📄 সা’দের প্রাসাদে আগুন
সেনাপতি সা'দ। মুসলিম বাহিনীর অধিনায়ক সা'দ পারস্য জয় করেছেন। বিজয়ের পর হযরত উমার তাঁকে কুফার শাসনকর্তা নিযুক্ত করলেন। সেনাপতি সা'দ তাঁর বিজয় অভিযান কালে পারস্য সম্রাটের বিলাসব্যসন ও আরাম আয়েশের অফুরান নজীর দেখেছেন।
কুফা নগরী সাজাবার সময় বোধ হয় তাঁর সেসব কথা মনে পড়েছিল। তিনি নিজের জন্যও তাই সেখানে একটি প্রাসাদ তৈরী করলেন এবং সম্রাট খসরুর প্রাসাদের একটি তোরণ এনে তাঁর প্রাসাদে সংযুক্ত করলেন। বোধ হয় বিজেতা সা'দের মনে আয়েশের কিঞ্চিত আমেজ এসে বাসা বেঁধেছিল। এনিষ্কলুষ ভোগ তাঁর কাছে কোন খারাপ বিষয় বলেও বোধ হয়নি।
কিন্তু খবরটা খলীফা উমারের কাছে পৌঁছতেই তিনি বারুদের মত জ্বলে উঠলেন। সেনাপতি সা'দের মতি বিভ্রম ঘটেছে কিনা তিনি ভেবে পেলেন না। হযরত উমার (রা) ত্বরিত একজন দূতকে সা'দের নামে একটি চিঠি দিয়ে বললেন, "শোন, পৌঁছেই তুমি সা'দের প্রাসাদে আগুন ধরিয়ে দেবে। সা'দ তোমাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেই তাকে এ চিঠিখানা দেবে।” দূত ছুটল কুফার দিকে। হযরত উমারের যা নির্দেশ ছিল, তাই করল সে। সা'দের প্রাসাদে আগুন ধরিয়ে দিলো। স্তম্ভিত সা'দ খলীফার দূতের এই কান্ড দেখে তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। দূত বিনা বাক্য ব্যয়ে খলীফার চিঠি তাঁর হাতে তুলে দিল। সা'দ চিঠিটি তাঁর চোখের সামনে মেলে ধরলেন। তাতে লিখা ছিলঃ "শুনতে পেলাম, নিজের আরাম-আয়েশের জন্য খসরুর প্রাসাদের মত তুমি এক প্রাসাদ গড়েছো। শুনেছি, খসরুর প্রাসাদের একটি কবাটও এনে তোমার প্রাসাদে লাগিয়েছ। দারোয়ান, সিপাইও রেখেছ। এতে প্রজাদের অভাব অভিযোগ জানাতে অসুবিধা হবে। তা বোধ হয় তুমি নিশ্চয়ই ভাবনি। নবীর পথ পরিত্যাগ করে খসরুর পথ ধরেছো। ভুলোনা, প্রাসাদে বাস করেও খসরুদের দেহ কবরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আর নবী সামান্য কুটিরে বাস করেও সর্বোচ্চ জান্নাতে উন্নীত হয়েছেন। মাসলামাকে তোমার প্রাসাদ পুড়িয়ে ফেলবার জন্য পাঠালাম। বাস করার জন্য একটি কুটির এবং একটি খাজাঞ্চি খানাই যথেষ্ট।” সা'দ নত মস্তকে, অশ্রুসিক্ত নয়নে খলীফার নির্দেশ মেনে নিলেন。
📄 জর্দানের রোমান শাসকের দরবারে মুয়াজ
জর্দানের সুন্দর 'ফাহল' নগরী। ইরাক-জর্দান এলাকায় এটা রোমানদের শেষ দুর্গ। নিরুপায় রোমক বাহিনী মুসলিম সেনাপতি আবু উবাইদার কাছে সন্ধির প্রস্তাব দিল। সন্ধি সম্বন্ধে আলোচনার জন্য সেনাপতি আবু উবাইদাহ মুয়াজ ইবন জাবালকে পাঠালেন রোমক শাসক সাকলাবের দরবারে।
মুয়াজ দরবারে পৌঁছলে সাকলাব তাঁকে পরম সমাদরে একটি কারুকার্যখচিত আসনে বসবার জন্য অনুরোধ করলেন।
কিন্তু মুয়াজ দরবারের মাটির আসনেই বসে পড়লেন। সাকলাব বললেন, "আমরা আপনাকে মর্যাদা দিতে চাই, কিন্তু নিজেই আপনি আপনার সম্মান নষ্ট করেছেন।”
মুয়াজ বললেন, "যে আসন দরিদ্র প্রজাদের বক্ষরক্তে চারু চিত্রের রূপ ধারণ করেছে, সে আসনকে আমরা ঘৃণা করি।” সাকলাব বললেন, "এই আসন দরিদ্র প্রজাদের অর্থে নির্মিত তা আপনি কেমন করে বুঝলেন?”
