📄 সিরিয়ার আকাশে প্রথম ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি
মুতা যুদ্ধ-যাত্রার একটি মুহূর্ত।
তিন হাজার সৈন্যের মুসলিম বাহিনী আরব সীমান্ত অতিক্রম করে সিরিয়া প্রদেশে প্রবেশের পর জানতে পারলো, খৃস্টান শাসনকর্তা শুরাহবিল এক লাখ সৈন্যের এক সুসজ্জিত বাহিনী নিয়ে সিরিয়ার মা'আব স্থানে অপেক্ষা করছেন। মুসলিম বাহিনী আরও জানতে পারলো, রোম সম্রাট স্বয়ং ২ লাখ সৈন্যের একটা বাহিনী তৈরী করছেন শুরাহবিলের সাহায্যের জন্যে। অর্থাৎ গোটা খৃস্টান সাম্রাজ্যই যেন এই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।
এ খবর পাওয়ার পর মুসলিম বাহিনীর অনেকেই পরিস্থিতি সম্পর্কে পরামর্শ করার প্রয়োজন অনুভব করল।
পরামর্শ সভায় মিলিত হবার জন্যে মুসলিম বাহিনীর যাত্রাবিরতি হলো।
বসল পরামর্শ সভা।
অনেক কথা হলো।
কিছু লোক পরামর্শ দিলেন, 'এই নতুন পরিস্থিতি সম্পর্কে মদীনায় খবর পাঠানো হোক। এ ব্যাপারে মহানবী (সা)-এর পরামর্শ আসার পর সে অনুসারে কাজ করা উচিত।'
যারা এই মত প্রকাশ করলেন, তারা যুক্তি হিসেবে বললেন, 'তিন হাজার সৈন্য নিয়ে লাখ অথবা তারও বেশী সুসজ্জিত সৈন্যের সাথে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হওয়া সঙ্গত হবে না।'
যুক্তি খুবই শক্তিশালী। বিশেষ করে মহানবী (সা)-এর পরামর্শ নেয়ার প্রস্তাব অনেকের কাছে সঙ্গত বলে মনে হলো।
কিন্তু অনেকেই এই দ্বিধাগ্রস্ততাকে মেনে নিতে পারলেন না। তাদেরই একজন মহামতি আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা, যাকে মুতা যুদ্ধের তৃতীয় সেনাপতি হিসেবে মহানবী (সা) নিয়োগ দিয়েছিলেন, উঠে দাঁড়িয়ে গুরুগম্ভীর আওয়াজে তেজোদীপ্ত কণ্ঠে বললেন, 'মুসলিম সৈনিকবৃন্দ, তোমরা যে সাফল্য অর্জনের জন্যে বের হয়েছিলে, আল্লাহর কসম এখন সে সাফল্যই যেন তোমাদের কাছে অবাঞ্ছিত বলে মনে হচ্ছে। তোমরা তো বের হয়েছিলে শাহাদাত হাসিলের উদ্দেশ্যে, সত্যের নামে আত্মোৎসর্গ করার জন্যে। সংখ্যার গণনা মুসলমানরা কখনই করে না, পার্থিব শক্তির তুলনা করার কাজে কখনই তারা প্রবৃত্ত হয় না, তাদের একমাত্র শক্তি আল্লাহ। সেই আল্লাহর প্রেরিত মহাসত্যকে বক্ষে ধারণ করে, সত্যের তেজে উদ্দীপ্ত হয়ে কর্তব্যের কোরবান গাহে আল্লাহর নামে হৃৎপিণ্ডের শোণিত ঢেলে দেয়াই তো আমাদের সাফল্য। বিজয়ী হতে পারি ভাল, আর শাহাদাত যদি হয় আরও ভাল। সুতরাং এ সময় এত আলোচনা আর এই যুক্তি-পরামর্শ কিসের জন্যে?
