📘 আমরা সেই জাতি 📄 নীতিই উর্ধ্বে স্থান পেলো

📄 নীতিই উর্ধ্বে স্থান পেলো


মক্কার কিছু দূরে হুদাইবিয়া গ্রাম। বিরাট এক বৈঠক বসেছে। বৈঠকে রয়েছেন মহানবী (সা) এবং উল্লেখযোগ্য সব সাহাবী। মুশরিক কুরাইশদের পক্ষ থেকে রয়েছে কয়েকজন প্রভাবশালী সরদার। হুদাইবিয়া সন্ধির শর্তাবলী চূড়ান্ত হয়েছে। কিন্তু তখনও লিখা শুরু হয়নি। এমন সময় মক্কা থেকে আবু জান্দাল এসে সেখানে হাজির হলো। তার হাতে-পায়ে শিকল। সারা গায়ে তার নির্যাতনের চিহ্ন। মুসলমান হওয়ার অপরাধে তাকে আটকে রাখা হয়েছিল। পুনরায় পৌত্তলিক ধর্মে তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য তার আত্মীয়-স্বজন তার উপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছে। কত দিন আর নির্যাতন সইবে সে। মুক্তির আশায় সে পাগল হয়ে উঠেছিল। এই সময় সে জানতে পারে, মহানবী (সা) তাঁর চৌদ্দশ' সাহাবাসহ হুদাইবিয়া পর্যন্ত এসে যাত্রা বিরতি করেছেন। অনেক আশা তার মনে, একবার কোন ক্রমে যদি মহানবীর (সা) কাছে গিয়ে সে পৌঁছতে পারে, তাহলেই তার জীবনে এসে যাবে চির মুক্তির সুবহে সাদিক। আবু জান্দাল হুদাইবিয়ার সে বৈঠকে হাজির হয়ে মহানবীকে (সা) তার সব কথা জানিয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করলো। আবু জান্দালের নির্যাতনের কাহিনী শুনে উপস্থিত মুসলমানদের মনে বেদনার তরংগ বয়ে গেল।
আবু জান্দাল হুদাইবিয়ার বৈঠকে পৌঁছার পর পরই আবু জান্দালের পিতা সুহাইল তার মুখে কয়েকটি চপেটাঘাত করল এবং আবু জান্দালকে তার হাতে ফিরিয়ে দেবার জন্য মহানবীর (সা) কাছে দাবী জানাল। সে বলল, 'হুদাইবিয়া সন্ধির শর্তানুসারে আবু জান্দালকে আপনারা রাখতে পারেন না। তাকে আপনারা ফিরিয়ে দিতে বাধ্য। (হুদাইবিয়ার সন্ধির একটি শর্ত ছিল, মক্কার কোন লোক মুসলমান হয়ে কিংবা অন্যভাবে মুসলমানদের আশ্রয়ে গেলে তাকে মক্কাবাসীদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে)।
সুহাইলের কথা শুনে মহানবী (সা) বললেন, 'সন্ধি এখনো লিখিত হয়নি, স্বাক্ষর তো হয়ইনি। সুতরাং এর শর্ত এই মূহূর্তে মেনে নেয়া কি খুবই জরুরী?'
সুহাইল কিন্তু নাছোড় বান্দা। সে বলল, 'সন্ধি লিখিত ও স্বাক্ষরিত না হলেও কথা তো পাকাপাকি হয়ে গেছে। সুতরাং আবু জান্দালকে আমি অবশ্যই ফিরে পাব।'
মহানবী (সা) সুহাইলের কথার জবাব দিলেন না। সুহাইলের কথা যে অমূলক নয়, তা তিনি জানেন। যা উভয় পক্ষে স্বীকৃত ও নির্দিষ্ট হয়ে গেছে, তা অস্বীকার করা যায় না। চিন্তিত হলেন তিনি। মহানবীকে (সা) নীরব থাকতে দেখে মুসলমানরাও আশংকিত হয়ে পড়লেন। কি জানি, তাদের এক ভাইকে নাকি আবার কাফিরদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হয়। মহানবী (সা) অত্যন্ত নরম ভাষায় আবু জান্দালকে ফেরত না চাইবার জন্য সুহাইলকে অনুরোধ জানালেন। কিন্তু মহানবীর বিনীত প্রার্থনাতেও সুহাইলের মন গলল না।
মহানবীর (সা) সামনে তখন উভয় সংকট। একদিকে সন্ধির শর্ত রক্ষা, অন্যদিকে একজন মুসলমানকে কাফিরদের হাতে ফেরত না দেয়া। সন্ধির শর্ত যেহেতু আগেই নির্ধারিত হয়েছে, তাই সন্ধির শর্ত পালনই তাঁর কাছে বড় হয়ে উঠল। আবু জান্দাল যখন বুঝল যে, তাকে পুনরায় কাফিরদের হাতে ফিরিয়ে দেয়া হবে, তখন সে করুণভাবে কেঁদে উঠল। বলল, "আমি মুসলমান হয়ে আপনাদের কাছে আশ্রয় নিলাম। আর আপনারা আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। কত অত্যাচার, কত যন্ত্রণা যে আমাকে ভোগ করতে হয়, তাতো আপনারা জানেন না।"
আবু জান্দালের কথা শুনে উপস্থিত প্রতিটি মুসলমানের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। মন তাদের বিদ্রোহী হয়ে উঠতে চায়, না আমাদের ভাইকে আমরা ফিরিয়ে দেব না। দরকার হলে, তাকে রক্ষার জন্য যে কোন পরিস্থিতির মুকাবিলা করব। কিন্তু মহানবীর (সা) সৌম্য শান্ত ভাবনার গভীরে নিমজ্জিত মুখের দিকে চেয়ে তারা কিছুই বলতে পারল না।
ব্যথা-বেদনার রাজপথ বেয়ে আবু জান্দালকে বিদায় দেবার সময় মহানবী (সা) তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, "আবু জান্দাল, আল্লাহর নামে ধৈর্য ধর, আল্লাহই তোমার মুক্তির ব্যবস্থা করে দেবেন।” চোখ মুছে আবু জান্দাল আবার ফিরে চলল মক্কায়। ন্যায়-বিচার ও স্বীকৃত নীতিবোধকে এ ভাবেই মুসলমানরা সব সময় সবার উর্ধে স্থান দিয়েছেন।

