📄 সালাহউদ্দীনের জানাযা
১১৯৩ সন। ২০শে ফেব্রুয়ারী। মক্কা মুয়াজ্জমা থেকে হাজীরা দেশে ফিরছেন। সুলতান সালাহ উদ্দীন হাজীদের কাফিলাকে আগ বাড়াতে গেলেন। গরম কাপড় না পরে ভিজা আবহাওয়ায় হাঁটাহাঁটি করে তাঁর জ্বর হলো। জ্বর থেকে আর উঠলেন না তিনি। ১১৯৩ সনের ৪ঠা মার্চ সারা মুসলিম জাহানকে কাঁদিয়ে সুলতান সালাহউদ্দীন ইন্তিকাল করলেন।
ইসলামের সোনালী ইতিহাসের এক অনন্য নায়ক সুলতান সালাহউদ্দীন। ১১৮৭ সনে খৃষ্টান ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা ও বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধার করার পর দীর্ঘ পাঁচ বছর রণাঙ্গনেই কাটাতে হয়েছে তাঁকে। জেরুসালেম হাতছাড়া হওয়ার সংবাদে গোটা খৃষ্টান ইউরোপ ক্রোধে ফুলে উঠেছিল। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানী, ডেনমার্ক, ইতালী প্রভৃতি ইউরোপীয় দেশ থেকে ১১৮৯ সনে ছয় লক্ষ খৃষ্টান সৈন্য ছুটে এসেছিল ফিলিস্তিনে। তারা সাথে করে নিয়ে এসেছিল গোটা ইউরোপবাসীর আয়ের এক-দশমাংশ। দীর্ঘ তিন বছর, ধরে সুলতান সালাহউদ্দীন যুদ্ধ করলেন উম্মত্ত ক্রুসেডারদের সাথে। কিন্তু সমগ্র ইউরোপের সমবেত শক্তিও সালাহউদ্দীনের সাথে এঁটে উঠতে পারেনি। ব্যর্থ হলো তাদের তৃতীয় ক্রুসেডও। প্রায় ৪ লক্ষ থেকে ৫লক্ষ ইউরোপীয়কে ভূমধ্যসাগরের বালুবেলায় চিরতরে শুইয়ে রেখে ক্রুসেডাররা ফিরে গেল দেশে। ফিলিস্তিনসহ গোটা নিকট প্রাচ্যের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে থাকলেন সুলতান সালাহউদ্দীন। সুলতান সালাহ উদ্দীন সমগ্র
ইউরোপে কি অপরিসীম ভীতির সৃষ্টি করেছিলেন, সালাহ উদ্দীনকে পরাভূত করার জন্য গোটা ইউরোপ থেকে তোলা 'সালাহউদ্দীন কর'ই তার প্রমাণ। ইউরোপের ভীতি ও এক বিশাল রাজ্যের একচ্ছত্র অধিনায়ক সেই সুলতান সালাহউদ্দীন ইন্তিকাল করলেন।
আল্লাহর পথে জিহাদের আত্মোৎসর্গিত এই সুলতান যখন মৃত্যুবরণ করলেন, তখন কপর্দকহীন ছিলেন তিনি। তিনি ইউরোেপত্রাস প্রবল প্রতাপশালী সুলতান ছিলেন, কিন্তু তাঁর কোন সিংহাসন ছিলনা, ছিল না বিলাস ব্যসনের কোন রাজ প্রাসাদ। রাজ্যের সাধারণ রাজকোষ ছিল, কিন্তু তাঁর নিজস্ব কোন তহবিলের অস্তিত্ব ছিল না। নিজের জীবন, সম্পদ সব কিছুকেই তিনি উজাড় করে দিয়েছিলেন জিহাদে। তিনি যদি চাইতেন, যে শক্তি তাঁর ছিল তা দিয়ে তিনি বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন, কিন্তু তা তিনি চাননি। তিনি চেয়েছিলেন ইসলামের বিজয়, নিজের জন্য কোন রাজ্য প্রতিষ্ঠা নয়। এ পথেই তিনি তাঁর সবকিছু উজাড় করে দিয়েছিলেন। তাঁর যেদিন মৃত্যু হলো, সে দিন জানাযার খরচ সংকুলানের অর্থও তাঁর কাছে পাওয়া যায়নি। ধার করা অর্থে তাঁর জানাযার কাজ সম্পন্ন করা হয়েছিল।