রাওয়াহার এই তেজোদীপ্ত কথা প্রতিটি মুসলিম সৈনিকের দেহে যেন বিদ্যুৎ প্রবাহ সৃষ্টি করলো। দুই চারজন যারা দূরদর্শিতা অবলম্বন ও হিসাব-নিকাশের কথা বলছিলেন, তারাও নতুন চেতনায় জেগে উঠলো। সকলে একবাক্যে বলে উঠল, 'আল্লাহর কসম, রাওয়াহার পুত্র ঠিক বলেছেন।'
তিন সহস্র মুসলিম সৈনিকের কণ্ঠে ধ্বনি উঠল, 'আল্লাহু আকবার।' সিরিয়ার আকাশে প্রথম উত্থিত এই সম্মিলিত তাকবির ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ল সিরিয়ার পথ-প্রান্তরে। মুসলিম বাহিনীর যুদ্ধযাত্রা আবার শুরু হলো।
📄 খালিদ হলেন সেনাপতি
মুতার যুদ্ধ চলছে।
এক লাখ সুসজ্জিত সৈন্যের বিরুদ্ধে তিন হাজার সৈন্যের লড়াই। সেনাপতি যায়েদ ইবনে হারেসার শাহাদাতের পর সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলেন জাফর ইবনে আবু তালিব। ভয়াবহ যুদ্ধের তীব্রতার মধ্যে সেনাপতি জাফরও শহীদ হলেন। তাঁর শাহাদাতের পর পতাকা তুলে ধরলেন আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা। তিনিও শহীদ হলেন।
মুসলিম পতাকা ভূলুণ্ঠিত হলো রণাঙ্গনে।
পতাকা ভূলুণ্ঠিত হওয়ায় মুসলিম বাহিনীর কেন্দ্র ভেঙ্গে পড়লো। মুসলিম বাহিনীর তখন মহাবিপর্যয়কর অবস্থা। একদিকে শত্রুপক্ষের প্রবল চাপ, অন্যদিকে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতিহীন বিশৃংখল অবস্থা। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ালো যে, গোটা যুদ্ধক্ষেত্রে দু'জন মুসলিম সৈনিকও একসাথে ছিলো না। যুদ্ধের এই অবস্থা দেখে কেউ কেউ মদীনা অভিমুখে পালানো শুরু করেছিলেন। ভয়াবহ এই দুঃসময়ে উকবা ইবনে আমের নামক একজন সাহাবী উচ্চস্বরে চিৎকার করে বলে উঠলেন, 'পলাতক অবস্থায় নিহত হওয়া অপেক্ষা সামনে অগ্রসর হয়ে জীবন দেয়া শ্রেয়তর।'
উকবার এই চিৎকারে অনেকের চেতনা হলো, কেন্দ্রও একটা খুঁজে পেলো তারা। কিছু মুসলিম যোদ্ধা ছুটে এলো তাঁর দিকে। সামনেই তাদের মুসলিম বাহিনীর ভূলুণ্ঠিত, পদদলিত পতাকা। সাবেত ইবনে আকরাম নামে একজন মুসলিম সৈনিক বিদ্যুৎবেগে ছুটলেন শুত্রুর মরণব্যূহ ভেদ করে পতাকার দিকে। তুলে ধরলেন তিনি পতাকা এবং সবেগে তা বাতাসে উড়াতে উড়াতে চিৎকার করে বলতে লাগলেন, 'কে কোথায় আছ মুসলিম বীর, এদিকে ছুটে এসো'। একজন সেনাপতি নির্বাচন করতে হবে। ছুটে এলো আরও কিছু মুসলিম সৈনিক। সাবেত এবং উপস্থিত অন্যান্য সৈনিকরা সেনাপতি হিসেবে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ-এর নাম প্রস্তাব করলেন।
