📄 সুলতান মাহমুদ মূর্তি বিক্রেতা নয়
সুলতান মাহমুদ সতেরবার ভারতে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। তিনি যেমন জয় করেছিলেন বহু রাজ্য, তেমনি প্রভূত সম্পদও সংগ্রহ করেছিলেন। অনেকেই তাঁকে সম্পদ লোলুপ বলে অভিযুক্ত করেন। কিন্তু সম্পদের জন্যই তিনি অভিযানগুলো পরিচালনা করেছিলেন তা প্রমাণ হয়না।
সোমনাথ মন্দিরের ঘটনা। সোমনাথ জয়ের পর সুলতান মাহমুদ সোমনাথ মন্দিরে প্রবেশ করলেন। বিশাল সোমনাথ মন্দির।
পাঁচশ' নর্তকী, তিনশ' গায়ক এবং মন্দিরে প্রবেশের পূর্বে ভক্তদের মাথা মুন্ডনের জন্যেই ৩০০ নাপিত ছিল এ মন্দিরে।
সুলতান মন্দিরে প্রবেশের পর পাঁচ গজ দীর্ঘ বিশাল সোমনাথ মূর্তির নাক ভেঙে দিলেন এক আঘাতে। তারপর মূর্তিটি গুঁড়িয়ে দিতে উদ্যত হলে ব্রাহ্মণরা প্রস্তাব করল মূর্তিটি না ভাঙলে সুলতানকে তারা প্রচুর স্বর্ণ উপহার দেবে।
সুলতানের কতিপয় কর্মচারীও সুলতানকে বুঝাল, মূর্তি ভেঙে কি লাভ। তার চেয়ে স্বর্ণ পেলে তা দান করে দিলেও প্রচুর পুণ্য হবে।
সুলতান মাহমুদ হাসলেন তাদের প্রস্তাব শুনে। তারপর গম্ভীর কন্ঠে বললেন, 'সুলতান মাহমুদ মূর্তি বিক্রেতা নয়, মূর্তি ধ্বংসকারী।'
মূর্তি ভাঙা হলো। মূর্তির বিশাল পেট থেকে বের হলো প্রচুর হিরা, পদ্মরাগ মণি, অঢেল মুক্তা যার মূল্য ছিলো ব্রাহ্মণদের প্রতিশ্রুত উপহারের চেয়ে বহু বহু গুণ বেশী।
📄 সুলতান মালিক শাহের প্রার্থনা
আফগানিস্তান, পারস্যসহ মধ্য এশিয়ার বিশাল অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত সেলজুক সুলতানদের শাসন।
১০৭২ সাল।
সেলজুক বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সুলতান মালিক শাহ তখন ক্ষমতায়।
ছোট ভায়ের সাথে বিরোধ চলছিল মালিক শাহের। সিংহাসনের দাবী করে বিদ্রোহ করেছিল তাঁর ছোট ভাই। সে সময়ের একটি ঘটনা।
সেলজুক সুলতান মালিক শাহ একদিন তাউস-এর একটা সমজিদ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। মসজিদ থেকে বের হবার পথে তিনি প্রধান উজির নিজামুল মুলককে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি মসজিদে যে দোয়া করেছেন সেটা কি?'
নিজামুল মুলক বললেন, 'আমি দোয়া করেছি আল্লাহ যাতে আপনাকে আপনার ভাইয়ের উপর বিজয় দান করেন।'
মালিক শাহ বললেন, 'আর আমি কি দোয়া করেছি জানেন?' জিজ্ঞেস করার পর তিনিই উত্তরে বললেন, 'আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে আমি এটুকুই বলেছি, হে আল্লাহ। জনগণের জন্য যার শাসন মঙ্গলকর হবে, তাকেই আপনি শাসন ক্ষমতা দান করুন।'
📄 শেষ রক্তবিন্দুর লড়াই
১৭৯৯ সালের ৪ঠা মে। ইংরেজ, নিযাম ও মারাঠার মিলিত বাহিনী শ্রীরঙ্গপত্তমে বীর টিপুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
টিপু ও টিপু সুলতানের ছোট্ট বাহিনী নির্ভীকভাবে তাদের মুকাবিলা করলো। নিহত হলো অনেক শত্রু সৈন্য। কিন্তু শত্রুর বিশাল বাহিনীর প্রবল চাপে ভেঙ্গে পড়ল দুর্গের সিংহদ্বার।
ক্ষুদ্র বাহিনী সাথে নিয়ে টিপু সুলতান দুর্গদ্বার রক্ষার জন্যে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। গুলীর অবিরাম বৃষ্টি তাদের ভয় দেখাতে পারল না। অকস্মাৎ একটা গুলী এসে টিপুর বাম পাশে বিদ্ধ হলো। কিন্তু তিনি স্থান ত্যাগ করলেন না, তাঁর কোন সৈন্যও নয়।