📄 সেনাপতি তারিক ফেরার জাহাজ পুড়িয়ে দিলেন
৭১১ সন। মুসলিম সেনাপতি তারিক ইবন যিয়াদ ভূমধ্য সাগর পাড়ি দিয়ে স্পেনের মাটি-জিব্রালটারে পা রাখলেন। তাঁর সাথে ৭শ' সৈন্যের এক ক্ষুদ্র বাহিনী। এ ক্ষুদ্র বাহিনী দেখে স্পেনরাজ রডারিক হেসেই আকুল। সাগর-উর্মির ন্যায় বিপুল রডারিকের সৈন্যদের মুকাবিলায় দাঁড়িয়ে মুসলিম সৈনিকদের মনেও অজ্ঞাতে নানা প্রশ্ন ভিড় জমিয়েছিল। কিন্তু সেনাপতি তারিক অচল-অটল। বিজয় আসে সত্য-ন্যায়ের শক্তিতে, সংখ্যাধিক্যে নয়। বদর উহুদ, ইয়ারমুক, কাদেসিয়া প্রভৃতি কত ক্ষেত্রে কতবার তা প্রমাণ হয়ে গেছে।
অকুতোভয় তারিক ইবন যিয়াদ জিব্রালটারে নেমে জাহাজে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিলেন সব জাহাজ। তারপর সৈন্যদের দিকে চেয়ে বললেন, "চেয়ে দেখ বন্ধুগণ, গভীর সমুদ্র আমাদের পেছনে গর্জন করছে। আর সামনে অন্যায় অবিচারের প্রতীক বিশাল রডারিক বাহিনী। আমরা যদি পালিয়ে যেতে চাই, সমুদ্র আমাদের গ্রাস করবে। আর যদি আমরা সামনে অগ্রসর হই, তাহলে ন্যায় ও বিশ্ব-কল্যাণ প্রতিষ্ঠার স্বার্থে আমরা শহীদ হবো, কিংবা বিজয় মাল্য লাভ করে আমরা গাজী হবো। এই জীবনমরণ সংগ্রামে কে আমার অনুগামী হবে?” মুসলিম বাহিনীর প্রতিটি সৈনিকই বজ্র নির্ঘোষে 'তাকবীর' দিয়ে সেনাপতি তারিকের সাথে ঐক্যমত ঘোষণা করল।
স্পেনরাজ রডারিকের প্রধান সেনাপতি থিওডমিরের নেতৃত্বাধীন বিশাল এক বাহিনীর সাথে মুসলিম সৈন্যের প্রথম যুদ্ধ সংঘটিত।
হলো। সে এক অসম যুদ্ধ। যুদ্ধ বিজ্ঞানের উচিত অনুচিতের দৃষ্টিকোণ থেকে মনে হবে, নিতান্ত আত্মহত্যার খাহেশ নিয়েই ৭০০ সৈন্যের মুসলিম বাহিনীটি এ বিদেশ বিভুয়ে এসে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
কিন্তু এই অসম যুদ্ধই এক ইতিহাস সৃষ্টি করল। জানবাজ মুসলিম বাহিনীর প্রচন্ড পাল্টা আক্রমণে রডারিক বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলো।
মুসলিম সৈন্য ও তাদের সেনাপতির শৌর্যবীর্য ও সাহস দেখে সেনাপতি থিওডমির বিস্মিত ও স্তম্ভিত হয়ে রাজা রডারিককে লিখে পাঠালেন, "সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করেও অদ্ভুত শৌর্য বীর্যের অধিকারী মুসলিম বাহিনীর অগ্রগতি আমি রুখতে পারলামনা।?”
