📄 উত্তোলিত তলোয়ার কোষবদ্ধ হলো
যুদ্ধের এক ময়দান। মুসলমানদের সাথে কাফিরদের ভীষণ যুদ্ধ চলছে। হযরত আলী (রা) জনৈক বিপুল বলশালী শত্রুর সাথে যুদ্ধে মত্ত রয়েছেন। বহুক্ষণ যুদ্ধ চলার পর তাকে কাবু করে ভূপাতিত করলেন এবং তাকে আঘাত হানার জন্য তাঁর জুলফিকার উর্ধে উত্তোলন করলেন। কিন্তু আঘাত হানার আগেই ভূপাতিত শত্রুটি তাঁর চেহারা মুবারকে থুথু নিক্ষেপ করলো। ক্রোধে হযরত আলীর চেহারা রক্তবর্ণ হয়ে উঠলো। মনে হলো, এই বুঝি তাঁর তরবারি শতগুণ বেশী শক্তি নিয়ে শত্রুকে খন্ড-বিখন্ড করে ফেলে। কিন্তু তা হলো না। যে তরবারিটি আঘাত হানার জন্য উর্ধে উত্তোলিত হয়েছিল এবং যা বিদ্যুৎ গতিতে শত্রুর দেহ লক্ষ্যে ছুটে যাচ্ছিল, তা থেমে গেল। শুধু থেমে গেল নয়, ধীরে ধীরে তা নীচে নেমে এল। পানি যেমন আগুনকে শীতল করে দেয়, তেমনিভাবে আলীর ক্রোধে লাল হয়ে যাওয়া মুখমন্ডলও শান্ত হয়ে পড়ল।
হযরত আলীর এই আচরণে শত্রুটি বিস্ময় বিমূঢ়। যে তরবারি এসে তার দেহকে খন্ড-বিখন্ড করে ফেলার কথা, তা.. আবার কোষবদ্ধ হলো কোন কারণে? বিস্ময়ের ঘোরে শত্রুর মুখ থেকে কিছুক্ষণ কথা সরল না। এমন ঘটনা সে দেখেনি, শোনেওনি কোনদিন। ধীরে ধীরে শত্রুটি মুখ খুলল। বলল, "আমার মতো মহাশত্রুকে তরবারির নীচে পেয়েও তরবারি কোষবদ্ধ করলেন কেন?”
হযরত আলী বললেন, "আমরা নিজের জন্য কিংবা নিজের কোন খেয়াল খুশী চরিতার্থের জন্য যুদ্ধ করিনা। আমরা আল্লাহর পথে আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য যুদ্ধ করি। কিন্তু আপনি যখন আমার মুখে থুথু নিক্ষেপ করলেন তখন প্রতিশোধ গ্রহণের ক্রোধ আমার কাছে বড় হয়ে উঠল। এ অবস্থায় আপনাকে হত্যা করলে সেটা আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য হতোনা। বরং তা আমার প্রতিশোধ গ্রহণ হতো। আমি আমার জন্য হত্যা করতে চাইনি বলেই উত্তোলিত তরবারি ফিরিয়ে নিয়েছি। ব্যক্তিস্বার্থ এসে আমাকে জিহাদের পুণ্য থেকে বঞ্চিত করুক, তা আমি চাইনা।”
শত্রু বলল, "আমিদূর থেকে এতদিন আপনাদের উদারতা, মহানুভবতা ও সত্যনিষ্ঠার কথা শুনেছি, আজ তা নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য অর্জন করলাম।”
শত্রুটি ভূমি শয্যা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সংগে সংগে তাওবাহ করে ইসলাম কবুল করল। এমন অদম্য অতুল্য বীরের ক্ষুদ্ধ হৃদয়েও এত বেশী ক্ষমা এবং স্বস্তি গুণ বিদ্যমান থাকে, এত বড় যোদ্ধা চরম মুহূর্তেও এমন ভীষণ শত্রুকে এতটুকু কর্তব্য বোধে ছেড়ে দিতে পারেন, এত বড় জিতেন্দ্রীয় এত বড় ক্ষমাশীলের ইতিহাস আজ পর্যন্ত রচিত হয়নি-একথা শত্রু অকুন্ঠ চিত্তেই স্বীকার করে নিল।
