চিত হয়ে উঠলো। তিনি বললেন, "সর্ব সাধারনের সম্পত্তি থেকে কোন একজনকে বিনা কারণে এত টাকা দেয়া কিভাবে সম্ভব? আল্লাহর কসম, আমার পক্ষে এটা কিছুতেই সম্ভব নয়।”
শুনে গাসবা খুবই রেগে গেল। কিন্তু রাগ চেপে সে চিন্তা করতে লাগল, কিভাবে খলীফাকে উচিত জবাব দেয়া যায়, কি করে তাকে জব্দ করা যায়।
সে উমার ইবন আব্দুল আযিযকে খোঁচা দেয়ার একটি পথ পেল। সে বিদ্রুপের হাসি হেসে বলল, "খলীফা সুলাইমান আপনাকেও জাবালুল ওয়ারস'-এর জায়গীর দান করেছেন। ওটা সম্পর্কে তাহলে আপনার সিদ্ধান্ত কি হবে?”
প্রশ্ন শুনে খলীফা হাসলেন, "তোমার ব্যাপারে সিদ্ধান্তের অনেক আগে খলীফার আসনে বসার সংগে সংগেই জাবালুল ওয়ারস' সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি। ওটা যেখান থেকে এসেছে, সেখানেই ফিরে যাবে, তারপর উপযুক্ত প্রার্থীকে তা দিয়ে দেয়া হবে।” বলে তিনি ছেলেকে দিয়ে সিন্দুক থেকে দলিল-দস্তাবেজ আনালেন। তারপর 'জাবালুল ওয়ারস'-এর দলিলটি বের করে গাসবার সামনেই ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে দিলেন। গাসবা আর একটি কথাও না বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
ন্যায় ও সুবিচারের ভিত্তিতে যে সব ফরমান অতীতে জারি হয়নি, উমার ইবন আব্দুল আযিয সে সমস্তই বাতিল করে দিয়েছিলেন। ফলে পূর্ববর্তী খলীফারা বনু উমাইয়াকে অন্যায়ভাবে যেসব ভাতা মঞ্জুর করেছিলেন, সে সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এই সাথে খলীফার এক ফুফুরও ভাতা বন্ধ হয়েছিল। একদিন ফুফু এই অভিযোগ নিয়ে তাঁর কাছে আসলেন। খলীফা তখন রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যস্ত ছিলেন। অল্পক্ষণ পরে আবার তাঁর সামনে গিয়ে দেখলেন খলীফা খেতে বসেছেন। তাঁর সামনে দু'টুকরো রুটি, একটু লবণ ও সামান্য কিছু তেল। ফুফু খলীফার খাবারের আয়োজন দেখে বললেন, "কিছু অভাব অভিযোগের কথা বলতে এসেছিলাম, কিন্তু এখন দেখি তোমার অভাব-অভিযোগের কথাই আমাকে আগে বলতে হবে।” ফুফুর অভিযোগের জবাবে খলিফা বললেন, "কি করব ফুফু আম্মা, এরচেয়ে ভালো খাবার সংগতি আমার নেই।”
ফুফু অনেক ভূমিকার পর বনি উমাইয়ার পক্ষ থেকে বললেন, “তুমি তাদের ভাতা বন্ধ করে দিয়েছ, অথচ তুমি সেসব দান করনি?” খলীফা বললেন, "সত্য ও ন্যায় যা আমি তাই করেছি।”
তারপর তিনি একটি দিনার, একটি জলন্ত অঙ্গারের পাত্র ও একটুকরো গোশত আনালেন। অঙ্গারপাত্রে দিনারটি গরম করলেন, তারপর অগ্নিসদৃশ উত্তপ্ত দিনার গোশতের উপর চেপে ধরলেন। গোশতটি পুড়ে গেল। খলীফা উমার ইবন আবদুল আযিয সেদিকে ইংগিত করে বললেন, "ফুফুজান, আপনি কি আপনার ভাতিজাকে এরূপ কঠিন শাস্তি থেকে বাঁচাতে চান না?” ফুফু সবই বুঝলেন। লজ্জিতভাবে ফিরে এলেন খলীফার কাছ থেকে।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 এই বিরান ঘরের সাহায্যেই কি আপন ঘর ঠিক করতে এসেছি

