📄 আল-বেরুনীর জ্ঞান পিপাসা
জ্ঞানানুসন্ধিৎসু আল-বেরুনীর মৃত্যুকালীন অবস্থা সম্পর্কে ফকীহ আবুল হাসান বলেনঃ
"যখন আমি তাঁর শয্যাপাশে গেলাম, তখন দেখলাম তিনি শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। তিনি আমাকে দেখে বললেন, একদিন আপনি আমাকে নানীর সম্পত্তির অংশ ভাগ সম্পর্কে বলেছিলেন। আপনি কি অনুগ্রহ করে সে কথা বলবেন যাতে আমি তা আবার স্মরণ করতে পারি।"
আমি বললাম, 'আপনার এই অবস্থায় সেই আলোচনা আমি কিভাবে তুলি?' তিনি বললেন, 'এ বিষয়টি না জেনে পৃথিবী থেকে যাওয়ার চেয়ে জেনে যাওয়াই ভাল।'
আমি সেই ভাগ-বন্টনের ফর্মুলা বললাম। আল-বেরুনী তা মুখস্থ করে আমাকে শুনালেন তাঁর ভুল শুধরাবার জন্যে।
এর পর তাঁর শয্যাপাশ থেকে চলে এলাম। রাস্তায় পা দেবার আগেই শুনতে পেলাম সেই জ্ঞানতাপস আর দুনিয়াতে নেই।
📄 বাবরের আমানতদারী
ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর। মধ্যএশিয়ার ফারগানা রাজ্যের শাসন কর্তার তিনি ছেলে। পরে তিনি ফারগানার শাসনকর্তা হন। বহু উত্থান-পতনে ভরা ছিল তাঁর জীবন। সবকিছু ছাপিয়ে তাঁর চরিত্র ছিল হিরকের মত উজ্জ্বল। তাঁর সততা, মানবিকতা ছিল কিংবদন্তির মত মানুষের মুখে মুখে।
বাবর যখন ফারগানার শাসনকর্তা, তখন একটি বাণিজ্য কাফিলার মালিক ইন্দিজান পাহাড় এলাকায় বজ্রপাতে মারা যায়। বাবর এ কাফিলার সমস্ত সম্পদ সংগ্রহ করে জমা করতে এবং মালিকের উত্তরাধিকারীদের কাছে ফেরত দেয়ার নির্দেশ দেন।
দু'বছর পর এ উত্তরাধিকারীরা আসে এবং সমস্ত জিনিস ফেরত পায়। বাবরকে তারা উপঢৌকন দিতে চায়। কিন্তু বাবর শুধু প্রত্যাখ্যানই করেননি উপরন্তু তাদের আসা-যাওয়ার সব খরচ বহন করেন。
📄 ইমাম ইউনুসের ব্যবসায়
ইমাম ইউনুস বিন ওবায়েদের কথা। তিনি ইসলামের একজন বড় খাদেম। এই সাথে সাথে বড় ব্যবসায়ীও। বিরাট তাঁর কাপড়ের ব্যবসা। বিভিন্ন দামের কাপড় থরে থরে সজ্জিত তাঁর দোকানে।
তাঁর দোকানে এক ধরনের প্রতি জোড়া কাপড়ের দাম ছিল ৪০০ দিরহাম। অন্য আর এক ধরনের কাপড়ের প্রতি জোড়ার দাম ছিল ২০০ দিরহাম।
একদিন তিনি ভাতিজাকে দোকানে রেখে আসরের নামায পড়তে গেলেন। এ সময় একজন খদ্দের তাঁর দোকানে গেল এবং ৪০০ দিরহাম দামের একজোড়া কাপড় চাইল।
ইমাম ইউনুসের ভাতিজা তাকে ২শ' দিরহাম দামের এক জোড়া দিল।
খদ্দের কাপড় জোড়া দেখে পছন্দ করল এবং ৪০০ দিরহাম দিয়ে কাপড়টি নিয়ে নিল।
যখন খদ্দেরটি কাপড় নিয়ে চলে যাচ্ছিল, তখন ইমাম ইউনুস নামায পড়ে ফিরছিলেন। লোকটির হাতে কাপড় জোড়া দেখে চিনতে পারলেন যে, তাঁর দোকানের কাপড়। তিনি খদ্দেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, সে কাপড়টি কত টাকা দিয়ে কিনেছে?