📄 অপরূপ সুন্দরী রাজকন্যা ও এক হাজার দীনার
হযরত উসমানের (রা) শাসন কাল। নীল ভূমধ্যসাগর তীরের তারাবেলাস নগরী। পরাক্রমশালী রাজা জার্জিসের প্রধান নগরী এটা। এই পরাক্রমশালী রাজা ১লক্ষ ২০ হাজার সৈন্য নিয়ে 'আবদুল্লাহ ইবন সাদে'র নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনীর অগ্রাভিযানের পথ রোধ করে দাঁড়ালেন। স্বয়ং রাজা জার্জিস তাঁর বাহিনীর পরিচালনা করছেন। পাশে রয়েছে তাঁর মেয়ে। অপরূপ সুন্দরী তাঁর সে মেয়ে।
যুদ্ধ শুরু হল। জার্জিস মনে করেছিলেন তাঁর দুধর্ষ বাহিনী এবার মুসলিম বাহিনীকে উচিত শিক্ষা দেবে। কিন্তু তা হল না। মুসলিম বাহিনীর পাল্টা আঘাতে জার্জিস বাহিনীর ব্যূহ ভেংগে পড়ল। উপায়ান্তর না দেখে তিনি সেনা ও সেনানীদের উৎসাহিত করার জন্য ঘোষণা করলেন, "যে বীর পুরুষ মুসলিম সেনাপতি আবদুল্লাহর ছিন্ন শির এনে দিতে পারবে, আমার কুমারী কন্যাকে তার হাতে সমর্পণ করবো।"
জার্জিসের এই ঘোষণা তাঁর সেনাবাহিনীর মধ্যে উৎসাহের এক তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টি করল। তাদের আক্রমণ ও সমাবেশে নতুন উদ্যোগ ও নতুন প্রাণাবেগ পরিলক্ষিত হলো। জার্জিসের সুন্দরী কন্যা লাভের উদগ্র কামনায় তারা যেন মরিয়া হয়ে উঠল। তাদের উন্মাদ আক্রমণে মুসলিম রক্ষা ব্যুহে ফাটল দেখা দিল। মহানবীর শ্রেষ্ঠ সাহাবা হযরত যুবাইরও সে যুদ্ধে শরীক ছিলেন। তিনি সেনাপতি সাদকে পরামর্শ দিলেন, "আপনিও ঘোষণা করুন, যে তারা বেলাসের শাসনকর্তা জার্জিসের ছিন্নমুন্ড এনে দিতে পারবে, তাকে সুন্দরী জার্জিস দুহিতাসহ এক হাজার দিনার বখশিশ দেব।” যুবাইরের পরামর্শ অনুসারে সেনাপতি সা'দ এই কথাই ঘোষণা করে দিলেন।
তারাবেলাসের প্রান্তরে ঘোরতর যুদ্ধ সংঘটিত হলো। যুদ্ধে জার্জিস পরাজিত হলেন। তাঁর কর্তিত শিরসহ জার্জিস কন্যাকে বন্দী করে মুসলিম শিবিরে নিয়ে আসা হলো। কিন্তু এই অসীম সাহসিকতার কাজ কে করল? এই বীরত্বের কাজ কার দ্বারা সাধিত হলো? যুদ্ধের পর মুসলিম শিবিরে সভা আহূত হলো। হাজির করা হলো জার্জিস-দুহিতাকে। সেনাপতি সা'দ জিজ্ঞেস করলেন, "আপনাদের মধ্যে যিনি জার্জিসকে নিহত করেছেন, তিনি আসুন। আমার প্রতিশ্রুত উপহার তাঁর হাতে তুলে দিচ্ছি।”