📄 এই বিরান ঘরের সাহায্যেই কি আপন ঘর ঠিক করতে এসেছি


খলীফা উমার ইবন আব্দুল আযিযের বাসগৃহ। খলীফার পত্নী ঘরে বসে সেলাই করছিলেন। সে সময়ে একজন মহিলা খলীফার গৃহে প্রবেশ করলো। খলীফার ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল সে। পরিচয় দিল, "আমি সুদূর ইরাক থেকে এসেছি।” খলীফা পত্নী ফাতিমা মহিলাটিকে ঘরে এসে বসতে বললেন। মহিলাটি ঘরে প্রবেশ করে এদিক-ওদিক চাইতে লাগলো। বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলো, ঘরে কোন আসবাবপত্র নেই। সে খলীফা পত্নীর দিকে চেয়ে বললো, "এই বিরান ঘরের সাহায্যেই কি আপন ঘর ঠিক করতে এসেছি!”
খলীফা পত্নী তা শুনে বললেন, "লোকদের ঘর ঠিক করতে গিয়েই তো এ ঘর বিরান হয়েছে।”
এ সময় খলীফা উমার ইবন আব্দুল আযিয বাড়ি প্রবেশ করলেন। খলীফার ঘরের সামনেই একটা কূপ ছিল। খলীফা কূপ থেকে পানি তুলে উঠানের এক জলাধারে ঢালতে লাগলেন। তিনি পানি ঢালছিলেন আর মাঝে মাঝে ফাতিমার দিকে দেখছিলেন। এটা লক্ষ্য করে ইরাক থেকে আসা মহিলা খলীফা পত্নীকে বললো, "আপনি এ বেহায়া লোকটি থেকে কেন পর্দা করেন না? লোকটি তো নির্লজ্জের মত বার বার আপনাকে দেখছে।” খলীফা পত্নী ফাতিমা হেসে বললেন, "ইনিইতো আমীরুল মুমিনীন।”
খলীফা উমার ঘরের দিকে এগিয়ে এলেন। তারপর সালাম করে স্বীয় কক্ষের দিকে চলে গেলেন। জায়নামাযে যাওয়ার আগে খলীফা ফাতিমাকে ডেকে মহিলার পরিচয় জিজ্ঞাসা করলেন। ফাতিমা মহিলাটির আগমনের উদ্দেশ্য খলীফাকে জানালেন। মহিলার সব বিষয় জেনে খলীফা তাকে কাছে ডাকলেন এবং তার বক্তব্য জানতে চাইলেন। মহিলাটি বলল, "আমি খুবই অভাবগ্রস্ত, আমার পাঁচটি মেয়ে আছে। আমি তাদের ভরণ পোষণ করতে পারি না।” খলীফা তার দুঃখের কাহিনী শুনে খুবই ব্যথিত হলেন। সংগে সংগে তিনি দোয়াত কলম নিয়ে ইরাকের গভর্ণরকে চিঠি লিখলেন। খলীফা মহিলার ১মা, ২য়া, ৩য়া ও ৪র্থা মেয়ের জন্য ভাতা নির্ধারণ করে দিলেন। আর বললেন, "৫ম মেয়েকে ঐ চারজনের ভাতা থেকেই পরিপোষণ করতে হবে।”
মহিলা চিঠি নিয়ে ইরাক চলে এলো। পরে সময় করে দেখা করলো ইরাকের গভর্ণরের সাথে। গভর্ণর উমার ইবন আবদুল আযিযের চিঠি পড়ে কাঁদতে শুরু করলেন। মহিলাটি উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, "খলীফা কি মারা গেছেন?” গভর্ণর হাঁসূচক জবাব দিলেন। মহিলাও কাঁদতে শুরু করলো। গভর্ণর তাকে প্রবোধ দিয়ে বললেন, "তোমার আশংকার কোন কারণ নেই। ঐ মহা মানবের চিঠির অমর্যাদা আমি করব না।” গভর্ণর চিঠির মর্ম অনুসারে মহিলাটিকে তার প্রাপ্যের ব্যবস্থা করে দিলেন।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 খলিফা ফরমাস খাটলেন

📄 খলিফা ফরমাস খাটলেন


খলীফা মামুনের প্রাসাদ। তাঁর প্রাসাদে অতিথি এসেছেন। অতিথি জ্ঞানী ইয়াহইয়া। মেহমান-মেজবান আলোচনায় রত। গভীর রাত। মোমবাতির মিঠা আলো জ্বলছে ঘরে। অতিথির পিপাসা পেয়েছে।
পানির জন্য উৎসুক হয়ে এদিক ওদিক খুঁজতেই খলীফা মামুন জিজ্ঞেস করলেন, "কি চাই আপনার?” অতিথি ইয়াহইয়া তাঁর তৃষ্ণার কথা জানালেন। শুনেই খলীফা উঠে দাঁড়ালেন পানি আনার জন্য। ইয়াহইয়া ব্যস্ত হয়ে খলীফাকে অনুরোধ করলেন "আপনি না উঠে কোন ভৃত্যকে ডাকলে হতো না?”
খলীফা মামুন বললেন, "না না, তা হয় না। খলীফা বলেই কি আপনি আমাকে একথা বলছেন? খলীফা পানি নিয়ে আসতে দোষ কি? স্বয়ং মহানবীই (সা) বলে গেছেন, জাতির প্রধান ব্যক্তি, জনগণের সাধারণ ভৃত্য মাত্র।”
ইয়াহইয়া খলীফার এ কথার কোন জবাব দিতে পারলেন না। মহানবীর (সা) প্রতি, মহানবীর (সা) প্রচারিত আদর্শের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে এল তাঁর। সর্বশক্তিমানের দেয়া কি সে মহান আদর্শ। সে আদর্শ বাদশাহকে বানিয়েছে ফকির, খলীফাকে বানিয়েছে জনগণের ভৃত্য, সেবক ও রক্ষক।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 আপনি এই সামান্য কয়েক তাল মাটি তুলতে পারলেন না

