📄 বিত্তবান মানুষটি খলীফা হওয়ার পর হলেন দরিদ্র
খিলাফতের দায়িত্ব নেবার পর লোকেরা উমার বিন আবদুল আযীযকে মুবারকবাদ জানাতে এলো। তিনি বললেন, 'তোমরা কাকে মুবারকবাদ দিতে এসেছ, সেই ব্যক্তিকে—যে ধ্বংসের মুখে নিক্ষিপ্ত হয়েছে? সবচাইতে বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছে গেছে?'
তাঁকে নতুন খলীফা হবার জন্যে রাজকোষাগার থেকে বিশেষ খুশবু দেয়া হলো। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে বললেন, 'খুশবু গ্রহণ করার মত আনন্দের দিন আমার শেষ হয়েছে। ইসলামী শাসনের অন্তর্ভুক্ত সমগ্র এলাকায় যদি একটি প্রাণীও অনাহারে থাকে বা কোন একজনের উপরও যদি যুলুম হয়, তাহলে সবার আগে মহাপ্রতাপশালী আল্লাহ উমারকেই পাকড়াও করবেন।'
কবিরা দীর্ঘ প্রশস্তিমূলক কবিতা লিখে দরবারে লাইন দিলেন। কিন্তু তাঁরা নিরাশ হলেন। খলীফা প্রশংসা শুনতে চান না এবং নিজের প্রশংসা শোনার জন্যে জনগণের অর্থের একটি কপর্দকও ব্যয় করাকে তিনি আমানতের খেয়ানত মনে করেন।
তিনি নিজের সম্পত্তির যৎকিঞ্চিৎ রেখে বাইতুলমালে জমা দিয়ে দিলেন। কারণ জনগণের অধিকার অন্যায়ভাবে গ্রাস করে তাঁর পূর্বসূরীরা এ সম্পত্তি হস্তগত করেছিলেন বলে তাঁর মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছিল।
নিজের স্ত্রীকেও তিনি আহবান করে বললেন, 'আমাকে চাও, না তোমার বাপের দেয়া অন্যায়ভাবে আহরিত তোমার সম্পদগুলো চাও? যদি আমাকে চাও তো এই মুহূর্তে তোমার বাপের দেয়া সোনাদানা সব সম্পত্তি বাইতুলমালে জমা করে দাও।'
খলীফা সুলাইমানের কন্যা সোনাদানার পরিবর্তে স্বামীকেই পছন্দ করলেন। খলীফা উমার বিন আবদুল আযীয রাজপরিবারের লোকদের ভাতাও বন্ধ করে দিলেন।
এইভাবে খলীফা হওয়ার আগে যিনি বিত্তশালী ছিলেন, জাঁক-জমকে ডুবে ছিলেন, তিনি ইসলামী সাম্রাজ্যের খলীফা হবার পর সব বিত্ত ও জাঁক-জমক পরিত্যাগ করে দারিদ্র গ্রহণ করলেন, নেমে এলেন সাধারণ মানুষের কাতারে।
📄 জননেতা হয়ে উমার বিন আব্দুল আযীয জনতার কাতারে নেমে এলেন
খলীফা সুলাইমানের মৃত্যুর পর উমার বিন আবদুল আযীয ইসলামী বিশ্বের খলীফার দায়িত্ব নিয়ে দামেস্কের সিংহাসনে বসেন।
খলীফা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত রাজকীয় প্রাচুর্যের মধ্যে তাঁর জীবন কেটেছে। কিন্তু জনগণের নেতা হবার পর সব প্রাচুর্য তিনি ছুড়ে ফেললেন, নেমে এলেন জনগণের কাতারে।
তিনি খলীফা নির্বাচিত হবার পর খলীফার প্রাসাদের দিকে চলছেন। রাস্তার দু'ধারে কাতারে কাতারে দাঁড়ানো আছে সৈন্যের দল।
খলীফা জিজ্ঞাসা করলেন, 'এরা কারা?' উত্তর এলো, 'এরা আপনার দেহরক্ষী সৈন্য।'
খলীফা বললেন, 'প্রয়োজন মতো এদের বাইরে পাঠিয়ে দাও। আমার দেহরক্ষীর প্রয়োজন নেই। জনগণের ভালবাসাই আমার প্রতিরক্ষা।'
