📄 আসামীর কাঠগড়ায় আল মানসূর
খলীফা আল-মানসুর এসেছেন মদীনায়। প্রধান কাজী ইবনে ইমরান বিচার সভায় বসে আছেন। একজন উটের মালিক এসে খলীফার বিরুদ্ধে তাঁর কাছে নালিশ জানালো। অষ্টম শতকের সর্বশ্রেষ্ঠ সমৃদ্ধ ও উন্নত ইসলামী সাম্রাজ্যের অধিপতি খলীফা আল-মানসুরের বিরুদ্ধে একজন উট চালক অভিযোগ এনেছে।
সামান্য উট চালক সে নয়। জনগণের তখন ছিল পূর্ণ আত্মবিশ্বাস। সত্য ও আত্মপ্রত্যয়ে প্রদীপ্ত ছিল তাদের জীবন। জনগণের এই চেতনা ছিল জাগ্রত। আর খলীফাগণ যে জনগণের সেবক মাত্র সে সম্বন্ধেও তাঁরা সচেতন ছিলেন। জনগণের দাবীর কাছে, বলিষ্ঠ জনমতের কাছে নতি স্বীকার করতে খলীফারাও বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করতেন না। খলীফার কাছে কাজীর সমন গেল। কাজীর দরবারে তাঁকে হাজির হতে হবে। খলীফা আল-মানসুর সঙ্গীদের বললেন, "আমাকে আদালত ডেকেছে, সে জন্য আমাকে একাই যেতে হবে। সেখানে আমি একজন সাধারণ আসামী মাত্র।”
ঠিক সময়ে খলীফা হাজির হলেন কাজীর সম্মুখে। কাজী তাঁর আসন থেকে উঠলেন না। যেমন কাজ করছিলেন তেমনি কাজ করে চললেন। বিচার হলো। কাজী খলীফার বিরুদ্ধে রায় দিলেন। রায় প্রকাশিত হবা মাত্র খলীফা হর্ষধ্বনি করে বলে উঠলেন, "আল্লাহকে শত ধন্যবাদ আপনার এ বিচারের জন্য। আল্লাহ আপনাকে পুরস্কৃত করুন। আমি সামান্য দশ হাজার দিরহাম আপনাকে পুরষ্কার দেবার জন্য আদেশ দিলাম।"
📄 আল-মানসূরের এক বিজয় অভিযান
একদা স্পেনের মুসলিম সেনাপতি আল-মানসূর তাঁর এক অভিযানে একটি সংকীর্ণ এলাকা দিয়ে খৃষ্টান এলাকায় ঢুকে গেলেন। তাঁর যাবার পরেই খৃষ্টানরা সে এলাকা দখল করে ফেললো। মুসলিম বাহিনী দৃশ্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় ভীষণ বিপদে পড়ে গেল।
কিন্তু অদম্য মনোবলের অধিকারী আল-মানসূর অধিকৃত এলাকায় নিশ্চিন্ত মনে বাড়ী উঠাবার নির্দেশ দিলেন এবং সৈন্যদের চাষাবাদে লাগালেন। খৃষ্টানরা মুসলিম সেনাপতির এ কান্ড দেখে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলো। আল-মানসূর বললেন, সৈন্যরা বললো যে, 'বাড়ী ফেরার আগে তারা কিছু চায়। অবশ্য আর সময় ওরা পাবে না—অভিযানের সময় হয়েছে।'
মুসিলিম সেনাপতির এমন নিশ্চিত, অবিচলিত ও দৃঢ়তাপূর্ণ উক্তি শুনে খৃস্টানরা ভয় পেয়ে গেল। তারা আল-মানসূরের অনুকূল শর্তে সন্ধি করলো এবং তারা মুসলিম সৈন্যদের ভারবহনকারী অনেক পশু সরবরাহ করে তাদের স্বদেশ যাত্রাকে সহজ ও আরামদায়ক করে দিল。
📄 শাসক আল-মানসূর প্রিয় ঢাল রক্ষকের বিচার করলেন
