📘 আমরা সেই জাতি > 📄 মৃত্যু যেখানে মধুর

📄 মৃত্যু যেখানে মধুর


৬২৩ খ্রীষ্টাব্দের ২রা হিজরী সনের কথা। ইসলামী রাষ্ট্র তখন সবেমাত্র শিশু। একজন আরব শেখ নবীর (সা) কাছে এক দূত পাঠিয়ে বললেন, "আমার দলের লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে উৎসুক, কিন্তু এখানে উপযুক্ত কোন ধর্ম প্রচারক নেই। আপনি যদি কয়েকজন জ্ঞানী ব্যক্তিকে এই উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেন তবে আমরা বিশেষ বাধিত হবো।” আল্লাহর রাসূল (সা) কয়েকজন ধর্মপ্রচারক পাঠিয়ে দিলেন। তাঁরা আরব শেখের অঞ্চলসীমায় পৌঁছামাত্র সেখানের কয়েকজন গোত্রপতি দলবল নিয়ে তাঁদের ঘিরে ফেললো এবং হয় আত্মসমর্পণ নয় তো মৃত্যু এ দুটোর মধ্যে যে কোন একটা বেছে নিতে বললো। খন্ড যুদ্ধ হলো। একে একে অনেকেই শহীদ হলেন। বন্দী হলেন খুবাইব (রা)। তাঁকে তুলে দেয়া হলো মক্কার কুরাইশদের হাতে। নৃশংসতম উপায়ে তাঁকে হত্যা করা হবে ঠিক হলো। নির্দিষ্ট দিনে খুবাইবকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাওয়া হলো। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার জন্য তিনি শেষ অনুরোধ জানালেন। অনুমতি পেয়ে তিনি একটু তাড়াতাড়িই নামায শেষ করলেন। তারপর উপস্থিত সকলকে লক্ষ্য করে বললেন, "জীবনের শেষ নামায একটু দীর্ঘতর করতেই মৃত্যু পথযাত্রীর ইচ্ছা হয়। কিন্তু আমি তা অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ করলাম, পাছে তোমরা মনে কর আমি ভীত হয়ে কালহরণ করছি।” বধ্যমঞ্চে পাঠাবার পূর্বে তাঁকে শেষ বারের জন্য বলা হলো, "এখনও সময় আছে ইসলাম ত্যাগ করে আবার এক নব জীবন লাভ কর।” ধীর শান্ত ও দৃঢ় স্বরে খুবাইব বললেন, "অসত্যের পথে বেঁচে থাকার চাইতে মুসলমান হয়ে মৃত্যুকে বরণ করা শতগুণে শ্রেয়। ইসলামে আত্মসমর্পিত জীবনই আমার কাছে সর্বাধিক মূল্যবান।” উঁচু বধ্যমঞ্চে দৃঢ় পদক্ষেপে খুবাইব উঠে গেলেন। চার দিক থেকে নির্মমভাবে বর্শা ও তীর বর্ষিত হতে লাগলো। নির্ভীক খুবাইব নির্বিকার চিত্তে হাসিমুখে রক্তদান করলেন, শহীদ হলেন। দেহ পড়ে রইলো—মৃত্যুঞ্জয়ী অমর আত্মার যাত্রা শুরু হলো—লোক হতে আনন্দলোকে।
সত্যাশ্রয়ী মানুষ যাঁরা জীবন মৃত্যু তাঁদের পায়ের ভৃত্য। তাই তাঁরাই বহন করেন সত্যের আলো, সত্যের পতাকা। প্রেরণার আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়েন প্রাণে প্রাণে, সৃষ্টি করেন নব নব প্রাণলোক।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 আমরা কাউকে রাজস্ব দেবার মত অবনত হতে পারি না