কিন্তু গোটা মুসলিম বাহিনী নীরব নিস্তব্ধ। কেউ কথা বলল না, কেউ দাবী নিয়ে এগুলোনা। সেনাপতি সা'দ বার বার আহবান জানিয়েও ব্যর্থ হলেন। এই অভূতপূর্ব ব্যাপার দেখে বিস্ময়ে হতবাক হলেন জার্জিস দুহিতা। তিনি দেখতে পাচ্ছেন তাঁর পিতৃহন্তাকে। কিন্তু তিনি দাবী নিয়ে আসছেন না কেন? টাকার লোভ, সুন্দরী কুমারীর মোহ তিনি উপেক্ষা করছেন? এত বড় স্বার্থকে উপেক্ষা করতে পারে জগতের ইতিহাসে এমন জিতেন্দ্রীয় যোদ্ধা-জাতির নাম তো কখনও শুনেননি তিনি। পিতৃহত্যার প্রতি তাঁর যে ক্রোধ ও ঘৃণা ছিল, তা যেন মুহূর্তে কোথায় অন্তর্হিত হয়ে গেল। অপরিচিত এক অনুরাগ এসে সেখানে স্থান করে নিল।
অবশেষে সেনাপতির আদেশে জার্জিস দুহিতাই যুবাইরকে দেখিয়ে দিলেন। বললেন, "ইনিই আমার পিতৃহন্তা, ইনিই আপনার জিজ্ঞাসিত মহান বীর পুরুষ।” সেনাপতি সা'দ যুবাইরকে অনুরোধ করলেন তাঁর ঘোষিত উপহার গ্রহণ করার জন্য।
যুবাইর উঠে দাঁড়িয়ে অবনত মস্তকে বললেন, "জাগতিক কোন লাভের আশায় আমি যুদ্ধ করিনি। যদি কোন পুরষ্কার আমার প্রাপ্য হয় তাহলে আমাকে পুরষ্কৃত করার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।”
📄 মূর্তির নাকের বদলে মানুষের নাক
একদিন আলেকজান্দ্রিয়ার খ্রীষ্টান পল্লীতে হৈ চৈ পড়ে গেল। কে একজন গত রাত্রে যীশু খ্রীষ্টের প্রস্তর নির্মিত প্রতিমূর্তির নাক ভেঙ্গে ফেলেছে। খ্রীষ্টানরা উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। ধরে নিল তারা যে, এটা একজন মুসলমানেরই কাজ। খ্রীষ্টান নেতারা মুসলিম সেনাপতি আমরের কাছে এলো বিচার ও অন্যায় কাজের প্রতিশোধ দাবী করতে। আমর সব শুনলেন। শুনে অত্যন্ত দুঃখিত হলেন। ক্ষতিপূরণ স্বরূপ তিনি প্রতিমূর্তিটি সম্পূর্ণ নতুন করে তৈরী করে দিতে চাইলেন। কিন্তু খ্রীষ্টান নেতাদের প্রতিশোধ নেবার বাসনা ছিল অন্যরূপ। তাদের সংকল্প প্রকাশ করে একজন খ্রীষ্টান নেতা বললো, "যীশুখ্রীষ্টকে আমরা আল্লাহর পুত্র বলে মনে করি। তাঁর প্রতিমূর্তির এরূপ অপমান হওয়াতে আমরা অত্যন্ত আঘাত পেয়েছি। অর্থ এর যথেষ্ট ক্ষতিপূরণ নয়। আমরা চাই আপনাদের নবী মুহাম্মাদের প্রতিমূর্তি তৈরী করে ঠিক অমনি ভাবে তার অসম্মান করি।” এ কথা শুনে বারুদের মত জ্বলে উঠলেন আমর। ভীষণ ক্রোধে মুখমন্ডল উদ্দীপ্ত হয়ে উঠলো। কিছুক্ষণ নীরব থেকে নিজেকে সংযত করে নিয়ে তিনি খ্রীষ্টান বিশপকে লক্ষ্য করে বললেন, "আমার অনুরোধ, এ প্রস্তাব ছাড়া অন্য যে কোন প্রস্তাব করুন আমি তাতে রাজি আছি। আমাদের যে কোন একজনের নাক কেটে আমি আপনাদের দিতে প্রস্তুত, যার নাক আপনারা চান।”
খ্রীষ্টান নেতারাও সকলেই এ প্রস্তাবে সম্মত হলো। পরদিন খৃষ্টান ও মুসলমান বিরাট এক ময়দানে জমায়েত হলো। মিসরের শাসক সেনাপতি আমর সবার সামনে হাজির হয়ে বিশপকে বললেন, "এদেশ শাসনের দায়িত্ব আমার। যে অপমান আজ আপনাদের, তাতে আমার শাসন দুর্বলতাই প্রকাশ পেয়েছে। তাই তরবারি গ্রহণ করুন এবং আপনিই আমার নাসিকা ছেদন করুন।"