এই ভাবেই সত্যের জয় হল-ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন হলো স্পেনে। তারপর গৌরবময় মুসলিম শাসন চললো সেখানে দীর্ঘ ৭শ' বছর ধরে। কর্ডোভা, গ্রানাডা, মালাগাকে কেন্দ্র করে যে মুসলিম সভ্যতার বিকাশ ঘটল, তা সারা ইউরোপকে আলোকিত করে তুললো। অন্ধকার ইউরোপের বুকে সূর্যশিখার মতোই জ্বলছিল কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞান শিখা। সেখানে জ্ঞান আহরণের জন্য ইউরোপের সব দেশ থেকেই ছুটে এসেছিল জ্ঞান পিপাসুরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম মনীষীদের কাছ থেকে সেদিনের অন্ধকার ইউরোপ জ্ঞানের এ.বি.সি.ডি শিক্ষা করল। কর্ডোভার এই ছাত্ররাই ছিল ইউরোপীয় জাগরণের স্থপতি। সুতরাং আজকের যে ইউরোপ তার ঘুম ভাঙিয়েছে মুসলমানরাই। আর তাদের এ ঘুম ভাঙার প্রথম গান গেয়েছিলেন তারিক ইবন যিয়াদ। তিনি গোথিক শাসনের নির্মম নিষ্পেষণ থেকে শুধু স্পেনকেই মুক্ত করেননি, বলা চলে স্মরণাতীত কালের অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকেও তিনি জাগিয়েছেন ইউরোপকে।
📄 সন্তানের প্রতি সুলতান সালাহউদ্দীন
সুলতান গাজী সালাহ উদ্দীন তাঁর পুত্র জহিরকে প্রাদেশিক শাসনকর্তার পদে নিয়োগের সময় বলেনঃ "হে আমার পুত্র, আমি তোমার মনোযোগকে সমস্ত মংগলের উৎস আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দিকে আকর্ষণ করছি। যেখানে বা যে কাজে তাঁর মঞ্জুরী আছে, সেখানেই শান্তি নিহিত। রক্তপাত থেকে বিরত থাকবে। এর উপর কখনও ভরসা করো না। কারণ যে রক্ত প্রবাহিত হয় তা কোন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না করে যায় না। তোমরা জনগণের মন জয় করার চেষ্টা করবে, তাদের উন্নতির জন্য কাজ করবে। স্মরণ রেখ, তাদের মঙ্গল বিধানের জন্যই আল্লাহ তোমাকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন, আমার নিয়োগও এই জন্যই। আমি যদি উল্লেখযোগ্য কোনও কারণে হয়ে থাকি, তাহলে তা এই জন্যই যে, আমি ভদ্রতা ও দয়ার মাধ্যমে যথাসাধ্য মানুষের হৃদয় জয় করতে চেষ্টা করেছি।”
📄 সুলতান সালাহউদ্দিন এবং এক শত্রুশিশু
মুসলিম এবং খৃষ্টান ক্রুসেডারদের মধ্যে আক্রায় তখন ঘোরতর যুদ্ধ চলছিল। এ সময় একদিন একজন খৃষ্টান মহিলা কাঁদতে কাঁদতে তাঁবু থেকে বেরিয়ে সুলতান সালাহ উদ্দীনের তাঁবুর দিকে ধাবিত হলো। কিন্তু তাঁবুতে পৌঁছার আগেই প্রহরীরা তাকে থামিয়ে দিল। মহিলাটি প্রহরীর প্রতি করুণ আবেদন জানিয়ে বলল, 'আমাকে সুলতানের নিকট নিয়ে চলুন।' প্রহরী মহিলার আবেদনে নরম হয়ে সুলতানের কাছে নিয়ে গেল।
ক্রন্দনরত মহিলাকে সুলতান জিজ্ঞেস করলেন, তার কি হয়েছে। মহিলাটি অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলল, "আমার শিশু সন্তানকে মুসলিম সৈন্যরা ধরে এনেছে।” এ কথা শুনে সুলতান খুব ব্যথিত হলেন এবং শিশুটিকে খুঁজে এনে দেয়ার জন্য তৎক্ষণাৎ নির্দেশ দিলেন। সহজে শিশুটি পাওয়া গেল। সন্তানকে ফেরত পেয়ে মা আনন্দিত হলো। প্রহরীরা তখন সন্তানসহ মহিলাকে খৃষ্টান তাঁবুতে পৌঁছে দিল।