📄 খলীফা ছেলের মুখ থেকে খেজুর কেড়ে নিয়ে রাজকোষে দিলেন
খলীফা উমার ইবন আবদুল আযীযের কাছে বাইতুলমালের জন্যে কিছু খেজুর এলো। তাঁর শিশুপুত্র সেখান থেকে একটা খেজুর নিয়ে মুখে পুরে দিল। তিনি দেখতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গেই তার গাল থেকে খেজুর বের করে বাইতুলমালের ঝুড়িতে রেখে দিলেন। ছেলে কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে চলে গেল।
বাড়ী ফিরে খলীফা স্ত্রীর মলিন মুখ দেখে বললেন, 'ছেলের মুখ থেকে খেজুর কেড়ে নেবার সময় আমার কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কি করবো বলো। বাইতুলমাল জনসাধারণের সম্পত্তি। এতে জনসাধারণ হিসেবে আমারও অংশ আছে। কিন্তু ভাগ হবার পূর্বে কেমন করে আমি তা নিতে পারি?'
আরেক দিনের কথা। সানাআ থেকে একজন মহিলা খলীফার কাছে আরযি নিয়ে এলেন। সরাসরি খলীফার কাছে না গিয়ে তিনি খলীফার অন্তঃপুরে গেলেন। বারান্দায় বেগমের কাছে বসে নিজের সুখ-দুঃখের কাহিনী বলতে লাগলেন।
এমন সময় বাইরে থেকে এক ব্যক্তি ভেতরে এলো কুয়ার পানি তুলতে। পানির বালতি টানতে টানতে লোকটি বারবার বেগমের দিকে চাইছিল। বিদেশী মহিলার কাছে বড়ই দৃষ্টিকটু লাগল ব্যাপারটা। তিনি বেগমকে বললেন, গোলামটিকে বাইরে যেতে বলছেন না কেন, দেখছেন না আপনার দিকে কেমন বারবার তাকাচ্ছে।
বেগম একটু মুচকি হাসলেন।
কিছুক্ষণ পর খলীফার ডাকে বিদেশী মহিলাটি তার কাছে গিয়ে হাযির হলেন। খলীফাকে দেখে তিনি অবাক। এতো সেই ব্যক্তি, যে কুয়ার পানি তুলছিল। হায় হায়, পোশাকে আশাকে তো তাঁর চাইতেও গরীব মনে হচ্ছে খলীফাকে!
📄 ঈদে খলীফার ছেলেমেয়ে নতুন জামা-কাপড় পেল না
দামেস্ক। ইসলামী সাম্রাজ্যের রাজধানী। খলীফা উমার বিন আবদুল আযীযের শাসনকাল। ঈদের মওসুম।
দামেস্কে ঈদের আনন্দ-উৎসবের সাড়া পড়ে গেছে। আমীর-উমরা, গরীব- মিসকীন সকলেই সাধ্যমত নতুন কাপড়-চোপড় তৈরী করে, রকমারি খাবার বানিয়ে উৎসবের আয়োজনে ব্যস্ত। আমীরদের ছেলে-মেয়েরা রঙিন পোশাক পরে আনন্দ করে বেড়াচ্ছে।
খলীফা অন্দর মহলে বসে আছেন। স্ত্রী ফাতিমা এসে উপস্থিত হলেন। স্বামীকে বললেন, 'ঈদ এসে গেল, কিন্তু ছেলেমেয়েদের নতুন পোশাক তো খরিদ করা হলো না।'
খলীফা বললেন, 'তাই তো, কিন্তু কি করবো। তুমি যা আশা করছো, তা পূর্ণ করা আমার পক্ষে অসম্ভব। প্রতিদিন খলীফা হিসেবে আমি যে ভাতা পাই তাতে সংসারের দৈনন্দিন খরচই কুলোয় না, তারপর নতুন পোশাক পরা, সে অসম্ভব।' ফাতিমা বললেন, 'তবে আপনি এক সপ্তাহের ভাতা বাবদ কিছু অর্থ অগ্রিম নিয়ে আমাকে দিন, তাই দিয়ে আমি ছেলেমেয়েদের কাপড় কিনে দিই।'
