📄 ইমাম ইউনুসের ব্যবসায়
ইমাম ইউনুস বিন ওবায়েদের কথা। তিনি ইসলামের একজন বড় খাদেম। এই সাথে সাথে বড় ব্যবসায়ীও। বিরাট তাঁর কাপড়ের ব্যবসা। বিভিন্ন দামের কাপড় থরে থরে সজ্জিত তাঁর দোকানে।
তাঁর দোকানে এক ধরনের প্রতি জোড়া কাপড়ের দাম ছিল ৪০০ দিরহাম। অন্য আর এক ধরনের কাপড়ের প্রতি জোড়ার দাম ছিল ২০০ দিরহাম।
একদিন তিনি ভাতিজাকে দোকানে রেখে আসরের নামায পড়তে গেলেন। এ সময় একজন খদ্দের তাঁর দোকানে গেল এবং ৪০০ দিরহাম দামের একজোড়া কাপড় চাইল।
ইমাম ইউনুসের ভাতিজা তাকে ২শ' দিরহাম দামের এক জোড়া দিল।
খদ্দের কাপড় জোড়া দেখে পছন্দ করল এবং ৪০০ দিরহাম দিয়ে কাপড়টি নিয়ে নিল।
যখন খদ্দেরটি কাপড় নিয়ে চলে যাচ্ছিল, তখন ইমাম ইউনুস নামায পড়ে ফিরছিলেন। লোকটির হাতে কাপড় জোড়া দেখে চিনতে পারলেন যে, তাঁর দোকানের কাপড়। তিনি খদ্দেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, সে কাপড়টি কত টাকা দিয়ে কিনেছে?
লোকটি বলল, ৪০০ দিরহাম। ইমাম বললেন, 'এটা তো দু'শ' দিরহামের কাপড়। যান কাপড় ফেরত দিয়ে আসুন।'
লোকটি বলল, আমি কাপড় পছন্দ করেই ঐ দাম দিয়ে কিনেছি। আমার এলাকায় এ কাপড়ের দাম ৫০০ দিরহাম। সুতরাং আমি ঠকিনি।
ইমাম বললেন, 'না কাপড় আপনাকে ফেরত দিতেই হবে। কারণ, ইসলামে মানুষের ব্যাপারে হিত কামনার চেয়ে উত্তম আর কিছু হতে পারে না।'
ইমাম তাঁর ভাতিজাকে দারুণ ভর্ৎসনা করলেন, বললেন, 'তোমার মনে আল্লাহর ভয় হলো না?' ভাতিজা দুঃখ প্রকাশ করে বলল, 'খদ্দের মহোদয় কাপড় দেখে শুনে পছন্দ করে ঐ দামে কিনেছিলেন।'
ইমাম ইউনুস বললেন, নিজের জন্য যা পছন্দ কর, তা অপরের জন্যও পছন্দ করতে হয়, এ কথা ভুললে কেন?
📄 আবু ইউসুফের বিচার
আব্বাসীয় খলিফা হাদী'র শাসনকাল。
বাগদাদে প্রধান বিচারপতি আবু ইউসুফের আদালত।
এক ব্যক্তি একটি মামলা নিয়ে এলেন আদালতে。 মামলা স্বয়ং খলিফা হাদী'র বিরুদ্ধে।
একটা বাগান নিয়ে খলিফার সাথে তাঁর ঝগড়া। লোকটির দাবী বাগানটি খলিফা হাদীর নয়, তাঁর।
সব শুনে বিচারপতি আবু ইউসুফ নিশ্চিত হলেন বাগানটি লোকটিরই প্রাপ্য। কিন্তু সমস্যা হলো খলিফার পক্ষে দু'জন সাক্ষ্য দিচ্ছে। এই অবস্থায় বিচারপতি আবু ইউসুফ সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য খলিফাকে আদালতে হাজির হবার নির্দেশ দিলেন।
খলিফা আদালতে হাজির হলে বিচারপতি আবু ইউসুফ তাঁকে বললেন, 'খলিফার সাক্ষীরা যে সত্যবাদী এ ব্যাপারে খলিফাকে শপথ করতে হবে।'
খলিফা এই শপথ করার চাইতে বাগানটি বাদীকে ছেড়ে দেয়াকেই সহজ মনে করলেন এবং বাগানটি বাদীকে দিয়ে দিলেন।
আবু ইউসুফের আরেকটি বিচারের ঘটনা।
আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশীদ তখন শাসন ক্ষমতায়। একটি মামলায় খলিফা আবু ইউসুফের আদালতে হাজির হলেন। খলিফার দাবীর পক্ষে সাক্ষী ছিল ফজল ইবনুর রাবী।
বিচারপতি আবু ইউসুফ ফজল ইবনুর রবীর সাক্ষ্য বাতিল করে দিলেন।
খলিফা হারুনুর রশীদ ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, "ফজলের সাক্ষ্য নাকচ করে দেবার কারণ কি?"