📄 আমরা কাউকে রাজস্ব দেবার মত অবনত হতে পারি না


সমগ্র আরব উপদ্বীপের বাছাই করা সৈনিকদল এক যোগে পঙ্গপালের মত ছুটে আসছে মদীনা মনোয়ারার দিকে। ওরা চারদিক থেকে একসাথে মদীনার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্ষুদ্র ইসলামী শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়।
মদীনা রক্ষার জন্য তিন হাজার মুসলমান মহানবীর (সা) নেতৃত্বে মদীনা শহর ঘিরে খন্দক কাটছেন। শত্রুরা ছুটে আসছে। হাতে সময় নেই। নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিজনকে দশগজ দীর্ঘ ৫গজ গভীর খন্দক খনন করতে হবে। শীতকাল। বরফজমা ঠান্ডা রাতেও তাই অবিরাম কাজ চলছে। তিনদিন থেকে খাওয়া নেই। পেট পিঠে লেগে গেছে। ক্লান্ত-শ্রান্ত সবাই। কিন্তু মুখে তাদের প্রশান্ত হাসি। চোখ থেকে তাদের ভক্তি ও আনুগত্যের পবিত্র জ্যোতি যেন ঠিকরে পড়ছে। ভক্তি গদ গদ কন্ঠে তারা গাইছে,
"আমরা সেই দল যারা মুহাম্মাদের (সা) হাতে শপথ গ্রহণ করেছে জিহাদের, যতক্ষণ তারা জীবিত থাকবে।”
মহানবীও (সা) খন্দক কাটছেন। তাঁর পেটও পিঠে লাগা। পাথর বাঁধা পেটে। ভক্ত সাহাবীরা তাঁকে সাহায্য করতে চাইছেন। তিনি প্রশান্ত হাসিতে ফিরিয়ে দিচ্ছেন তাদেরঃ তোমরা তোমাদের দায়িত্ব পালন করগে।
তিন হাজার সাহাবীর অবিরাম শ্রমে ২০ দিনে খন্দক কাটা শেষ হলো। শত্রুরা এসে গেছে। অশান্ত, আদিগন্ত সাগর উর্মির মতো তারা এসে ঘিরে ফেলল মদীনাকে। মদীনার ছান-আ পর্বতকে পেছনে আর খন্দককে সামনে রেখে সৈন্য সমাবেশ করলেন মহানবী (সা)।
সমগ্র আরব বাহিনী তিনটি বাহিনীতে বিভক্ত হয়ে মদীনা বেষ্টন করল। উমাইয়া ইবন হিছন ফুজারীর নেতৃত্বে গাতফান বাহিনী, তুলাইহার নেতৃত্বে আসাদ বাহিনী এবং আবু সুফিয়ান ইবন হারবের নেতৃত্বে অবশিষ্ট বাহিনী।
অবরোধ চলছে দিনের পর দিন ধরে। মদীনার তিন দিক ঘিরে দাঁড়ানো আরব বাহিনীর তর্জন গর্জনে মদীনার ভূমিও যেন কাঁপছে। স্বয়ং আল্লাহ এ সময়কার দৃশ্য সম্পর্কে বলেছেনঃ "উপর নীচ সব দিক থেকেই শত্রু যখন তোমাদের উপর আপতিত হলো, যা দেখে তোমাদের চক্ষু স্থির হয়ে গেল। ত্রাসে যখন প্রাণ ওষ্ঠাগত হবার উপক্রম হলো, আর তোমরা আল্লাহ সম্পর্কে বিভিন্ন প্রকার ধারণা করতে লাগলে, তখন মুসলমানদের উপর কঠিন পরীক্ষার সময় এল এবং তাদেরকে সাংঘাতিক রকমের একটি দোদুল্যমান অবস্থায় ফেলে দেয়া হলো।” (সুরা আল-আহযাব)
অবরোধের তীব্রতা এবং শত্রু বাহিনীর জৌলুস ও আস্ফালন দেখে মহানবীও (সা) চিন্তিত হয়ে পড়লেন। চিন্তিত হলেন এই ভেবে, যদি মদীনার আনসারদের মনোবল ভেংগে পড়ে। যদি তারা হতাশ হয়ে পড়ে। মহানবী (সা) এই চরম সংকট মুহূর্তে তাই আনসারদের মনোবলের একবার পরীক্ষা নিতে চাইলেন। তিনি আনসার সর্দার হযরত সা'দ ইবন উবাদা এবং সা'দ ইবন মুয়াযকে ডাকলেন। ডেকে তাদের মতামতের জন্য বললেন, "মদীনার উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ দেবার প্রতিশ্রুতি করে আমরা গাতফান বাহিনীকে অবশিষ্ট আরব বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারি।” আনসার সর্দারদ্বয় শান্তভাবে মহানবীর (সা) প্রস্তাব শুনলেন।
শুনে ধীর কণ্ঠে আরয করলেন, "এটা যদি আল্লাহর হুকুম হয়, তাহলে অস্বীকার করার উপায় নেই। আর যদি রায় বা ব্যক্তিগত অভিমত হয় তাহলে আমাদের নিবেদনঃ ইসলাম আমাদেরকে যে মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে, তা নিয়ে আমরা কাউকে রাজস্ব দেবার মত অবনত হতে পারি না।”
মহানবী (সা) আশ্বস্ত হলেন। নিশ্চিত হলেন, এই উন্নত শির বাহিনীর কাছে শত্রু পক্ষের বিশাল শক্তি বুদ্বুদের মত মিশে যাবে।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 নীতিই উর্ধ্বে স্থান পেলো

