📄 চাকুরীর চেয়ে শাস্তিই পছন্দ করলেন ইমাম আবু হানিফা
খলীফা আল-মানসূর ইমাম আবু হানীফাকে উচ্চ পদমর্যাদা দান করে তাঁকে বশীভূত করতে চাইলেন। তিনি তাঁকে প্রধান বিচারপতির পদে নিযুক্ত করলেন। কিন্তু ইমাম সঙ্গে সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করলেন।
খলীফা অপমানিত বোধ করলেন এবং ভীষণ ক্রুদ্ধ হলেন। সরকারী নির্দেশ না মানার অভিযোগে ইমাম কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হলেন। শাস্তি হিসেবে শাহী জল্লাদ তাকে নির্মমভাবে প্রহার করলো। তিরিশটি কোড়ার আঘাত তাঁর পিঠে করা হলো। শরীর তাঁর ফেটে গেল। শিরাগুলো ছিঁড়ে রক্তের স্রোত বইল দেহ থেকে। খলীফা আল-মানসূরের চাচা খলীফাকে তিরস্কার করে বললেন, 'হায় হায়! তুমি এ কি করলে, এক লাখ উন্মুক্ত তরবারি তোমার মাথার উপর বিছিয়ে নিলে। আবু হানীফা হচ্ছে ইরাকের ফকীহ, সমস্ত পূর্ব ও পশ্চিমের তথা সারা বিশ্বের ইমাম।'
এ কথায় খলীফা আল-মানসূর লজ্জিত হলেন এবং তিনি ক্ষতিপূরণ দিতে চাইলেন। প্রত্যেক কোড়ার জন্যে এক হাজার দিরহাম হিসেবে তিরিশ হাজার দিরহাম তাঁর কাছে পাঠালেন।
কিন্তু তিনি তা নিতে চাইলেন না। বলা হলো, 'এগুলো আপনি নিজে না রাখেন খয়রাত করে দিন।' ইমাম জবাব দিলেন, 'খলীফার কাছে কি কোনো হালাল অর্থ আছে যা নিয়ে আমি খয়রাত করবো?'
📄 তাউস এবং শাসকের একটি চাদর
তাউস ইবনে কাইসান ছিলেন একজন বড় আলেমে দ্বীন। ইয়েমেনের কোনো এক শহরে তিনি বসবাস করতেন। শাসক ও ক্ষমতাসীনদের অনুগ্রহ কখনো বরদাশত করতেন না তিনি।
একবার তিনি ওহাব ইবনে মাজবাহর সাথে হাজ্জাজ ইবনে ইউসূফের ভ্রাতা মুহাম্মাদ ইবনে ইউসূফেরও ওখানে যান। শীতের মওসুম। মুহাম্মাদ ইবনে ইউসূফ তাঁর শরীরে একটা চাদর পরিয়ে দিলেন। কিন্তু সে চাদর তিনি শরীর থেকে ফেলে দিলেন। মুহাম্মাদ ক্রোধে ফুলে উঠলেন। কিন্তু তাউস তার কোন পরওয়াই করলেন না।
সেখান থেকে বিদায়ের পর ওহাব ইবনে মাজবাহ বললেন, 'আপনি অন্যায় করেছেন। চাদর আপনার প্রয়োজন না থাকলেও মুহাম্মাদ ইবনে ইউসূফের ক্রোধ থেকে লোকদের বাঁচানোর জন্য তখন চাদরটা গায়ে রাখাই ভালো ছিল। পরে তা বিক্রি করে মিসকিনদের মধ্যে তার মূল্য বন্টন করে দিতে পারতেন।'
তাউস বললেন, 'তুমি যা স্বাভাবিক তাই বলেছ, কিন্তু তুমি কি জান না, আজ যদি আমি এ চাদর গ্রহণ করতাম তবে আমার এ কাজ জনগণের জন্য সনদ ও দলিলে পরিণত হতো।"
📄 রাজ্যের পরিবর্তে পুস্তক
