📄 হাকাম উত্তপ্ত উত্তেজনার মধ্যে এক খন্ড বরফ
৮১৪ খৃষ্টাব্দের কথা। হাকাম তখন স্পেনের শাসক। কর্ডোভায় এক ভয়ানক বিদ্রোহ দেখা দিল। বিদ্রোহীরা সমুদ্র গর্জনের মত ভয়ানক রূপ নিয়ে এগিয়ে আসছে।
হাকাম ঘোড়সওয়ার এক বাহিনীকে নির্দেশ দিলেন ওদের প্রতিরোধ করতে। কিন্তু তারা পরাজিত হয়ে ফিরে এলো। তাঁর প্রাসাদের রক্ষীরাও হতাশ ও আতংকিত হয়ে পড়ল।
কিন্তু হাকামকে দেখা গেল অত্যন্ত শান্ত। চারদিকের উত্তপ্ত উত্তেজনার মধ্যে যেন তিনি একখন্ড বরফ। দরবারে বসেই তিনি তাঁর হেরেম থেকে মৃগনাভি আনালেন। তারপর তিনি চুল ও দাড়ি সুবিন্যস্ত করে তাতে মৃগনাভি লাগালেন।
তাঁর ঘনিষ্ঠ একজন সহচর চিৎকার করে বলে উঠল, 'জাহাপনা, আমাকে মাফ করুন, নিজকে সুগন্ধচর্চিত করার আশ্চর্য এক সময় আপনি বেছে নিয়েছেন। যে বিপদ আমাদের আতংকিত করছে তা কি আপনি দেখতে পাচ্ছেন না?'
হাকাম ধমক দিলেন, 'চুপ কর বোকা, যদি আমার মুখ মাথা সুগন্ধচর্চিত না করি, তাহলে কেমন করে বিদ্রোহীরা শত মাথার মধ্যে আমার মাথা চিহ্নিত করবে।?'
তারপর হাকাম পূর্ণভাবে অস্ত্রসজ্জিত হয়ে সিংহাসন থেকে নামলেন। ধীর ও শান্তভাবে সেনাবাহিনী পরিদর্শন করলেন। তারপর তিনি তাঁর সৈন্যদের ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দিলেন। বিদ্রোহীরা ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পরাজিত হলো ও পশ্চাদপসরণ করল।
📄 মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত উযীরের মা
হাসান ছিলেন সুলতান মাহমুদের একজন বিখ্যাত উযীর। সুলতান মাহমুদের সন্তান ও উত্তরাধিকারী সুলতান মাসুদের সময় তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার হলেন। তাঁকে বিদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হলো। তাঁকে লাঞ্ছিত করা হলো। অবশেষে প্রাণদন্ড দেয়া হলো।
পাগড়ী-পাজামা পরে উজ্জ্বল মুখ এবং দ্যুতিময় দেহ নিয়ে বিজ্ঞ আসামী মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলেন। যারা হাযির ছিল, তারা কেউ এ বেদনাদায়ক মৃত্যুতে না কেঁদে থাকতে পারলো না।
শুধু কাঁদলো না হাসানের মা। একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বললেন, 'আমার সন্তানের কি ভাগ্য। সুলতান মাহমুদ তাকে দিয়েছিল দুনিয়া আর মাসুদের মত সুলতান তাকে দান করলো আখিরাত।'
📄 পরিচারিকার কথায় কাঁপতে লাগলেন রাজা ইব্রাহীম আদহাম
বলখের রাজা ইব্রাহীম আদহাম একদিন পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে শিকারে গেলেন। সেই সময় রাজ প্রাসাদের এক দাসী বালিকা তার শয়নকক্ষে এলো এবং দেখল বেগম বাইরে গেছেন। রাজকক্ষের বহুমূল্য আসবাবপত্র, সুশোভিত বিছানা, আতরদানি থেকে আসা মনোহর সুগন্ধ সব মিলে দাসী-বালিকাকে আত্মহারা করে তুলল। সে ভুলে গেল নিজের অবস্থার কথা। তার লোভ হলো সে বিছানায় একটু শয়নের। সে সন্তর্পণে সেই রাজকীয় বিছানায় শুয়ে পড়ল এবং ঘুমিয়ে গেল।
ঘুমন্ত অবস্থায়ই তাকে ঐ রাজকীয় বিছানায় পাওয়া গেল। ইব্রাহীম আদহাম শিকার থেকে ফেরার সাথে সাথেই এই গুরুতর ব্যাপারটা তাঁকে জানানো হলো। শুনে রাজা ভয়ানক ক্ষিপ্ত হলেন। একজন দাসী বালিকা তাঁর রাজ-বিছানা স্পর্শ করেছে এত বড় ঔদ্ধত্য।
ক্রুদ্ধ রাজা ইব্রাহীম আদহাম নির্দেশ দিলেন, দাসী বালিকাটিকে ৫০টি বেত্রাঘাত করা হোক। যখন তার আদেশ প্রতিপালিত হলো, তখন রাজা বললেন, 'হে বালিকা, তুমি তোমার কৃতকর্মের জন্য নিশ্চয় দুঃখবোধ করছ?' বালিকাটি উত্তর দিল, 'হ্যাঁ, মহামান্য রাজা। কিন্তু আমি আমার নিজের অবস্থার চেয়ে আপনার জন্যেই বেশী দুঃখবোধ করছি।' রাজা সরবে বললেন, 'কেন এই অমূলক চিন্তা করছ?'
বালিকা বলল, 'কারণ এক ঘন্টা আপনার বিছানায় শোয়ার জন্যে যদি আমার এই শাস্তি হয়ে থাকে, তাহলে বছরের পর বছর ঐখানে শোয়ার জন্যে আপনার কেমন শাস্তি হবে, তা ভেবে আমি দুঃখবোধ করছি।'
বালিকার এই কথা যেন রাজার উপর বিনা মেঘে বজ্রপাত ঘটালো। তিনি হতবাক হয়ে গেলেন। তাঁর মুখের চেহারা বদলে গেল। তিনি দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে কাঁপতে কাঁপতে তাঁর পরিচারকদের বললেন, "এই বালিকাকে নিয়ে যাও, তার ভালভাবে চিকিৎসা কর। আমাকে একাকী থাকতে দাও।”
📄 বাদশাহর পরিচারিকা রাখার সংগতি নেই
দিল্লীর বাদশাহ নাসির উদ্দিন। বাদশাহ আলতামাসের পুত্র তিনি।
বাদশাহর পুত্র হলেও স্বহস্তে পুস্তক নকল করে তার বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণের পরও তিনি এভাবেই নিজ পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করতেন।
তাঁর বেগম নিজ হাতে রান্না-বান্নাসহ সংসারের যাবতীয় কাজ করতেন। একদিন রুটি সেকবার সময় বাদশাহর বেগমের হাত পুড়ে গেল।
বেগম এসে বললেন, 'বাদশাহ, একলা আর পেরে উঠিনে, একজন পরিচারিকার ব্যবস্থা করে দিন।' বাদশাহের চক্ষে দেখা দিল অশ্রু। তিনি বললেন, 'পরিচারিকা রাখার সংগতি আমার নেই। ধৈর্য ধরে কাজ করে যাও বেগম, আল্লাহ তার পুরস্কার দেবেন। দাসী রাখা অসম্ভব। রাজকোষ জনসাধারণের—আমি তার রক্ষক মাত্র। অনাবশ্যক ব্যয় বৃদ্ধি দ্বারা রাজ্যের ব্যয়ভার বৃদ্ধি করতে আমি পারব না।'