📄 নীতিই উর্ধ্বে স্থান পেলো


মক্কার কিছু দূরে হুদাইবিয়া গ্রাম। বিরাট এক বৈঠক বসেছে। বৈঠকে রয়েছেন মহানবী (সা) এবং উল্লেখযোগ্য সব সাহাবী। মুশরিক কুরাইশদের পক্ষ থেকে রয়েছে কয়েকজন প্রভাবশালী সরদার। হুদাইবিয়া সন্ধির শর্তাবলী চূড়ান্ত হয়েছে। কিন্তু তখনও লিখা শুরু হয়নি। এমন সময় মক্কা থেকে আবু জান্দাল এসে সেখানে হাজির হলো। তার হাতে-পায়ে শিকল। সারা গায়ে তার নির্যাতনের চিহ্ন। মুসলমান হওয়ার অপরাধে তাকে আটকে রাখা হয়েছিল। পুনরায় পৌত্তলিক ধর্মে তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য তার আত্মীয়-স্বজন তার উপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছে। কত দিন আর নির্যাতন সইবে সে। মুক্তির আশায় সে পাগল হয়ে উঠেছিল। এই সময় সে জানতে পারে, মহানবী (সা) তাঁর চৌদ্দশ' সাহাবাসহ হুদাইবিয়া পর্যন্ত এসে যাত্রা বিরতি করেছেন। অনেক আশা তার মনে, একবার কোন ক্রমে যদি মহানবীর (সা) কাছে গিয়ে সে পৌঁছতে পারে, তাহলেই তার জীবনে এসে যাবে চির মুক্তির সুবহে সাদিক। আবু জান্দাল হুদাইবিয়ার সে বৈঠকে হাজির হয়ে মহানবীকে (সা) তার সব কথা জানিয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করলো। আবু জান্দালের নির্যাতনের কাহিনী শুনে উপস্থিত মুসলমানদের মনে বেদনার তরংগ বয়ে গেল।
আবু জান্দাল হুদাইবিয়ার বৈঠকে পৌঁছার পর পরই আবু জান্দালের পিতা সুহাইল তার মুখে কয়েকটি চপেটাঘাত করল এবং আবু জান্দালকে তার হাতে ফিরিয়ে দেবার জন্য মহানবীর (সা) কাছে দাবী জানাল। সে বলল, 'হুদাইবিয়া সন্ধির শর্তানুসারে আবু জান্দালকে আপনারা রাখতে পারেন না। তাকে আপনারা ফিরিয়ে দিতে বাধ্য। (হুদাইবিয়ার সন্ধির একটি শর্ত ছিল, মক্কার কোন লোক মুসলমান হয়ে কিংবা অন্যভাবে মুসলমানদের আশ্রয়ে গেলে তাকে মক্কাবাসীদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে)।
সুহাইলের কথা শুনে মহানবী (সা) বললেন, 'সন্ধি এখনো লিখিত হয়নি, স্বাক্ষর তো হয়ইনি। সুতরাং এর শর্ত এই মূহূর্তে মেনে নেয়া কি খুবই জরুরী?'
সুহাইল কিন্তু নাছোড় বান্দা। সে বলল, 'সন্ধি লিখিত ও স্বাক্ষরিত না হলেও কথা তো পাকাপাকি হয়ে গেছে। সুতরাং আবু জান্দালকে আমি অবশ্যই ফিরে পাব।'
মহানবী (সা) সুহাইলের কথার জবাব দিলেন না। সুহাইলের কথা যে অমূলক নয়, তা তিনি জানেন। যা উভয় পক্ষে স্বীকৃত ও নির্দিষ্ট হয়ে গেছে, তা অস্বীকার করা যায় না। চিন্তিত হলেন তিনি। মহানবীকে (সা) নীরব থাকতে দেখে মুসলমানরাও আশংকিত হয়ে পড়লেন। কি জানি, তাদের এক ভাইকে নাকি আবার কাফিরদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হয়। মহানবী (সা) অত্যন্ত নরম ভাষায় আবু জান্দালকে ফেরত না চাইবার জন্য সুহাইলকে অনুরোধ জানালেন। কিন্তু মহানবীর বিনীত প্রার্থনাতেও সুহাইলের মন গলল না।
মহানবীর (সা) সামনে তখন উভয় সংকট। একদিকে সন্ধির শর্ত রক্ষা, অন্যদিকে একজন মুসলমানকে কাফিরদের হাতে ফেরত না দেয়া। সন্ধির শর্ত যেহেতু আগেই নির্ধারিত হয়েছে, তাই সন্ধির শর্ত পালনই তাঁর কাছে বড় হয়ে উঠল। আবু জান্দাল যখন বুঝল যে, তাকে পুনরায় কাফিরদের হাতে ফিরিয়ে দেয়া হবে, তখন সে করুণভাবে কেঁদে উঠল। বলল, "আমি মুসলমান হয়ে আপনাদের কাছে আশ্রয় নিলাম। আর আপনারা আমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। কত অত্যাচার, কত যন্ত্রণা যে আমাকে ভোগ করতে হয়, তাতো আপনারা জানেন না।"
আবু জান্দালের কথা শুনে উপস্থিত প্রতিটি মুসলমানের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। মন তাদের বিদ্রোহী হয়ে উঠতে চায়, না আমাদের ভাইকে আমরা ফিরিয়ে দেব না। দরকার হলে, তাকে রক্ষার জন্য যে কোন পরিস্থিতির মুকাবিলা করব। কিন্তু মহানবীর (সা) সৌম্য শান্ত ভাবনার গভীরে নিমজ্জিত মুখের দিকে চেয়ে তারা কিছুই বলতে পারল না।
ব্যথা-বেদনার রাজপথ বেয়ে আবু জান্দালকে বিদায় দেবার সময় মহানবী (সা) তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, "আবু জান্দাল, আল্লাহর নামে ধৈর্য ধর, আল্লাহই তোমার মুক্তির ব্যবস্থা করে দেবেন।” চোখ মুছে আবু জান্দাল আবার ফিরে চলল মক্কায়। ন্যায়-বিচার ও স্বীকৃত নীতিবোধকে এ ভাবেই মুসলমানরা সব সময় সবার উর্ধে স্থান দিয়েছেন।