লোকটি বলল, ৪০০ দিরহাম। ইমাম বললেন, 'এটা তো দু'শ' দিরহামের কাপড়। যান কাপড় ফেরত দিয়ে আসুন।'
লোকটি বলল, আমি কাপড় পছন্দ করেই ঐ দাম দিয়ে কিনেছি। আমার এলাকায় এ কাপড়ের দাম ৫০০ দিরহাম। সুতরাং আমি ঠকিনি।
ইমাম বললেন, 'না কাপড় আপনাকে ফেরত দিতেই হবে। কারণ, ইসলামে মানুষের ব্যাপারে হিত কামনার চেয়ে উত্তম আর কিছু হতে পারে না।'
ইমাম তাঁর ভাতিজাকে দারুণ ভর্ৎসনা করলেন, বললেন, 'তোমার মনে আল্লাহর ভয় হলো না?' ভাতিজা দুঃখ প্রকাশ করে বলল, 'খদ্দের মহোদয় কাপড় দেখে শুনে পছন্দ করে ঐ দামে কিনেছিলেন।'
ইমাম ইউনুস বললেন, নিজের জন্য যা পছন্দ কর, তা অপরের জন্যও পছন্দ করতে হয়, এ কথা ভুললে কেন?
📄 আবু ইউসুফের বিচার
আব্বাসীয় খলিফা হাদী'র শাসনকাল。
বাগদাদে প্রধান বিচারপতি আবু ইউসুফের আদালত।
এক ব্যক্তি একটি মামলা নিয়ে এলেন আদালতে。 মামলা স্বয়ং খলিফা হাদী'র বিরুদ্ধে।
একটা বাগান নিয়ে খলিফার সাথে তাঁর ঝগড়া। লোকটির দাবী বাগানটি খলিফা হাদীর নয়, তাঁর।
সব শুনে বিচারপতি আবু ইউসুফ নিশ্চিত হলেন বাগানটি লোকটিরই প্রাপ্য। কিন্তু সমস্যা হলো খলিফার পক্ষে দু'জন সাক্ষ্য দিচ্ছে। এই অবস্থায় বিচারপতি আবু ইউসুফ সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য খলিফাকে আদালতে হাজির হবার নির্দেশ দিলেন।
খলিফা আদালতে হাজির হলে বিচারপতি আবু ইউসুফ তাঁকে বললেন, 'খলিফার সাক্ষীরা যে সত্যবাদী এ ব্যাপারে খলিফাকে শপথ করতে হবে।'
খলিফা এই শপথ করার চাইতে বাগানটি বাদীকে ছেড়ে দেয়াকেই সহজ মনে করলেন এবং বাগানটি বাদীকে দিয়ে দিলেন।
আবু ইউসুফের আরেকটি বিচারের ঘটনা।
আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশীদ তখন শাসন ক্ষমতায়। একটি মামলায় খলিফা আবু ইউসুফের আদালতে হাজির হলেন। খলিফার দাবীর পক্ষে সাক্ষী ছিল ফজল ইবনুর রাবী।
বিচারপতি আবু ইউসুফ ফজল ইবনুর রবীর সাক্ষ্য বাতিল করে দিলেন।
খলিফা হারুনুর রশীদ ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, "ফজলের সাক্ষ্য নাকচ করে দেবার কারণ কি?"
বিচারপতি আবু ইউসুফ বললেন, "আমি ফজলকে বলতে শুনেছি যে, সে আপনার গোলাম।” যদি তার কথা সত্য হয়, তাহলে আপনার গোলামের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়, আর যদি সে আপনার গোলাম না হয় তাহলে সে মিথ্যুক。 মিথ্যুকের সাক্ষ্য গ্রহণ করা যেতে পারে না।"