📄 নামায যুদ্ধ থামিয়ে দিল
আফগানিস্তানের উত্তর পশ্চিমে এক পর্বতময় মালভূমি। তদানীন্তন বলখ ও বাদাখশান রাজ্যের সীমান্ত সন্নিহিত একটি স্থান। ভীষণ যুদ্ধ চলছে দুই দলে। বহু যুদ্ধের মত এটিও ভাইয়ে ভাইয়ে মুসলমানে মুসলমানে আত্মঘাতী এক লড়াই। যুদ্ধমান দু'পক্ষের এক পক্ষে রয়েছে মোগল বাহিনী, অন্যপক্ষে রয়েছে বলখের সুলতান আযীয খানের সৈন্যদল। মোগল বাহিনীকে পাঠিয়েছেন দিল্লীর সম্রাট শাহাজান তাঁর পিতৃভূমি বলখ-বুখারা-বাদাখশান পুনরুদ্ধার করতে। অপর পক্ষে বলখের সূলতান রক্ষা করতে এসেছেন তাঁর রাজ্য। উভয় পক্ষেই কাজ করছে ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠি স্বার্থ, জাতীয় স্বার্থ চিন্তার কোন চিহ্ন কোথাও নেই।
মোগল বাহিনীর পরিচালনা করছেন শাহজাদা আওরঙ্গজেব। আর বলখের সুলতান স্বয়ং তাঁর বাহিনী পরিচালনা করছেন যুদ্ধ ক্ষেত্রে।
ভীষণ যুদ্ধ চলছে। ধীরে ধীরে সূর্য তার আকাশ পরিক্রমায় উঠে এল মধ্য গগনে। মধ্য গগন থেকে সূর্য একটু হেলে পড়ল পশ্চিমে। সেনাপতি শাহজাদা আওরঙ্গজেব মাথা তুলে একবার সুর্যের দিকে চাইলেন। তাঁর চেহারায় পরিবর্তন ঘটল। তিনি হাতের বর্শা ছুড়ে দিলেন মাটিতে। ঘোড়া থেকে নামলেন। কমরবন্ধ খুলে রেখে দিলেন মাটিতে। তার পর জায়নামায বিছিয়ে পশ্চিমমুখী হয়ে নামায শুরু করলেন। যুদ্ধ তখন অবিরাম চলছে। বৃষ্টির মত ছুটে আসছে তীর বর্শা। যোদ্ধাদের হুংকার, আহতের আহাজারি, অশ্বের হেষা রব এক ভয়াবহ পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। কোন দিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই,
জায়নামাযের উপর চোখ দুটি তাঁর যেন আটকে আছে, অখন্ড মনোযোগে নামায আদায় করছেন শাহজাদা আরঙ্গজেব। শত্রুদের পুরোপুরি দৃষ্টির মধ্যে রয়েছেন তিনি। যে কোন সময় তীর বর্শা ছুটে এসে তাঁকে বিদ্ধ করতে পারে কিংবা স্বশরীরে শত্রু তাঁর উপর এসে চড়াও হতে পারে। কিন্তু শাহজাদা আওরঙ্গজেবের সমগ্র চেহারায় এজন্য কোন প্রকার চিত্ত-চাঞ্চল্যের লেশ মাত্র নেই। মনে হচ্ছে তিনি যেন কোন এক বিরল উপত্যকার নীরব নিঝুম পরিবেশে গভীর প্রশান্তিতে নামায আদায় করছেন।
এই অপরূপ অদৃশ্য অশ্বে সমাসীন সুলতান আব্দুল আযীয খান দেখতে পেলেন। তাঁর দৃষ্টি যেন আটকে গেল মহাপ্রভুর সামনে বিনীতভাবে দন্ডায়মান শাহজাদা আওরঙ্গজেবের উপর। হৃদয়টি তাঁর মোচড় দিয়ে উঠলো। শিউরে উঠলো তাঁর গোটাদেহ। কার বিরুদ্ধে, কোন মহান ভাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন তিনি। সুলতান আবদুল আযীয খান চীৎকার করে উঠলেন, "যুদ্ধ অসম্ভব—যুদ্ধ থামাও—থামাও যুদ্ধ।”
