📄 ইবনে আবজা যে কারণে গভর্নর হলেন
উমর (রা)-এর ফিলাফত-কাল। মক্কায় গভর্নর নিযুক্ত করেছেন তিনি নাফে ইবনুল হারিসকে।
কোন এক প্রয়োজনে খলিফা উমর (রা) এসেছিলেন আরবেরই 'উসফান' নামক স্থানে। খলিফা সেখানে মক্কার গভর্নর নাফেকেও ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
নাফের সাথে যখন উসফানে উমর (রা)-এর সাক্ষাৎ হলো, তখন তিনি নাফেকে (রা) জিজ্ঞাসা করলেন, 'মক্কায় তুমি কাকে তোমার স্থলাভিষিক্ত করে এসেছ?'
নাফে বললেন, 'আজাদকৃত গোলাম ইবনে আবজাকে আমার স্থলাভিষিক্ত করে এসেছি।'
উমর (রা) ইবনে আবজাকে পুরোপুরি জানতেন না। বললেন, "সেকি! একজন আজাদকৃত গোলামকে মক্কাবাসীদের উপর নিজের স্থলাভিষিক্ত করে দিয়ে এলে"?
নাফে বলল, "তিনি কুরআনে অভিজ্ঞ, শরীয়তে সুপণ্ডিত এবং সুবিচারক।”
উমর (রা) স্বগতোক্তির মত বললেন, "হবেই তো! রাসূল (সা) বলে গেছেন, আল্লাহ তায়ালা এই কিতাব দ্বারা অনেককে ওপরে তুলবেন, অনেককে নীচে নামাবেন।"
📄 খলীফার উপঢৌকন ও ইমাম আবু হানিফা
স্বেচ্ছাচারী শাসকের অধীনে কোন চাকুরী নেয়া কিংবা তাকে কোন সহযোগিতা করা ইমাম আবু হানিফা ঠিক মনে করতেন না। শাসকদের বিশেষ কোন আনুকূল্যও তিনি চাইতেন না। এমনকি তাঁদের কোন উপঢৌকন তিনি স্পর্শ করতেন না। খলীফা আল-মানসূর একবার ইমাম আবু হানীফাকে জিজ্ঞাসা করলেন, "আপনি তো আমার উপহার গ্রহণ করেন না।”
জবাবে আবু হানীফা বললেন, "আমীরুল মুমিনীন, আপনি নিজের সম্পদ থেকে কবে আমাকে দিয়েছেন যে আমি তা গ্রহণ করিনি? আপনি তো মুসলমানদের বাইতুলমাল থেকে আমাকে দিয়েছেন যাতে আমার কোন হক নেই। তাদের প্রতিরক্ষার জন্য আমি লড়ি না। কাজেই একজন সিপাহীর মতো প্রাপ্য আমার নেই। আমি মুসলিম সমাজের কোন শিশু-কিশোর নই যে, তাদের জন্য বরাদ্দ প্রাপ্য আমি বাইতুলমাল থেকে পাবো। আমি কোন ফকীর-মিসকীনও নই যে, তাদের মতো অধিকার আমি লাভ করবো।”
📄 ইমাম আবু হানিফা খলীফার কাছে হাত পাতলেন
ইমাম আবু হানিফা (র)-এর একজন মুচি প্রতিবেশী ছিলো। মুচি তার ঘরের দরজায় বসে সারাদিন কাজ করতো এবং সারারাত ধরে মদ খেয়ে মাতলামি করতো এবং অশ্লীল হৈচৈ ও গন্ডগোল করে ইমামের মনোযোগ নষ্ট করতো।
এক রাতে ইমাম মুচির ঘর থেকে হৈচৈ শুনলেন না। সে রাতে তিনি নিরিবিলি ইবাদত করতে পারলেন, কিন্তু মনে শান্তি পেলেন না।
পরদিন খুব সকালে ইমাম মুচির ঘরে গেলেন এবং মুচির খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারলেন যে, তার মদ খেয়ে মাতলামির জন্যে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে জেলে পুরেছে।
খলীফা মানসুর তখন রাষ্ট্র ক্ষমতায়। ইমাম আবু হানিফা (র) কোন দিন কোন ব্যাপারেই খলীফার দ্বারস্থ হননি। বরং খলীফাই মাঝে মাঝে তাঁর দ্বারস্থ হয়েছেন। কিন্তু আজ প্রতিবেশীর বিপদ তাকে অস্থির করে তুলল এবং তিনি দরবারে গিয়ে হাযির হলেন।
দরবারের দ্বাররক্ষকরা মহান অতিথির সম্মানে দ্বার খুলে দিলেন। ইমামকে দেখে দরবারের আমীর-উমারাদের চোখ বিস্ফারিত হলো এবং স্বয়ং খলীফা আসন থেকে উঠে তাঁর দিকে অগ্রসর হলেন। তিনি ইমামকে নিয়ে তাঁর আসনে বসালেন এবং জানতে চাইলেন, কষ্ট করে তাঁর এ আগমনের কারণ কি?