বিচারপতি আবু ইউসুফ বললেন, "আমি ফজলকে বলতে শুনেছি যে, সে আপনার গোলাম।” যদি তার কথা সত্য হয়, তাহলে আপনার গোলামের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়, আর যদি সে আপনার গোলাম না হয় তাহলে সে মিথ্যুক。 মিথ্যুকের সাক্ষ্য গ্রহণ করা যেতে পারে না।"
📄 জালেম শাসকের সামনে নির্ভীক আলেম
জাহির নামের এক সুলতান তখন দামেস্কের সিংহাসনে। বৃষ্টি না হওয়ায় পশুর মড়ক ইত্যাদি কারণে সিরিয়ায় তখন দুর্ভিক্ষাবস্থা। মানুষের দুর্গতির সীমা নেই।
এই সময় যুদ্ধ-প্রস্তুতির কথা বলে শাসক জাহির জনগণের উপর ট্যাক্স বসালেন। দামেক্কেই বাস করতেন শেখ মহিউদ্দিন নববী নামের এক বিখ্যাত আলেম। তিনি সুলতান জাহিরের কাছে এক চিঠি লিখে দুর্গত জনগণের উপর ট্যাক্স না বসাবার জন্যে অনুরোধ করলেন।
শেখ মহিউদ্দিনের এই চিঠি পেয়ে সুলতান ক্ষুব্ধ হলেন এবং তার ট্যাক্স বসাবার পক্ষে আলেমদের ফতোয়া জোগাড় করতে লাগলেন।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মাধ্যমে এ ধরনের বহুসংখ্যক ফতোয়া জোগাড় হবার পর জাহির ডাকলেন শেখ মহিউদ্দিনকে তাঁর দরবারে।
শেখ দরবারে এলে সুলতান তাঁকে ফতোয়ায় অন্য আলেমদের দস্তখত দেখিয়ে ট্যাক্স বৃদ্ধির পক্ষে তাঁকেও দস্তখত দিতে বললেন।
সুলতান জাহির-এর এই কৌশল ও তাঁর উপর চাপ প্রয়োগ দেখে শেখ মহিউদ্দিন নববী খুবই অসন্তুষ্ট হলেন। তিনি সুলতানকে বললেন, 'আমি জানি, আপনি একজন কয়েদী ক্রীতদাস ছিলেন। ছিলেন একজন দেউলিয়া। আল্লাহ আপনার উপর অনুগ্রহ করেন এবং আপনাকে বাদশাহর মর্যাদায় উন্নীত করেন। আমি জানি, আপনার কাছে জরিদার কাপড় পরিহিত এক হাজার ক্রীতদাস এবং আপাদমস্তক স্বর্ণালংকারে মণ্ডিত একশো ক্রীতদাসী রয়েছে। এখন আপনি যদি ক্রীতদাসদের এই জরিদার কাপড়গুলো এবং দাসীদের অলংকারসমূহ বিক্রি করে দেন, তাহলে আমি ফতোয়া দেব যে, প্রজাদের নিকট থেকে আপনার ট্যাক্স আদায় বৈধ।” সুলতান জাহির ক্রোধে ফেটে পড়লেন শেখ মহিউদ্দিনের এই কথায়। তৎক্ষণাত তাঁকে বহিষ্কার করলেন দামেস্ক থেকে।
দেশের সমস্ত আলেম ও ফকিহগণ আহত হলেন এই ঘটনায়। তাঁরা সকলে সুলতান জাহিরকে বললেন, "ইনি আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় ও সবার সেরা আলেম। তাঁকে দামেস্কে ফিরিয়ে আনুন।"