📄 আপনি এই সামান্য কয়েক তাল মাটি তুলতে পারলেন না


স্পেনে তখন হাকামের রাজত্ব। একদিন রাজধানীর নিকটবর্তী একটি স্থান তাঁকে আকৃষ্ট করলো। সেখানে তাঁর জন্য একটি রাজপ্রাসাদ নির্মাণের পরিকল্পনা তিনি ঠিক করে ফেললেন। স্থানটি ছিল এক বৃদ্ধার। বৃদ্ধা সেই স্থানের উপর একটি কুটিরে বাস করতেন। হাকাম স্থানটি উচিত মূল্যে খরিদ করার প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু বৃদ্ধা রাজী হলেন না। তিনি দ্বিগুণ মূল্য দিতে চাইলেন, তবুও বৃদ্ধা সম্মত হলেন না। ক্রুদ্ধ হয়ে হাকাম জোর করে স্থানটি বৃদ্ধার নিকট থেকে কেড়ে নিলেন। অল্প কালের মধ্যেই সে স্থানে বিরাট সুন্দর প্রাসাদ নির্মিত হলো, সম্মুখে তার একটি সুন্দর উদ্যান। বৃদ্ধা কিন্তু নিরুৎসাহিত হলেন না। তিনি সোজা কাজীর কাছে হাকামের বিরুদ্ধে নালিশ করলেন।
কিছুকাল পর হাকাম কাজী সাহেবকে দাওয়াত করলেন তাঁর নতুন প্রাসাদ ও বাগান দেখতে। নির্দিষ্ট সময়ে কাজী একটি গাধা ও কয়েকটি শূন্য থলে নিয়ে উপস্থিত হলেন। বাদশাহ একটু বিস্মিত হলেন। সঙ্গে সঙ্গে একটু কৌতুকও বোধ করলেন। কাজী বাদশাহর কাছে বিনীত নিবেদন জানিয়ে বললেন, "জাঁহাপনা, আমাকে এই বাগান থেকে কয়েক বস্তা মাটি দিতে হুকুম করুন।” এই অদ্ভুত অনুরোধে বাদশাহ তৎক্ষণাৎ রাজী হলেন। কিন্তু মাটি দিয়ে কাজী কি করবেন, তিনি তা আর ভেবে পাননা। কাজী বস্তাগুলো মাটি দিয়ে ভর্তি করলেন, তারপর বাদশাহকে আরও বিস্মিত করে তিনি বস্তাগুলো গাধার পিঠে তুলে দিতে তাকে সাহায্য করতে অনুরোধ করলেন। বাদশাহর কৌতূহল চরমে উঠলো। তিনি তাতেও রাজী হয়ে সানন্দে বস্তাগুলো তুলে দিতে অগ্রসর হলেন। কিন্তু বস্তাগুলো এত ভারী ছিল যে, বাদশাহ শত চেষ্টা করে তার একটিও নড়াতে পারলেন না।
কাজী বাদশাহর দিকে ফিরে চেয়ে বললেন, "আপনি এই সামান্য কয়েক তাল মাটি তুলতে পারলেন না। কিন্তু মহা বিচারের দিন আপনি কি করে গোটা বাগানটাই কাঁধে করে আল্লাহর আদেশে বৃদ্ধাকে ফিরিয়ে দেবেন? কারণ, স্থানটি আপনি বৃদ্ধার নিকট থেকে অন্যায়ভাবে দখল করেছেন।” বাদশাহ লজ্জিত হলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ বৃদ্ধাকে ডেকে পাঠালেন। বৃদ্ধার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তিনি বাগান ও প্রাসাদ সমেত স্থানটি বৃদ্ধাকে দিয়ে দিলেন। শাসনের কর্তৃত্বভার, বড় গুরুদায়িত্ব সে। তার ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য জবাবদিহি করতে হবে মহাবিচারের দিন। আল্লাহর কাছে তার হিসেব নিকেশ দিতে হবে। তাই খলীফাদের, মুসলিম বাদশাহর চিন্তার শেষ নেই, ব্যাকুলতার সীমা নেই। আবার কেউ হয়তো আত্মবিস্মৃত হয়ে ক্ষণিকের জন্য কর্তব্যের কথা ভুলে যান, তখন রূঢ় আঘাত দিয়ে, কৌশল ও তৎপরতার সংগে তার সম্বিত ফিরিয়ে আনতে হয়। খলীফা মানুষ তো। ভুল তাই হতে পারে, কিন্তু ভুলের জন্য ভুগতে হয় জনগণকে, দুর্বলকে। তাই দেশের উজীর, দেশের কাজী, খলীফার প্রতিটি কার্যে তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখেন, নির্মমভাবে আঘাত দিতে, অপ্রিয় ও রূঢ় সত্যকথা বলতে একটুও ইতস্ততঃ বোধ করেন না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00