মুয়াজ বললেন, "আপনার জৌলুসপূর্ণ বেশভূষা আর আপনার সৈন্যদের বেশ দেখেই এটা আমি বুঝেছি।”
রোমান শাসক সাকলাব বললেন, "আপনাদের উর্ধতন কর্মচারী ও আপনাদের প্রভুও কি এরূপ আসনে বসেন না?”
মুয়াজ বললেন, "না, আমীরুল মুমিনীনও এরূপ আসনে উপবিষ্ট হন না। আমাদের প্রভুর কথা বলছেন? একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আমরা কাকেও প্রভু বলে সম্বোধন করি না। আমরা নিজেকে কখনও কোন মানবের দাস বলে ভাবি না। মানুষের উপর মানুষের প্রভুত্ব চালিয়ে যাওয়াকে আমরা মানব ধর্মের বহির্ভূত কাজ বলে মনে করি।”
রোমান শাসকের চোখ দু'টিতে নিঃসীম বিস্ময় ঝরে পড়ল। একটু সময় নিয়ে তিনি বললেন, "আপনারা যদি এমন ন্যায় নিষ্ঠ, তাহলে পররাজ্য অধিকারে আসেন কেন?” মুয়াজ বললেন, "আমরা পররাজ্য অধিকার করি ঠিক, কিন্তু কোন ন্যায় পরায়ণ ও সত্য নিষ্ঠের রাজ্য আমরা দখল করি না। দখল করি আপনাদের মত স্বার্থপরের রাজ্য। তারপর সেখানকার মৃত প্রায় মানুষকে নতুন জীবন দান করি-প্রত্যেকটি মানুষকে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকবার জন্য উদ্বুদ্ধ করি।”
সর্বশেষে সাকলাব বললেন, "আমরা আপনাদেরকে বালকা জিলাসহ জর্দানের কিয়দংশ দিয়ে দেব, আপনারা আমাদের সাথে সন্ধি করুন।” মুয়াজ বললেন, "না আমরা ধন বা রাজ্যলোভে যুদ্ধ করি না। আমরা সাম্য মৈত্রী ও স্বাধীনতার ধর্ম প্রচার করি। হয় আপনারা ইসলামের সত্য ও ন্যায়ের পথ অনুসরণ করুন, নতুবা জিযিয়া দিন। এ দু'টির কোনটিই গৃহীত না হলে যুদ্ধ অনিবার্য।”
দুর্বিনীত রোমক শাসক যুদ্ধের পথই অনুসরণ করল। কিন্তু যুদ্ধ ডেকে আনল তার জন্য চরম পরাজয়। আর মুসলমানদের হাতে তুলে দিল ফাহল, বেসান, আম্মান, জিরাশ, মায়াব প্রভৃতি নগরীসহ গোটা জর্দান প্রদেশ।
📄 উত্তোলিত তলোয়ার কোষবদ্ধ হলো
যুদ্ধের এক ময়দান। মুসলমানদের সাথে কাফিরদের ভীষণ যুদ্ধ চলছে। হযরত আলী (রা) জনৈক বিপুল বলশালী শত্রুর সাথে যুদ্ধে মত্ত রয়েছেন। বহুক্ষণ যুদ্ধ চলার পর তাকে কাবু করে ভূপাতিত করলেন এবং তাকে আঘাত হানার জন্য তাঁর জুলফিকার উর্ধে উত্তোলন করলেন। কিন্তু আঘাত হানার আগেই ভূপাতিত শত্রুটি তাঁর চেহারা মুবারকে থুথু নিক্ষেপ করলো। ক্রোধে হযরত আলীর চেহারা রক্তবর্ণ হয়ে উঠলো। মনে হলো, এই বুঝি তাঁর তরবারি শতগুণ বেশী শক্তি নিয়ে শত্রুকে খন্ড-বিখন্ড করে ফেলে। কিন্তু তা হলো না। যে তরবারিটি আঘাত হানার জন্য উর্ধে উত্তোলিত হয়েছিল এবং যা বিদ্যুৎ গতিতে শত্রুর দেহ লক্ষ্যে ছুটে যাচ্ছিল, তা থেমে গেল। শুধু থেমে গেল নয়, ধীরে ধীরে তা নীচে নেমে এল। পানি যেমন আগুনকে শীতল করে দেয়, তেমনিভাবে আলীর ক্রোধে লাল হয়ে যাওয়া মুখমন্ডলও শান্ত হয়ে পড়ল।
হযরত আলীর এই আচরণে শত্রুটি বিস্ময় বিমূঢ়। যে তরবারি এসে তার দেহকে খন্ড-বিখন্ড করে ফেলার কথা, তা.. আবার কোষবদ্ধ হলো কোন কারণে? বিস্ময়ের ঘোরে শত্রুর মুখ থেকে কিছুক্ষণ কথা সরল না। এমন ঘটনা সে দেখেনি, শোনেওনি কোনদিন। ধীরে ধীরে শত্রুটি মুখ খুলল। বলল, "আমার মতো মহাশত্রুকে তরবারির নীচে পেয়েও তরবারি কোষবদ্ধ করলেন কেন?”