ইমাম বললেন, 'আপনার পুলিশ আমার একজন প্রতিবেশীকে গ্রেফতার করে জেলে পুরেছে। আমি তার মুক্তির প্রার্থনা নিয়ে এসেছি।'
খলীফা একটু চিন্তা করলেন। তারপর বললেন, 'হে সম্মানিত ইমাম। শুধু তাকে নয়, আপনার সম্মানে ঐ জেলের সবাইকেই আমি মুক্তি দিলাম।'
ইমাম আবু হানিফা (রা) তাঁর প্রতিবেশীকে নিয়ে ফিরে এলেন। প্রতিবেশী ঐ মুচি এরপর আর কোনদিন মদ স্পর্শ করেনি。
📄 চাকুরীর চেয়ে শাস্তিই পছন্দ করলেন ইমাম আবু হানিফা
খলীফা আল-মানসূর ইমাম আবু হানীফাকে উচ্চ পদমর্যাদা দান করে তাঁকে বশীভূত করতে চাইলেন। তিনি তাঁকে প্রধান বিচারপতির পদে নিযুক্ত করলেন। কিন্তু ইমাম সঙ্গে সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করলেন।
খলীফা অপমানিত বোধ করলেন এবং ভীষণ ক্রুদ্ধ হলেন। সরকারী নির্দেশ না মানার অভিযোগে ইমাম কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হলেন। শাস্তি হিসেবে শাহী জল্লাদ তাকে নির্মমভাবে প্রহার করলো। তিরিশটি কোড়ার আঘাত তাঁর পিঠে করা হলো। শরীর তাঁর ফেটে গেল। শিরাগুলো ছিঁড়ে রক্তের স্রোত বইল দেহ থেকে। খলীফা আল-মানসূরের চাচা খলীফাকে তিরস্কার করে বললেন, 'হায় হায়! তুমি এ কি করলে, এক লাখ উন্মুক্ত তরবারি তোমার মাথার উপর বিছিয়ে নিলে। আবু হানীফা হচ্ছে ইরাকের ফকীহ, সমস্ত পূর্ব ও পশ্চিমের তথা সারা বিশ্বের ইমাম।'
এ কথায় খলীফা আল-মানসূর লজ্জিত হলেন এবং তিনি ক্ষতিপূরণ দিতে চাইলেন। প্রত্যেক কোড়ার জন্যে এক হাজার দিরহাম হিসেবে তিরিশ হাজার দিরহাম তাঁর কাছে পাঠালেন।
কিন্তু তিনি তা নিতে চাইলেন না। বলা হলো, 'এগুলো আপনি নিজে না রাখেন খয়রাত করে দিন।' ইমাম জবাব দিলেন, 'খলীফার কাছে কি কোনো হালাল অর্থ আছে যা নিয়ে আমি খয়রাত করবো?'