📄 শেষ রক্তবিন্দুর লড়াই
১৭৯৯ সালের ৪ঠা মে। ইংরেজ, নিযাম ও মারাঠার মিলিত বাহিনী শ্রীরঙ্গপত্তমে বীর টিপুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
টিপু ও টিপু সুলতানের ছোট্ট বাহিনী নির্ভীকভাবে তাদের মুকাবিলা করলো। নিহত হলো অনেক শত্রু সৈন্য। কিন্তু শত্রুর বিশাল বাহিনীর প্রবল চাপে ভেঙ্গে পড়ল দুর্গের সিংহদ্বার।
ক্ষুদ্র বাহিনী সাথে নিয়ে টিপু সুলতান দুর্গদ্বার রক্ষার জন্যে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। গুলীর অবিরাম বৃষ্টি তাদের ভয় দেখাতে পারল না। অকস্মাৎ একটা গুলী এসে টিপুর বাম পাশে বিদ্ধ হলো। কিন্তু তিনি স্থান ত্যাগ করলেন না, তাঁর কোন সৈন্যও নয়।
টিপুর সৈন্যের মৃতদেহের স্তূপ দুর্গের দ্বার প্রায় বন্ধ করে দিল। এ সময় আরেকটি গুলী টিপু সুলতানের বাম বুক বিদ্ধ করল। অজস্র রক্তপাতে সিংহদিল টিপু লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে। কিন্তু অস্ত্র তিনি ত্যাগ করেননি। একজন ইংরেজ তাঁর স্বর্ণ নির্মিত তরবারির বাঁটের জন্যে অগ্রসর হলো। টিপু বাম বাহুর উপর ভর করে মাথাটা তুলে এক আঘাতে তাকে শেষ করে দিলেন। আরও একজন ছুটে এলো তাঁর দিকে। তাকেও তিনি শেষ করলেন। আরেকটি গুলী এসে এ সময় তাঁর কপালে বিদ্ধ হলো।
শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন টিপু। তাঁর মুখে কোন ভয়, দুশ্চিন্তা কিংবা উদ্বেগের ছাপ ছিল না, ছিল তাতে অসাধারণ এক প্রশান্তি ও দৃঢ়তার ছাপ। যেন গভীর প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছেন তিনি।
📄 অজেয় যে বাহিনী
বদর যুদ্ধের প্রারম্ভ।
যুদ্ধ তখনও শুরু হয়নি।
মক্কার কুরাইশদের মুশরিক (কাফের) বাহিনী এবং মহানবী (সা)-এর নেতৃত্বে মদীনার মুসলিম বাহিনী মুখোমুখি দণ্ডায়মান।
কুরাইশদের সহস্রাধিক সৈন্য বিপুল যুদ্ধ-সাজে সজ্জিত। কুরাইশ বাহিনীর শুধু সামনের কাতারেই আপাদমস্তক লৌহ বর্মে আচ্ছাদিত শতাধিক ঘোড়সওয়ার দেখা যাচ্ছে।
মহানবীর (সা) বাহিনীতে একটি মাত্র ঘোড়া। তলোয়ার ও তীর ছাড়া আর কোন অস্ত্র নেই তাদের।
যে কোন মুহূর্তে যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠবে।
চারদিকে শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনা।
মহানবী (সা) মুসলিম বাহিনীর প্রতিটি ব্যুহ, প্রতিটি ছত্র পরিদর্শন শেষে সবার সামনে এসে দাঁড়ালেন। সকলের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে আদেশ করলেন, সকলে সাবধান! তোমরা আগে আক্রমণ করবে না। বিপক্ষরা আক্রমণ করলে তীর নিক্ষেপ করে বাধা দেবে। সাবধান! আমি আদেশ না দেয়া পর্যন্ত আক্রমণ করবে না।
তারপর মহানবী (সা) প্রবেশ করলেন তাঁর জন্যে তৈরী কাপড়-ঘেরা বিশ্রাম স্থানে।
এ সময় কুরাইশ সৈন্যের পক্ষ থেকে তীর বর্ষণ শুরু হলো। একটি তীর এসে মুসলিম বাহিনীর মেহজা নামক সাহাবীর বক্ষ বিদীর্ণ করল। ঢলে পড়ল তার রক্তাক্ত দেহ মাটিতে। শাহাদাৎ বরণ করলেন তিনি।
মুসলিম সৈন্যের সকলের তীর তখনও তুনিরে আবদ্ধ। আক্রমণের হুকুম নেই মহানবীর। নীরবে তারা সকলে দেখল সাথীর মৃত্যু।
মহানবী (সা)-এর আরেকজন সাহাবী হারেছা ইবনে সুরাকা পানি পান করতে যাচ্ছিলেন। বিপক্ষের একটা তীর তাঁর কণ্ঠনালি বিদ্ধ করল। তিনিও শাহাদাৎ বরণ করলেন।
কিন্তু মুসলিম বাহিনী পাথরের মত স্থির, নিশ্চলভাবে দণ্ডায়মান। শান্ত, অচঞ্চল চোখে তারা দেখলো আরেক সাথীর মৃত্যু। মহানবীর আদেশ নেই তাই একটা তীরও তুনির থেকে বেরুলো না, একটা তরবারিও কোষমুক্ত হলো না। কারও চোখে প্রতিশোধের একটা স্ফুলিঙ্গও জ্বলল না।
কুরাইশ বাহিনীর ওমের ইবনে আহর ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়েছিল ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনীর অবস্থা, সংখ্যা, রণসজ্জা দেখার জন্যে। মুসলিম বাহিনীর চারদিক ঘুরে দেখার পর ফিরে গিয়ে সে বলল, মুসলমানদের সংখ্যা তিনশ'র বেশী হবে না। ওদের পেছনে সাহায্যকারী কেউ নেই এবং আত্মরক্ষার জন্যে তরবারি ছাড়া কোন অস্ত্র নেই তাদের। কিন্তু তাদের দেখে মনে হলো, একটি প্রাণের বিনিময় না দিয়ে তাদের একটি প্রাণনাশ করতে আমরা পারবো না। এমন বাহিনীকে জয় করা কঠিন।
📄 ‘সে আমর, আমিও আলী’
খন্দকের যুদ্ধ।
পরিখার ওপারে দশ হাজার মুশরিক সৈন্য। আর এপাড়ে প্রতিরোধের জন্য দাঁড়ানো আড়াই হাজার মুসলিম।
মদীনায় প্রবেশের মুখে পরিখা দেখে মুশরিক বাহিনী বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। কারণ পরিখা খনন করে প্রতিরোধের কৌশলের সাথে আরবরা পরিচিত নয়। বিমূঢ় ভাব তাদের কেটে যাবার পর তারা অস্থির হয়ে পড়ল। পরিখা অতিক্রমের জন্যে অগভীর ও প্রশস্ত কোন জায়গা তারা তালাশ করতে লাগল। পাহাড়ের কিনারে যেখানে পরিখা শেষ হয়েছে, সেখানে এমন একটি সুবিধামত জায়গা তারা পেয়ে গেল।
তারা পরিকল্পনা করল এই পথে তারা দুর্ধর্ষ ও অজেয় একটি ক্ষুদ্র বাহিনী প্রেরণ করবে। তারা ওপাড়ে গিয়ে পরিখার এই অংশকে শত্রুমুক্ত রাখবে এবং সেই সুযোগে অবশিষ্ট সৈন্য ঐ পথে নগরে প্রবেশ করবে।
তারা ক্ষুদ্র বাহিনীর সেনাধ্যক্ষ নির্বাচন করল আরবের সর্বজনবিদিত শ্রেষ্ঠ বীর আমর ইবনে আব্দে ওদ্দ এবং অমিত সাহসী তরুণ সেনাধ্যক্ষ ইকরামা ইবনে আবু জেহেলকে। আরবের মানুষের সাধারণ ধারণা, আমর একাই এক হাজার যোদ্ধার সাথে লড়াই করে জিততে পারবে।
আমর প্রথমে তার ঘোড়া নিয়ে লাফিয়ে পরিখা অতিক্রম করল। তারপর অন্যান্যরা।
আমর ওপাড়ে পার হয়েই ভয়াল আকারে তর্জন-গর্জন শুরু করে দিল, কে আছ যোদ্ধা, সাহস থাকলে এগিয়ে এসো আমরের সামনে।
একেতো শত্রুর একটি দল পরিখা অতিক্রমে সমর্থ হয়েছে! তার উপর পরিখা অতিক্রম করেছে আমর-এর মত পালোয়ান। প্রথমটায় মুসলমানরা চমকে গিয়ে কিছুটা বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। সে কারণেই আমর প্রথম দিকে তার আস্ফালনের কোন জবাব পেল না।
আমরের তর্জন-গর্জন অব্যাহত। আহ্বান জানাচ্ছে কাউকে সে যুদ্ধের। 'এই যে আমি আছি' বলে শেরে খোদা হযরত আলী বেরিয়ে এলেন। আমরের তুলনায় হযরত আলী বালক-সদৃশ। আমর মহাবীর ও বহুদর্শী এক বিশাল পালোয়ান।
আর হযরত আলী মাত্র এক নব্য তরুণ। মহানবী (সা) হযরত আলীকে লক্ষ্য করে ত্বরিত কণ্ঠে বললেন, 'জানো তো, সে আমর।'
হযরত আলী ঘুরে দাঁড়িয়ে সসম্ভ্রমে বললেন, 'সে আমর, আমিও আলী।'