📘 আমরা সেই জাতি 📄 পরাজিত হুনাইনের বিজয়ের ডাক

📄 পরাজিত হুনাইনের বিজয়ের ডাক


মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী হুনাইনের পার্বত্য অঞ্চল আওতাস। আরবের বিখ্যাত হাওয়াযেন ও সাকিফ গোত্র তাদের অন্যান্য মিত্র গোত্রসহ বিরাট এক বাহিনী নিয়ে সেখানে এসে শিবির গেড়েছে। তারা চায়, মক্কাজয়ী ইসলামী শক্তির উপরে শেষ এবং চূড়ান্ত আঘাত হানতে। তারা সাথে করে নিয়ে এসেছে তাদের নারী, শিশু এবং বৃদ্ধদেরকেও। উদেশ্য, এদের বিপদ ও ভবিষ্যত চিন্তা করে যাতে কেউ যুদ্ধের ময়দান পরিত্যাগ না করে। হাওয়াযেন ও সাকিফ গোত্রের বিখ্যাত তীরন্দাজরা গিরিপথ ও গিরিখাতগুলোতে গোপন অবস্থান গ্রহণ করেছে।
অষ্টম হিজরী। শাওয়াল মাস। মহানবীর (সা) নেতৃত্বে ১২ হাজার সৈন্যের মুসলিম বাহিনী হাওয়াযেন ও সাকিফ বাহিনীর মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। মহানবী (সা) এই প্রথমবারের মত একটি মিশ্র বাহিনীর নেতৃত্ব দিলেন। মুসলিম বাহিনীতে সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী নও মুসলিম ছাড়াও প্রায় দু'হাজারের মত এমন লোক শামিল ছিল যারা তখনও ইসলাম গ্রহণ করেনি। বিশেষ করে মুসলিম সৈন্যদের অগ্রবর্তী বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন খালিদ ইবন ওয়ালিদ। তাঁর অধীনের অধিকাংশই ছিল অতিমাত্রায় উৎসাহী নব্য দীক্ষিত তরুণের দল। সুসজ্জিত ও বিশাল মুসলিম বাহিনীর মনে সেদিন এমন একটি ভাবের সৃষ্টি হলোঃ 'আজ আমাদের সাথে যুদ্ধে জয়ী হয় এমন সাধ্য কার?'
যুদ্ধ শুরু হলো। হাওয়াযেনদের তীর বৃষ্টি গোটা প্রান্তরকে ছেয়ে ফেলল। অগ্রবর্তী বাহিনীতে বিশৃংখলা দেখা দিল। সে বিশৃংখলা সংক্রামক হয়ে ছড়িয়ে পড়ল গোটা বাহিনীতে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সবাই ছুটে পালাতে লাগল। সমগ্র যুদ্ধের ময়দানে শুধু এক ব্যক্তি তাঁর জায়গায় স্থির ও অটলভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি মহানবী (সা)। ময়দানের এক প্রান্তে তখন হযরত উমার (রা)। তলোয়ার থেকে একজন কাফিরের রক্ত মুছতে মুছতে আবু কাতাদাহ (রা) তাঁর সমীপবর্তী হয়ে বললেন, "মুসলমানদের অবস্থা কি?” সিংহ হৃদয় হযরত উমার (রা) অবনত মুখে শান্ত কন্ঠে বললেন, "এটাই আল্লাহর ফায়সালা ছিল।”