প্রধান সেনাপতি সশ্রদ্ধ সালাম জানিয়ে তাঁর নির্দেশ পালনের প্রতিশ্রুতি দিলেন।
উমার বিন আবদুল আযীয প্রাসাদে ঢুকলেন। দেখলেন, সেখানে ৮শ' দাস তাঁর অপেক্ষায় দন্ডায়মান। জিজ্ঞাসা করে জানলেন, এরা তাঁরই সেবার জন্যে। খলীফা প্রধানমন্ত্রীকে বললেন, 'এদের মুক্ত করে দিন। আমার সেবার জন্যে আমার স্ত্রীই যথেষ্ট।'
প্রধানমন্ত্রী তাঁর হুকুম তামিল করলেন।
📄 খলীফা উমার ইবনে আবদুল আযীযের কান্না
বিশাল ইসলামী সাম্রাজ্যের শক্তিমান খলীফা উমার ইবনে আবদুল আযীয। দামেস্কে তাঁর রাজধানী। রাজধানীতে থাকলেও তার অতন্দ্র চোখ রাজ্যের খুঁটি-নাটি সব বিষয়ের প্রতি।
কিন্তু সব কি তিনি জানতে পারেন? সব সমস্যার সমাধান কি তিনি দিতে পারেন?
অপারগতার ভয় সব সময় তাঁকে অস্থির করে রাখে।
একদিন খলীফা উমার বিন আবদুল আযীযের স্ত্রী নামাযের পর খলীফাকে অশ্রুসিক্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে ক্রন্দনের কারণ জানতে চাইলেন। খলীফা বললেন, 'ওহে ফাতিমা, আমি মুসলমান এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের খাদেম নিযুক্ত হয়েছি। যে কাঙ্গালগণ অনশনগ্রস্ত, যে পীড়িতগণ অসহায়, যে বস্ত্রহীনগণ দুর্দশাগ্রস্ত, যে উৎপীড়িতগণ নিষ্পেষিত, যে অচেনা-অজানাগণ কারারুদ্ধ এবং যে সকল সম্মানিত বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি তাদের নগণ্য উপার্জন দ্বারা কষ্টে-সৃষ্টে বৃহৎ পরিবারের ভরণ-পোষণ করেন, তাদের বিষয় এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ও দূরবর্তী প্রদেশে অনুরূপ দুর্দশাগ্রস্ত মানবকূলের বিষয়াদি চিন্তা করছিলাম। শেষ বিচারের দিন মহাপ্রভু আমার কাছে হিসেব চাইবেন। সেই জবাবদিহিতে কোন আত্মরক্ষার কৌশলই কাজে লাগবে না। আমি তা স্মরণ করে কাঁদছিলাম।'
📄 খলীফা দিনের পর দিন ডাল খান
বিশাল ইসলামী সম্রাজ্যের খলীফা উমার বিন আবদুল আযীয। তাঁর সাম্রাজ্য তখন পূর্বে ভারত থেকে পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর, দক্ষিণে মধ্য আফ্রিকা থেকে উত্তরে স্পেন ও চীন পর্যন্ত বিস্তৃত।
খলীফা উমার ইবন আবদুল আযীযের রাজধানী দামেস্ক তখন শক্তি ও সমৃদ্ধিতে দুনিয়ার সেরা।
সেই খলীফা উমার বিন আবদুল আযীযের জীবন ছিল দারিদ্রে ভরা। একদিনের ঘটনা।
সেদিন খলীফার স্ত্রী তাঁর চাকরকে খেতে দিলেন। আর দিলেন শুধু ডাল। নতুন চাকর খাবার দেখে বিস্মিত হলো। বিস্ময়ভরা চোখে বললো, 'এই আপনাদের খাদ্য।'
খলীফা পত্নী উত্তরে বললেন, 'এই সাধারণ খাদ্যই খলীফা দিনের পর দিন গ্রহণ করে যাচ্ছেন।'
ইসলামে রাষ্ট্রের সকল সম্পদের মালিক জনগণ, শাসকরা সে সম্পদের রক্ষক মাত্র।