অষ্টম শতকের শেষ ভাগ। পূর্ব রোম সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ করেছেন নিসোফোরাস। শক্তিগর্বে অন্ধ হয়ে তিনি বাগদাদের খলীফাকে পূর্ব নির্ধারিত কর দেয়া বন্ধ করে দিলেন। কর বন্ধ করেই তিনি ক্ষান্ত হলেন না। এক ঔদ্ধত্যপূর্ণ পত্রে তিনি লিখলেন, 'পূর্বে আপনাকে যে সমস্ত মণি-মুক্তা দেয়া হয়েছে তা অবিলম্বে ফেরত পাঠাবেন। নয়তো অস্ত্রই এর মীমাংসা করবে।'
খলীফা উত্তরে শুধু লিখলেন, 'চিঠির উত্তর চোখেই দেখতে পাবে।' নিসোফোরাসের পত্রের উত্তর দিতে খলীফা হারুনুর রশীদ সেই দিনই বিপুল সৈন্য বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলেন।
হেকক্লিয়াতে ভীষণ যুদ্ধ হলো। খৃষ্টান শক্তি শোচনীয় পরাজয় বরণ করলো। নিসোফোরাস ভীত হয়ে পূর্বের চাইতে অধিক কর দিতে সম্মত হয়ে সন্ধি ভিক্ষা করলেন।
খলীফা নিসোফোরাসের রাজ্য ততদিনে প্রায় অর্ধেক গ্রাস করে ফেলেছেন। তবু তিনি এক শর্তে সন্ধি করতে রাজি হলেন।
এক অপূর্ব শর্ত। পৃথিবীর কোন যুদ্ধে এরূপ শর্তে সন্ধি হয়নি। খলীফা বলে পাঠালেন, 'আপনার রাজ্যে সাহিত্য ও বিজ্ঞান সম্বন্ধে যে সমস্ত পুস্তক আছে তার এক একটি কপি আমাকে পাঠিয়ে দেবেন। পরিবর্তে আমি আপনার রাজ্যের অর্ধেক অংশ আপনাকে ফিরিয়ে দেব।'
রাজ্যের পরিবর্তে পুস্তক। অদ্ভুত শর্ত। কিন্তু জ্ঞানের সাধক বাগদাদের খলীফার পক্ষেই এইরূপ শর্ত প্রদান সম্ভব। খলীফা এশিয়া মাইনরে দলে দলে পন্ডিত পাঠালেন। বহুদিনের পরিশ্রমের পরে তারা খলীফাকে বহু মূল্যবান পুস্তক পাঠিয়ে দিলেন।
📄 মিসরের এক কাযীর কথা
ইসলামী সাম্রাজ্যের রাজধানী তখন বাগদাদ। আবাসীয় খলীফা আল-মানসূরের তখন শাসনকাল। আল-মানসূরের অধীনে মিসর তখন সমৃদ্ধশালী ও সুখী একটি প্রদেশ। ইসলামী বিচার-ব্যবস্থার তখনও স্বর্ণযুগ।
সে সময় মিসরে এক কাযী ছিলেন। ৭৬১ খৃষ্টাব্দে তিনি তাঁর পদে নিয়োগ লাভ করেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মভীরু। তিনি সরকারী কাজের জন্যে যে বেতন নিতেন, তা খরচের ব্যাপারে খুব হুঁশিয়ার ছিলেন। তিনি মনে করতেন, যে বেতন তিনি নেন, সেটা তাঁর সরকারী কাজের সময়ের জন্যে। সুতরাং তিনি যে সময় নিজের কাজ করতেন, সে সময়ের জন্যে বেতন নেয়াকে তিনি হক মনে করতেন না। তাই দেখা যেত, তিনি যখন নিজের কাপড় কাচতেন কিংবা কোন জানাযায় যেতেন বা নিজের কোন কাজ করতেন, তখন হিসেব করে সে সময়ের পয়সা বেতন থেকে বাদ দিতেন।
তিনি তাঁর বিচার কাজের অবসরে, প্রতিদিন দু'টি করে ঘোড়ার মুখের সাজ তৈরি করতেন। দু'টি সাজের একটির বিক্রয়লব্ধ টাকা তিনি নিজের জন্য খরচ করতেন, অপরটির টাকা আলেকজান্দ্রিয়ায় তাঁর এক বন্ধুর নামে পাঠাতেন, যিনি কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদে লিপ্ত ছিলেন。