📄 মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত উযীরের মা
হাসান ছিলেন সুলতান মাহমুদের একজন বিখ্যাত উযীর। সুলতান মাহমুদের সন্তান ও উত্তরাধিকারী সুলতান মাসুদের সময় তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হলেন। তাঁকে বিদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হলো। তাঁকে লাঞ্ছিত করা হলো। অবশেষে প্রাণদন্ড দেয়া হলো।
পাগড়ী-পাজামা পরে উজ্জ্বল মুখ এবং দ্যুতিময় দেহ নিয়ে বিজ্ঞ আসামী মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলেন। যারা হাযির ছিল, তারা কেউ এ বেদনাদায়ক মৃত্যুতে না কেঁদে থাকতে পারলো না।
শুধু কাঁদলো না হাসানের মা। একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বললেন, 'আমার সন্তানের কি ভাগ্য। সুলতান মাহমুদ তাকে দিয়েছিল দুনিয়া আর মাসুদের মত সুলতান তাকে দান করলো আখিরাত।'
📄 পরিচারিকার কথায় কাঁপতে লাগলেন রাজা ইব্রাহীম আদহাম
বলখের রাজা ইব্রাহীম আদহাম একদিন পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে শিকারে গেলেন। সেই সময় রাজ প্রাসাদের এক দাসী বালিকা তার শয়নকক্ষে এলো এবং দেখল বেগম বাইরে গেছেন। রাজকক্ষের বহুমূল্য আসবাবপত্র, সুশোভিত বিছানা, আতরদানি থেকে আসা মনোহর সুগন্ধ সব মিলে দাসী-বালিকাকে আত্মহারা করে তুলল। সে ভুলে গেল নিজের অবস্থার কথা। তার লোভ হলো সে বিছানায় একটু শয়নের। সে সন্তর্পণে সেই রাজকীয় বিছানায় শুয়ে পড়ল এবং ঘুমিয়ে গেল।
ঘুমন্ত অবস্থায়ই তাকে ঐ রাজকীয় বিছানায় পাওয়া গেল। ইব্রাহীম আদহাম শিকার থেকে ফেরার সাথে সাথেই এই গুরুতর ব্যাপারটা তাঁকে জানানো হলো। শুনে রাজা ভয়ানক ক্ষিপ্ত হলেন। একজন দাসী বালিকা তাঁর রাজ-বিছানা স্পর্শ করেছে এত বড় ঔদ্ধত্য।
ক্রুদ্ধ রাজা ইব্রাহীম আদহাম নির্দেশ দিলেন, দাসী বালিকাটিকে ৫০টি বেত্রাঘাত করা হোক। যখন তার আদেশ প্রতিপালিত হলো, তখন রাজা বললেন, 'হে বালিকা, তুমি তোমার কৃতকর্মের জন্য নিশ্চয় দুঃখবোধ করছ?' বালিকাটি উত্তর দিল, 'হ্যাঁ, মহামান্য রাজা। কিন্তু আমি আমার নিজের অবস্থার চেয়ে আপনার জন্যেই বেশী দুঃখবোধ করছি।' রাজা সরবে বললেন, 'কেন এই অমূলক চিন্তা করছ?'
বালিকা বলল, 'কারণ এক ঘন্টা আপনার বিছানায় শোয়ার জন্যে যদি আমার এই শাস্তি হয়ে থাকে, তাহলে বছরের পর বছর ঐখানে শোয়ার জন্যে আপনার কেমন শাস্তি হবে, তা ভেবে আমি দুঃখবোধ করছি।'
বালিকার এই কথা যেন রাজার উপর বিনা মেঘে বজ্রপাত ঘটালো। তিনি হতবাক হয়ে গেলেন। তাঁর মুখের চেহারা বদলে গেল। তিনি দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে কাঁপতে কাঁপতে তাঁর পরিচারকদের বললেন, "এই বালিকাকে নিয়ে যাও, তার ভালভাবে চিকিৎসা কর। আমাকে একাকী থাকতে দাও।”
📄 বাদশাহর পরিচারিকা রাখার সংগতি নেই
দিল্লীর বাদশাহ নাসির উদ্দিন। বাদশাহ আলতামাসের পুত্র তিনি।
বাদশাহর পুত্র হলেও স্বহস্তে পুস্তক নকল করে তার বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণের পরও তিনি এভাবেই নিজ পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করতেন।
তাঁর বেগম নিজ হাতে রান্না-বান্নাসহ সংসারের যাবতীয় কাজ করতেন। একদিন রুটি সেকবার সময় বাদশাহর বেগমের হাত পুড়ে গেল।
বেগম এসে বললেন, 'বাদশাহ, একলা আর পেরে উঠিনে, একজন পরিচারিকার ব্যবস্থা করে দিন।' বাদশাহের চক্ষে দেখা দিল অশ্রু। তিনি বললেন, 'পরিচারিকা রাখার সংগতি আমার নেই। ধৈর্য ধরে কাজ করে যাও বেগম, আল্লাহ তার পুরস্কার দেবেন। দাসী রাখা অসম্ভব। রাজকোষ জনসাধারণের—আমি তার রক্ষক মাত্র। অনাবশ্যক ব্যয় বৃদ্ধি দ্বারা রাজ্যের ব্যয়ভার বৃদ্ধি করতে আমি পারব না।'
📄 সুলতান বাহমানীর উচিত শিক্ষা
দক্ষিণ ভারতের বাহমনী রাজ্যের সুলতান আলাউদ্দিন শাহ বাহমানি (দ্বিতীয়) একজন বাগ্মী লোক ছিলেন। মাঝে মাঝে তিনি মসজিদে খুতবা দিতেন এবং বলতেন তিনি সংযমী, ন্যায়পরায়ণ, উদার ও দয়ালু রাষ্ট্রনায়ক।
একজন আরবীয় বণিক শাহ বাহমানির কাছে একটি ঘোড়া বিক্রয় করেছিলেন, কিন্তু দাম তখনও পাননি।
শাহ বাহমানির খুতবা দেয়ার সময় একদিন তিনি মসজিদে হাযির ছিলেন এবং রাজা নিজের যে প্রশস্তি গাইছিলেন তা শুনছিলেন। এসব কথা শুনে তার প্রতি দুর্ব্যবহার এবং নিরপরাধ সাইয়েদদের সাম্প্রতিক হত্যাকান্ডের কথা তাঁর মনে পড়ে গেলো। তিনি চিৎকার করে উঠলেন এই বলে—"আপনি না ন্যায়পরায়ণ, না দয়ালু, না ধৈর্যশীল, না উদার; বরং আপনি সত্যিকার মু'মিনের জন্য নির্দিষ্ট মসজিদের মিম্বর থেকে বাগাড়ম্বর প্রকাশের সাহস করছেন?”
শাহ বাহমানি তৎক্ষণাৎ ঐ বণিকের ঘোড়ার দাম ঐখানেই দিয়ে দিতে বললেন এবং তিনি প্রাসাদে চলে গেলেন। এরপর তিনি আর মসজিদের মিম্বরে উঠেননি।