যুদ্ধ বন্ধ হলো। ব্যক্তি স্বার্থ পেছনে পড়ে গেল, জয়ী হলো জাতীয় স্বার্থ, ভ্রাতৃ সম্পর্ক। ইসলাম যেন মূর্তিমান রূপ নিয়ে এসে দু'ভায়ের রক্তপাত বন্ধ করলো। প্রমাণ হলো একমাত্র ইসলামই ভাইয়ে ভাইয়ে আপোষ ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হতে পারে।
📄 তাইমুরের দরবারে হামিদাবানু
১৩৮০ সন। তাইমুর লংয়ের দুর্ধর্ষ তাতার বাহিনী ধ্বংসের বিষান বাজিয়ে এগিয়ে চলেছে সামনে। তুর্কী সুলতান বায়েজিদ সে তাতার বাহিনীর ঘূর্ণিঝড়কে সিংহ বিক্রমে বাধা দান করলেন। তুরস্কের রণক্ষেত্রে রক্তের নদী বইল। কিন্তু সুলতান অবশেষে পরাজয় বরণ করলেন। অনেক তুর্কী সৈন্য ও সেনানায়ক বন্দী হল। নিষ্ঠুর তাইমুর তাদের নির্বিচারে প্রাণদন্ড দিতে লাগলেন। একজন তরুন সেনানী রূখে দাঁড়াল এই অবিচারের বিরুদ্ধে। সে তাইমুরের সাক্ষাত প্রার্থনা করল। শিকলে বেঁধে সে বন্দীকে তাইমুর সমীপে আনা হল। বিশ্বজয়ী তাইমুরের সামনে গর্বোন্নত শিরে দাঁড়িয়ে সে তরুন সৈনিক বলল, "সম্রাট তাইমুর, আপনি অন্যায়ভাবে সুলতান বায়েজিদকে আক্রমণ করে হাজার হাজার আল্লাহর বান্দাকে হত্যা করেছেন, মুসলমান হয়ে আপনি ইসলামের অনুগত সেবকদের হত্যা করছেন। বিশ্ব জয়ের অন্যায় ও গর্বিত দাবির জন্যেই শুধু এসব অন্যায় ও গর্হিত কাজ করছেন। কিন্তু মনে রাখবেন আপনাকেও একদিন সকল রাজার রাজা আল্লাহর সামনে হাজির হতে হবে, তখন এসব কাজের কি জওয়াবদিহি আপনি করবেন?”
তরুণ সৈনিকের এ কথা শুনে বিমূঢ় গোটা দরবার। এভাবে পৃথিবীর কেউ যে তাইমুরের সামনে কথা বলতে পারে, আল্লাহর রাজ্যে যে এমন লোকও আছে, দরবার আজই যেন তা বুঝল, বুঝে সন্ত্রস্ত হলো। ভাবল তারা, না জানি এই তরুণের ভাগ্যে কি উৎপীড়ণ আছে।
তরুণ বন্দী মুহূর্তের জন্য একটু থেমেছিল। তারপর মন্ত্রমুগ্ধ দরবারের সামনে এক ঝটকায় মাথার শিরস্ত্রাণ খুলে ফেলল। একরাশ সুন্দর কেশগুচ্ছ প্রকাশ হয়ে পড়ল-সুন্দর মসৃণ একরাশ নারীকেশ। বিশ্ব জয়ী তাইমুরও এবার বিস্মিত। বন্দিনী আবার বলতে লাগল, "চেয়ে দেখুন, আমি একজন অন্তঃপুরবাসিনী নারী। তবু অন্যায়-অবিচারের প্রতিরোধের জন্য অস্ত্র হাতে ধরতে হয়েছে, রক্তের নদীতে সাঁতার কাটতে হয়েছে। আপনি আপাততঃ জয়ী হয়েছেন, কিন্তু মনে রাখবেন, যে জাতি এ ধরনের মানসিকতায় উজজীবিত, তাকে পদানত রাখা যায় না, ধ্বংস করা যায় না।”
বিশ্বজয়ী তাইমুরের শির নুইয়ে পড়ল। তিনি মুক্তি দিলেন বায়েজিদ তনয়া হামিদা বানুকে। হামিদা বানুর অনলবর্ষী উক্তি এবং তাঁর সাথে তাইমুরের পরিচয় তাইমুরের জীবনে আনল অভূতপূর্ব পরিবর্তন। ধ্বংসের হাত তাঁর জাতি গড়ার কাজে ব্রতী হলো।