হযরত আলী বললেন, "আমরা নিজের জন্য কিংবা নিজের কোন খেয়াল খুশী চরিতার্থের জন্য যুদ্ধ করিনা। আমরা আল্লাহর পথে আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য যুদ্ধ করি। কিন্তু আপনি যখন আমার মুখে থুথু নিক্ষেপ করলেন তখন প্রতিশোধ গ্রহণের ক্রোধ আমার কাছে বড় হয়ে উঠল। এ অবস্থায় আপনাকে হত্যা করলে সেটা আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্য হতোনা। বরং তা আমার প্রতিশোধ গ্রহণ হতো। আমি আমার জন্য হত্যা করতে চাইনি বলেই উত্তোলিত তরবারি ফিরিয়ে নিয়েছি। ব্যক্তিস্বার্থ এসে আমাকে জিহাদের পুণ্য থেকে বঞ্চিত করুক, তা আমি চাইনা।”
শত্রু বলল, "আমিদূর থেকে এতদিন আপনাদের উদারতা, মহানুভবতা ও সত্যনিষ্ঠার কথা শুনেছি, আজ তা নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য অর্জন করলাম।”
শত্রুটি ভূমি শয্যা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সংগে সংগে তাওবাহ করে ইসলাম কবুল করল। এমন অদম্য অতুল্য বীরের ক্ষুদ্ধ হৃদয়েও এত বেশী ক্ষমা এবং স্বস্তি গুণ বিদ্যমান থাকে, এত বড় যোদ্ধা চরম মুহূর্তেও এমন ভীষণ শত্রুকে এতটুকু কর্তব্য বোধে ছেড়ে দিতে পারেন, এত বড় জিতেন্দ্রীয় এত বড় ক্ষমাশীলের ইতিহাস আজ পর্যন্ত রচিত হয়নি-একথা শত্রু অকুন্ঠ চিত্তেই স্বীকার করে নিল।
📄 অপরূপ সুন্দরী রাজকন্যা ও এক হাজার দীনার
হযরত উসমানের (রা) শাসন কাল। নীল ভূমধ্যসাগর তীরের তারাবেলাস নগরী। পরাক্রমশালী রাজা জার্জিসের প্রধান নগরী এটা। এই পরাক্রমশালী রাজা ১লক্ষ ২০ হাজার সৈন্য নিয়ে 'আবদুল্লাহ ইবন সাদে'র নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনীর অগ্রাভিযানের পথ রোধ করে দাঁড়ালেন। স্বয়ং রাজা জার্জিস তাঁর বাহিনীর পরিচালনা করছেন। পাশে রয়েছে তাঁর মেয়ে। অপরূপ সুন্দরী তাঁর সে মেয়ে।
যুদ্ধ শুরু হল। জার্জিস মনে করেছিলেন তাঁর দুধর্ষ বাহিনী এবার মুসলিম বাহিনীকে উচিত শিক্ষা দেবে। কিন্তু তা হল না। মুসলিম বাহিনীর পাল্টা আঘাতে জার্জিস বাহিনীর ব্যূহ ভেংগে পড়ল। উপায়ান্তর না দেখে তিনি সেনা ও সেনানীদের উৎসাহিত করার জন্য ঘোষণা করলেন, "যে বীর পুরুষ মুসলিম সেনাপতি আবদুল্লাহর ছিন্ন শির এনে দিতে পারবে, আমার কুমারী কন্যাকে তার হাতে সমর্পণ করবো।"