খালিদ বিনীতিভাবে বললেন, 'সাবেত, তুমি আমাদের সকলের ভক্তিভাজন, তুমিই এর উপযুক্ত পাত্র। তুমিই আমাদের সেনাপতি।' কিন্তু দূরদর্শী সাবেত তাঁকে বাধা দিয়ে বললেন, 'খালিদ, ভাবপ্রবণতা ছাড়, কথা কাটাকাটির সময় এটা নয়। আমরা সকলে তোমাকেই সেনাপতি মনোনীত করেছি। মহানবী (সা:)এর পতাকা তুমি গ্রহণ করো এবং বলো আমাদের কি করতে হবে।'
খালিদ আর অপেক্ষা করলেন না। ভক্তিভরে মহানবীর যুদ্ধ-পতাকা হাতে তুলে নিলেন।
📄 যে যুদ্ধে ৮টি তরবারী ভাঙ্গে সেনাপতির
মুতার যুদ্ধ নিয়ে উদ্বিগ্ন মহানবী (সা)।
মুতায় সৈন্যদল পাঠাবার কয়েকদিন পর যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহের জন্যে আবু আমের আশআরী নামক একজন সাহাবীকে তিনি পাঠালেন মুতা অঞ্চলে।
তিন সেনাপতি শহীদ হওয়ার মর্মান্তিক খবর পেয়ে আবু আমের ছুটে এলেন মদীনায়। বললেন মহানবীকে, তিন সেনাপতি শহীদ হওয়ার পর খালিদ ইবনে ওয়ালিদ এখন সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
শহীদ তিন সেনাপতির মধ্যে জাফর ছিলেন মহানবী (সা)-এর চাচাতো ভাই। শহীদের আত্মীয়-স্বজনকে সান্ত্বনা দিয়ে মহানবী (সা) জনসমক্ষে এসে দাঁড়ালেন। বললেন সকলকে উদ্দেশ্য করে, 'সকলে যুদ্ধ যাত্রা কর, ভাইদের সাহায্য কর। একজন সমর্থ ব্যক্তিও যেন বাদ না পড়ে।'
যে যুদ্ধে যায়েদ, জাফর, আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহার মত বীর সেনাপতি পর পর শহীদ হন সে যুদ্ধ যে কতটা ভয়াবহ তা বুঝতে মদীনার কারোরই বাকী রইল না। তার উপর মহানবীর আহ্বান পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। অভূতপূর্ব এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো মদীনায়।
সাহাবীরা যে যে অবস্থায় ছিল, যে যা পেল তা নিয়ে ছুটলো মুতার দিকে। কেউ হেঁটে কেউ ঘোড়ায় বা উটে চড়ে। এই যুদ্ধ-যাত্রার ক্ষেত্রে কেউ কারও অপেক্ষা করেনি। কে কার আগে যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছতে পারে তারই যেন প্রতিযোগিতা। মহানবী (সা), হযরত আবু বকর (রা) এবং হযরত ওমর (রা)-একইভাবে মুতা যাত্রা করলেন।
মদীনা থেকে প্রেরিত এই সাহায্যের কি পরিমাণ যথাসময়ে মুতা যুদ্ধে খালিদ ইবনে ওয়ালিদের মুসলিম সেনাদলে শামিল হতে পেরেছিলেন, এটা বড় কথা নয়। বড় কথা হলো মদীনা থেকে সাহায্য পৌঁছেছিল। খৃস্টান শুরাহবিলের বাহিনীর জন্যে এটা ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক ধরনের বড় খবর।
সেদিন রাত শেষে খালিদ ইবনে ওয়ালিদ মুতা প্রান্তরে মুসলিম বাহিনীকে এমন কৌশলে ছকে ছকে দাঁড় করালেন যাতে মনে হতে লাগল মদীনা থেকে অসংখ্য সৈন্য মুতায় পুরাতন সেনাদলের সাথে যোগ দিয়েছে।
খৃস্টান বাহিনীকে স্তম্ভিত করল এই ঘটনা।
আর সেদিন মুসলিম বাহিনীও এমনভাবে যুদ্ধ শুরু করল যেন তারা শতগুণ শক্তিতে আজ উদ্দীপ্ত।