বৃষ্টির অবিরাম ধারার মত তীর ছুটে আসছে। এই তীরবৃষ্টির মধ্যে যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে আছেন মহানবী (সা)। তিনি চারদিকে চোখ ফিরিয়ে দেখলেনঃ শূণ্য মাঠ, কেউ কোথাও নেই। তিনি ধীরে ধীরে দক্ষিণ দিকে চোখ ফিরালেন। তাঁর দরাজকন্ঠে ধ্বনিত হলোঃ 'হে আনসারবৃন্দ!' সঙ্গে সঙ্গে সে শূণ্য প্রান্তর পেরিয়ে উত্তর এলঃ 'আমরা উপস্থিত আছি।' মহানবী (সা) বাম দিকে তাকিয়ে সে একই আহবান জানালেন। দক্ষিণের সে উত্তর এল বাম দিক থেকেও। এর পর মহানবী (সা) তাঁর বাহন থেকে নেমে পড়লেন। এ সময় হযরত আব্বাস (রা) এসে পড়লেন। মহানবীর (সা) নির্দেশে হযরত আব্বাসের (রা) সুউচ্চকণ্ঠে ধ্বনিত হলো, "হে আনসারবৃন্দ! হে বৃক্ষতলে শপথকারীগণ।”
এই মর্মস্পর্শী আহবান কর্ণকুহরে পৌঁছার সাথে সাথে ঝড়ের বেগে মুসলিম সৈন্যদল যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে এল। সর্বাগ্রে পৌঁছার আকাংখায় এমন ভিড় জমে গেল যে, অনেকের পক্ষে ঘোড়ায় চড়ে আসা সম্ভব হলো না। তারা ঘোড়া ফেলে রেখে আবার অনেকে শরীরটাকে হালকা করার জন্য গায়ের বর্ম ছুড়ে ফেলে দিয়ে পাগল প্রায় ছুটে এল যুদ্ধ ক্ষেত্রে। অপেক্ষাকৃত কম সংখ্যায় কিছু নিখাদ হয়ে ফিরে আসা মুসলিম বাহিনী বদর, উহুদ ও খন্দকের সেই রূপ আবার ফিরে পেল। মুহূর্তে ঘুরে গেল যুদ্ধের মোড়। সমগ্র আরবের অদ্বিতীয় দুর্ধর্ষ তীরন্দাজ হাওয়াযেন ও সাকিফদের তীরের প্রাচীরও আর মুসলমানদের অগ্রগতি রোধ করতে পারলো না। সাকীফ গোত্রের প্রধান সেনানায়ক উসমান ইবন আবদুল্লাহ নিহত হলো। শত্রুপক্ষ রণে ভংগ দিয়ে পালাল। যারা পালাতে পারল না তারা বন্দী হলো। এই হুনাইনের যুদ্ধে ছ'হাজার শত্রু বন্দী হল এবং চব্বিশ হাজার উট, চল্লিশ হাজার ছাগ-ছাগী ও চার হাজার উকিয়া চান্দী মুসলমানদের হাতে এসে পড়ল।