খলীফা বললেন, 'তাও সম্ভব নয়। আমি যে এক সপ্তাহ বেঁচে থাকবো তারই বা নিশ্চয়তা কি। আর কালই যে জনগণ আমাকে খলীফার পদ থেকে সরিয়ে দেবে না, তাই বা কি করে বলি। তার চেয়ে এ বিলাস বাসনা অপূর্ণই থেকে যাক- তবু ঋণের দায় থেকে যেন সর্বদা মুক্ত থাকি।'
📄 উপহার ফিরিয়ে দিলেন উমার ইবনে আবদুল আযীয
বার শ' বাহাত্তর বছর আগের কথা। ইসলামী দুনিয়ায় তখন উমাইয়া খলীফাদের শাসন। উমাইয়া বংশের উমার বিন আবদুল আযীয দামেস্কের সিংহাসনে আসীন।
একদিনের ঘটনা। খলীফা উমার বিন আবদুল আযীযের কাছে উপহার এলো। আপেলের উপহার। আপেলের পক্কতা এবং সুমিষ্ট গন্ধে খলীফা খুবই খুশী হলেন। আপেল কিছুক্ষণ নেড়ে চেড়ে তিনি আপেল মালিকের কাছে ফেরত পাঠালেন। সেখানে উপস্থিত একজন এটা দেখে অনুযোগ করে বললেন, 'খলীফা, মহানবী (সা) তো এরূপ উপহার গ্রহণ করতেন।' উত্তরে খলীফা বললেন, 'এরূপ উপহার আল্লাহর নবীর কাছে সত্যই উপহার, কিন্তু আমাদের বেলায় এ ঘুষ।'
📄 খলিফা আল-মানসুর যখন লা-জবাব
মুসলিম সাম্রাজ্যের রাজধানী তখন বাগদাদে।
খলিফা আল-মানসুরের শাসনকাল। খলিফার পরিচিতি নিয়ে চললেও এই শাসন তখন বহু ক্ষেত্রেই খেয়াল খুশীর উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যেমন জনগণের বাইতুল মাল তারা ব্যক্তিগত সম্পত্তির মত ব্যবহার করতেন।
কিন্তু অবিরাম প্রতিবাদ হয়েছে এই স্বেচ্ছাচারিতার। এক দিনের একটি ঘটনা।
সুফিয়ান সওরী গেলেন খলিফা আল-মানসুরের দরবারে। তিনি বললেন তাঁকে, "আমীরুল মুমিনীন, আপনি আল্লাহ ও মুসলমানদের ধন-সম্পদ তাদের ইচ্ছা ও সম্মতি ছাড়াই ব্যয় করছেন। বলুন এর কি জবাব আছে আপনার কাছে?” বলে একটু থেমেই খলিফার দৃষ্টি আকর্ষণ করে আবার বলতে শুরু করলেন, "উমর (রা) একবার সরকারী খরচে হজ্ব করেছিলেন। তাতে তাঁর ও তাঁর সংগী-সাথীদের উপর সর্বমোট ১৬ দিনার ব্যয়িত হয়েছিল। তথাপি হযরত উমর (রা) বলেছিলেন, 'আমরা বাইতুল মালের উপর বিরাট বোঝা চাপিয়েছি।' আপনি নিশ্চয় জানেন, মনসুর ইবনে আম্মার আমাদেরকে কি হাদীস শুনিয়েছিলেন। কারণ সেই মজলিসে আপনিও হাজির ছিলেন এবং সর্বপ্রথম হাদীসটা আপনিই লিপিবদ্ধ করেছিলেন। সে হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সম্পদে নিজের খেয়াল-খুশীমত হস্তক্ষেপ করবে তার জন্যে দোজখের আগুন অবধারিত।"
সুফিয়ান সওরীর এ স্পষ্ট বক্তব্যে খলিফার চাটুকাররা ক্ষেপে গেল। কয়েকজন ঝুনা চাটুকার বলে উঠলেন, 'কি, আমীরুল মুমিনীনের সাথে এ ধরনের আলাপ?' সুফিয়ান সওরী তাকে ধমক দিয়ে বললেন, 'চুপ হতভাগা, হামান ও ফেরাউন এভাবেই চাটুকারিতা করে পরস্পরকে ধ্বংস করেছিল'— বলে যে উন্নত শির নিয়ে সুফিয়ান সওরী আল-মানসুরের দরবারে ঢুকেছিলেন, সেভাবে শির উন্নত রেখেই তিনি দরবার থেকে বেরিয়ে এলেন।
প্রবল প্রতাপশালী খলিফা আল-মানসুর সুফিয়ান সওরীর কথার জবাবে একটি কথাও বলতে পারেননি।