ভয়াবহ এক যুদ্ধ সংঘটিত হলো সেদিনও। অবশেষে খৃস্টান বাহিনী পিছু হটল। সেদিন প্রথমে তাদের মানসিক পরাজয় সূচিত হয়েছিল। সেই মানসিক পরাজয় ডেকে আনল যুদ্ধে তাদের এক শোচনীয় পরাভব।
মুতার যুদ্ধ চলেছিল প্রায় ৭ দিন ধরে। এক খালিদ ইবনে ওয়ালিদের হাতেই ৮টি তরবারি টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে তিনি ব্যবহার করেছিলেন নবম তরবারী।
মুতা ছিল তদানীন্তন আরব এলাকার বাইরে মুসলমানদের প্রথম যুদ্ধ এবং প্রথম বিজয়।
📄 ‘ফাতহুম মুবিনে’র প্রথম বন্দী
'ফাতহুম মুবিন' বা মক্কা বিজয়ের মহামুহূর্তটি সমাগত।
দশ হাজার মুসলিম সৈন্যের বাহিনী সেদিন গভীর রাতে মক্কার উপকণ্ঠ মাররুজ্-জাহরান উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছল এবং সেখানেই রাত যাপনের সিদ্ধান্ত নিলো।
মক্কার কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ান ও আরও কয়েকজন রাতে মক্কার চারদিকটা পর্যবেক্ষণে বেরিয়েছিল। তারা জানতো না মুসলিম বাহিনী মক্কার উপকণ্ঠে পৌঁছে গেছে। মাররুজ-জাহরান উপত্যকায় হাজার হাজার আলোর সারি দেখে স্তম্ভিত হলো আবু সুফিয়ান।
রহস্য উদ্ধারের জন্যে আবু সুফিয়ান অতি সন্তর্পণে এগুলো ঐ উপত্যকার দিকে। হঠাৎ আবু সুফিয়ান বন্দী হয়ে গেলো হযরত উমর (রা)-এর হাতে। হযরত উমর (রা) আরও কয়েকজনকে সাথে নিয়ে পাহারা দিচ্ছিলেন মুসলিম বাহিনীর অগ্রবর্তী দিকটা।
হযরত উমর (রা) আবু সুফিয়ানকে মহানবীর সামনে হাজির করে বললেন, সত্যের শত্রুদের সমূলে উৎপাটিত করার শুভমুহূর্ত সমাগত। আবু সুফিয়ান বন্দী। প্রতিশোধ গ্রহণ ও প্রতিফল দানের সময় উপস্থিত।
মহানবী (সা) এ প্রসঙ্গে না গিয়ে আবু সুফিয়ানকে সম্বোধন করে বললেন, আবু সুফিয়ান, এখনও তুমি সেই করুণা-নিধান 'ওয়াহদাহু লা-শারিকালাহু' কে চিনতে পারোনি?
আবু সুফিয়ান বিমর্ষভাবে আমতা আমতা করে বললো, 'তা, এখন পারছি বৈ কি। আমাদের ঠাকুর কেউ থাকলে আমাদের পানে তাকাতো।'
আবু সুফিয়ানের উত্তরে উৎসাহিত হয়ে মহানবী (সা) আবার জিজ্ঞাসা করলেন, 'আচ্ছা আবু সুফিয়ান, আমি যে আল্লাহর প্রেরিত সত্য নবী, এ ব্যাপারে এখনও কি তোমার সন্দেহ আছে?'
আবু সুফিয়ান বললো, 'এখনও কিছু কিছু সন্দেহ আছে?'
মহানবী (সা) বন্দী আবু সুফিয়ানের কথায় বিন্দুমাত্রও ক্রুদ্ধ হলেন না এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও গ্রহণ করলেন না।
শুধুমাত্র মহানবী (সা) আবু সুফিয়ান যখন ফিরে যাবার জন্যে উদ্যত হলেন, তখন তাকে আদেশ করলেন সকাল পর্যন্ত থেকে যেতে। মহানবী (সা) বোধ হয় চেয়েছিলেন আবু সুফিয়ান ফিরে গিয়ে গোঁট পাকাবার কোন সুযোগ না পাক।