📘 আমরা সেই জাতি 📄 জিরানা শিবিরের বন্দীমুক্তি

📄 জিরানা শিবিরের বন্দীমুক্তি


তায়েফের সন্নিকটবর্তী জিরানা লোকালয়। হুনাইন যুদ্ধের ছ'হাজার বন্দী এখনও জিরানার মুসলিম শিবিরে বন্দী। তায়েফের অবরোধ শেষ করে মহানবী (সা) ফিরে এলেন জিরানার শিবিরে।
জিরানায় যারা বন্দী ছিল সবাই হাওয়াযেন গোত্রের লোক। হাওয়াযেন গোত্রের একটি শাখা বনু সা'দ। এই বনু সা'দ মহানবীর (সা) দুধমাতা হালিমার কবিলা। এদের সাথেই হেসে-খেলে মহানবীর (সা) শিশুকালের ৫টি বছর কেটেছে। বনু সা'দ কবিলার লোকেরাও হাওয়াযিনদের সাথে বন্দী ছিল জিরানায়।
মহানবী (সা) জিরানায় ফিরে এলে হাওয়াযেনদের একটি সম্মানিত প্রতিনিধিদল মহানবীর (সা) সাথে এসে দেখা করলেন। প্রতিনিধি দলের নেতা যুহাইর ইবন সা'দ মহানবীর (সা) কাছে এসে আরজ করলেন, "যারা বন্দী শিবিরে অবস্থান করছে, তাদের মধ্যে আপনার ফুফু ও খালারাও রয়েছেন। খোদার কসম, যদি আরবের সুলতানদের মধ্য থেকে কেউ আমাদের বংশের কারো দুধ পান করতেন, তাহলে তাঁর কাছে আমাদের অনেক আকাংখা আবদার থাকতো। আর আপনার কাছ থেকে আমরা আরও বেশী আশা রাখি।”
মহানবী (সা) সাগ্রহে তাদের কথা শুনলেন। বোধ হয় তাঁর মন ছুটে গেল সুদূর অতীতের এক দৃশ্যে। ভেসে উঠল তাঁর চোখে, হাওয়াযেনদের উপত্যকা ও প্রান্তর ভূমি। ফুফু-খালা যারা বন্দী তাঁদের স্নেহ তাঁকে কতইনা শান্তির স্নিগ্ধ পরশ বুলিয়েছে। কিন্তু তিনি তো কোন রাজা নন, কিংবা নন কোন ডিক্টেটর অথবা স্বেচ্ছাচারী সম্রাট। সব মুসলমানের স্বার্থ ও মতামত যে বন্দীমুক্তির সাথে জড়িত সে বন্দীদের তো তিনি তাঁর একার ইচ্ছায় ছেড়ে দিতে পারেন না। এ অধিকার সকলের, সকলের সামনেই এটা পেশ করা দরকার। মহানবী (সা) শান্ত স্নিগ্ধ কন্ঠে বললেন, "যুহাইর! যুদ্ধ বন্দীদের উপর আবদুল মুত্তালিবের বংশধরদের অধিকার যতটুকু, তা আমি এই মুহূর্তে ত্যাগ করছি। আর অন্যান্য সকল যুদ্ধ বন্দীর মুক্তির জন্য যোহরের নামাযের পর সমবেত মুসলমানদের কাছে আবেদন কর।”
সে দিনই যোহরের নামাযের পর হাওয়াযেনদের প্রতিনিধি দলটি এসে মুসলমানদের সামনে দাঁড়াল। আবেদন জানাল তারা বন্দীদের মুক্তির জন্য আগের মত করেই। মহানবী (সা) ঠিক আগের মত বললেন, "আমি আমার কবিলার লোকদের অধিকার রাখি, আমি তাদের দাবী পরিত্যাগ করছি। আর মুসলমানদের সকলের কাছে সমস্ত বন্দীর মুক্তির জন্য সুফারিশ করছি।” সমবেত আনসার ও মুহাজির সবাই এক বাক্যে বলে উঠল, "আপনার কবিলার মত আমাদের অধিকারও আপনার উপর অর্পিত হলো।” এর পর মহানবী (সা) ছ'হাজার বন্দীর সকলকেই মুক্তি দিলেন। মহানবী (সা) ইচ্ছা করলে সব বন্দীকে আগেই নিজের ইচ্ছায় মুক্তি দিতে পারতেন। কেউ-ই প্রতিবাদ করতোনা। কিংবা অসন্তুষ্টও হতো না কেউ। কিন্তু সব যুগের সব মানুষের আদর্শ মহানবী তা করেননি। মুসলমানদের শাসক, অধিনায়ক যাঁরা তাঁরা মুসলমানদেরই একজন হবেন, তাঁর অধিকারের সীমাও সকলের চেয়ে বেশী কিছু হবে না, এ উজ্জল শিক্ষাই চিরন্তন করে রাখলেন তিনি পৃথিবীতে।