বাদশাহ জাহির অনুমতি দিলেন শেখ মহিউদ্দিনকে দামেস্কে আসার জন্যে। কিন্তু শেখ মহিউদ্দিন সুলতানের এই অনুগ্রহ গ্রহণ করতে অস্বীকার করে বললেন, 'যতদিন জাহির সেখানে থাকবেন, আমি যাব না।' এই ঘটনার এক মাসের মধ্যে জাহির ইন্তিকাল করলেন。
📄 ‘এ দরবারে শুধু একজন আলেমই আছেন’
সুলতান আবদুল আজিজ মিসর সফরে আসছেন। সাড়া পড়ে গেছে গোটা মিসরে। মিসরের শাসক ইসমাঈল সম্বর্ধনার আয়োজনে মহাব্যস্ত। সুলতান খুশী হলে শুধু তার আসন পাকাপোক্ত হওয়াই নয়, বহু আকাঙ্ক্ষিত খেতাবও এবার মিলে যেতে পারে।
সুলতানের জন্যে আড়ম্বরপূর্ণ সম্বর্ধনার ব্যবস্থা করলেন। নির্দিষ্ট দিনে সুলতান আবদুল আজিজ মিসরে আসলেন। তাঁর সম্মানে বিশেষ দরবার বসানো হলো।
সুলতানকে সম্মান প্রদর্শনের জন্যে আলেমদেরও একত্রিত করা হয়েছে।
আলেমদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাঁরা অবনত মস্তকে দরবারে সুলতানের সামনে হাজির হবেন এবং মাথা ঝুঁকিয়ে কুর্নিশ করার পর পিছু হটে দরবার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, সুলতানকে পেছন দেখিয়ে অসম্মান করা যাবে না কিছুতেই। সুলতান খুশী হলে আলেমরা প্রচুর ইনাম পাবেন।
একে একে আলেমরা দরবারে প্রবেশ করতে লাগলেন অবনত মস্তকে এবং কুর্নিশ করে পিছু হটে বেরিয়ে এলেন।
আলেমদের মধ্যে ছিলেন শেখ হাসানুল আদাদী। সর্বশেষে এল তাঁর দরবারে প্রবেশের পালা।
তিনি উন্নত শিরে দরবারে প্রবেশ করলেন। সুলতানকে কুর্নিশ না করে তিনি সালাম দিলেন। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে যেভাবে দরবারে প্রবেশ করেছিলেন, সেইভাবে উন্নত শিরে দরবার থেকে বেরিয়ে এলেন।
সুলতানের কাছে বসা ইসমাঈলের মন হায় হায় করে উঠল। সুলতান নিশ্চয় অপমানিত বোধ করেছেন এবং ভীষণ ক্ষুব্ধ হবেন নিশ্চয়।
দরবার শুদ্ধ সকলের মুখ শুকিয়ে গেল। মহামান্য সুলতান কি করেন সেই শংকা দেখা দিল সকলের মনে।
দরবার থেকে বের হলে সকলেই শেখ হাসানুলকে ছেঁকে ধরলো। বলল তাঁকে, আপনি একি করলেন সবকিছু জানার পরেও।
শেখ বললেন, একজন সুলতান হিসেবে যে সম্মান পাওয়া উচিত তাঁকে তা দিয়েছি।
দরবার শেষ করার আগে সুলতান আবদুল আজিজ আলেমদের মধ্যে শুধু শেখ হাসানুল আদাদীকেই পুরস্কৃত করলেন এবং বললেন, 'এই দরবারে শুধু এই একজন আলেমই রয়েছেন।'