এই কথা বলেই তিনি বিশপকে একখানি তীক্ষ্মধার তরবারি হাতে দিলেন। জনতা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, খ্রীষ্টানরা স্তম্ভিত। চারদিকে থমথমে ভাব। সে নীরবতায় নিঃশ্বাসের শব্দ করতেও যেন ভয় হয়। সহসা সেই নীরবতা ভঙ্গ করে একজন মুসলিম সৈন্য এলো। চিৎকার করে বলল, "আমিই দোষী-সিপাহসালারের কোন অপরাধ নেই। আমিই মূর্তির নাসিকা কর্তন করেছি, এই তা আমার হাতেই আছে!” সৈন্যটি এগিয়ে এসে বিশপের তরবারির নীচে নিজের নাসিকা পেতে দিল। স্তম্ভিত বিশপ। নির্বাক সকলে। বিশপের অন্তরাত্মা রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। তরবারি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বিশপ বললেন, "ধন্য সেনাপতি, ধন্য এই বীর সৈনিক, আর ধন্য আপনাদের মুহাম্মাদ যাঁর মহান আদর্শে আপনাদের মত মহৎ, উদার, নির্ভীক ও শক্তিমান ব্যক্তি গড়ে উঠেছে। যীশু খ্রীষ্টের প্রতিমূর্তির অসম্মান করা অন্যায় হয়েছে সন্দেহ নেই, কিন্তু তার চাইতেও অন্যায় হবে যদি আজ আমি এই সুন্দর ও জীবন্ত দেহের অঙ্গহানি করি। সেই মহান ও আদর্শ নবীকেও আমার সালাম জানাই।”
📄 শত্রুকে নিজের তরবারি দান
চতুর্থ খলীফা বীরবর আলী। বিস্ময়কর তাঁর শক্তি, সাহস ও ঔদার্য। এক যুদ্ধের ময়দানে বিপুল বিক্রমে তিনি যুদ্ধ করছেন। একজন বলিষ্ঠ ও সাহসী সৈন্য তাঁর দিকে অগ্রসর হয়ে প্রচন্ড বেগে তাঁকে আক্রমণ করল। তুমুল যুদ্ধ চললো। অকস্মাৎ আলীর আঘাতে শত্রুর তরবারী ভেঙ্গে গেল। শত্রুকে অসহায় দেখে আলী তরবারি কোষ বদ্ধ করলেন। শত্রু মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছে। আলীকে ক্ষান্ত হতে দেখে সে বিস্মিত হলো। সে আলীর কাছে আর একখানি তরবারি চাইতেই আলী তৎক্ষণাৎ দ্বিধাহীন চিত্তে নিজের তরবারি খানি তাকে দিয়ে দিলেন। শত্রু অবাক বিস্ময়ে তাঁর দিকে চেয়ে রইলো। এভাবে আপনাকে অরক্ষিত করে যে বীর অন্যের প্রার্থনা পূর্ণ করে, তাঁর সঙ্গে তো যুদ্ধ অসম্ভব। শত্রু জিজ্ঞাসা করলো, “হে বীর শ্রেষ্ঠ আলী, আপনি কেন এভাবে নিজেকে বিপদের মুখে ফেলে আপনার তরবারি দান করলেন?” আলী উত্তর দিলেন, “কিন্তু আমি যে কারও প্রার্থনা অপূর্ণ রাখিনে।” শত্রু অম্লান বদনে আলীর এই মহত্ত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করলো। সত্যের কাছে অসত্য এমনিভাবে পরাজয় স্বীকার করেছে-যুগে যুগে। সত্যের মহিমা মিথ্যার গর্বকে জয় করেছে।
সত্য-ন্যায়ের শক্তি পশুত্বকে জয় করেছে, অস্ত্রের চাকচিক্য, মৃত্যুর ভ্রুকুটিকে ম্লান করেছে-উপেক্ষা করেছে।