জার্জিসের এই ঘোষণা তাঁর সেনাবাহিনীর মধ্যে উৎসাহের এক তড়িৎ প্রবাহ সৃষ্টি করল। তাদের আক্রমণ ও সমাবেশে নতুন উদ্যোগ ও নতুন প্রাণাবেগ পরিলক্ষিত হলো। জার্জিসের সুন্দরী কন্যা লাভের উদগ্র কামনায় তারা যেন মরিয়া হয়ে উঠল। তাদের উন্মাদ আক্রমণে মুসলিম রক্ষা ব্যুহে ফাটল দেখা দিল। মহানবীর শ্রেষ্ঠ সাহাবা হযরত যুবাইরও সে যুদ্ধে শরীক ছিলেন। তিনি সেনাপতি সাদকে পরামর্শ দিলেন, "আপনিও ঘোষণা করুন, যে তারা বেলাসের শাসনকর্তা জার্জিসের ছিন্নমুন্ড এনে দিতে পারবে, তাকে সুন্দরী জার্জিস দুহিতাসহ এক হাজার দিনার বখশিশ দেব।” যুবাইরের পরামর্শ অনুসারে সেনাপতি সা'দ এই কথাই ঘোষণা করে দিলেন।
তারাবেলাসের প্রান্তরে ঘোরতর যুদ্ধ সংঘটিত হলো। যুদ্ধে জার্জিস পরাজিত হলেন। তাঁর কর্তিত শিরসহ জার্জিস কন্যাকে বন্দী করে মুসলিম শিবিরে নিয়ে আসা হলো। কিন্তু এই অসীম সাহসিকতার কাজ কে করল? এই বীরত্বের কাজ কার দ্বারা সাধিত হলো? যুদ্ধের পর মুসলিম শিবিরে সভা আহূত হলো। হাজির করা হলো জার্জিস-দুহিতাকে। সেনাপতি সা'দ জিজ্ঞেস করলেন, "আপনাদের মধ্যে যিনি জার্জিসকে নিহত করেছেন, তিনি আসুন। আমার প্রতিশ্রুত উপহার তাঁর হাতে তুলে দিচ্ছি।”
কিন্তু গোটা মুসলিম বাহিনী নীরব নিস্তব্ধ। কেউ কথা বলল না, কেউ দাবী নিয়ে এগুলোনা। সেনাপতি সা'দ বার বার আহবান জানিয়েও ব্যর্থ হলেন। এই অভূতপূর্ব ব্যাপার দেখে বিস্ময়ে হতবাক হলেন জার্জিস দুহিতা। তিনি দেখতে পাচ্ছেন তাঁর পিতৃহন্তাকে। কিন্তু তিনি দাবী নিয়ে আসছেন না কেন? টাকার লোভ, সুন্দরী কুমারীর মোহ তিনি উপেক্ষা করছেন? এত বড় স্বার্থকে উপেক্ষা করতে পারে জগতের ইতিহাসে এমন জিতেন্দ্রীয় যোদ্ধা-জাতির নাম তো কখনও শুনেননি তিনি। পিতৃহত্যার প্রতি তাঁর যে ক্রোধ ও ঘৃণা ছিল, তা যেন মুহূর্তে কোথায় অন্তর্হিত হয়ে গেল। অপরিচিত এক অনুরাগ এসে সেখানে স্থান করে নিল।
অবশেষে সেনাপতির আদেশে জার্জিস দুহিতাই যুবাইরকে দেখিয়ে দিলেন। বললেন, "ইনিই আমার পিতৃহন্তা, ইনিই আপনার জিজ্ঞাসিত মহান বীর পুরুষ।” সেনাপতি সা'দ যুবাইরকে অনুরোধ করলেন তাঁর ঘোষিত উপহার গ্রহণ করার জন্য।
যুবাইর উঠে দাঁড়িয়ে অবনত মস্তকে বললেন, "জাগতিক কোন লাভের আশায় আমি যুদ্ধ করিনি। যদি কোন পুরষ্কার আমার প্রাপ্য হয় তাহলে আমাকে পুরষ্কৃত করার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।”