📘 আমরা সেই জাতি > 📄 পরাজিত হুনাইনের বিজয়ের ডাক

📄 পরাজিত হুনাইনের বিজয়ের ডাক


মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী হুনাইনের পার্বত্য অঞ্চল আওতাস। আরবের বিখ্যাত হাওয়াযেন ও সাকিফ গোত্র তাদের অন্যান্য মিত্র গোত্রসহ বিরাট এক বাহিনী নিয়ে সেখানে এসে শিবির গেড়েছে। তারা চায়, মক্কাজয়ী ইসলামী শক্তির উপরে শেষ এবং চূড়ান্ত আঘাত হানতে। তারা সাথে করে নিয়ে এসেছে তাদের নারী, শিশু এবং বৃদ্ধদেরকেও। উদেশ্য, এদের বিপদ ও ভবিষ্যত চিন্তা করে যাতে কেউ যুদ্ধের ময়দান পরিত্যাগ না করে। হাওয়াযেন ও সাকিফ গোত্রের বিখ্যাত তীরন্দাজরা গিরিপথ ও গিরিখাতগুলোতে গোপন অবস্থান গ্রহণ করেছে।
অষ্টম হিজরী। শাওয়াল মাস। মহানবীর (সা) নেতৃত্বে ১২ হাজার সৈন্যের মুসলিম বাহিনী হাওয়াযেন ও সাকিফ বাহিনীর মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। মহানবী (সা) এই প্রথমবারের মত একটি মিশ্র বাহিনীর নেতৃত্ব দিলেন। মুসলিম বাহিনীতে সদ্য ইসলাম গ্রহণকারী নও মুসলিম ছাড়াও প্রায় দু'হাজারের মত এমন লোক শামিল ছিল যারা তখনও ইসলাম গ্রহণ করেনি। বিশেষ করে মুসলিম সৈন্যদের অগ্রবর্তী বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন খালিদ ইবন ওয়ালিদ। তাঁর অধীনের অধিকাংশই ছিল অতিমাত্রায় উৎসাহী নব্য দীক্ষিত তরুণের দল। সুসজ্জিত ও বিশাল মুসলিম বাহিনীর মনে সেদিন এমন একটি ভাবের সৃষ্টি হলোঃ 'আজ আমাদের সাথে যুদ্ধে জয়ী হয় এমন সাধ্য কার?'
যুদ্ধ শুরু হলো। হাওয়াযেনদের তীর বৃষ্টি গোটা প্রান্তরকে ছেয়ে ফেলল। অগ্রবর্তী বাহিনীতে বিশৃংখলা দেখা দিল। সে বিশৃংখলা সংক্রামক হয়ে ছড়িয়ে পড়ল গোটা বাহিনীতে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সবাই ছুটে পালাতে লাগল। সমগ্র যুদ্ধের ময়দানে শুধু এক ব্যক্তি তাঁর জায়গায় স্থির ও অটলভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি মহানবী (সা)। ময়দানের এক প্রান্তে তখন হযরত উমার (রা)। তলোয়ার থেকে একজন কাফিরের রক্ত মুছতে মুছতে আবু কাতাদাহ (রা) তাঁর সমীপবর্তী হয়ে বললেন, "মুসলমানদের অবস্থা কি?” সিংহ হৃদয় হযরত উমার (রা) অবনত মুখে শান্ত কন্ঠে বললেন, "এটাই আল্লাহর ফায়সালা ছিল।”