📘 আমরা সেই জাতি 📄 মুতার রণাঙ্গনে আত্মত্যাগ

📄 মুতার রণাঙ্গনে আত্মত্যাগ


মুতার যুদ্ধ ক্ষেত্র। সিরিয়ার রোমক শাসক শুরাহবিলের নেতৃত্বে এক লক্ষ রোমক সৈন্য দন্ডায়মান। যুদ্ধক্ষেত্রে এক লক্ষ সৈন্যের বিরুদ্ধে তিন হাজার মুসলিম মুজাহিদ দাঁড়িয়ে। মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব করছেন যায়েদ ইবন হারেসা। ঘোরতর যুদ্ধ শুরু হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেনাপতি যায়েদ শহীদ হলেন। মহানবীর (সা) পূর্ব নির্দেশ অনুযায়ী সৈন্য পরিচালনার ভার গ্রহণ করলেন জাফর ইবন আবী তালিব। এক লক্ষ সৈন্যের বিরুদ্ধে তিন হাজার সৈন্যের এক অদ্ভুত অসম যুদ্ধ চলছে। জাফরের এক হাতে পতাকা, অন্য হাতে তাঁর তরবারি। ভীষণতর যুদ্ধে মেতেছেন তিনি। যুদ্ধে প্রথমে তাঁর ডান হাত কাটা গেল, পরে বাম হাত। তাঁর বাম হাত ছিন্ন হওয়ার সাথে সাথে পিছন দিক থেকে এক আঘাত এসে পড়ল তাঁর দেহে। দ্বিখন্ডিত হয়ে ঢলে পড়ল তাঁর দেহ। জাফর যখন শহীদ হলেন, তখন মহানবীর (সা) মনোনীত পরবর্তী সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবন রওয়াহা যুদ্ধ ক্ষেত্রের এক কোণে বসে এক টুকরা গোশত খাচ্ছিলেন। দু'দিন আগে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আর তিনি কিছু খাননি। তিনি যখন খাচ্ছিলেন, সে সময় তাঁর নামে ডাক এল। সঙ্গে সঙ্গে হাত থেকে গোশত ফেলে দিয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। নিজকে সম্বোধন করে বললেন, "জাফর শহীদ হয়ে গেল, আর তুই এখনো দুনিয়ায় ব্যস্ত।”
অতঃপর আবদুল্লাহ ইবন রওয়াহা সৈন্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহন করলেন। ঘোরতর যুদ্ধে ব্যাপৃত হয়ে পড়লেন তিনি। এক আঘাতে তাঁর একটি আঙ্গুল কেটে গেল। মুহূর্তের জন্য আবদুল্লাহ ইবন রওয়াহা একটু দমে গেলেন। বোধ হয় একটু দ্বিধা কিংবা ভয় এল তার মনে। কিন্তু দ্বিধা-ভয় ঝেড়ে ফেলে বললেন, 'হে অন্তর, এখন কিসের জন্য এ চিন্তা! স্ত্রী! আচ্ছা, তাকে তালাক! গোলাম! তাকে আযাদ করে দিলাম। বাগবাগিচা! ঐগুলো আল্লাহর রাস্তায় সদকা করে দিলাম।'
আবদুল্লাহ ইবন রওয়াহার নেতৃত্বে ভীষণতর সংগ্রাম চলতে লাগল 'মুতা' রণাঙ্গনে।
মুতা যুদ্ধে যাত্রা করার সময় আবদুল্লাহ ইবন রওয়াহা বলেছিলেন, "আল্লাহর দরবারে আমার গুনাহর জন্য মাফ চাচ্ছি। আমার জন্য এমন তরবারি আসুক, যদ্বারা ঝরনার মত আমার রক্ত প্রবাহিত করা হবে কিংবা শত্রু এমন বর্শা দিয়ে আমাকে আঘাত করবে যা আমার হৃদপিন্ড বিদীর্ণ করে দেবে এবং লোকেরা আমার কবরের পাশ দিয়ে যাবে, তখন তারা বলবে, আল্লাহ তোমাকে কৃতকার্য এবং তাঁর প্রিয় হিসেবে গ্রহন করুন। বস্তুতঃ তুমি তো প্রিয় এবং সফলকামই ছিলে।”
আবদুল্লাহ ইবন রওয়াহার এ আকাংখা সফল হয়েছিল। শাহাদাতের অমৃত পেয়ালা তিনি পান করেছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার বলেন, "যুদ্ধের পরে যখন আমরা দাফনের জন্য আবদুল্লাহ ইবন রওয়াহার লাশ সংগ্রহ করে নিয়ে এলাম; তখন দেখা গেল, তাঁর শরীরের উপরিভাগে ৯০টি জখম রয়েছে।” যায়েদ, জাফর, আবদুল্লাহ এবং জানবাজ মুজাহিদদের এই আত্মত্যাগই এক লক্ষ রোমক সৈন্যের মনে দারুন বিস্ময় ও ভয় সৃষ্টি করেছিল।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية