📄 রাজ্যের পরিবর্তে পুস্তক
অষ্টম শতকের শেষ ভাগ। পূর্ব রোম সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ করেছেন নিসোফোরাস। শক্তিগর্বে অন্ধ হয়ে তিনি বাগদাদের খলীফাকে পূর্ব নির্ধারিত কর দেয়া বন্ধ করে দিলেন। কর বন্ধ করেই তিনি ক্ষান্ত হলেন না। এক ঔদ্ধত্যপূর্ণ পত্রে তিনি লিখলেন, 'পূর্বে আপনাকে যে সমস্ত মণি-মুক্তা দেয়া হয়েছে তা অবিলম্বে ফেরত পাঠাবেন। নয়তো অস্ত্রই এর মীমাংসা করবে।'
খলীফা উত্তরে শুধু লিখলেন, 'চিঠির উত্তর চোখেই দেখতে পাবে।' নিসোফোরাসের পত্রের উত্তর দিতে খলীফা হারুনুর রশীদ সেই দিনই বিপুল সৈন্য বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলেন।
হেকক্লিয়াতে ভীষণ যুদ্ধ হলো। খৃষ্টান শক্তি শোচনীয় পরাজয় বরণ করলো। নিসোফোরাস ভীত হয়ে পূর্বের চাইতে অধিক কর দিতে সম্মত হয়ে সন্ধি ভিক্ষা করলেন।
খলীফা নিসোফোরাসের রাজ্য ততদিনে প্রায় অর্ধেক গ্রাস করে ফেলেছেন। তবু তিনি এক শর্তে সন্ধি করতে রাজি হলেন।
এক অপূর্ব শর্ত। পৃথিবীর কোন যুদ্ধে এরূপ শর্তে সন্ধি হয়নি। খলীফা বলে পাঠালেন, 'আপনার রাজ্যে সাহিত্য ও বিজ্ঞান সম্বন্ধে যে সমস্ত পুস্তক আছে তার এক একটি কপি আমাকে পাঠিয়ে দেবেন। পরিবর্তে আমি আপনার রাজ্যের অর্ধেক অংশ আপনাকে ফিরিয়ে দেব।'
রাজ্যের পরিবর্তে পুস্তক। অদ্ভুত শর্ত। কিন্তু জ্ঞানের সাধক বাগদাদের খলীফার পক্ষেই এইরূপ শর্ত প্রদান সম্ভব। খলীফা এশিয়া মাইনরে দলে দলে পন্ডিত পাঠালেন। বহুদিনের পরিশ্রমের পরে তারা খলীফাকে বহু মূল্যবান পুস্তক পাঠিয়ে দিলেন।
📄 মিসরের এক কাযীর কথা
ইসলামী সাম্রাজ্যের রাজধানী তখন বাগদাদ। আবাসীয় খলীফা আল-মানসূরের তখন শাসনকাল। আল-মানসূরের অধীনে মিসর তখন সমৃদ্ধশালী ও সুখী একটি প্রদেশ। ইসলামী বিচার-ব্যবস্থার তখনও স্বর্ণযুগ।
সে সময় মিসরে এক কাযী ছিলেন। ৭৬১ খৃষ্টাব্দে তিনি তাঁর পদে নিয়োগ লাভ করেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মভীরু। তিনি সরকারী কাজের জন্যে যে বেতন নিতেন, তা খরচের ব্যাপারে খুব হুঁশিয়ার ছিলেন। তিনি মনে করতেন, যে বেতন তিনি নেন, সেটা তাঁর সরকারী কাজের সময়ের জন্যে। সুতরাং তিনি যে সময় নিজের কাজ করতেন, সে সময়ের জন্যে বেতন নেয়াকে তিনি হক মনে করতেন না। তাই দেখা যেত, তিনি যখন নিজের কাপড় কাচতেন কিংবা কোন জানাযায় যেতেন বা নিজের কোন কাজ করতেন, তখন হিসেব করে সে সময়ের পয়সা বেতন থেকে বাদ দিতেন।
তিনি তাঁর বিচার কাজের অবসরে, প্রতিদিন দু'টি করে ঘোড়ার মুখের সাজ তৈরি করতেন। দু'টি সাজের একটির বিক্রয়লব্ধ টাকা তিনি নিজের জন্য খরচ করতেন, অপরটির টাকা আলেকজান্দ্রিয়ায় তাঁর এক বন্ধুর নামে পাঠাতেন, যিনি কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদে লিপ্ত ছিলেন。
📄 একজন শাহজাদার প্রকৃত কাজ
গজনীর সুলতান সবুক্তগীন। মাহমুদ তাঁর সন্তান।
গজনীর কাছে শাহজাদা মাহমুদ একটি মনোরম বিনোদন প্রাসাদ তৈরী করেছিলেন। যখন এর নির্মাণ সমাপ্ত প্রায়, তখন একদিন তিনি তাঁর পিতা সবুক্তগীনকে এই বাড়ীটি দেখার জন্য আমন্ত্রণ করলেন।
তাঁর পিতা সবুক্তগীন সভাসদসহ সেই প্রাসাদ দেখতে এলেন। আমন্ত্রিতদের সকলেই সেই প্রাসাদের বিভিন্ন দিক, বিভিন্ন কাজের ভূয়সী প্রশংসা করলেন। কিন্তু মাহমুদ পিতার মন্তব্য কি তা জানার জন্য উদগ্রীব ছিলেন।
প্রাসাদ পরিদর্শন শেষে সুলতান সবুক্তগীন বললেন, "আমার বিবেচনায় গোটা জিনিসটাই একটা খেলনা। দেশের যে কোন প্রজাই অর্থ খরচ করে এ ধরনের প্রাসাদ গড়তে পারে। একজন শাহজাদার প্রকৃত কাজ হলো সুকর্ম-সুখ্যাতির এমন ভিত রচনা করা যা যুগ যুগ ধরে অনুকরণ করা হবে এবং কারও পক্ষে অনায়াসে যা অতিক্রম করা দুরূহ হবে।”
এই শাহাযাদা মাহমুদই পরবর্তীকালের মহান বিজেতা সুলতান মাহমুদ।
📄 ফকিরের দরবারেই সুলতান হাযির হলেন
গজনীর সুলতান মাহমুদ একদিন সমরখন্দের খারকান গ্রামে গেলেন। শেখ আবুল হাসান নামে একজন বুযর্গ ব্যক্তি সেখানে বাস করতেন। সুলতানের ইচ্ছা তাঁরই সাথে দেখা করা।
তিনি সেখানে পৌঁছে বুযর্গ ব্যক্তিকে অনুরোধ করে পাঠালেন তাঁর তাঁবুতে আসার জন্য।
সুলতানের বেয়ারা যখন সুলতানের বার্তাটি ঐ বুযর্গ ব্যক্তিকে দিলেন, তখন তিনি বললেন, 'আমি উপরের মহারাজাধিরাজের হুকুম পালনে এতই ব্যস্ত যে, অধঃস্তন এই রাজার হুকুম পালনের জন্য আমার সময় নেই বলে আমি দুঃখিত।'
সুলতান মাহমুদ যখন এই খবর শুনলেন তিনি অভিভূত হয়ে পড়লেন এবং বললেন, 'উঠ তোমরা, আমরাই তাঁর কাছে যাব। তিনি এখানে আসবেন এমন মানুষ তিনি নন।
সুলতান শেখ আবুল হাসানের কাছে গেলেন এবং তাঁকে অভিনন্দন জানালেন। শেখ স্বাগত জানালেন সুলতানকে। কিন্তু আসন থেকে উঠলেন না।
সুলতান তাঁর কাছে কিছু উপদেশ চাইলেন। শেখ বললেন, 'মসজিদে নামায পড়বে, দান করবে এবং নিজ জনগণকে ভালবাসবে।'
সুলতান তাঁর আশীর্বাদ চাইলেন। শেখ বললেন, 'তুমি সর্বশেষ মাহমুদের (প্রশংসিতের) সাথে থাক।'
সুলতান এক থলে টাকা শেখের সামনে রাখলেন। শেখ এক খন্ড বার্লির রুটি তুলে নিয়ে সুলতানকে বললেন, 'খাও।' সুলতান মুখভরে রুটি চিবালেন কিন্তু গিলতে পারলেন না। শেখ বললেন, 'এই বার্লির রুটি যেমন তোমার গলায় বাধছে, তোমার স্বর্ণ মুদ্রাগুলো তেমনি আমার গলায় বাধবে।' এই স্বর্ণ মুদ্রাগুলো নিয়ে যাও এবং দরিদ্রদের মধ্যে বিলি করে দাও।