📄 মুজাদ্দিদের মাথা মানুষ-সম্রাটের কাছে নত হলোনা
মোগল আমল। সম্রাট আকবরের ছেলে জাহাঙ্গীর তখন মোগল সাম্রাজ্যের প্রতাপশালী সম্রাট।
একদা তিনি শায়খ আহমদ সরহিন্দীকে দরবারে ডেকে পাঠালেন।
শায়খ আহমদ ছিলেন ইসলামী আন্দোলনের এক অকুতোভয় কর্মী পুরুষ। জাহাঙ্গীরের দরবারে এ রেওয়াজ ছিল যে, কোন ব্যক্তি দরবারে আগমন করলে প্রথমে বাদশাহকে কুর্নিশ করতে হতো।
বাদশাহ আশা করেছিলেন শায়খ আহমদ তাই করবেন। কিন্তু তিনি দরবারে প্রবেশ করে ইসলামী বিধান অনুযায়ী সালাম করলেন।
বাদশাহ রাগান্বিত হয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আপনার সাহস তো কম নয়। আপনি কেন দরবারের বিধি লংঘন করলেন? কেন সম্মানসূচক কুর্নিশ করেননি?'
জবাবে শায়খ আহমদ বললেন, 'হে সম্রাট! যে মস্তক প্রত্যহ কমপক্ষে পাঁচবার সম্রাটের সম্রাট রাবুল আলামীনের সামনে নত হয়, সে মাথা দুনিয়ার কোন মানুষের সামনে নত হতে পারে না, তিনি যত বড় শক্তিধরই হোন না কেন।'
📄 আও রঙ্গজেব নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে সন্তানকে কারাগারে পাঠালেন
বাদশাহ আওরঙ্গজেব যে কত বড় ন্যায়বিচারক ছিলেন, তাঁর ৫০ বছর রাজত্বকালের হাজার হাজার ন্যায়বিচারের ঘটনা থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি বলতেন, বিচার ক্ষেত্রে শাহজাদাদেরকেও আমি সাধারণ লোকের পর্যায়ভুক্ত মনে করি। বাদশাহ আওরঙ্গজেব ১০৮২ হিজরী সনে এক আদেশ জারি করেন, জিলায় জিলায় প্রতিনিধি নিযুক্ত করে জনসাধারণকে জানিয়ে দেয়া হোক যে, বাদশাহর বিরুদ্ধেও যদি কারো কোন অভিযোগ থাকে, তাহলে নির্ভয়ে তা পেশ করতে পারবে।। সরকারী প্রতিনিধি সে সব অভিযোগের কৈফিয়ত প্রদান করবে। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে অভিযোগকারী তার অধিকার ফিরে পাবে। বাদশাহ সরাসরি দায়ী হলে বাদশাহ নিজেই তার প্রতিকার করবেন।
মির্যা কামবখশ আলমগীরের অত্যন্ত স্নেহপরায়ণ পুত্র ছিলেন। তাঁর দুধ ভাইয়ের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আরোপিত হয়।
আলমগীর আদেশ দিলেন যে, বিচারালয়ে এর তথ্যানুসন্ধান করা হোক। তদন্তের নিরপেক্ষতা যাতে কোনভাবেই নষ্ট না হয়, কোন সুফারিশ যেন গ্রাহ্য করা না হয়, সুফারিশকারী যদি বাদশাহর সন্তানও হয়।
কিন্তু কামবখশ তার দুধ ভাইয়ের পক্ষে দাঁড়ালেন। আলমগীর কামবখশকে দরবারে ডেকে পাঠালেন। কামবখশ দুধ ভাইকে সংগে নিয়ে আসলেন।
আলমগীর নিজ সন্তানকে গ্রেফতার করে তদন্ত কমিটিকে বললেন, 'এবার নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে পারবে।'