বৃষ্টির অবিরাম ধারার মত তীর ছুটে আসছে। এই তীরবৃষ্টির মধ্যে যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে আছেন মহানবী (সা)। তিনি চারদিকে চোখ ফিরিয়ে দেখলেনঃ শূণ্য মাঠ, কেউ কোথাও নেই। তিনি ধীরে ধীরে দক্ষিণ দিকে চোখ ফিরালেন। তাঁর দরাজকন্ঠে ধ্বনিত হলোঃ 'হে আনসারবৃন্দ!' সঙ্গে সঙ্গে সে শূণ্য প্রান্তর পেরিয়ে উত্তর এলঃ 'আমরা উপস্থিত আছি।' মহানবী (সা) বাম দিকে তাকিয়ে সে একই আহবান জানালেন। দক্ষিণের সে উত্তর এল বাম দিক থেকেও। এর পর মহানবী (সা) তাঁর বাহন থেকে নেমে পড়লেন। এ সময় হযরত আব্বাস (রা) এসে পড়লেন। মহানবীর (সা) নির্দেশে হযরত আব্বাসের (রা) সুউচ্চকণ্ঠে ধ্বনিত হলো, "হে আনসারবৃন্দ! হে বৃক্ষতলে শপথকারীগণ।”
এই মর্মস্পর্শী আহবান কর্ণকুহরে পৌঁছার সাথে সাথে ঝড়ের বেগে মুসলিম সৈন্যদল যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে এল। সর্বাগ্রে পৌঁছার আকাংখায় এমন ভিড় জমে গেল যে, অনেকের পক্ষে ঘোড়ায় চড়ে আসা সম্ভব হলো না। তারা ঘোড়া ফেলে রেখে আবার অনেকে শরীরটাকে হালকা করার জন্য গায়ের বর্ম ছুড়ে ফেলে দিয়ে পাগল প্রায় ছুটে এল যুদ্ধ ক্ষেত্রে। অপেক্ষাকৃত কম সংখ্যায় কিছু নিখাদ হয়ে ফিরে আসা মুসলিম বাহিনী বদর, উহুদ ও খন্দকের সেই রূপ আবার ফিরে পেল। মুহূর্তে ঘুরে গেল যুদ্ধের মোড়। সমগ্র আরবের অদ্বিতীয় দুর্ধর্ষ তীরন্দাজ হাওয়াযেন ও সাকিফদের তীরের প্রাচীরও আর মুসলমানদের অগ্রগতি রোধ করতে পারলো না। সাকীফ গোত্রের প্রধান সেনানায়ক উসমান ইবন আবদুল্লাহ নিহত হলো। শত্রুপক্ষ রণে ভংগ দিয়ে পালাল। যারা পালাতে পারল না তারা বন্দী হলো। এই হুনাইনের যুদ্ধে ছ'হাজার শত্রু বন্দী হল এবং চব্বিশ হাজার উট, চল্লিশ হাজার ছাগ-ছাগী ও চার হাজার উকিয়া চান্দী মুসলমানদের হাতে এসে পড়ল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00