স্পেনের নাবালক সুলতান দ্বিতীয় হিশামের সময় রাজ্যের প্রকৃত শাসক ছিলেন আল-মানসূর। তাঁর কৃতিত্বের জন্যে ঐতিহাসিকরা তাঁকে 'দশম শতাব্দীর বিসমার্ক' বলে অভিহিত করেছেন। ঐতিহাসিক ডোজি বলেছেন, 'শুধু দেশ নয়, সভ্যতাও তাঁর কাছে ঋণী।'
আল-মানসূর ন্যায়-বিচারক হিসেবেও ছিলেন বিখ্যাত। বিচারে তিনি ব্যক্তিকে দেখতেন না, দেখতেন ন্যায়- নীতিকে।
একদিনের ঘটনা।
একজন সাধারণ মানুষ আল-মানসূরের কাছে গিয়ে অভিযোগ করলো, 'হে ন্যায়বিচারক, আপনার ঢালরক্ষক, যাকে আপনি প্রভূত সম্মান দিয়েছেন, আমার সাথে চুক্তি ভংগ করেছে। বিচারের জন্যে কাযীর এজলাসেও তাকে হাযির করা যায়নি।'
আল-মানসূর চিৎকার করে বললেন, 'কি! সে কোর্টে হাযির হতে অস্বীকার করেছে। আর কাযী তাকে হাযির হতে বাধ্য করেনি?'
আল-মানসূর ঢালরক্ষককে বললেন, 'তুমি তোমার পরবর্তী লোককে তোমার দায়িত্ব দিয়ে বিনীতভাবে গিয়ে কাযীর দরবারে হাযির হও।'
তারপর তিনি পুলিশের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'এই দুই লোককে কাযীর কাছে নিয়ে যাও। কাযীকে গিয়ে বলো, আমার ঢালরক্ষক একজনের সাথে চুক্তি ভংগ করেছে, তার উপযুক্ত শাস্তি আমি চাই।'
বাদী লোকটি তার মামলায় জিতে গেল। সে ধন্যবাদ জানানোর জন্যে আল-মানসূরের কাছে এলো। আল-মানসূর বললেন, 'তোমার ধন্যবাদ থেকে আমাকে রক্ষা কর। ভাল, তুমি তোমার মামলা জিতেছ এবং সন্তুষ্ট হতে পেরেছ। কিন্তু আমি সন্তুষ্ট হতে পারছি না। আমার চাকরিতে থেকে যে আইন সে লংঘন করেছে, তার শাস্তি তার বাকী আছে।'
📄 ঐতিহাসিক ওয়াকেদি এবং খলীফা মামুনের দানশীলতা
আরব ঐতিহাসিক ওয়াকেদি আব্বাসীয় খলীফা মামুনের অধীনে একজন বিচারক ছিলেন। তিনি তাঁর দানশীলতার জন্যে বিখ্যাত ছিলেন—যেমন মামুন ছিলেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিরাট সহযোগী।
এমনকি ওয়াকেদি ঋণ করেও দান করতেন। এইভাবে তিনি বিরাট ঋণে জড়িয়ে পড়লেন।
একদিন ওয়াকেদি মামুনকে লিখলেন, 'আমি আমার ঋণ নিয়ে বড় বিপদে পড়েছি।'
খলীফা মামুন তাঁর স্বহস্তলিখিত পত্রে তাঁকে বললেন, 'আপনার দু'টি বড় গুণ রয়েছে: একটা হলো দানের হাত, অপরটি প্রয়োজন। প্রথম গুণটি আপনাকে অপরিমিত খরচে বাধ্য করে। আর দ্বিতীয়টি আপনার যা ঋণ বা প্রয়োজন তার একটি অংশমাত্র প্রকাশে সুযোগ দিয়েছে। তাই আমি নির্দেশ দিয়েছি যা আপনি চেয়েছেন তার দ্বিগুণ আপনাকে দেবার জন্যে। এ দিয়েও যদি আপনার প্রয়োজন পূরণ না হয়, তাহলে দোষ আপনার। আর যদি এটা প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট হয়ে যায়, তাহলে আগের চেয়েও মুক্তহস্ত হতে আপনার বাধা নেই। কারণ আল্লাহ দানশীলতাকে ভালবাসেন।'