টিপুর সৈন্যের মৃতদেহের স্তূপ দুর্গের দ্বার প্রায় বন্ধ করে দিল। এ সময় আরেকটি গুলী টিপু সুলতানের বাম বুক বিদ্ধ করল। অজস্র রক্তপাতে সিংহদিল টিপু লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে। কিন্তু অস্ত্র তিনি ত্যাগ করেননি। একজন ইংরেজ তাঁর স্বর্ণ নির্মিত তরবারির বাঁটের জন্যে অগ্রসর হলো। টিপু বাম বাহুর উপর ভর করে মাথাটা তুলে এক আঘাতে তাকে শেষ করে দিলেন। আরও একজন ছুটে এলো তাঁর দিকে। তাকেও তিনি শেষ করলেন। আরেকটি গুলী এসে এ সময় তাঁর কপালে বিদ্ধ হলো।
শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন টিপু। তাঁর মুখে কোন ভয়, দুশ্চিন্তা কিংবা উদ্বেগের ছাপ ছিল না, ছিল তাতে অসাধারণ এক প্রশান্তি ও দৃঢ়তার ছাপ। যেন গভীর প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছেন তিনি।
📄 অজেয় যে বাহিনী
বদর যুদ্ধের প্রারম্ভ।
যুদ্ধ তখনও শুরু হয়নি।
মক্কার কুরাইশদের মুশরিক (কাফের) বাহিনী এবং মহানবী (সা)-এর নেতৃত্বে মদীনার মুসলিম বাহিনী মুখোমুখি দণ্ডায়মান।
কুরাইশদের সহস্রাধিক সৈন্য বিপুল যুদ্ধ-সাজে সজ্জিত। কুরাইশ বাহিনীর শুধু সামনের কাতারেই আপাদমস্তক লৌহ বর্মে আচ্ছাদিত শতাধিক ঘোড়সওয়ার দেখা যাচ্ছে।
মহানবীর (সা) বাহিনীতে একটি মাত্র ঘোড়া। তলোয়ার ও তীর ছাড়া আর কোন অস্ত্র নেই তাদের।
যে কোন মুহূর্তে যুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠবে।
চারদিকে শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনা।
মহানবী (সা) মুসলিম বাহিনীর প্রতিটি ব্যুহ, প্রতিটি ছত্র পরিদর্শন শেষে সবার সামনে এসে দাঁড়ালেন। সকলের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে আদেশ করলেন, সকলে সাবধান! তোমরা আগে আক্রমণ করবে না। বিপক্ষরা আক্রমণ করলে তীর নিক্ষেপ করে বাধা দেবে। সাবধান! আমি আদেশ না দেয়া পর্যন্ত আক্রমণ করবে না।
তারপর মহানবী (সা) প্রবেশ করলেন তাঁর জন্যে তৈরী কাপড়-ঘেরা বিশ্রাম স্থানে।
এ সময় কুরাইশ সৈন্যের পক্ষ থেকে তীর বর্ষণ শুরু হলো। একটি তীর এসে মুসলিম বাহিনীর মেহজা নামক সাহাবীর বক্ষ বিদীর্ণ করল। ঢলে পড়ল তার রক্তাক্ত দেহ মাটিতে। শাহাদাৎ বরণ করলেন তিনি।
মুসলিম সৈন্যের সকলের তীর তখনও তুনিরে আবদ্ধ। আক্রমণের হুকুম নেই মহানবীর। নীরবে তারা সকলে দেখল সাথীর মৃত্যু।
মহানবী (সা)-এর আরেকজন সাহাবী হারেছা ইবনে সুরাকা পানি পান করতে যাচ্ছিলেন। বিপক্ষের একটা তীর তাঁর কণ্ঠনালি বিদ্ধ করল। তিনিও শাহাদাৎ বরণ করলেন।
কিন্তু মুসলিম বাহিনী পাথরের মত স্থির, নিশ্চলভাবে দণ্ডায়মান। শান্ত, অচঞ্চল চোখে তারা দেখলো আরেক সাথীর মৃত্যু। মহানবীর আদেশ নেই তাই একটা তীরও তুনির থেকে বেরুলো না, একটা তরবারিও কোষমুক্ত হলো না। কারও চোখে প্রতিশোধের একটা স্ফুলিঙ্গও জ্বলল না।
কুরাইশ বাহিনীর ওমের ইবনে আহর ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়েছিল ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনীর অবস্থা, সংখ্যা, রণসজ্জা দেখার জন্যে। মুসলিম বাহিনীর চারদিক ঘুরে দেখার পর ফিরে গিয়ে সে বলল, মুসলমানদের সংখ্যা তিনশ'র বেশী হবে না। ওদের পেছনে সাহায্যকারী কেউ নেই এবং আত্মরক্ষার জন্যে তরবারি ছাড়া কোন অস্ত্র নেই তাদের। কিন্তু তাদের দেখে মনে হলো, একটি প্রাণের বিনিময় না দিয়ে তাদের একটি প্রাণনাশ করতে আমরা পারবো না। এমন বাহিনীকে জয় করা কঠিন।