বলেই হযরত আলী মহানবীর অনুমতি নিয়ে উলংগ তরবারী হাতে ছুটলেন অমরের দিকে। শুরু হলো যুদ্ধ। মুহূর্তেই ধুলায় অন্ধকার হয়ে গেল স্থানটা। অস্ত্রের ঝনঝনানি ছাড়া কিছুই দৃষ্টিগোচর হলো না কারও। ভয়াবহ এই যুদ্ধের একদিকে শক্তি, অন্যদিকে ঈমানের তেজ। শক্তির সাথে ঈমানের তেজের লড়াই। মহানবীর (সা) কণ্ঠে তখন করুণ প্রার্থনা, হে আল্লাহ, বদর যুদ্ধে ওবায়দাকে গ্রহণ করেছ, ওহোদের অনল পরীক্ষায় হামজাকে তুমি নিয়েছ, আর এই আলী তোমার সন্নিধানে উপস্থিত। সে আমার পরমাত্মীয়। আমাকে একদম স্বজন-বর্জিত করো না।
মুসলমানরা বাক্হীন রুদ্ধশ্বাসে ধুলায় অন্ধকার যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে তাকিয়ে। তাদের উদ্বিগ্ন, অচঞ্চল চোখ অপেক্ষা করছে ফলাফলের।
এক সময় ধুলায় অন্ধকার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আল্লাহু আকবার নিনাদ ধ্বনিত হলো হযরত আলীর কণ্ঠে। সংগে সংগে সহস্র কণ্ঠে আবেগ আনন্দ-আপুত প্রতিধ্বনি উঠল, আল্লাহু আকবার।
এই বিজয় আনন্দের বন্যাবেগ সৃষ্টি করল মুসলমানদের মধ্যে।
📄 খালিদের দুর্ধর্ষ বাহিনীও অবসন্ন
খন্দকের যুদ্ধ চলছে। আরব-খ্যাত বীর আমর হযরত আলীর হাতে নিহত এবং ইকরামা ইবনে আবু জেহেল ব্যর্থ হবার পর এবার মক্কায় মুশরিক সৈন্যের শেষ বড় ভরসা খালিদ ইবনে ওয়ালিদ এগিয়ে এলেন।
খালিদ বাছাই করা সৈন্য নিয়ে একটা অজেয় বাহিনী গঠন করলেন। দীর্ঘ পরিখা পর্যবেক্ষণ করার পর খালিদ আক্রমণের জন্যে সে স্থানটিই বেছে নিলেন যেখানে মহানবী অপেক্ষা করছেন।
তার কৌশল হলো, মহানবীর (সা) অবস্থান স্থলে যদি আকস্মিক সর্বাত্মক আক্রমণ কেন্দ্রীভূত করা যায়, যদি কোনভাবে মহানবীর অবস্থান এলাকায় বিপর্যয় ঘটানো যায়, তাহলে মুসলমানদের ভীত-সন্ত্রস্ত ও দুর্বল করা যাবে এবং সেই সুযোগে অরক্ষিত এ স্থান দিয়ে পরিখা অতিক্রম করা সম্ভব হবে।
এই পরিকল্পনা অনুসারে দুর্ধর্ষ সেনাপতি খালিদ তার কথিত 'অজেয়' বাহিনী নিয়ে আকস্মিকভাবে প্রচণ্ড আক্রমণ পরিচালনা করলেন মহানবীর অবস্থান স্থলের উপর।
ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। খালিদের লক্ষ্য হলো পরিখার তীর থেকে মহানবীর বাহিনীকে হটিয়ে দিয়ে তাদের পরিখা পাড় নিরাপদ করা, আর মুসলিম বাহিনীর চেষ্টা মুশরিক বাহিনীকে পরিখার তীর থেকে দূরে রাখা।
আক্রমণের বিরতি নেই। আক্রমণের ঢেউ একের পর এক এসে আঁছড়ে পড়ছে। এ যেন সাগরে অফুরন্ত ঢেউ-এর অব্যাহত আঘাত।
যুদ্ধ এমন এক ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছল যে, মহানবী (সা) এবং তার সাথীরা নামায পড়ার সময় পর্যন্ত কেউ বের করতে পারলেন না।
খালিদ এভাবে তাঁর আক্রমণ কয়েকদিন পর্যন্ত অব্যাহত রাখলেন। কিন্তু শেষে তাঁর 'নির্বাচিত দুর্ধর্ষ' সৈন্যরা ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে পড়ল। কিন্তু পরিখার ওপারে মুসলমানরা তখনও অস্ত্র উচিয়ে শির উঁচু করে দাঁড়িয়ে।
খালিদ ইবনে ওয়ালিদ সেদিকে হতাশ চোখে তাকিয়ে ভাবতে বাধ্য হলেন, পরিখা রক্ষাকারী মুসলিম সেনা-প্রাচীর ভেদ করা বা ভাঙ্গা তাদের পক্ষে সম্ভব নয় এবং পরিখা পার হবারও তাদের কোন সুযোগ নেই।